নিজের রোগের কথা বলতে কার আর ভাল লাগে! তবুও সেই রোগ নিয়েই শুরু করি। বিশ বছর থেকে ধমনীতে, কোষের মজ্জায় বেজায় বেশি পরিমাণে ডায়াবেটিস বহন করে বেড়াচ্ছি। প্রতিদিন দু বেলায় মোট ৫৫ ইউনিট ইনসুলিন নিই। আর ট্যাবলেট ক্যাপসুল মিলে ২৪ ঘণ্টায় খাই ৯টি। শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী সামশুল হালসানার পরামর্শে মাস চারেক থেকে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক চিকিৎসক শেখ আব্বাসুদ্দিনের দেওয়া বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে আগের থেকে বেশ কিছুটা ভাল আছি। কিন্তু দুই দশকের ডায়াবেটিস চোখের দৃষ্টিশক্তির অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে, বছর পাঁচেক আগেই। তাই ছাপার অক্ষর পড়তে পারি না বললেই চলে।
ট্যাবে ও কম্পিউটারের অক্ষর অতিরিক্ত আলোয় উদ্ভাসিত এবং অক্ষরগুলো নিজের সুবিধা মতো বড় করে নেওয়া যায়। তাই কিছুটা কষ্ট হলেও ট্যাব ও কম্পিউটারই এখন আমার পড়া ও লেখার একমাত্র ভরসা। এই ভরসা আর কত দিন টিকে থাকবে তাতেও সংশয় দেখা দিয়েছে। আজ ২১ জুলাই কাকভোরে সেই ট্যাবেই ভেসে ওঠে আজকালে প্রকাশিত সৌরভ হোসেনের লেখা ছোটগল্প ‘কেটলি’। দিন পাঁচেক আগে তিনি তাঁর ফেসবুক ওয়ালে গল্পটি পোস্ট করেছেন। কাকভোরে গল্পটি পড়ার পর স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে আমার পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখলাম এবং সৌরভের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করলাম। কিন্তু পোস্ট করার সময় ভুল বোতামে চাপ পড়ে যাওয়ায়, নাকি লেখাটি আয়তনে বড় হওয়ায় ঘণ্টা দুয়েকের কষ্টার্জিত পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যায়। ডিলিট হয়ে যায়। সৌরভ পড়েছে বলে জানালেও আমি তাঁর ওয়ালে এখনও লেখাটি দেখতে পাচ্ছি না। এ কারণে আমার অসুখের কথা সাতকাহন করে বললাম। অবশেষে শোক সামলে তাই এবার আমার নিজের ওয়ালেই লিখতে বসলাম।
গল্পটি পড়তে পড়তে টাইম মেশিন আমাকে নিয়ে চলে গিয়েছিল চার দশকের অতীতে। তখন ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রাক্তন নকশাল নেতা শৈবাল মিত্রের একটি ছোটগল্প পড়ে ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম। সেই হ্যাঙ্গওভারের তাড়নায় গৃহশিক্ষকতায় উপার্জিত টাকা দিয়ে ওই বছরের কলকাতা বইমেলা থেকে শৈবাল মিত্রের সব উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ কিনেছিলাম। দেশে পড়া গল্পটি ছিল, এক মামুলি কেরানির সৎ থাকার সংগ্রাম ও নিজস্ব একটি পাকাঘর তৈরি করার স্বপ্নকল্পনার অধরা বাস্তবের কাহিনি। সত্যনিষ্ঠ মামুলি কেরানি মাকে নিয়ে তাঁর দুঃখী সংসারে জন্য নিজের বৌও জোটাতে পারেননি তিনি।
আমি তখন ছিলাম আগুনখোর বিপ্লবী। তাই ‘বুর্জোয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত শৈবাল মিত্রের গল্পটি পড়তে বলতাম সহকর্মী কমরেডদের। তাঁদের আরও বলতাম, ‘বুর্জোয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত ওই গল্পটি ‘বিপ্লবী’ পত্রিকা ‘পথিকৃৎ’ ছাপতে পারলে ধন্য হয়ে যেত। শুনে বিপ্লবীরা নাক কুচকাতেন। মহানগরী কলকাতার অধ্যাপক শৈবাল মিত্রের ওই গল্পটির জাতগোত্রের সঙ্গে মফস্বল বাংলার প্রত্যন্ত হরিহরপাড়ার ভূসন্তান সৌরভের ‘কেটলি’র মিলমিশ বেশ জব্বর। সৌরভ যাকে কেটলি বলেছেন সেটি অনেকের কাছে টিফিন ক্যারিয়ার। আর কেটলি সাধারণত চায়ের দোকানে ব্যবহৃত নলওয়ালা পাত্র।
জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে যাওয়া ইয়াকুব-আয়েশা দম্পতি নিঃসন্তান কিনা গল্পপাঠ শেষে বোঝা গেল না। ওই দুটি জিজ্ঞাসা বাদ দিলে কট্টর সমালোচকের পক্ষেও কেটলির সৌরভে মোহিত না হয়ে উপায় নেই। ‘কবরেই তো আছি। ভাত আর ভাতার।’ মাত্র ছয়টি শব্দের দুটি বাক্যে কেবল ইয়াকুব-আয়েশার দাম্পত্যেরই নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ আর্থিক ভাবে পিছড়েবর্গের সব দাম্পত্যজীবনেরই চালচিত্র উঠে এসেছে। জীবন্তরূপ পেয়েছে আয়েশার ‘কবর’ সদৃশ জীবনমৃত যাপনযন্ত্রণা।
ভুঁই, বাতাল, বিত্তি, কাহান, কুতকুতে, ঘুতঘুত, টুকঝুক, দোজখ, তওবা, ফ্যাঁকড়া, ডিহি, শুকরিয়া, আশমান, ফেরেস্তা, দুনিয়াদারি, নটঘট, টুসকা, কষটে, ছিদল, হিলহিল, ঝুপঝুপ, শাহান, লিয়ি, থপ করে, কুত করে — এজাতীয় গ্রামীণ শব্দের সঙ্গে নগরজীবন অভ্যস্থ নয়। নগর জীবনের এই অনভ্যস্ত শব্দ ছাড়া ছোট ভৈরব পাড়ের গ্রামজীবন জীবন্ত হয়ে উঠবে না। প্রমিত বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারকে তাই এই গল্প লোকজ শব্দ জুগিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।
কেটলি করণিক, ঘণ্টা কেরানি, পিতল রঙের রোদ, ভাত আর ভাতার এর মতো শব্দ কয়েন তৈরি করে আর এক মুর্শিদাবাদী সাহিত্যিক আবুল বাশারের শিল্পশৈলিকে মনে করিয়ে দিয়েছেন সৌরভ।
সত্যনিষ্ঠ ইয়াকুবকেও পুরোপুরি সৎ থাকতে দেয়নি বঙ্গের সর্বগ্রাসী দলতন্ত্রিক রাজনীতি। কূট রাজনীতির টানাপোড়নে কখন যে কোন দল ক্ষমতা দখল করে তা অনিশ্চিত। তাই পানিশমেন্ট বদলির আশঙ্কা আটকাতে আর অবসরকালে পেনসনের ঝুট ঝামেলা এড়াতে ইয়াকুবকে শাসক ও বিরোধী উভয় দলের মিছিলেই মুখ দেখানোর লুকোচুরি খেলতে হয়। অন্দরে-বাইরে লড়াই করে সৎ থাকা ইয়াকুবকে দলতন্ত্রের বাধ্যবাধকতাজনিত তঞ্চকতায় পা মেলাতে হয়েছে। গণতন্ত্রহননকারী রাজনীতি এননই শক্তিমান। ফলে গল্পটি সমকালের দলিলও বটে। যুগসন্ধির কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) সিপাহি বিদ্রোহের ঘোরতর শত্রু ছিলেন। ঔপনিবেশিক ইংরেজের ছিলেন পরম বন্ধু। যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর ও প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশের সহায়তায় ১৮৩১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘সংবাদ প্রভাকর’। ১৮৩৯ সালে সেই পত্রিকাটিই বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পত্রিকার মাধ্যমেই শিল্প-সাহিত্য জগতে মুসলিম বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়। অতি প্রভাবশালী এই প্রবল ধারাটির প্রবল প্রবাহের জোরে বাংলা সাহিত্য ও সিনেমায় মুসলিম চরিত্রগুলো খুনি, চোর, ডাকাত, চাকর, খানসামা, বাবুর্চি, দারোয়ান, ঘোড়ার গাড়ির সহিস, গাড়ির ড্রাইভার হোটেল-বয় ও কষাই-এর উপরে উঠতে পারেনি।
অকৃতদার, বহু ভাষাবিদ হাজি মুহম্মদ মহসিন (১৭৩২-১৮১২) ছিলেন দুই বাংলার বিশাল জমিদারির মালিক। আমজনতার, বিশেষত মুসলমানদের ধর্মাচরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে ১৮০৬ সালে তিনি তাঁর জমিদারির সবটা দান (ওয়াকফ) করে দেন। তারপর জীবনের শেষ ছয়টি বছর তিনি তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে কোরান নকল করার পারিশ্রমিকে দিনাতিপাত করেছেন। এমন দৃষ্টান্ত ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও তাঁদের অনুগামী মনুবাদীদের বিদ্বেষবিষের চিন্তাচেতনা থেকে মুক্ত করতে পারেনি।
তাঁর নিজের জীবনের দ্বিতীয়ার্ধের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রোকেয়া সাখওয়াত হোসেন, কাজি নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, সমরেশ বসু, আব্দুল আজিজ আল আমান, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আব্দুল জাব্বার, আবুল বাশার প্রমুখ সাহিত্যিকদের কলমে উন্নততর চরিত্রের মুসলিম পাত্রপাত্রীর আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁদের প্রবন্ধ-নিবন্ধেও বিদ্বেষবিষের বিরুদ্ধে অসির মতো করেই ঝলসে উঠেছে মসির তরবারি। সেই ঐতিহ্যের অনুগামী সৎ ও সুন্দর ইয়াকুব চিত্রিত হয়েছেন গল্পকার সৌরভ হোসেনের কলমে। বাংলা সাহিত্যের বিশেয একটি শূন্যস্থান পূরণের খুব প্রয়োজনীয় চেষ্টায় তিনি মগ্ন থেকেছেন। গল্পটি কোন দিকে মোড় নেবে তা শেষের শেষ অনুচ্ছেদের আগে পাঠকের কল্পনাতীত ছিল।
এই মুন্সিয়ানা গল্পকারের স্বকীয় অর্জন।