| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

উত্তর রাঢ়ের দাবদাহে ফুলবাহার : ড. শিবশঙ্কর পাল

Reporter
ড. শিবশঙ্কর পাল / ৩৫৯ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

পাথরেও ফোটে ফুল। কথাটা খুব সত্যি। পাষাণের গায়ে কোন্ উপায়ে রঙ লাগে তা জানা নেই। ওটাই হয়তো প্রকৃতির লীলা। ওসব ফুল এমনিই ফোটে। বিনা পরিচর্যায়। যারা পাহাড় গিয়েছেন তারা দেখেছেন সেসব নাম না জানা জংলি ফুলের বাহার। ছোট ছোট কমলা লাল বেগুনি সাদা ফুল। পাহাড়ি মানুষগুলোর বাড়ির সামনেও নানা রঙের ফুল দেখা যায়। সারাবছর। ঘন লাল, ঘন নীল, হলুদ, গোলাপি রঙের কচি নরম ফুলবাগান ওদের ঘরে ঘরে। ঘরের দুয়ার বারান্দা সিঁড়ি চাতাল কার্নিশ সর্বত্রই ফুলমহল। ওসব পরিবেশে ফুল সহজে মেলে পাঁপড়ি। দার্জিলিং কালিম্পং জেলায় যা সহজলভ্য। কিন্তু ওসব পাহাড়ি দেশ, কম তাপের ভূমি। তাই হয়তো ফুল ওখানে সহজেই ওঠে হেসে।

অথচ পরিবেশটা যদি উচ্চ তাপের হয়! তাপমাত্রা যদি ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রি ছুঁয়ে যায়! সেসব এলাকায় কি ফুল ফোটে? তীব্র তাপে তা ঝলসে যাবে! মুষড়ে যাবে কয়েক ঘন্টায়! যদিও পুরুলিয়ার মতো রুক্ষ পরিবেশে বসন্ত এলে দেখা যায় পলাশে পলাশে কমলা রঙের আভা। রঙে রঙে দিশেহারা হয়ে ওঠে পুরুলিয়ার পাহাড়। কাছে-দূরে ছড়িয়ে দেয় রঙের আলো। বলে — ‘বসন্ত এসে গেছে।’ পুরুলিয়ার পরিবেশে কুসুম গাছের পাতাও হয়ে ওঠে লালে লাল। পুরুলিয়ার মতো গরমের দেশ বীরভূম। সেই বীরভূমে কি ফুলের বাহার দেখা যায়! বিশেষত গ্রীষ্মকালে যে দেশে আগুনের হলকা ছোটে। আম-টক, তেঁতুল-টক, কামরাঙা, দই খেয়ে যেখানে দেহের তাপ কমাতে হয়! রাঢ়ের দেশ বীরভূম। রুক্ষ মাটির দেশ বীরভূম। গ্রীষ্মে যে দেশের মাটি হয় আগুন। সূর্য আসে তেড়ে। পুকুর নদীর জল বাষ্প হয়ে উধাও হয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’য় জানিয়েছেন সে পরিবেশের স্বরূপ —

‘এ দেশের নদীর চেয়ে মাটির সঙ্গেই মানুষের লড়াই বেশি। ‘খরা’ অর্থাৎ প্রখর গ্রীষ্ম উঠলে নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যায়, ধূ-ধূ করে বালি… মাটি তখন হয়ে ওঠে পাষাণ; ঘাস যায় শুকিয়ে, গরম হয়ে ওঠে আগুনে-পোড়া লোহার মত; কোদাল কি টামনায় কাটে না, কোপ দিলে কোদাল-টামনারই ধার বেঁকে যায়; গাঁইতির মত যে যন্ত্র সে দিয়ে কোপ দিলে তবে খানিকটা কাটে, কিন্তু প্রতি কোপে আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়ে। খাল বিল পুকুর দীঘি চৌচির হয়ে ফেটে যায়।’

— অথচ এই প্রখর রোদেও বীরভূম ওঠে মেতে। রঙে রঙে। ফুলে ফুলে। প্রকৃতির এ-এক অকৃপণ দান। চূড়ান্ত তাপকে সহ্য করেও হাসে ফুল। যা বীরভূমের সাধারণ বৈশিষ্য্ে। অথচ এ-দিকটা আমরা দেখেও দেখিনা। বসন্তের শেষে বা চোত-বোশেখ মাসে বীরভূমে লাগে রঙের আভা। বিশেষত রাস্তার ধারে ধারে থোকা থোকা লাল লাল ফুলের গাছ দেখলেই মনে পড়ে ‘এসো হে বৈশাখ’। মনে পড়ে ক’দিন পরে ২৫শে বৈশাখ। ওই লাল ফুলের থোকা দিয়ে সাজানো হবে রবীন্দ্র জয়ন্তীর মঞ্চ। লাল কৃষ্ণচূড়া। হলুদ রাধাচূড়া। সকালে বা বিকেলে ওরা যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এ-জন্য শান্তিনিকেতন যেতে হবেনা। বীরভূমের রাস্তার ধারে ধারে বসন্ত শেষে বৈশাখে এদের দেখা মিলবে। সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকে ওরা। লাল হলুদ, লাল হলুদ হয়ে দু’দিকে বাড়ায় হাত। পথচলতি মানুষকে জানায় এই তাপেও আছে মায়াবী খেলা। দাবদাহের মাঝেও বীরভূমে আছে প্রাণের ছোঁয়া। বীরভূমে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার শেষ নেই। কেও লাগায় না ওদের। ওরা বেড়ে ওঠে নিজে থেকে। অযত্নে। প্রকৃতির কৃপায়। এখানেই হয়তো প্রকৃতির লীলা। এখানেই চূড়ান্ত গরমে বসে রঙের মেলা। শুধু বসন্ত নয়, গ্রীষ্মেও বীরভূম ওঠে সেজে। রামপুরহাট মল্লারপুর সিউড়ি হাইওয়ের দুধারে অজস্র গাছের ভিড়ে ওরা টানে চোখ। চামড়া ঝলসানো গরমে ওদের দেখে, ওদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া যায়। গাছের নিচে নিচে, রাস্তার দুধারে ছড়িয়ে থাকে অজস্র হলুদ রাধাচূড়া। কৃষ্ণচূড়ার লাল পাঁপড়ি। ঝরা ফুলের গালিচা হয় পাতা —

‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি-কর্ণে

আমি ভূবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে।’

(কাজী নজরুল ইসলাম)

বীরভূমের রুক্ষ প্রকৃতির এ-এক অপরূপ লীলা। শুধু লাল হলুদ নয়। এদের মাঝেই দেখা যায় বেগনি রঙের জারুল ফুল। ছয় পাঁপড়ি নিয়ে জারুল ফুল, মুখ উঁচু করে ফুটে থাকে গাছে গাছে। জানিয়ে দেয় লাল (কৃষ্ণচূড়া) হলুদের (রাধাচূড়া) মাঝে বেগনি রঙের বাহার কোনও অংশে কম নয়। বরং প্রকৃতির দেওয়া অতিরিক্ত দান। লাল বেগনি হলুদের অদ্ভুত মেলবন্ধনে বীরভূম ওঠে মেতে। যে দেশে গ্রীষ্মে ক’দিন পর ঘাস যাবে পুড়ে। মাটির গায়ে দেখা দেবে বড় বড় ফাট। সে দেশে এসময় (এপ্রিল-মে) বসে রঙের মেলা। পথ চলতে গেলে দেখা মিলবে সোনালু ফুলের গাছ। যার ফুলের রঙ হলুদ। লতানো ফুল। কানের দুলের মতো ওরা ঝুলে থাকে ডালে ডালে। ঝোপ হয়ে। থোকা থোকা। যেন তুলে নিয়ে খোঁপায় গুঁজলেই হয়! সে এক চোখকাড়া ফুলবাহার। এ-সময় শিরীষ গাছের ফাঁকে ফাঁকে হাসে সাদা-গোলাপি শিরীষ ফুল। যা দেখতে অনেকটা কানের ঝুমকোর মতো। রাতের আকাশে ছোট ছোট তারার মতো ওরা। যারা গাছের বুকে রাতের জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে দিনে। একটু চোখ রাখলে ওদেরও দেখা মিলবে রাস্তার এদিক ওদিক। এসব দেখে বীরভূমকে শুধু রুক্ষমাটির দেশ বলতে ভীষণ কষ্ট হয়। কেননা যে দেশ লাল মাটির দেশ, শুকনো দেশ বলে পরিচিত সে দেশে যে ফুলও ফোটে তা আমরা মনেও রাখিনা। রাস্তা পার হতে গিয়ে চোখে লাগলেও গাছগুলোর নাম জানার ইচ্ছে থাকেনা। বরং সেসময় খুঁজি একটু ঠাণ্ডা জল বা কোল্ড ড্রিঙ্কস্। সিউড়ি দুবরাজপুর রোড বা হোক ছোটনাগপুর ঘেঁষা বীরভূমের প্রান্তদেশ, একটু চোখ মেললেই রঙের দোলা সহজেই লাগে চোখে। যদিও অসহ্য গরমে জীবন বেড়িয়ে যায়, তবুও রঙের খেলা চলতে থাকে গাছে গাছে। তবে বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের শুরুতে এরা থাকবে। জ্যৈষ্ঠ গড়ালে মুষড়ে যাবে ধীরে ধীরে।

বীরভূম শুধু লাল মাটি বা রুক্ষ মাটির দেশ নয়। খুব স্পষ্ট করে বললে বীরভূম কালো মাটির দেশ। বীরভূম ধূসর মাটির দেশ। বীরভূমে আছে সাদা মাটি। বিচিত্র এই রাঢ়দেশে প্রকৃতিও বিচিত্র। গ্রীষ্মকালে শান্তিনিকেতন গেলে দেখা যায় বীরভূমের আরেক স্বরূপ। বাড়িতে বাড়িতে দেখা যায় লাল-গোলাপি-সাদা রঙের কাগজফুল। লতিয়ে পড়ে রাস্তা বা পাঁচিলের কোলে। রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে ফোটে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া। দেখা মেলে বাঁদরলাঠির হলুদ ফুল। কাঠ গোলাপের সাদা সাদা ফুল ছড়িয়ে দেয় মিষ্টি গন্ধ। তবে রবীন্দ্রনাথের প্রিয়ফুল এ-সময়ে দেখা যায়না।

অনেকেই গুরুডংমার ইয়ামথাম ভ্যালি দেখে এসেছেন। সিমলা উটি কাশ্মীর অরুণাচলের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। তারা কেও কেও পলাশের টানে বসন্তে গিয়েছেন পুরুলিয়া। কিন্তু গ্রীষ্মে বীরভূম আসার কথা কেও কল্পনাও করেনা। দূর দূরান্তেও ভাবতে পারে না বীরভূমের গরমে ফুটতে পারে ফুল। কিন্তু তাঁরা অনেকটাই ভুল। অবশ্য গ্রীষ্মকালীন বীরভূমের ফুল-প্রকৃতি দেখতে গেলে গায়ে একটু তাপ লাগাতে হবে। বেড়োতে হবে সকালে বা বিকেলে। ঠিক সন্ধে নামার আগে। ঘুড়তে হবে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর মাঠে-ঘাটে। শুকনো নদীর ধারে। দেখা যাবে কোনও দীঘিতে একটু জল। তার উপর সবুজ কষকষে পাতা। তার উপর শঙ্খের আকৃতি নিয়ে জেগে আছে পদ্মের কুঁড়ি। দেখা যাবে আঙুলের মুদ্রা নিয়ে ফুটে থাকা গোলাপি রঙের পদ্ম। পুকুর ভর্তি পদ্ম এই গ্রীষ্মেও পাওয়া যাবে। কোনও কোনও গ্রামের হাঁটুজল পুকুরে দেখা মিলবে শালুক ফুলের দল। ঘন লাল বা সাদা রঙের শালুক ফুল মোহিত করে দেবে মন। বর্ষাকাল ছাড়াও গ্রীষ্মকালে কোনও কোনও পুকুরে এরা টিকে থাকে। বাচ্চার যা দিয়ে বানায় গলার মালা। শালুক বা শাপলার কাণ্ড দিয়ে কেও রাঁধে উত্তম ব্যঞ্জন।

গ্রীষ্মে যেসব নিচু জায়গায় বা পুকুরে কিছুটা জল অবশিষ্ট থাকে সেখানে দেখা যায় কচুরিপানা। আর তার মাঝেই দেখা যায় কচুরিপানার ফুল। সাদা সাদা পাঁপড়ি। তার মাঝে নীল রঙ। তার ভিতরে হলুদ। কচি নরম এই ফুল। পুকুর ভর্তি কচুরিপানার ফুল দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। গ্রীষ্মের অত্যাচার সহ্য করেও স্থানবিশেষে ওরা টিকে থাকে। রাশি রাশি সাদা নীল আভার কচুরিপানা ফুল সত্যিই প্রকৃতিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ক্যামেরাবন্দী করতে বাধ্য করে সে-সব দৃশ্যপট। বীরভূম যখন তাপে রোদে ভাঁপে ধোঁকে, তখন প্রকৃতির এই লীলা সৃষ্টি করে রহস্য। কোন্ প্রাকৃতিক বিদ্যায় ওরা জেগে ওঠে বিশেষ এই সময়ে সেটা ওরাই জানে। বীরভূমের ঝোপে ঝাড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে শুধু শাল তালের সারি থাকেনা। শুকনো মাটি, উষ্ণ বাতাসের এই দেশে প্রকৃতির আলাদা আয়োজনও থাকে। জলশূন্য পুকুরে থাকে কলমির ডাল। কলমির ডালে ডালে ধুতুরা ফুলের মতো সাদা কলমি ফুল ওঠে জেগে। সাদা পাঁপড়ির ভিতর গোলাপি রঙের আভা। অবহেলায় আপনাআপনি ফুটে ওঠা এই ফুলের সৌন্দর্য কোনও অংশে কম নয়। বীরভূমের মাঠে ঘাটে, গ্রীষ্মের দেশে এদের সহজেই দেখা মেলে। মিষ্টি গন্ধযুক্ত ফুল ঘেঁটু। যা ঘেঁটু পুজোর সময় লাগে। বনে বাদারে দেখা যায় অজস্র ঘেঁটু ফুল। থোকা থোকা। সাদা পাঁপড়ির মাঝে মাঝে লাল বা বেগনি রঙের ছোপ। রঙের খেলা নিয়ে ফুটে ওঠে এই ফুল।

বীরভূমের প্রকৃতি সত্যি বিচিত্র। কোথাও লাল মোড়াম। কালো পাথরের খাদান। খড়ি খাদানের সাদা মাটি। কোথাও টিলা। কোথাও নদীকূলবর্তী নিচুতট। কোথাও আম জাম কাঁঠাল বন। সারি সারি তাল গাছ। সোনাঝুড়ির জঙ্গল। শতাব্দী প্রাচীন অশ্বত্থ তেঁতুল বট। নদীতীরে বাঁশের ঝোপ। সাবাই ঘাসের জঙ্গল। নদী নালা খাল বিল পুকুর। এ-সময় গ্রীষ্মকালীন ধান ওঠে পেকে। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, গায়ে মাখে হলুদ চাদর। সোনালি পাকা ধানের গায়ে লাগে রোদের ঝলক। ঝলমল করে সেই ছবি। এই গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে বা সকালে।

বছরের এ-সময় (মার্চ এপ্রিল মে) রাঢ় দেশ ধীরে ধীরে ঝলসে উঠবে। দীর্ঘ তালগাছগুলোর পাতা যাবে শুকিয়ে। বাঁশবনের তলে বাজবে শুকনো পাতার গান। প্রখর রোদে মাঠে দাঁড়াবার জায়গা অবধি থাকেনা তখন। কিছু গাছ-গুল্ম তাও থাকে টিকে। ফাটে মাটি। মরে ঘাস। নদীগায়ে লাগে মৃত্যুর ছোঁয়া। তবুও নদী পারে দেখা যায় শিমূল গাছ। যা হয় পাতাবিহীন। গোটা গাছে অপূর্ব নজর কাড়া লাল ফুল ওঠে ফুটে। দূর থেকে দেখলে লালের লীলা মন মোহিত করে। দূরন্ত গ্রীষ্মে চোখে লাগে আরাম। শিমূলের লাল লাল মোটা মোটা ফুল, পলাশের শোভাকেও হার মানায়। গোটা গাছটাই হয়ে ওঠে রঙে আঁকা। কালো বৃন্ত লাল পাঁপড়ির শিমূল, প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি। গ্রীষ্মে রাঢ়ের প্রকৃতি নিষ্ঠুর হলেও রঙের দেখা মেলে। পাঁপড়ি খসে পড়ে থাকে গাছের তলে তলে। মাঠে গেলে দেখা মেলে ঢ্যাঁড়স ফুল। অতি চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দিত এই ফুল। রক্তরাঙা আভা। লালের সে এক অপরূপ লালিত্য। টক ঢ্যাঁড়সের ফুল লাল। মাঠজোড়া টক ঢ্যাঁড়সের ফুল কোনও শিল্পীর আঁকা ছবি হয়ে ধরা দেয়। আবার এমনি ঢ্যাঁড়সের ফুল হলুদ। সে ফুলও বীরভূমের খেতে খেতে দেখা যায়। মাঠে মাঠে থাকে লাল শাক। যার পাতা ও কাণ্ড খাদ্য হিসাবে উপাদেয়। বড় বড় লাল পাতার লাল শাক সত্যি দৃষ্টিকাড়া। এ-সময় বট গাছে পাকে ফল। গোল গোল ছোট ছোট লাল লাল বট ফল —

‘অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া যখন লেগেছে নীল বাংলার বনে

মাঠে-মাঠে ফিরি একা…

চেয়ে দেখ কত শত শতাব্দীর বট

হাজার সবুজ পাতা লাল ফল বুকে লয়ে শাখার ব্যজনে

আকাঙ্ক্ষার গান গায় — ’

(রূপসী বাংলা : জীবনানন্দ)

জীবনানন্দের কবিতায় যেসব ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়, তার অনেকটা মিলে যায় বীরভূমের গ্রীষ্মকালীন ফুলের সঙ্গে। বীরভূমের মাঠে ঘাটে জঙ্গলে ঝোপে এ-সময় দেখা যায় কলমি ফুল, ঘেঁটু ফুল (ভাট ফুল), বট ফল, আকন্দ, পদ্মের দীঘি। জীবনানন্দও এসব ফুলকে স্মরণ করেছেন তাঁর কবিতায় — ‘বনে আজও কলমির ফুল ফুটে যায় — ’।

মাঠে-ঘাটে এখানে ওখানে দেখা যায় আকন্দ ফুল। চৈত্র গাজনে যা দিয়ে বানানো হয় শিবের মালা। থোকা থোকা সাদা-বেগনি রঙের আকন্দ ফুল বীরভূমের যত্রতত্র দেখা যায়। বনে বাদারে সাদা সাদা নরম তুলির মতো ঘাসজাতীয় গুল্ম মুখ তুলে ডাকে। এ-সময়ই দেখা যায় শশা ও ঝিঙে ফুল। হলুদ-নরম পাঁপড়ির ফুল ওরা। যারা চৈত্র-বৈশাখের দাবদাহেও রাঢ়বঙ্গের মান রাখে। গ্রীষ্মের বীরভূম চেয়ে দেখলে, কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া জারুল সোনালুর মতো আরও অনেক ফুলের দেখা মিলবে এ-দেশের মাঠেঘাটে, পথে প্রান্তরে। যার শোভা কোনও অংশে কম নয়। উত্তর রাঢ়ের দাবদাহে ফুলবাহার, মনকাড়া নজরকাড়া। যেমন নিচের ছবিতে সাদা গোলাপি সবুজ সোলানি নীল রঙের রোদ ঝলমলে রঙ-মেলা বসেছে মাঠের সীমান্তে।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “উত্তর রাঢ়ের দাবদাহে ফুলবাহার : ড. শিবশঙ্কর পাল”

  1. Naba Gopal says:

    ভালো লেখা। আরও চাই এমন লেখা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev