কালীঘাটের পট একসময় বাঙালির ঘরে ঘরে ঠাঁই পেত। ব্রিটিশদের জাদুঘরেও ঠাঁই হয়েছে কালীঘাটের পটের। কালীঘাটের পটচিত্র নিয়ে হাজার হাজার গবেষক গবেষণা করেছেন। লেখা হয়েছে অনেক বই। কিন্তু নতুন কিছু বলা হয়নি সেসব বইয়ে। সবই চর্বিতচর্বণ।
কালীঘাটের পটের পটভূমিকা না জানলে এর অঙ্কনশৈলীর বিশেষত্ব অনুধাবন করা যায় না৷ মূলত তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের জন্য পটুয়া তথা পটশিল্পীরা এই পট এঁকে দিতেন৷ গরিব পটুয়াদের ছিল উপকরণ ও সময়ের অপ্রতুলতা৷ এক তীর্থযাত্রীর পেছনে খরিদ্দার হিসেবে দাঁড়িয়ে যেত আর এক তীর্থযাত্রী৷ কালীঘাটের একটি স্মৃতিচিহ্ন ছাড়া পটের মূল্য তাদের কাছে কিছুই ছিল না৷ তারা কেউ শিল্পবোদ্ধা ছিল না৷
পটশিল্পীরা অত্যন্ত দ্রুতলয়ে একটি মাত্র তুলি দিয়ে, মাত্র দুয়েকটি রং ব্যবহার করে কাগজে ছবি আঁকতেন৷ তুলির কালি শেষ হওয়ার আগেই একটানে আউটলাইন সম্পূর্ণ করতেন তাঁরা৷ বংশপরম্পরায় শেখা অভ্যাস ও পটুত্ব দিয়ে পটের ছাঁদটি ফুটিয়ে তুলতেন ওঁরা৷ তবে একে অশিক্ষিতপটুত্ব বলে অবহেলা করা যাবে না। তাড়াতাড়ি ছবিটা সম্পূর্ণ করার জন্য বক্ররেখা বা Curve এর ব্যবহার বেশি করতেন, কৌণিক বা Angular হত না রেখাচিত্রগুলি৷ এতে নরনারীর অবয়বে স্থূলত্ব আরোপিত হত৷ হাত-পায়ের গড়ন, পশ্চাদ্দেশ ও বক্ষ এক বিশেষ পৃথুলভাব পরিগ্রহ করত৷ অনেক বিশেষজ্ঞ এতে তৎকালীন অন্তঃসারশূন্য সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতির স্থূলত্ব, বাবুকালচারের স্থূলরুচির বিরুদ্ধে পটশিল্পীদের তীব্র ব্যঙ্গ বা শ্লেষের গন্ধ খুঁজে পান৷

আমার মনে হয়, অত গভীরে যাওয়ার দরকার নেই৷ গরিব শিল্পীরা বাজার-অর্থনীতির তাড়নাতেই পটের জমি দ্রুত ভরিয়ে তোলার জন্য এই স্থূলতা-টেকনিক নিয়েছিলেন৷ বাস্তবানুগ বা রিয়েলিস্টিক শরীর আঁকতে গেলে যে সময় ব্যয় হয়, স্থূল দেহাবয়ব আঁকতে তার চেয়ে সময় কম তো লাগেই, রোগা শরীরের চেয়ে মোটা পৃথুল শরীর দিয়ে পটের জমিও তাড়াতাড়ি ভরিয়ে ফেলা যায়৷ পেছনে যে আর এক তীর্থযাত্রী তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে আছে! কৌণিক রেখার ব্যবহার পারতপক্ষে করতেন না পটশিল্পীরা, কার্ভ বা বক্ররেখার ব্যবহার ছিল অনিবার্য টেকনিক৷ দ্রুততার সঙ্গে ছবি শেষ করার জন্যই তৈরি হয়েছিল এই বিশেষ ফরমুলা৷
‘পট’ শব্দের একটি আভিধানিক অর্থ ‘অতি দ্রুত’৷ পট করে বলে ফেলা, পট করে শেষ হয়ে যাওয়া, পট করে উত্তর দেওয়ার মতো পট করে এঁকে দেওয়া ছবিকেই বলা হত পটচিত্র৷ কালীঘাটের পটচিত্র আর কিছুই নয়, বাজারমুখী তীর্থক্ষেত্রভিত্তিক এক অঙ্কনরীতি, যা মূলত অধৈর্যের প্রশমনার্থে চটজলদি তৈরি করে দিত হাতে-গরম ‘কালীঘাটের পট’৷
কালীঘাটের পটশিল্পীরা নরনারীর দেহ আঁকার কতগুলি আর্কেটাইপ সৃষ্টি করেছিলেন৷ নারীদেহের অনাবৃত অংশগুলি প্রথমে মেটে লাল রঙে রাঙিয়ে তুলতেন৷ তারপর সাদা অংশকে শাড়ির রূপ দিতেন৷ হাতের পাতা আঁকার জন্য বৃত্তাকার হাত এঁকে তাতে পাঁচটি আঙুল নিখুঁত ভঙ্গিমায় বসিয়ে দিতেন তাঁরা, বাবুকালচারের বাবুর মাথায় বাবরি চুল আঁকার জন্যও স্টিরিয়োটাইপ পদ্ধতি ছিল৷ বলা বাহুল্য, এসবের পেছনেই ছিল খরিদ্দারের তাড়া, সময়ের অপ্রতুলতা৷
অল্প সময়ে অতি দ্রুত অপরিসীম মুনশিয়ানার সঙ্গে অধিকাংশ পটশিল্পীকে ছবি আঁকা শেষ করতে হত৷ হাজার হাজার তীর্থযাত্রীকে সন্তুষ্ট করতে হত তাদের। তাই তৈরি হত কালীঘাটের ‘পট’। চটপট, হাতে-গরম এইরকম ছবির রেওয়াজ নতুনভাবে ফিরে এসেছে কলকাতা বইমেলা তথা অন্যান্য বইমেলায়৷ কালীঘাটের পটুয়ার মতো সক্রিয় হয়ে উঠছে ‘ধাপার মাঠের’ মঁমার্ত শিল্পীরাও৷ প্যারিস, মাদ্রিদ, রোম, সর্বত্রই দেখেছি মানুষের মুখ অতি দ্রুততার সঙ্গে এঁকে দিচ্ছেন ফুটপাথ ও রাস্তায় বসা অনামী শিল্পীরা।প্যারিসের পট বলে একে ডাকাই যায়।