শীতের সন্ধ্যায় মাঠে গেলেই এখন দেখা মিলবে আলোর ঝলকানি। মাঠে মাঠে পুড়ছে ধানের খড় ও নাড়া। ধোঁয়ায় ঢাকছে আকাশ — বাতাস। দূষণে ছেয়ে যাচ্ছে গোটা এলাকা। মারা যাচ্ছে কৃষিজমির উপকারী কীটপতঙ্গ। বন্ধ্যা হচ্ছে জমি। তবুও হুঁশ নেই কৃষক ও প্রশাসনের।
প্রসঙ্গত, রাজ্যের হুগলি, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান, পূর্ব মেদনীপুর, বাঁকুড়া ইত্যাদি জেলায় আমন ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। কারণ দ্রুত ধান কেটে সেই জমিতে রবি ফসল বিশেষ করে আলু বসানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। আর তা করতে গিয়ে অধিকাংশ কৃষক কম্বাইন হারভেস্টর দিয়ে ধান কাটা ও ঝাড়াই করে ধান বস্তাবন্দী করছেন। মাত্র এক ঘণ্টা সময়ে এক একর জমির ফসল ঘরে তুলছেন। অল্প সময় ও কম খরচ করে এ কাজটি করতে গিয়ে ধানের নাড়া খড় জমিতেই জড়ো হচ্ছে। তা দ্রুত পরিষ্কার করতে গিয়ে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছেন কৃষকরা। অসচেতনভাবে করতে গিয়ে বাতাসে ছড়াচ্ছে ভয়াবহ দূষণ। সেইসঙ্গে মাটির উপরিভাগে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও কেঁচো মারা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, মাটি গরম হয়ে তার নিজস্ব সত্তা হারাচ্ছে। ফলে বন্ধ্যা হচ্ছে মাটি। কৃষকরা নিজেদের পায়েই কুড়ুলটা মারচ্ছেন।

কৃষি দফতর ও প্রশাসন বারবার সচেতন করলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।উল্লেখ্য, হুগলি ও হাওড়া প্রধানত আলু চাষের উপর নির্ভরশীল। দ্রুত আমন ধান কেটে সেই জমিতে আলু বসানোর জন্য কম্বাইন হারভেস্টর ব্যবহার করছেন কৃষকরা। পড়ে থাকা খড় ও নাড়া জমিতেই পুড়িয়ে ফেলছেন। একরের পর একর জমিতে পুড়ছে খড় ও নাড়া। এ চিত্র এমনকী উপগ্রহ মারফত ধরাও পড়েছে। এ থেকে ভয়াবহ দূষণ ও জমির ক্ষতি নিয়ে চিন্তিত কৃষি বিজ্ঞানীরা।ক্ষুব্ধ পরিবেশবিদরা। কৃষিদফতর থেকে লিফলেট, ব্যানার এবং হোর্ডিং লাগিয়ে সচেতনতা করলেও কৃষকদের হুঁশ নেই। তাছাড়া প্রত্যক্ষ নজরদাদিও নেই প্রশাসনের। হুগলির উপকৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) সন্দীপ দে জানান, আমরা ধারাবাহিকভাবে মাইকে প্রচার, লিফলেট বিলি, এবং কৃষকদের সঙ্গে বৈঠক করে সচেতন করেছি। অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। আইনগত পদক্ষেপ করার মতো জায়গায় এখনো আমরা নেই। নাড়া ও খড় পোড়ানো নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় মানুষ ও পঞ্চায়েতগুলির সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, হুগলির পুরশুড়া আরামবাগ ও গোঘাট, হাওড়ার আমতা, উদয়নারায়ণপুর, বাঁকুড়ার জয়রামবাটি, বিষ্ণুপুর, কোতুলপুর, পূর্ব বর্ধমানের গলসি, উচানল ইত্যাদি এলাকায় যেভাবে প্রতিদিন মাঠে মাঠে খড় ও নাড়া পুড়ছে তাতেই কৃষি বিশেষজ্ঞদের ঘুম কেড়েছে। চাষিদের মতে আলু চাষ করতে গেলে দ্রুত আমনধানের জমি পরিষ্কার করতে হবে। এজন্য কম্বাইন হারভেস্টরকে কাজে লাগিয়ে কম মজুর ও স্বল্প খরচে কাজ সারা হচ্ছে। আর তা করতে গিয়ে জমিতেই অবশিষ্ট খড় ও নাড়া পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারপরই আলু বসানোর কাজ শুরু হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কৃষকদের এই অসচেতন কাজের জন্য একদিকে ভয়াবহ দূষণ ছড়াচ্ছে, অপরদিকে, পোড়া খড় ও নাড়া থেকে মাটির উপকারী জীবাণু পুড়ে নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া ধোঁয়া ও ছাইকণার সঙ্গে কার্বনডাইক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি নানা ক্ষতিকারক গ্যাস ও রাসায়নিক উৎপন্ন হয়। এমনকী এক ইঞ্চি গভীর পযর্ন্ত মাটিতে থাকা কেঁচো, জীবাণু সবই ধ্বংস হয়। তাছাড়া মাটি শক্ত হয়ে উর্বরতা শক্তি হারায়। ফলে পরবর্তী চাষে ফসল কম পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু কৃষকরা যদি জমির এককোণে নাড়া ও খড় জড়ো করে রাখে, পরে তা পচে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে জৈব সার হতে পারে। চাষিদের এটা ভেবে দেখা দরকার। আর তা নাহলে দূষণে দিল্লির মতো পশ্চিমবঙ্গও ‘গ্যাস চেম্বার’ হবে। তাই আগে থেকে সতর্ক হওয়া জরুরি।