এ রাজ্যের নির্বাচনে সংঘর্ষ-খুন নতুন ঘটনা নয়। এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কেবলমাত্র মনোনয়নপত্র জমা দিতেই ছ’জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে বোমা-গুলির দাপট আগে কখনো দেখা যায়নি, একথা বলা যাবে না। কিন্তু বাংলার নির্বাচনে খুন-সংঘর্ষ নতুন কিছু নয় বলেই যে তা ঘটবে, সেটাও কি সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজে অভিপ্রেত? তাই এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্ব থেকেই সন্ত্রাসের আগুন আর মৃত্যুর মিছিল দেখে বাংলার মানুষ আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন — আর কত রক্ত ঝরবে, আর কত লম্বা হবে মৃত্যু মিছিল।
এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বে বিভিন্ন জেলা বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে সংঘর্ষ-খুনের ঘটনা সব জেলায় ঘটেনি বা রাজ্যের ৩৪২টি ব্লকই অশান্ত হয়নি। ভাঙড়, ক্যানিং, ডোমকল, চোপড়া, আমোদপুর, ইন্দাস মিলিয়ে পাঁচ থেকে সাতটি জায়গায় সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়েছে। এই এলাকাগুলি ছাড়া আর যে সব জায়গায় ছোট বড় মিলিয়ে যতগুলি ঘটনা তেমন ঘটনা গত ৭৬ বছরে বাংলায় যতগুলি নির্বাচন হয়েছে তার সবকটিতেই হয়েছে। এরাজ্যের মানুষ ওই ধরনের হাঙ্গামার সঙ্গে অতি পরিচিত।
প্রসঙ্গত, বেশিরভাগ হাঙ্গামার জন্যই বিরোধীরা শাসকদলকে অভিযুক্ত করেছে। তবে একথাও ঠিক যে বহু জায়গায় হাঙ্গামা কিংবা কোনো বাধা ছাড়াও বিরোধীরা মনোনয়ন পেশ করতে পেরেছে। এমনকি রাতারাতি দল বদল করে নতুন দলে যোগ দিয়েও মনোনয়ন জমা দিতে পেরেছে। অন্তত মনোনয়ন জমার সর্বশেষ তথ্য তেমনটাই জানাচ্ছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় যেমন শাসকদল দাপাদাপি চালিয়েছে তেমনই অনেক জায়গায় বিরোধীরাও কিন্তু পিছিয়ে থাকেনি। আবার অনেক এলাকায় যেমন শাসকদলের সমর্থকেরা হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, লাঠি নিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, বিরোধীদেররও বহু জায়গায় হাতে অস্ত্র, লাঠি নিয়ে আস্ফালন করেছে। তারা এই সব অস্ত্র পেল কোথায়, কারা দিল এত উস্কানি? প্রতিটি নির্বাচনেই এই ছবিটা বাংলার মানুষ দেখে আসছেন, প্রশ্নও তুলছেন — কিন্তু নির্বাচন মিটে গেলেই সব প্রশ্নই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। বাংলার মানুষের আতঙ্ক, উদ্বেগ আর প্রতিবাদের আড়ালে এই কঠিন সত্যটাকে কি উপেক্ষা করা চলে?
এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বের খুন-সন্ত্রাসে পরও প্রশ্ন, ডোমকল, ভাঙড়, ক্যানিং, কুলতলিতে খুব শান্তিতে নির্বাচন হয়েছে কবে? উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় শেষ কবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে? অনেক জায়গায় তো শরিক দলের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা যদি ধরা যায় তো সে বছরও নির্বাচনের শুরুতেই রক্ত ঝড়েছিল। সেবার বিরোধীরা বহু জায়গায় মনোনয়ন জমা দিতে পারেনি। মনোনয়ন দাখিল থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত একটানা সংঘর্ষ চলেছিল, রক্ত ঝড়েছিল। ওই পঞ্চায়েত নির্বাচনে মোট ৭০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদেই ৪৫ জন। আর পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিনেই প্রাণ হারান ২০ জন। আজ জনসমর্থন হারিয়ে তারা সেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের খুন-সংঘর্ষের হিসাব সঙ্গত কারণেই মনে না করে শাসকদলকে খুনি বলছেন আর আদালত ও নির্বাচন কমিশনের দরজায় কড়া নাড়ছেন। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসক দল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল ৬৮০০ আসনে। হিসাব অনুযায়ী তা ছিল মোট আসনের প্রায় ১১ শতাংশ। কেবল সে বছরই নয়, ২০০৮ সালেও শাসকদল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল ২৮৪৫টি আসন। শতকরা হিসেব অনুযায়ী সেটা ছিল ৫.৬ শতাংশ।
এ রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে পঞ্চায়েত ভোট হয়েছিল ২০১৩ সালে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মীরা পান্ডে একরকম লড়াই করেই কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে সেবার নির্বাচন করিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও কি বিরোধীরা খুব সুবিধা করতে পেরেছিল? গোটা নির্বাচন পর্বে ৩৯ জন প্রাণ হারিয়েছিল। আর ভোটের দিনই প্রাণ হারান ২৫ জন। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, দেশের অন্যান্য রাজ্যেও তো নির্বাচন হয়, কিন্তু এত খুন-সন্ত্রাসের ঘটনা তো সেখানে ঘটে না। এমনকি বিহারেও নয়। তাহলে বাংলায় সামান্য পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নেই অস্ত্র হাতে ক্ষমতার আস্ফালন কেন, কেন এত খুন-সংঘর্ষ? এত রক্তক্ষয়ের জন্য দায়ী কে রাজনীতি নাকি রাজনৈতিক দল? নাকি টাকা? কারণ পঞ্চায়েতে টাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্রামের উন্নয়নের জন্য বাংলা কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রতি বছর ৪০০০ কোটি টাকা পায়। এর মধ্যে পাঁচ বছরের জন্য ৫০০ কোটি টাকা ব্যায় করতে পারে জেলা পরিষদ, ৫-১৫ কোটি টাকা ব্যায় করতে পারে গ্রাম পঞ্চায়েত। অতএব রাজনৈতিক দলগুলি ওই টাকার মালিক হতে পঞ্চায়েত দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।