অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে আমরা অনেক কথাই শুনছি। স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির এতটা প্রভাব ছিল না। আজকাল সেই সংবাদপত্রগুলির প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে। আজ দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি সুস্পষ্ট ভাষায়ই অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি তাদের যে ঝোঁক আছে তা প্রকাশ করছে। কিন্তু যা সত্য ঘটনা, তা অস্বীকার করা যায় না। তা হচ্ছে এই যে, স্বদেশবাদ আমাদের বাসভূমিতেও গার্হস্থ্য জীবনে যে প্রভাব বিস্তার করেছিল তার সঙ্গে তুলনা করলে বলতে হয় যে, নন-কো-অপারেশন আন্দোলন তার কাছে দাঁড়াতেই পারে না। নন-কো-অপারেশন আন্দোলন, এমন কী তার সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী কেন্দ্রগুলিতেও (বাংলায় অবশ্য সে কেন্দ্রের সংখ্যা বেশি নেই) একটা সামাজিক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু স্বদেশি আন্দোলন তার কার্যকালে যে শক্তি ও প্রভাব বিস্তার করেছিল তা একটা সমাজ শক্তি হয়ে উঠেছিল। এই বাংলাদেশেই অসংখ্য গ্রাম আছে যেখানে চরকা ও খদ্দর লোকের কাছে অপরিচিত থেকে গেছে। আমি অবশ্য এমনটি না হওয়াই কামনা করি। কিন্তু সত্য যা তা বলতেই হবে। কোনো শিল্প-আন্দোলন যদি কোনো বিরোধমূলক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলে তবে তা সাময়িকভাবে একটা হুজুক প্রেরণা লাভ করতে পারে এবং তার ফলে সে আন্দোলন অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারে ; কিন্তু পরিণামে এই রাজনীতির সঙ্গে একত্রে চলার ফলে তাকে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। শিল্পকে পরিচালিত করতে হবে ব্যবসায়িক পন্থায়। এই ব্যবসাবুদ্ধিই শেষ পর্যন্ত এই শিল্পের গতিপথ ও উন্নতির ধারাকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত করবে। পুঁজি, সংগঠন ও বিশেষজ্ঞের জ্ঞান—এই তিনটিই হচ্ছে শিল্পোদ্যোগের মূল ভিত্তি। স্বদেশপ্রেমের প্রেরণা এ কাজে নিশ্চিতভাবেই সহায়তা করবে। কিন্তু তা করবে সাময়িকভাবে। কারণ সে প্রেরণা দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে আর থাকবে না।
সময় সময় একথা বলা হয়ে থাকে যে আমাদের গণ-আন্দোলনগুলি প্রাণহীন। এই প্রাণহীনতার কারণস্বরূপ বলা হয়ে থাকে যে আমরা সব সময় জনসাধারণকে আমাদের সঙ্গে নিচ্ছি না। এই প্রশ্নটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সময় বা স্থান এটা নয়। জনসাধারণ তাদের বিশেষ কোনো স্বার্থের সঙ্গে জড়িত নয় এমন কোনো আন্দোলনের সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে না। সমস্ত বড়ো বড়ো আন্দোলনই বুদ্ধিজীবী নেতাদের দ্বারাই সৃষ্ট হয় ; তারাই তা পরিচালনা করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন। জনসাধারণ যা করে, তা হল কমবেশি পরিমাণে সেই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ও নৈতিক সমর্থন। কোনো কোনো বড়ো বড়ো ঘটনার সময় তারা সোচ্চার হয়ে ওঠে যখন তাদের অন্তরে কোনো গভীর অনুভূতির আলোবন সৃষ্টি হয়। যখন তাদের প্রতি অতীতের কোনো অন্যায় অত্যাচারের স্মৃতি কিংবা বর্তমানের কোনো অত্যাচারবোধ জেগে ওঠে। এই অবস্থায় তারা বিক্ষোভ প্রদর্শনে নেমে পড়ে যা সময় সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ‘স্বদেশী’ আন্দোলন তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থবোধের প্রতি সার্থক আবেদন করেছিল। তাদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণের এরূপ বিচার বোধ ছিল যে তারা বুঝতে পেরেছিল যে এই আন্দোলন যদি সফল হয় তাহলে তা তাদের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা লাভের এক নব যুগের আবির্ভাব ঘোষণা করবে।
পঞ্চাশ বছর আগে আমি যখন দেশের কাজে নেমেছিলাম তখন আমার তিনটি লক্ষ্য ছিল। সে লক্ষ্য আমাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎসাহিত করে রেখেছে এবং আমি আমার রাজনৈতিক জীবনের নানা বৈচিত্রের মধ্যে সে লক্ষ্য অনুযায়ী আমার সাধ্যমত কাজ করার প্রয়াস পেয়েছি। আমার লক্ষ্যগুলি ছিল এই —
১. আমাদের একটি সার্বজনীন সাধারণ স্বার্থের উন্নয়ন বিধানের জন্য ভারতের সর্বশ্রেণির মানুষকে একটিমাত্র মঞ্চে এনে তাদের ঐক্যবদ্ধ করা।
২. তাদের উন্নতি বিধানের জন্য প্রথম অপরিহার্য সর্ত হিসাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব সম্বন্ধ স্থাপন করা।
৩. সাধারণ মানুষের অবস্থার উন্নতি সাধন করে তাদের আমাদের গণ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা।
এর মধ্যে প্রথম দুটি লক্ষ্য সাধনের জন্য আমি ১৮৭৬ এবং ১৮৭৭ সালে সারা ভারতে ভ্রমণ করেছি। অসংখ্য জনসভায় ভারতীয়দের মধ্যে একতা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বক্তৃতা করেছি এবং আমাদের জাতির একটি বড়ো বকমের অভিযোগের প্রতিকার আদায়ের জন্য সার্বজনীন দাবি উত্থাপন করে সারা ভারতে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছি। স্বদেশি আন্দোলন আমার জীবনের এই তিনটি লক্ষ্যের মধ্যে একটি লক্ষ্যে পৌঁছোবার এক মহান সুযোগ এনে দিয়েছিল এবং আমি সেই আন্দোলনকে সানন্দে তৎপরতা ও উৎসাহের সহিত আঁকড়ে ধরলাম।
দেশের সর্বত্র স্বদেশী সভার আয়োজন করা হল। আমাদের প্রদেশের সীমা ছাড়িয়েও অনেক জায়গায় সেই সভার অনুষ্ঠান হতে লাগল। আমার স্বাস্থ্য ও শক্তি সামর্থ্য নিয়ে যতগুলি স্থানে সম্ভব আমি উপস্থিত থেকে বক্তৃতা করেছি। এই সমস্ত বক্তৃতা প্রায়ই বাংলা ভাষায় করেছি। এই সময়টা ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং কাজও করতে হত দুর্দান্ত পরিশ্রম করে। কাজ করতে কেউই পিছপা হননি। সকলেই নিজ নিজ সাধ্যমত কাজ করেছেন। আমরা অনেক অজানা এবং অদ্ভুত জায়গায় ঘুরেছি। কোনো কোনো স্থানে যাওয়াও ছিল একটা কঠিন কাজ। অদ্ভুত অদ্ভুত খাওয়াও আমরা খেয়েছি। কিন্তু তাতে আমরা কেউ কিছুই মনে করিনি। কোনোকিছু সম্পর্কেই আমরা কোনো আপত্তি বা অভিযোগ করিনি। দূর দূর অঞ্চলে আমাদের যেতে আসতে নিদারুণ কষ্ট ও অসুবিধা হয়েছে. ম্যালেরিয়া ও কলেরা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও আমরা ঘুরেছি। আমাদের উৎসাহই ছিল আমাদের রক্ষাকবচ। কোনো রোগেই আমরা আক্রান্ত হব না কোনো বিপদই আমাদের স্পর্শ করবে না—কাজের উৎসাহের মধ্যে এই বিশ্বাসই আমাদের নৈতিক টীকা নেওয়ার মত কাজ করেছে। সে টীকা কখনও বিফল হয়নি।
এই প্রসঙ্গে আমাদের একজন সাথীর কথা উল্লেখ না করে পারছি না এবং বলতে কী তা এক্ষুণি করছি ; কারণ তাকে আমরা চিরদিনের মত হারিয়েছি। আমি কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের কথা বলছি। তিনি ছিলেন হিতবাদী পত্রিকার সম্পাদক। এক মারাত্মক ব্যাধিতে তিনি ভুগছিলেন, যে ব্যাধির নাম ব্রাইটস ডিজিজ। তা সত্ত্বেও আমন্ত্রণ পেলেই তিনি যে-কোনও স্বদেশী সভায় উপস্থিত থাকতেন। তিনি সভাগুলিতে একটি নতুন রীতির প্রচলন করেন। সেই রীতিটি আজও আমাদের সভা-সমিতি ও বিক্ষোভ শোভাযাত্রা ইত্যাদিতে অনুসরণ করা হয়ে থাকে। রীতিটি হচ্ছে এই সমস্ত অনুষ্ঠান একটি সময়োপযোগী দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের দ্বারা শুরু করা। কাব্য বিশারদের অতি সুন্দর সঙ্গীত প্রতিভা ছিল। নিজে তিনি গান করতে পারতেন না, কিন্তু তিনি অতি চমৎকার সঙ্গীত রচনা করতেন। এই সঙ্গীতগুলি স্বদেশি সভায় গাওয়া হত। শ্রোতাদের হৃদয়ে তা গভীরভাবে রেখাপাত করতে কখনোই ব্যর্থ হয়নি। সঙ্গীত রচনার ক্ষমতা ছিল তার একটি প্রকৃতি দত্ত স্বাভাবিক গুণ। হিন্দী ভাষায় তার সে রকম খুব পাকা দখল না থাকা সত্ত্বেও তার রচিত ‘দেশকি ইয়ে ক্যা হালত’ হিন্দি সঙ্গীতটি ছিল অন্যতম শ্রেষ্ঠ হৃদয়গ্রাহী সঙ্গীত। দেশি জিনিস ফেলে বিদেশি জিনিস গ্রহণের প্রতি যে মোহ আছে, তাকে প্রচণ্ডভাবে নিন্দা করা হয়েছে এই সঙ্গীতে। ১৯০৬ সালে কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে হাজার হাজার লোকের সমক্ষে যখন এই গানটি গাওয়া হয় তখন সেই বিশাল শ্রোতৃমণ্ডলীকে তা এক প্রবল অশান্ত উত্তেজনার মধ্যে টেনে নিয়ে যায়।
কাব্য বিশারদের সঙ্গে সর্বদাই দুজন ওস্তাদ সঙ্গীত শিল্পী থাকতেন। তারা স্বদেশি সভাগুলিতে উদ্বোধন ও সমাপ্তি সঙ্গীত গান করে শুনাতেন। কাব্য বিশারদ নিজেই তাদের শিক্ষা দিতেন ও বেতন দিয়ে ভরণপোষণ করতেন। নিজে ধনী ব্যক্তি না হলেও বাইরের কারো কাছে তিনি তাদের ভরণপোষণের জন্য কোনও সাহায্য চাইতেন না। একজন বড়ো ধরনের বক্তা তিনি ছিলেন না ; কিন্তু একজন শক্তিশালী লেখক ছিলেন। বিদ্রূপাত্মক রচনা লিখে ভারতের প্রগতি বিরোধী শক্তিগুলির উপর তীব্র ও নির্মমভাবে আক্রমণ চালাতেন। স্বদেশের কাজে আত্মনিবেদিত-প্রাণ কাব্য বিশারদ দেশ-মাতার সেবার কাজে কখনোই কুণ্ঠিত ছিলেন না। মনে আছে, ১৮৯৯ সালে গায়ে জ্বর নিয়ে তিনি লক্ষ্ণৌ কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন। সে সময় তার ওপর একটি মানহানির মামলার পরোয়ানাও ঝুলছিল। নিজের স্বাস্থ্য বা শরীর সম্পর্কে তার কোনো রকম ভ্রূক্ষেপই ছিল না। নিজের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়েই চলতেন ; এমনকি সে ব্যাপারে তার ছিল একটা একগুয়েমী ভাব। কারো উপদেশ বা বাদপ্রতিবাদের ওপরে ছিল তার নিজের ইচ্ছা। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে তিনি দ্রুত মৃত্যুর গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবগণ ভাবলেন যে তার স্বাস্থ্যের যদি উন্নতি সাধন করতে হয়, যদি তাকে তার এই স্বদেশ প্রেমোন্মাদনার পরিণতি থেকে বাঁচতে হয়, তাহলে তাকে তার স্বদেশ প্রেমের ক্ষেত্র থেকে দূরে সরাতে হবে। একজন বন্ধু ডাক্তার হিসাবে এক যাত্রীবাহী জাহাজে জাপান যাচ্ছিলেন ; তার আত্মীয় স্বজনের। কাব্য বিশারদকে তার সঙ্গে জাপানে যেতে বলেন। তারা মনে করেছিলেন যে সমুদ্র যাত্রা তার স্বাস্থ্যের পক্ষে হিতকর হবে। যে-কোনো কারণেই হোক এই প্রস্তাবটি আমার কাছে কখনোই ভালো মনে হয়নি। এর মধ্যে কেমন যেন একটা ভাবী অমঙ্গলের পূর্বাভাস আমার মনে বারে বারে উঁকি দিচ্ছিল। এটা হয়ত বা এজন্যও হতে পারে যে আমার মনের গভীরে দেশের কাজের চিন্তা বড়ো হয়ে দেখা দেওয়ায় আমার বিচারবুদ্ধির উপরে রঙিন ছোপ লেগে গিয়েছিল। সে যাই হোক, আমি কাব্য-বিশারদকে প্রতিনিবৃত্ত করতে চেষ্টা করলাম। তিনি আমাকে তার রাজনৈতিক গুরু বলতেন। এরকম আরো অনেকে আমাকে তাদের রাজনৈতিক গুরু বলে মনে করতেন। তবে কাব্য বিশারদের মত এতখানি উদ্দীপনা ও শ্রদ্ধা আর কারো মধ্যে ছিল না। তারা অনেকে তাদের গুরুর প্রতি কাদা ছুঁড়ে মারতেও প্রস্তুত ছিল। কাব্য বিশারদ এক সময় জাপান যাবেন না বলে মনস্থির করে ফেললেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করে যেতে রাজি হলেন। হাওড়া স্টেশনের কাছে তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। আমরা তখন কলকাতা থেকে অল্প কিছু দূরে বেঙ্গল নাগপুর রেল লাইনের পথে মুগকল্যাণে একটি স্বদেশি সভা করে ফিরে আসছিলাম। তিনি আমার পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলেন ; আমি আশীর্বাদ জানালাম ! কিন্তু হায়! আর আমাদের ভাগ্যে পুনর্মিলন ঘটল না। ফেরার পথে সমুদ্রে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
এইভাবে বাংলা তার এমন একজন খাঁটি স্বদেশপ্রেমিক সাংবাদিককে হারাল যিনি আমাদের ভাষা সম্পদকে তার শক্তিশালী লেখনী মুখে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন যাতে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুদের এবং জাতির শত্রুদের নিকট তিনি একটা আতঙ্ক বলে পরিগণিত হয়েছিলেন। অবশ্য তিনি ব্যক্তি বিশেষের নিন্দাবাদের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। এই ব্যক্তিগত আক্রমণটা ছিল আমাদের দেশীয় ভাষায় এক ধরনের সাংবাদিকতার এক মারাত্মক বিষের মতো। দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা আজও পর্যন্ত তা থেকে মুক্ত হতে পারিনি। তার কোনো কোনো রচনায় গার্হস্থ্য জীবনের পবিত্রতাকে লঘু ও বিদ্রূপ করা হয়েছে; সেগুলি আমাদের সকলের কাছে অবশ্যই নিন্দনীয় ও পরিতাপের বিষয়। কিন্তু তার কঠোরতম ব্যক্তিগত আক্রমণগুলি হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যারা ভারতের উন্নতির পথে শত্রুতা করছে এবং তাও আবার অনেক সময় করা হয়েছে ছদ্মবেশী বন্ধুরূপে, হিতাকাক্ষীর মতো। কলকাতায় তাঁর মৃত্যু সংবাদটি পাওয়া যায় ১৯০৭ সালের ৭ই জুলাই তারিখে। এই পনেরো দিন পরে বারাসতে ২৪ পরগনা জেলা সম্মেলন হল। তাঁর রচিত স্বদেশি সঙ্গীত দিয়ে যখন সেই সম্মেলন শুরু হল, তখন শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যিনি চোখের জলে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন না করেছেন। দোষ-ত্রুটি তাঁর অনেক ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি গভীর বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে দেশসেবা করে গেছেন। দেশসেবার মধ্যে যে সাহস তিনি দেখিয়েছেন, কোনও সময়েই তার একটুও নড়চড় হয়নি।
তবে একজন মহান ‘স্বদেশি’ কর্মী চলে গেলেও ‘স্বদেশি’র কাজকর্ম ব্যাহত হয়নি। সমস্ত বড়ো বড়ো আন্দোলনই ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রতিভার কাছে যতই ঋণী হউক না কেন, কোনো কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি-পুরুষের উপরও তা খুব বেশি পরিমাণে নির্ভরশীল নয়। তারা যে বীজ বপন করেন, সে বীজ নতুন মানুষ সৃষ্টির জন্যে ফল ধারণ করে, সেই নতুন মানুষেরা হয়ত সর্বদা বীজ বপনকারীদের সমকক্ষ না হতে পারেন; তারা তাদের কাজের ভার গ্রহণ করে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে। কাব্য বিশারদের উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে যে যুগের স্বদেশিভাব যে প্রবল ও ব্যাপক উত্তাপের সৃষ্টি করেছিল তারই এক প্রতিফলন ঘটেছিল।
জনমতের এই উত্তাল জাগরণে সরকার শঙ্কিত হয়ে পড়লেন, তারা দমন নীতির প্রয়োগ করতে লেগে গেলেন। ফলে জনমত আরো বেশি করে জেগে উঠতে থাকে। ট্যকিটাসের বিবরণে জানা যায় যে এগ্রিকোলা এই রকম একটি সূক্ষ্ম মন্তব্য করেছিলেন যে একটি সাম্রাজ্যকে শাসনে রাখার চেয়ে একটি গৃহ-পরিবারকে শাসনে রাখা বেশি কঠিন কাজ। কোনো পরিবারে বিপর্যয় দেখা দিলে তা কালেরও শুভবুদ্ধির নিরাময়কারী প্রভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ উপদেশের সাহায্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। সাধারণতঃ কাল অতিক্রমণ ও শুভবুদ্ধি এসব ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। কিন্তু আমলাতন্ত্রের ধরনই আলাদা। তাদের আছে অসীম ক্ষমতা ; সে ক্ষমতায় তারা বলীয়ান। কোনো অভাবিত-পূর্ব ঘটনা যদি ঘটে, তাহলে তারা তাদের সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে সহজ পন্থায় সেই ঘটনার মোকাবিলা করতে প্রলুব্ধ হয়। দমন-নীতির প্রয়োগ অতি সহজ ব্যাপার এবং তার কার্যকারিতা সম্পর্কেও কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য যে অত্যধিক মূল্য দিতে হয় এবং পরিণামে যে তা নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে খুব তাড়াতাড়ি, কাজ করার উৎসাহে সে কথা তাদের মনেই আসে না। সাময়িকভাবে হয়ত দমন-নীতি সাফল্য লাভ করে; কিন্তু তা স্থায়ীভাবে অনিষ্ট ঘটায় এবং ভবিষ্যতের অশান্তির বীজ বপন করে রাখে।
ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে যে ছাত্রগণ এবং ছাত্র নয় এমন তরুণেরা স্বদেশি আন্দোলনে এক প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের উৎসাহ সমস্ত সমাজ জীবনকেই উজ্জীবিত করে তোলে। তারা এই স্বদেশি আন্দোলনের স্বেচ্ছাব্রতী মিশনারীরূপে আত্মপ্রকাশ করল। কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যাবলীকে খর্ব করা ও শাসনে আনা প্রয়োজন বোধ করলেন। জেলায় জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটরা ফতোয়া জারি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রধানদের জানিয়ে দিলেন যে যদি স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকগণ তাদের ছাত্রদের স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বয়কট ও পিকেটিং এবং অন্যান্য অপকর্ম থেকে প্রতিনিবৃত্ত না করেন তাহলে তাদের স্কুল ও কলেজগুলিকে সরকারি সাহায্য দেওয়া হবে না, স্কলারশিপের জন্য প্রতিযোগিতা করার যে সুযোগ ছাত্রদের দেওয়া হয়েছে, তা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। মফঃস্বলের স্কুলগুলিকে এই সার্কুলার পাঠিয়ে দেওয়া হল।
সার্কুলারে কলকাতার ছাত্র ও মফঃস্বলের ছাত্রদের মধ্যে একটা পার্থক্য করা হল। কিন্তু কলকাতার ছাত্ররা তাদের মফঃস্বলের ছাত্র-বন্ধুদের মতোই স্বদেশি আন্দোলনে সমান উৎসাহী। দিনের পর দিন স্বদেশি আন্দোলনের উত্তেজনার সময় বেশ কিছুসংখ্যক ছাত্র ময়দানের কোণে দাঁড়িয়ে দেখত কারা ‘হোয়াইটওয়ে লেডেল’-এর বাড়িতে বিদেশি জিনিস কিনতে যাচ্ছে। ভারতীয় ক্রেতাদের তারা অনুরোধ করত বিদেশি দ্রব্য না কিনতে; আর কেউ যদি ইতিমধ্যেই কিছু কিনে ফেলে থাকেন তা হলে আর যেন কখনও এ রকম অন্যায় কাজ না করে। আমার কাছে সে সময়ে এরকম একটা সংবাদ পৌঁছে যে, এই সমস্ত যুবকদের মধ্যে কয়েকজন একজন ফ্যাসান দুরস্ত বাঙালি মহিলা যখন হোয়াইটওয়ে লেডেল’-এর দোকান থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন তার পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে এবং তাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে প্রার্থনা জানায় যে তিনি দেশে তৈরি সেইরকম জিনিস থাকতে আর যেন বিদেশি জিনিস না কেনেন।
এই সার্কুলার উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে তুলল। সবদিক থেকেই এর নিন্দাবাদ হল। এমনকি যে সমস্ত পত্র-পত্রিকা সাধারণতঃ সরকারি নীতি ও কার্যাবলীর সমর্থন করে থাকে, তারাও এই সার্কুলারের নিন্দায় এগিয়ে এল। ষ্টেটসম্যান পত্রিকা এই সার্কুলারের ওপর মন্তব্য করে এমন ভাষা প্রয়োগ করল যে ভাষা সেই থেকে প্রকৃত কোনো খারাপ কাজের নিন্দা করা ছাড়া স্টেটসম্যান তার স্তম্ভে বর্জন করে আসছে। স্টেটসম্যান ঘোষণা করল :
সত্যি আমাদের নাম জানা প্রয়োজন, এই নপুংসক অফিসারটি কে যার পরামর্শ মতো লেফট্যান্যান্ট গভর্ণর এই আদেশে সম্মতি দিয়েছেন। পত্রিকাটি আরো বলে, ‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে এমন কোনো লোক গভর্ণমেন্টকে ভুল পথে চালিত করছে যে, হয় প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞ নতুবা গত কয়েক সপ্তাহের অলীক ভীতি প্রদর্শনের মুখে আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়েছে।
এই মন্তব্য করে পত্রিকাটি তার বক্তব্যের উপসংহার টেনে বলল, ‘স্পষ্টতঃ গভর্ণমেন্ট এক ছেলেমানুষী নিষ্ফল নীতি গ্রহণ করে ভুল পথে চলেছে। এ নীতির ফল হবে একদল শহিদের সৃষ্টি করা।’
এই হল ছাত্রদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রথম সে সার্কুলার জারি করা হয় তার প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ একটি প্রধান ইংরেজি সংবাদপত্রের ভাষ্য। কিন্তু ফতোয়ার পর ফতোয়া জারি করা চলতে থাকে প্রত্যেকটি সার্কুলারই চলমান উত্তেজনায় ইন্ধন যোগাতে থাকে, এবং যে অশুভকে দূর করার জন্য স্থির করা হয় সেটা শুভকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
এইসব সার্কুলারের মধ্যে একটি ছিল ‘বন্দে মাতরম’ সার্কুলার। এটি জারি করেছিল পূর্ববঙ্গ সরকার। এই সার্কুলার অনুযায়ী প্রকাশ্যে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেওয়াকে বে-আইনী বলে ঘোষণা করা হল। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীকে খুঁজে বার করা হল ‘বন্দে মারতম’ ধবনিটির ব্যাখ্যা করার জন্য। এই কর্মচারীটিকে আমাদের প্রাচীন শিক্ষাদীক্ষা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়। তিনি ব্যাখ্যা করে জোর দিয়ে বললেন যে ‘বন্দে মাতরম’ হচ্ছে প্রতিহিংসার জন্য কালীমায়ের নিকট প্রার্থনা। এই ধারণা তিনি কোথায় পেলেন তা খুঁজে বার করা কঠিন ব্যাপার। ‘বন্দে মাতরম-এর’ প্রথম কয়েকটি পঙক্তি হল একটি সঙ্গীত। এই সঙ্গীতের মধ্যে আছে মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার কথা। আর আছে জন্মভূমির রূপের বর্ণনা ও শক্তির বাণী। ‘আমি মাতাকে বন্দনা করি যে মাতা সকলেরই জননী, আমার স্বদেশ জননী’—এই হল ‘বন্দে মাতরম’ কথাটির সরল ও সহজ অর্থ। কিন্তু সরকারি কর্মচারী মহলে যে ক্রোধ ও উত্তেজনার ভাব প্রকাশ পেয়েছিল তারই মধ্যে এই নির্দোষ, পবিত্র সংক্ষিপ্ত ধবনির মধ্যে একটা কদর্থ খুঁজে বার করা হল এবং পূর্ববঙ্গ সরকার কর্তৃক রাস্তায় ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি বন্ধ করার জন্য এক সার্কুলার ঘোষণা করা হল। আমরা এ ব্যাপারে আইনজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করলাম। কলকাতা বারের একজন খ্যাতনামা অ্যাডভোকেট মিঃ পুঘের অভিমত আমাদের পক্ষেই গেল ও ওই সার্কুলার যে আইনসম্মত নয়, তা সাব্যস্ত হল।
বরিশাল সম্মেলনে এই ধবনিটি একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করেছিল। সে বিষয় পরে বলবো। ইত্যবসরে সকৃতজ্ঞ চিত্তে একথা বলতে চাই যে এর পরে এ বিষয়ে সরকারি মহলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে এবং সঙ্গীতটি সম্পর্কে যে জাতীয় ধারণা গড়ে উঠেছে, তা স্বীকৃতি লাভ করেছে। একবার আমি উত্তরবঙ্গে এক সৈন্য সংগ্রহের সভায় যোগদান করতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি দেখলাম যে এই মহান জাতীয় সঙ্গীতটি গীত হচ্ছে। গান চলার সময় সমস্ত দর্শক ও শ্রোতাদের সঙ্গে ব্রিটিশ অফিসারগণও দণ্ডায়মান হলেন। রাজকীয় সৈনিকের উর্দি-পরা বেঙ্গলী রেজিমেন্টের সৈন্যগণ যখন বিভিন্ন শহর পরিভ্রমণে যায় তখন তাদের দেশবাসীগণ তাদের ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করে সংবর্ধনা জানায়। তা ছাড়া সৈন্য সংগ্রহ সভায় তাদের মধ্যে যখন কেউ কিছু বলেছে তখন কেউ কেউ অফিসারদের পূর্ণ সম্মতি নিয়ে তাদের সমক্ষেই একথা ঘোষণা করেছে যে জার্মানদের পরিখা আক্রমণ করার সময় মুখে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি তাদের যেমন আনন্দ ও স্বদেশ গৌরব বোধ দান করবে তেমন আর কিছুতেই করবে না।
একসময় নিষিদ্ধ অবাঞ্ছিত ও দলিত হলেও এই ‘বন্দে মাতরম’ এখন সর্বভারতীয় জাতীয় ধবনিতে পরিণত হয়েছে। এখন ভারতের শিক্ষিত ব্যক্তিগণ যখন কোনো গণ-অনুষ্ঠানে স্বদেশপ্রেমের উচ্ছ্বাসবোধ করেন, তখন এই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করেই তাদের চিত্তের হর্ষভাব প্রকাশ করে থাকেন। এই প্রসঙ্গে আরো একটি লক্ষ্য করবার মতো বিষয় হল এই যে বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা একথা মনে করে না যে ‘বন্দে মাতরম’ হচ্ছে রাজদ্রোহীদের শান্তিভঙ্গ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য লোক জড় করার ধবনি।
‘বন্দে মাতরম’ হচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জির সুপরিচিত উপন্যাস আনন্দমঠ-এর একটি সঙ্গীতের প্রারম্ভিক কয়েকটি কথা। এটি একটি বাংলা গান। কিন্তু সংস্কৃত শব্দে সঙ্গীতটি এমন সমৃদ্ধ যে সারা ভারতের প্রতি অংশেই শিক্ষিত লোকেরা এটি বুঝতে পারে। এর শব্দ প্রয়াগের সুঠাম ভঙ্গী, সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা, এর আকুল স্বদেশপ্রেম সঙ্গীতটিকে জাতীয় সঙ্গীতের মহিমায় ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। বড়ো বড়ো জাতীয় সমাবেশে সভার কাজের প্রারম্ভে এই সঙ্গীতটি গেয়েই সভার কাজের উদ্বোধন হয়ে থাকে। স্বদেশি আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের বিরাট ভূমিকা সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জির হয়ত সে রকম কোনো পূর্ব ধারণা ছিল না। যে সুনিশ্চিত স্থান সমস্ত জাতীয় সভ্য-সমিতি, বিক্ষোভ শোভাযাত্রায় এই সঙ্গীতটি অর্জন করছে, বঙ্কিমচন্দ্রের সে সম্পর্কে কোনো চিন্তাও হয়ত ছিল না। দান্তে যখন ইটালীর ঐক্য সঙ্গীত গেয়েছেন, তখন তাঁরও কোনো ধারণা ছিল না যে তাঁর সঙ্গীতকে ম্যাজিনি ও গ্যারিবল্ডি কোনো ব্যবহারিক কাজে লাগাবেন, অথবা ইটালির লোকদের রাজনৈতিক বিবর্তনে ইহা কোনো ভূমিকা পালন করবে। প্রতিভাশালী লোকেরা তাদের চিন্তাধারাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে যান। তার কিছু কিছু উপযুক্ত জমিতে পতিত হয়। মহাকাল তার শক্তি দিয়ে তাকে পালনপোষণ করেন। পরে তা সুপরিপক্ক হয় এবং প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন করে ভবিষ্যৎ মানুষের অবর্ণনীয় মঙ্গলসাধন করে।