| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শম্ভুর পটচিত্রে আদিবাংলার লোক ঐতিহ্য : লিখছেন আসিফুর রহমান সাগর

Reporter
আসিফুর রহমান সাগর / ১৭৭৮ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২০

কোন কোন সংগ্রাম চোখে পড়ে না। লোক চোখের আড়ালে থেকে যায়। এক জনম তো শুধু নয়। জনম জনম ধরে চলে সে লড়াই। সে লড়াই শিল্পের প্রতি ভালোবাসার লড়াই। মাটি প্রকৃতি মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যে শিক্ষা তা টিকিয়ে রাখার লড়াই। নাগরিক সমাজ সে লড়াই চোখে দেখে না। তারা শুধু শিল্পের রূপটাকে নেয়। মুগ্ধ হয়। অর্থ দিয়ে তার দাম নির্ধারন করে। কিন্তু শিল্পের সেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে কেউ কেউ বংশ পরম্পরায় জীবনটাকে উত্সর্গ করেন। ঠিক তেমন করেই সাড়ে চারশ বছর ধরে পটচিত্রের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন মুন্সীগঞ্জের কালিন্দীপাড়ার ঠাকুরবাড়ির আচার্য পরিবার। আট পুরুষ ধরে বাংলার আদি শিল্পধারাকে লালন করে চলেছেন তারা। সেই বংশধারার বর্তমানে একমাত্র কাণ্ডারি পটুয়া শম্ভু আচার্য্য।

এই লোকচিত্র প্রাচীন বাংলার অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রাচীনকালে যখন কোন রীতিসিদ্ধ শিল্পকলার অস্তিত্ব ছিল না তখন এই পটশিল্পই বাংলার শিল্পকলার ঐতিহ্যের বাহক ছিল। পটচিত্র পটে আঁকা বিভিন্ন চিত্র। প্রাচীন বাংলায় যখন কোন দরবারি শিল্পের ধারা গড়ে ওঠেনি তখন পটচিত্রই ছিল বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক। বাংলাদেশে দু রকমের পটচিত্র প্রচলিত আছে এককচিত্র বা চৌকাপট এবং বহুচিত্র বা দীর্ঘপট। কালিঘাটের পট প্রথম শ্রেণীভুক্ত। কলকাতা নগরী প্রতিষ্ঠার পর আঠারো-উনিশ শতকে শহরকেন্দ্রিক এ চিত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে। পাশ্চাত্যের আদর্শে আধুনিক চিত্ররীতি প্রবর্তিত হলে কালিঘাটের পট লোপ পায়। আর এ চিত্র যারা আঁকেন তাঁদের বলা হয় পটুয়া। কলকাতায় লোপ পেলেও বাংলাদেশে বংশ পরম্পরায় পটচিত্র আঁকছেন নবম উত্তরপ্রজন্ম পটুয়া শম্ভু আচার্য্য।

তাঁর বাবা আঁকতেন গামছায়। শম্ভু আঁকেন মোটা ক্যানভাসে। ইটের গুঁড়া ও চক পাউডারের সঙ্গে তেতুঁল বিচির আঠা মিশিয়ে তৈরি করা হয় মিশ্রণ। আঞ্চলিক ভাষায় একে বলে ‘ডলি’। এই ডলি দিয়ে পুরো মার্কিন কাপড়ে লেপে দিয়ে তৈরি হয় ‘লেয়ার’ বা ‘পরত’। তার ওপরে রেখার টান, নানা রঙের প্রয়োগ। রংগুলিও তৈরি হয় দেশিয় পদ্ধতিতে। ডিমের কুসুম, সাগুদানা, গাছের কষ, বেলের কষ, এলা মাটি, গুপি মাটি, রাজা নীল, লাল সিদুঁর, মশালের ধোঁয়া (শিশুদের চোখের কাজল) এসব দিয়ে তৈরি হয় রং। আর তুলি বানানো হয় ছাগলের লোম দিয়ে। সেসব রং রেখা তিনি লোকায়ত জীবনের গল্প বলেন। তুলে আনেন পৌরাণিক কাহিনী।

ধলেশ্বরী নদীর ধারে মুন্সীগঞ্জের কালিন্দীপাড়ায় শম্ভু আচার্য্যের নয় পুরুষের বাস। শতবর্ষী তমাল গাছের ছায়ায় এ বাড়িতেই গত নয় পুরুষ ধরে ছবি আঁকছেন তারা। শম্ভু আচার্য্য বললেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা পটে চিত্র আঁকতেন। পরে এটা গামছায় ও ক্যানভাসে আঁকা শুরু করেন তারা। সেই জন্যই এর নাম পটচিত্র।

কিন্তু এই শিল্পধারা তো হারিয়েই যেতে বসেছিল। শম্ভু আচার্য্য নারায়ণগঞ্জ শহরে ছবি আঁকার দোকান দিয়েছিলেন। সংসার চলতো তা দিয়েই। পটচিত্র আঁকা চলতো পারিবারিক ধারাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু সেই ছবির খোঁজ তখন কে রাখে! সেই শম্ভু আচার্য্যকে খুঁজে বের করেন লোককারুশিল্প বিশারদ তোফায়েল আহমেদ। ভারতের একটি জাদুঘরে সুধীর আচার্য্যের পটচিত্র দেখেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন এটা বাংলাদেশের শিল্পীর আঁকা। কিন্তু ঠিকানা ছিল না। সারাদেশ চষে অবশেষে গাজীর গানের দলের কাছ থেকে খোঁজ বের করে তিনি তুলে আনেন এই আচার্য্য পরিবারকে। পটচিত্র নতুন করে উঠে আসে বাংলাদেশের মানুষের সামনে।

শম্ভু আচার্য্য বলছিলেন, তোফায়েল আহমেদ আমাদের যেমন তুলে এনেছিলেন অপর ব্যক্তিটি হচ্ছেন রামেন্দু মজুমদার। তিনি আমাকে নতুন করে পটচিত্র আঁকতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এর আগে অল্প করে ছবি আঁকতাম। সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন উত্সবে আমন্ত্রণে যোগ দিতে যেতাম। কিন্তু তাতে তো আর সংসার চলে না। ২০০৩ সালে আমার প্রথম প্রদর্শনী হয়। এর আগে ১৪ মাস আমি শুধু ছবি এঁকেছি। অন্য কোন কাজ করিনি। তখন প্রতিমাসে আমার সংসার চালানোর খরচ দিয়েছেন রামেন্দু দা। পটচিত্রের নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে তোফায়েল আহমেদ ও রামেন্দু মজুমদারের অবদান অনেক। শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীও আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এছাড়া অনেকেই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

শম্ভু বলেন, পটচিত্রের রংটাও যে দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি এটাও অনেকে জানতেন না। এমনকি বাংলাদেশের নামীদামী শিল্পীরাও জানতেন না দেশি পদ্ধতিতে তৈরি এসব রং বিদেশি কৃত্রিম রঙের মতই ৫০/৬০ বছর উজ্জ্বল থাকে। গ্যালারি কায়া ২০০৬ সালে যমুনা রিসোর্টে একটি কর্মশালার আয়োজন করে। সেখানে মুর্তজা বশীরসহ অনেক সিনিয়র শিল্পীদের সামনে আমি এই রং তৈরি করে ছবি আঁকি। তারাও আমার রং দিয়ে ছবি এঁকে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন।

শম্ভু আচার্য্যের বাবা সুধীর আচার্য্য ১৯৮৯ সালে জাতীয় কারুশিল্পী পরিষদের ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন’ পুরস্কার লাভ করেছিলেন। কিন্তু তা দেখে যাবার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। যেদিন এই পুরস্কারের চিঠি এসে পৌঁছায় সেদিনই তার মৃত্যু হয়। এই শম্ভু আচার্য্যরা নয় পুরুষ ধরে পটচিত্র আঁকছেন। এরা হলেন- রামলোচন আচার্য্য, রামগোপাল আচার্য্য, রামসুন্দর আচার্য্য, জগবন্ধু আচার্য্য, রাসমোহন আচার্য্য, প্রাণকৃষ্ণ আচার্য্য, সুধীর আচার্য্য ও তার ছেলে শম্ভু আচার্য্য। শম্ভু আচার্য্যের পড়াশোনা বেশিদূর না এগুলেও ছবি আঁকার গুণ তার রক্তে প্রবাহিত। ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিলেও ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকছেন। আর বর্তমানে শম্ভু আচার্য্য একজন স্বনামধন্য পটচিত্রকরে পরিণত হয়েছেন। তার পটচিত্র স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, চীনের কুবিং মিউজিয়াম, সাংহাই মিউজিয়াম, জাপানের অঅনাগাওয়া ও ফকুকুয়া মিউজিয়াম, ইন্দোনেশিয়া মিউজিয়ামে।

ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বাংলাদেশে এ পটশিল্পের শুরু খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে। গাজীর পটে যমদূত ও তার মায়ের চিত্র থেকে অনুমিত হয় যে, এর উত্স প্রাচীন যমপট, যেখানে ধমর্রাজ যমের মূর্তি এবং যমালয়ের ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য অঙ্কিত হতো। বাংলাদেশের পটচিত্রকলা ভারতীয় উপমহাদেশের বৌদ্ধপূর্ব ও অজন্তাপূর্ব যুগের চিত্রকলা এবং পরবর্তীকালে তিব্বত, নেপাল, চীন ও জাপানের ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। সেই ধারাকেই এখনও ধরে রেখেছেন এই আচার্য্য পরিবার।

এই শিল্পধারাকে কি এভাবেই টিকে থাকবে নাকি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন? এ প্রসঙ্গে শিল্পী বললেন, আমরা পারিবারিকভাবে এ ধারাকে টিকিয়ে রেখেছি। আমার তিন মেয়ে এক ছেলে। তারাও পটচিত্র আঁকছে। বেশ ভালোই আঁকছে তারা। আর সরকার এটাকে সংরক্ষণ করতে চায় সেটা ভিন্ন বিষয়।

এ প্রসঙ্গে গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী বললেন, শম্ভু আচার্যের পটচিত্রের করণকৌশলের ওপরে একটি কর্মশালা করেছিলাম ২০০৬ সালে। তার তৈরি দেশি রং দিয়ে ছবি এঁকেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, শিল্পী আমিনুল ইসলামের মত শিল্পীরা। এই ধারাকে  অবলম্বন করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা ছবি আঁকলে এটা টিকে থাকবে। তার জন্য একটা ইনস্টিটিউট বা চারুকলার বিভাগে ক্লাস নেয়াও যেতে পারে। শুধু পটচিত্র নয় আমাদের লোকশিল্প ধারার যেসব ধারা রয়েছে এসব কিছুকেই সংরক্ষণ ও তা তরুণ শিল্পীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

পটের বিষয় সাধারণত ধর্মীয়, সামাজিক ও কাল্পনিক। পটুয়াদের তুলিতে কল্পনা ধর্মবিশ্বাস ও মানুষের জীবনযাপন সরলভাবে উঠে আসে ক্যানভাসে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আট শতক থেকে বুদ্ধদেবের জীবনী-সংক্রান্ত জাতকের গল্পসম্বলিত মস্করী নামক পট প্রদর্শন করতেন। পরবর্তী সময়ে হিন্দুধর্ম ও  পুরাণ হয়ে উঠে পটের প্রধান বিষয়। হিন্দুদের বিভিন্ন দেবদেবী, যেমন: দূর্গা, কালী, মনসা, অন্নপূর্ণা, লক্ষ্মী, যম, চণ্ডী, দশ অবতার প্রভৃতি। এছাড়া পৌরাণিক কাহিনী যেমন- রামলীলা, কৃষ্ণলীলা, কৈলাস, বৃন্দাবন, অযোধ্যা ইত্যাদি পবিত্র স্থানসমূহও উঠে এসেছে পটচিত্রে। এরপরে গাজীর পট, মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনী, যেমন: রামের বনবাস, সীতাহরণ, রাবণবধ, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদিও উঠে আসে পটচিত্রে।

গাজীর পট

বাংলাদেশে গাজীর পট খুবই গুরুত্ব পেয়েছে একসময়। শম্ভু আচার্য্যের বাবা সুধীর আচার্য্য ছিলেন একজন খ্যাতনামা পটুয়া। তিনি বাঘের পিঠে গাজী এবং চব্বিশটি ছোট ছবির খোপ আঁঁকেন। এসব খোপে আছে মকরবাহিনী গঙ্গা, গাজীর আসা, খান্দুয়া বাঘ, যমদূত প্রভৃতি। কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়াম এবং গুরুসদয় দত্ত মিউজিয়ামে সুধীর আচার্য্যের একাধিক গাজীর পট সংরক্ষিত আছে।

মুসলমানদের গাজীর পটে গাজীকালু-চম্পাবতীর কাহিনী কিংবা গাজী পীরের বীরত্বব্যঞ্জক বিভিন্ন অলৌকিক কর্মকাণ্ড অঙ্কিত হয়। এতে গাজীকে কখনও দেখা যায় সুন্দরবনের রাজার সঙ্গে লড়াই করতে; কখনও বাঘের পিঠে সমাসীন; কখনও মাথায় টুপি অথবা রাজমুকুট, পরনে রঙিন পাজামা কিংবা ধুতি, এক হাতে চামর বা ত্রিকোণ পতাকা এবং অন্য হাতে তলোয়ার বা মুষ্টিঘেরা জ্যোতি। গাজীর পটে মানিকপীর, মাদারপীর, সত্যপীর, কালুফকির, বনবিবি প্রভৃতি সম্পর্কে নানা অলৌকিক ক্রিয়াকর্মের ছবিও প্রদর্শিত হয়। এরূপ ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নানা কৌতুক, রঙ্গরসসম্বলিত কাহিনী, ব্যঙ্গচিত্র এবং সামাজিক দুরবস্থার চিত্রও অঙ্কিত হয়। কখনও কখনও প্যাঁচা, বানর, গরু, বাঘ, সাপ, কুমির এবং গাছপালাও স্থান পায়। লোকধর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ অনেকে গৃহে পটচিত্র সংরক্ষণ করাকে কল্যাণ এবং দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় বলেও মানেন।

শম্ভুর পটচিত্র

পট প্রধানত দু প্রকার দীর্ঘ জড়ানো পট ও ক্ষুদ্রাকার চৌকো পট। জড়ানো পট ১৫-৩০ ফুট লম্বা ও ২-৩ ফুট চওড়া হয়। আর চৌকা পট হয় ছোট আকারের। পটচিত্রের পরিকল্পনা ও শৈলীতে মিশে রয়েছে বাংলার লোকশিল্পকলার ঐতিহ্যিক উত্কর্ষ। সম্মূখমুখী প্রতিকৃতির তিন চতুর্থাংশ পটচিত্রে দেখা যায়। এতে হাতের তালু থাকে মুষ্টিবদ্ধ। পটচিত্রের রং সবসময় উজ্জ্বল। ছবিতে শরীরের ভাবভঙ্গিতে অভিব্যক্তি থাকে না। তবে শম্ভু আচার্য্য পটচিত্রকে ক্যানভাসে তুলে এনেছেন। সেইসঙ্গে বিষয়ের ক্ষেত্রেও এনেছেন বৈচিত্র। বলা চলে, শম্ভু আচার্য্য ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখেই পটচিত্রের নগর সংস্করণ এনেছেন।

শম্ভুর ক্যানভাসে এখন উঠে এসেছে সমসাময়িক গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের দৃশ্যাবলি। কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, তাঁতীর সরল জীবন যেমন উঠে এসেছে, তেমনি দিনমজুর নারীশ্রমিকের ইট ভাঙার দৃশ্যও আছে। মসৃণ রেখা ব্যবহার এবং কোথাও কোথাও আলো-ছায়ার ব্যবহার করেছেন তিনি পটচিত্রের ঐতিহ্যের বাইরে এসে। এখন তার ছবি বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। শম্ভুর ছবিতে উঠে এসেছে কিষাণ-কিষাণির প্রেম। আবার ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরায় চড়ে পদ্মা বিহার দৃশ্য’। ‘পাখি, রাসলীলা, মহররম পর্ব, ময়ূরপঙাখী, শ্রীকৃষ্ণের নৌকাবিলাস। শম্ভু আচার্য্য মূলত ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র ধারার চিত্রকে নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে বিলুপ্তপ্রায় লোকচিত্রধারা উপস্থাপিত হয়েছে নতুনভাবে।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “শম্ভুর পটচিত্রে আদিবাংলার লোক ঐতিহ্য : লিখছেন আসিফুর রহমান সাগর”

  1. অজয় কুমার রায় । says:

    অত্যন্ত চমৎকার একটি তথ্যনির্ভর কাহিনী পড়লাম । আমিও সাংবাদিক ছিলাম । আমাদের গুরুস্থানীয় একজন সাংবাদিক বিপুল মজুমদার বলতেন — সংবাদ লেখা তো সাহিত্য লেখা । এই রাইট আন্টির লেখকও উক্তিটি সত্য প্রমাণিত করেছেন। আভূমি কুর্নিশ লেখককে।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev