ভারতীয় সিনেমা জগতের ইতিহাসে ‘পাঠান’ প্রায় দু-ডজন রেকর্ড ব্রেক করতে চলেছে। স্রেফ সেই কারণেই কি ‘পাঠান’- এর পাশে দাঁড়িয়ে গদগদ চিত্তে আমরা শাহরুখ খানের পিঠ চাপড়াবো? একদমই না।
দিনেরাতে কাড়ি কাড়ি, শত-সহস্র কোটি টাকা কামাচ্ছে, ৫ দিনে ৫০০ কোটির বুড়ি ছুঁয়েছে — স্রেফ এই কারণেই কি বেনিয়াদের সঙ্গে আহ্লাদে আটখানা হয়ে ‘পাঠান কি জয়’ আর ‘দীপিকা কি জিন্দাবাদ’ বলে কি শোর মাচাবো? একেবারেই না।
‘পাঠান’ বক্স অফিস ফ্লপ করলে কি আমরা, আজকের জন আব্রাহাম ভক্তরা চায়ের কাপে ভেজানো বিস্কুটের মতো টুপ করে কাপের মধ্যে পড়ে গিয়ে চায়ের সঙ্গে মিশে যেতাম? কখনওই না।
স্থান-কাল-পাত্রের মতো কাণ্ডজ্ঞানটা মাথায় রাখলে ‘মুঘলে আজম’, ‘গীত’, ‘শোলে’ ও ‘অমানুষ’-এর মতো জনউন্মাদনার জারক রসে জারিত বেশ কিছু সিনেমার কথা অবশ্যই আজও বিবেচনায় আসতে বাধ্য। এমনকি সময়ের দাঁড়িপাল্লায় মূল্যমানের বিচার করলে অর্থমূল্যেও তারা ফেলনা নয়।
এমনই তার মনমোহিনী শক্তি যে, সিনেমাটি রিলিজ হওয়ার সমকালে একটি ‘মার্কসবাদী’ দলের একজন প্রৌঢ় জেলা সম্পাদক টানা সাত দিন মু্র্শিদাবাদ জেলাসদর বহরমপুর শহরের একটি সিনেমাহলে গিয়ে ‘শোলে’ দেখেছিলেন।
শাহরুখ খানের কাছ থেকে বিগত ও বর্তমান প্রজন্ম প্রেমের পাঠ নিয়েছে ও নিচ্ছে বলার মতো জোলো কারণের জন্যও আমরা ‘পাঠান’-এর ভাই-বেরাদর নই। প্রেম-প্রশিক্ষণের জন্য শাহরুখের অনেক আগে থেকে আমাদের সামনে রবীন্দ্রনাথ, উত্তম-সুচিত্রা, শরৎচন্দ্র, নজরুল ছিল। শেক্সপীয়র ছিল। তারও শত-সহস্র বছর আগে অর্জুনের প্রতি অনুরক্ত ছিল কুমারী দ্রৌপদী। লায়লা-মজনু ছিল, শিরি-ফরহাদ ছিল। ইলিয়াড-ওডিসি ছিল।

এ জাতীয় নানা কথা সত্ত্বেও এবং বক্স অফিস শোচনীয় ভাবে ফ্লপ করলেও মুক্তবুদ্ধির মানুষ, গণতান্ত্রিকতায় আস্থাশীল মানুষ, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা-দেশ-বিদেশ নির্বিশেষে মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেওয়া অমৃতের সন্তানরা বিনাবাধায় ‘পাঠান’ প্রদর্শনের দাবির পক্ষেই থাকতেন। সেটিই স্বাভাবিক ছিল এবং এখন স্বাভাবিক।
বছর চারেক আগে, ২০১৮ সালে কাশ্মীরের একটি মন্দিরের ভিতরে ৮ বছরের নাবালিকা আসিফাকে কয়েকদিন আটকে রেখে গেরুয়াবসন পরে কয়েকজন ‘গোছানা’ কয়েকদিন ধরে ধর্ষণ করে খুন করেছে। তখন গেরুয়াবসন অসম্মানিত হয়েছিল বলে তো শোনা যায়নি!
২০০২ সালে মুখ্যমন্ত্রী মোদী শাসিত গুজরাতে রাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর আদরলালিত গেরুয়া পোশাকপরা নরাধমরা মাতৃগর্ভ চিরে ৯ মাসের ভ্রুণকে পেট থেকে বের করে ত্রিশূল-তরোয়ালের ডগায় গেঁথে, শূন্যে তুলে পৈশাচিক নৃত্য করেছিল। তখন গেরুয়া রং অসম্মানিত হয়েছিল বলে তো শোনা যায়নি!
এই সব কারণেই বিদ্বেষবিষের গোয়ালে পালিত গোছানাদের রক্তচক্ষুর রোষানলে পড়া ‘পাঠান’-এর পক্ষেই আমরা। সরকারি করমুক্ত বিদ্বেষবিষের প্রোপাগান্ডা ‘কাশ্মীর ফাইলস’-এর বিরুদ্ধেই আমরা। ২০০২ সালে ‘স্টেট স্পনসর্ড’ গুজরাত গণহত্যা নিয়ে বিবিসি নির্মিত তথ্যচিত্র ‘ইন্ডিয়া: দ্যা মোদী কোশ্চেন’ অবাধ সম্প্রচারের পক্ষেই আমরা। তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা থেকে ‘বিতাড়ন’-এর বিপক্ষেই আমরা। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ‘পাঠান’ এরও পক্ষে আমরা। অন্যকোনও পক্ষপাতদুষ্ট কারণের জন্য নয়। ‘ইন্ডিয়া: দ্যা মোদী কোশ্চেন’ নিয়ে মোদীজির এত্ত গোঁসা কিউ আতা হ্যায়?
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত উপপ্রধান জমিরুদ্দিন শাহ বছর তিনেক আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন। অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহের তিনি ভাই। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর ‘দ্য সরকারি মুসলমান’ নামে তিনি একটি বই লিখেছেন। গুজরাত দাঙ্গা-সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ আছে সেই বইয়ে। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সেই বইটি উদ্বোধন করেন অবসরপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি। সেই গ্রন্থের অতিক্ষুদ্র অংশ পড়লেই বোঝা যাবে বিবিসি নির্মিত তথ্যচিত্র নিয়ে মোদীজির ‘গোঁসা কিউ আতা হ্যায়’।
২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে গোধরা স্টেশনের কাছে করসেবক বোঝাই সবরমতি এক্সপ্রেসে অগ্নিকাণ্ডে ৫৯ জন পুড়ে মারা যায়। গোয়পন্দা বিভাগের আগাম সতর্কতা সত্বেও সন্ধ্যায় ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ি করে মুসলমান নিধন শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ডিভিশন কমান্ডার জমিরুদ্দিন শাহ তখন যোধপুরে কর্মরত। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারীর নির্দেশে ২৮ জানুয়ারি তাঁকে ফোন করে সেনাপ্রধান পদ্মনাভন হুকুম করেন, “তোমার ট্রুপস নিয়ে এক্ষুনি গুজরাত চলে যাও, দাঙ্গা ঠেকাও।” বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে জমিরুদ্দিন শাহ গুজরাতের রাজধানী আমেদাবাদে পৌঁছে যান।
ওই গ্রন্থে লেখা রয়েছে, নিয়মবিধি অনুসারে দাঙ্গা মোকাবিলা করার জন্য গুজরাত সরকারের তরফে সেনাবাহিনীকে গাড়ি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ এসকর্ট, কমিউনিকেশন সিস্টেম ও শহরের নকশা দেওয়ার কথা সত্ত্বেও সেনাকে কোনও কিছুই দেওয়া হয়নি। গুজরাত সরকারের তরফে কেউ সেই রাতে সেনার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, মুখ্যসচিব সেনার ফোন ধরেনি।
ওই গ্রন্থে লেখা রয়েছে অবশেষে গভীররাতে মুখ্যমন্ত্রী মোদীর বাসভবনে হাজির হন জমিরুদ্দিন শাহ। তখন সেখানে ছিলেন দেশের প্রতিরক্ষমন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজও। দাঙ্গা মোকাবিলায় সরকারি ভূমিকা পালন করার বদলে রাত ১টা নাগাদ ডিনারে আমন্ত্রণ জানায় মোদী। জমিরুদ্দিনের অনুরোধ সত্ত্বেও দাঙ্গা মোকাবিলার বদলে প্রায় ২ দিন ধরে সেনাবাহিনীকে হাত গুটিয়ে, নিষ্ক্রিয় ও অচল করে বসিয়ে রাখা হয়। দাঙ্গার আগুন মুসলমানদের বিরুদ্ধ আরও জোরে জ্বলতে দেওয়া হয়। খুন, ধর্ষণ ও ধ্বংসের পরিমাণ সরকারি উদ্যোগে বাড়তে দেওয়া হয়।
ফলে বেসরকারি মতে দু-হাজারের বেশি (সরকারি মতে ১০৪৪) মানুষকে হত্যা করা হয়। সুপ্রিমকোর্ট নিযুক্ত যে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতি ২০১৩ সালে মোদী ও তার সঙ্গীদের ক্লিনচিট দিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট, সেই কমিশন গোধরা দাঙ্গা থামানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর তৎকালীন ডিভিশন কমান্ডার জমিরুদ্দিনের কোনও রকম সাক্ষ্যগ্রহণ করেনি। দাঙ্গায় সরকারি ভূমিকার সমালোচনা করায় গুজরাত সরকারের সমালোচনা করায় আরও তিনজন আইপিএসের সাক্ষ্য বাতিল করে দেয় কমিশন।
দিল্লিতে ২০১৮ সালে ‘দ্য সরকারি মুসলমান’ গ্রন্থটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, গুজরাত দাঙ্গায় রাজ্য সরকারের মদত দেওয়ার যথেষ্ট দৃষ্টান্ত বইটি থেকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারি ভাবে কারফিউ ঘোষণা করেও বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি। এরকম পরিস্থিতিতে রাজ্যের উপর ৩৫৫ ধারা প্রয়োগ করার জন্য সংবিধান কেন্দ্রকে ক্ষমতা দিলেও বাজপেয়ি ও তাঁর সরকার তা না করে মোদীকে কেবল ‘রাজধর্ম’ পালন করার বাণী শুনিয়েই ক্ষান্ত থেকেছে।
তেহেলকা ম্যাগাজিনের গোপন ক্যামেরায় ২০০৭ সালে ধরা আছে গোধরার অন্যতম ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসাবে কুখ্যাত ‘বাবু ভাই প্যাটেল’ ওরফে ‘বাবু বজরঙ্গি’কে সাজা থেকে রেহাই দিতে মোদী কি ভাবে তিন তিনবার বিচারক বদলে দিয়েছেন তার ‘গর্বিত’ স্বীকারোক্তি। এই সব সত্যকথা তুলে ধরার জন্য বয়সে প্রৌঢ়া সমাজকর্মী ও সাংবাদিক তিস্তা শিতলাবাদকে জেলবন্দি করা হয়েছে। সেই ঘটনার অতি সামান্য ছোঁয়া দিয়ে এই পর্বে ছেদ টানা হবে।
গুজরাতের নারোদায় ছিল ‘গুলবার্গ কো অপারেটিভ অ্যাপার্টমেন্ট’ নামের বহুতল আবাসন। বাসিন্দারা সবাই মুসলমান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এহেসান জাফরি নামে এক প্রাক্তন সাংসদ। ১৪.১২.২২ তারিখে বন্দিমুক্তি কমিটির আয়োজনে বহরমপুর গ্রান্ট হলে একটি নাগরিকসভা হয়। সেখানে মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র তিস্তা শেতলাবাদের গ্রেফতারির ব্যাখ্যা করেন। অতি সংক্ষেপে সেটিই বলা যাক।
তিস্তা শেতলাবাদের তদন্ত রিপোর্ট উল্লেখ করে সুজাত জানান: হত্যা করার উদ্দেশ্যে উন্মত্ত গেরুয়া বাহিনী তাঁদের আাবাসন ঘিরে ফেলেছে বলে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে গুজরাতের পুলিশ ও মুখ্যমন্ত্রী মোদীর কাছে সাহায্য চেয়ে বারবার ফোন করে এহেসান জাফরি বলপন, “বাঁচান! বাঁচান!…!” পুলিশ সাহায্য করেনি। মোদী ফোন তুলে কাতর আর্তনাদ শুনে ফোন রেখে দেয়। সন্ধ্যা নাগাদ ওই আবাসনের ৬৫ জন মুসলমানকে পুড়িয়ে খুন করা হয়। এই ঘটনার সাক্ষ্য মেলে ওই দিনের দুপুর ১২.১৫ টার, ১৪.৫০টার এবং ১৭.০০টার গুজরাত সরকারে পুলিশ বাহিনীর স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এসআইবি)-র গোপন রিপোর্টে।
সুজাত ভদ্রের বয়ান থেকে জানা যায়, বিলকিস বানো ধর্ষণ ও খুনের মামলায় লড়তে পেরেছিলেন তিস্তা শেতলবাদের অনন্য সাহসি ও সৎ ভূমিকার অবদানের ফলে। মামলায় সদ্য জামিনে জেলমুক্ত তিস্তা শিতলাবাদকে এই সত্য প্রকাশ করার ‘অপরাধে’ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আবারও জেলবন্দি করে সুপ্রিম কোর্ট। সুজাতের ভাষ্যমতে সুপ্রিমকোর্টের বক্তব্য৷ “২০০২ সালের ঘটনা, আর তুমি (তিস্তা) ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হাওয়া গরম করছ!” এই প্রসঙ্গে সুজাত ভদ্রের আওয়াজ, “কয়েক বছরের প্রাচীন বাবরি মসজিদ নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট রায় দিতে পারে, আর ২৯ বছর আগের গোধরা গণহত্যা হাওয়া গরমের গপ্প হয়ে যায়!”
এই সব কারণেই আমরা ‘পাঠান’ এবং ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়শ্চেন’ এর পক্ষে আর ‘কাশ্মীর ফাইলস’ এর বিপক্ষে।
ভালো লাগলো।
দারুণ লেখা।