শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিকে বলা হয় পবিত্রা বা পুত্রদা একাদশী তিথি। মানুষের একাদশ ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী একাদশী দেবী। শাস্ত্র বলে, একাদশী ব্রত পালন করলে একাদশ ইন্দ্রিয়ের সংযম হয়। ইন্দ্রিয় সংযম হলে লোভ, ঈর্ষা, দম্ভ, আত্মঅহংকার ইত্যাদিতে অঙ্কুশ আনা সম্ভব। যা আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শাস্ত্রে যে চৌষট্টি প্রকার ভক্তাঙ্গের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একাদশী ব্রত সর্বত্তোম। শ্রী শ্রী পবিত্রা একাদশী দেবী তাঁর ভক্তদের মনের বিষয়াসক্ত বাসনাকে দূর করে মনকে বিশুদ্ধ জ্ঞানের আলোকে আলোকময় করে ভগবৎ কৃপা এবং করুণালাভে সহায়তা করে থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের এই কাহিনী বলেছিলেন।
পুত্রদা একাদশীর ব্রতকথা :
পুরাকালে দ্বাপর যুগের সূচনাতে মহিষ্মতী পুরীর রাজা ছিলেন মহিজিৎ। তিনি ছিলেন নানান সদগুন সম্পন্ন। কিন্তু তার মনে বিন্দুমাত্র সুখ ছিলোনা। রাজা ছিলেন অপুত্রক। সর্বদাই মনে পূর্ণতার অভাব বোধ করতেন রাজা। রাজার এই দুঃখ দেখে, রাজভক্ত পুরোহিত ব্রাহ্মণগণ রাজার মনকষ্ট নিবারণ ও মঙ্গলের জন্য সর্বশাস্ত্র বিশারদ ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ও ত্রিকালজ্ঞ ঋষি লোমশ মুনির কাছে রাজাকে যাবার প্রস্তাব দেন।
রামকথার অন্যতম বক্তা দীর্ঘায়ু, নীরোগ, নিরাহারে ঘোর উপাসনায় মগ্ন থাকতেন লোমাশ মুনি। শরীরের অতিরিক্ত চুলের কারণে তিনি এই নামটি পেয়েছেন। কিংবদন্তি বলে যে, তিনি একশত বছর ধরে পদ্মফুল দিয়ে ভগবান শিবের পূজা করেছিলেন। যার কারণে তিনি বর পেয়েছিলেন যে ব্রহ্মার এককল্প অতিবাহিত হলে ঋষির শরীরের একটি মাত্র লোম খসে পড়বে।

যাই হোক, মুনিবর রাজার কাছ থেকে তাঁর জীবনের দুঃখের কারণ জানতে চান। রাজা সবিস্তারে তার কথা জানান। এরপর লোমশ মুনি ধ্যানে জানতে পারেন, রাজা পূর্ব জন্মে এক দরিদ্র বৈশ্য ছিলেন। ব্যবসাই ছিলো জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। তাঁর মন ছিলো অপসংস্কৃতিতে ভরা। জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লপক্ষের দশমীর দিনে তৃষ্ণার্ত ব্যবসায়ীটি গ্রামের প্রান্তে একটি জলাশয়ে জলপান করতে যান। সেই সময় জলপান করতে আসা একটি গাভী ও তার বাছুরকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি জলপান করেন। এতে তার পাপ হয় গুরুতর। গত জন্মের সেই পাপের ফল হিসেবে বর্তমানে তাঁর এই দুঃখজনক পরিস্থতির সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থতি থেকে মুক্তিলাভের জন্য তিনি রাজা মহিজিৎকে শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষে পবিত্রা একাদশী পালনের উপদেশ দেন। মুনির নির্দেশ অনুযায়ী নিয়ম নিষ্ঠা সহযোগে ভক্তিভরে রাজা-রানী এই ব্রত পালন করে। যথাসময়ে রানীর কোল আলো করে বলিষ্ঠ, সর্বাঙ্গসুন্দর এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। ব্রত পালন করে রাজার মনের কষ্ট দুর হয়, পূর্ন হয় মনের ইচ্ছা।
তাই জন্য একে বলা হয় শ্রাবণ পুত্রদা একাদশী।
বলা হয়, এই ব্রতের প্রভাবে নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লাভ করে।
এবছর শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও ভোলানাথ শিবের তিথি একত্রে পড়েছে। বিষ্ণু কে তুলসী দ্বারা, শিবকে বেলপাতা দিয়ে পুজা করা হয়। পুরাণে বিভিন্ন শাস্ত্রে একাদশী পালনের উপবাস সম্পর্কে নিয়ম নীতির উল্লেখ্য করা আছে।
আট বছরের নীচে শিশু এবং অশীতিপর বৃদ্ধ, অশক্ত, অপটু, রোগী, উন্মাদ-কে একাদশী পালনের পক্ষে অনুপযোগী বলে গন্য করা হয়। একাদশী-তে উপবাসের কথা বলা হয়েছে। তবে অনাহারে উপবাস করাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়।’উপ’ অর্থাৎ নিকটে, ‘বাস’ অর্থাৎ অবস্থান করা। একসাথে বললে, শ্রীহরির নিকটে অবস্থান করাই হলো একাদশী ব্রত পালন।

মহিষ্মতী পুরীর রাজা ছিলেন মহিজিৎ।
কলিযুগে সরল ভক্তি ও ভগবৎ প্রীতি হচ্ছে ঈশ্বর সাধনার একমাত্র সহজ উপায়। শ্রবণ, কীর্তন, মননের মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণপ্রেম পাওয়াই একাদশীর মুখ্য উদ্দেশ্য।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুনকে বলেছেন, যা কিছুই আহার করবে তাই যেন প্রথমে ঈশ্বর-কে সমর্পণ করে গ্রহণ করা হয়। তাইতো রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলতেন, — একাদশী করা ভালো। “কলিতে অন্নগত প্রাণী। উপবাসী থাকলে ঈশ্বরের দিকে মন যায় না। “মিছরির জল, শরবৎ, ডাবের জল, খই-দুধ খেতে বলতেন। বলতেন, খই দুধ সাত্বিক আহার।
আধুনিক মানুষ বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, ব্রতকথার মধ্যে থাকে সামাজিক বিধানকথা। বিশ্বাস ও পালনের মধ্যে থাকে মঙ্গলবোধ। আর এই মঙ্গলবোধই সমাজ সংসারের জিয়নকাঠি।
“অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য ব্রতেনানেন কেশব, /প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভব”।।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : কৃষ্ণদ্বৈপায়ন মহাভারত, ব্রতকথা… ড শীলা বসাক ও অন্যান্য।।
প্রতিবেদন টি থেকে নুতন কিছু জানতে পারলাম।
ধন্যবাদ।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ????
পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে একটি অনবদ্য লেখা,,, ধন্যবাদ জানাই????????
খুব খুশি হলাম ????