আনারস এমন একটা ফল যার নাম শুনলেই জিভে আসে জল। প্লেটের মধ্যে সাজিয়ে বিট লবণ মাখিয়ে টক মিষ্টি স্বাদের আনারস খাওয়ার মজাই আলাদা। আনারস দিয়ে বানানো ডেজার্ট বা শেষপাতে খাওয়ার জন্য মিষ্টি চাটনি,পুডিং ফ্রুট স্যালাড শুধু মন ভালো করে দেয় তাই নয়, শরীরের জন্যও যথেষ্ট উপকারী। টাটকা কেটে খাওয়া যায় শুধু নয় ফল,কৌটো বন্দি রাখা যায় যাতে অনেকদিন পর্যন্ত।
ক্রান্তীয় জলবায়ুতে জন্মানো এই ফল থেকে ইয়োগার্ট আইসক্রিম পেস্ট্রি ফ্রুট ককটেল প্রভৃতিও তৈরি করা হয়। আনারসের পাতা দিয়ে তন্তু তৈরি করা হয় যা বয়ান বা টেক্সটাইল শিল্পে কাজে লাগে।
১৬৬৪ সালে পাইন গাছের ফলের সঙ্গে আনারসের আকৃতির সাদৃশ্য দেখে বিদেশি ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা এই ফলের নাম দেন পাইন অ্যাপল। ফলটির আদি নাম ছিল আনানাস্।দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের বিখ্যাত শহরের কথ্য ভাষার নাম টুপি। সেই ভাষায় এই ফলকে বলা হয় আনানাস্ — যার অর্থ হল এক্সিলেন্ট বা অতি চমৎকার। ১৪৯৬ সালে কলম্বাস ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে এই ফল ইউরোপে নিয়ে আসেন। ১৫৪৮ সালে এই ফল ভারতে এসে পৌঁছেছিল।
এই ফলের আদি জন্মস্থল দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ। তবে বর্তমানে ক্রান্তীয় অঞ্চলে বিশ্বের সর্বত্রই এর চাষের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। কোস্টারিকা, ব্রাজিল এবং ফিলিপাইন এই তিনটি দেশ একত্রে বিশ্বের সমগ্র আনারস উৎপাদনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে। ভারতে কেরালার ভাজাকুলামকে বলা হয় ‘বৃহত্তম আনারস বাজার’। বঙ্গে প্রায় ৯০% আনারস উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত হয়। এছাড়া দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং হুগলি জেলাতেও আনারস চাষ হয়।
আনারসে ম্যাঙ্গানিজ ও ভিটামিন সি আছে আনারসের রস মাংস মাখিয়ে রাখলে মাংস তাড়াতাড়ি সিদ্ধ হয়। কারণ এতে ‘ব্রোমিলেন’ (Bromelain) বলে এক ধরনের এনজাইম আছে যা প্রোটিন ভাঙতে সাহায্য করে। সম্ভবত এই কারণে অনেক গর্ভবতী মহিলাদের আনারস খেতে নিষেধ করা হয়। টাটকা আনারস যেমন দিনে বা রাতে যে কোন সময় খাওয়া যায়। তেমনি আনারস খাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি মাংসের সঙ্গে। শুয়োরের মাংস বা হ্যাম, চিকেন, ভেড়ার মাংস, বিফ, মটন — এইসব মাংস খাওয়ার পর আনারসের টুকরো খেলে খুব তৃপ্তি পাওয়া যায়।

বর্ষার বাজারে বাঙালির বাজারের ব্যাগে উঁকি দেয়নি আনারসের সবুজ পাতা, এ ছবি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ বাঙালি জানে স্বাদে অতুলনীয় আনারসের রসে আছে নানান গুণ।
১. পেট পাতলা, পেট ফাঁপা বাঙালির জন্য আনারস খুব কার্যকরী। আনারসের উপস্থিত যৌগ হজমে সহায়ককারী উৎসেচকের ক্ষরণ বৃদ্ধি করে।আনারসের ‘ব্রোমিলেন’ খাবারের প্রোটিনগুলিকে অ্যামিনো অ্যাসিড এবং পেপটাইডের ছোট ব্লকে ভেঙে দেয়।
২. প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস : আনারস হল প্রতিরক্ষামূলক উদ্ভিদ যৌগের একটি কার্যকর উৎস, বিশেষ করে ফ্ল্যাভোনয়েড, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নামে পরিচিত। নিয়মিতভাবে এগুলি গ্রহণ করলে হৃদরোগ , ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সার সহ কিছু দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত অবস্থার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৩. হৃদয়ের জন্য : আনারসে উপস্থিত এন্টি অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে হার্টের যত্ন নেয় ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে আনারস খুবই উপকারী। এতে থাকা ভিটামিন সি সংক্রমণজাতীয় রোগের সঙ্গে লড়াই করতে সক্ষম। স্কুলের বাচ্চাদের উপর নয় সপ্তাহ ধরে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন মাঝারি পরিমাণে আনারস (১৪০ গ্রাম) অথবা বেশি পরিমাণে (২৮০ গ্রাম) খেয়েছে, তাদের ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি তাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল যারা কখনও খাওয়া হয়নি।
৫. লোহা শোষণে সহায়তা করে : আনারস ভিটামিন সি-এর একটি উপকারী উৎস। একটি আকর্ষণীয় গবেষণায় দেখা গেছে যে নয় সপ্তাহ ধরে আনারস খেলে কম ওজনের এবং স্বাভাবিক ওজনের উভয় ব্যক্তির হিমোগ্লোবিনের মাত্রা উন্নত হয়।
৬. আঘাতের পর নিরাময়কে উৎসাহিত করতে পারে বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্রোমেলেন আঘাত বা অস্ত্রোপচারের পরে প্রদাহ, ফোলাভাব এবং ক্ষত কমাতে সাহায্য করে। এমনকি দাঁতের অস্ত্রোপচারের আগেও এটি গ্রহণ করা কার্যকর হতে পারে , যখন এটি ব্যথা কমাতে সাহায্য করে এবং প্রদাহ-বিরোধী ওষুধের মতোই উপশম প্রদান করে বলে মনে হয়।
৭. আর্থ্রাইটিসের লক্ষণগুলি উপশম করতে সাহায্য করতে পারে অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে আর্থ্রাইটিসের সাথে সম্পর্কিত প্রদাহজনিত ব্যথা উপশমে ব্রোমেলেন অনেকটাই কার্যকর হতে পারে।
৮. শরীরে জলে ঘাটতি কমাতে পারে আনারস। আনারস শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম শোষণ করে, পেট ফাঁপার মত সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।
৯. প্রাণীদের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে যে Bromelain রক্ত জমাট বাঁধার উপর প্রভাব ফেলে, কারণ এটি ফাইব্রিন নামক একটি প্রোটিনের উৎপাদনকে বাধা দেয়, যা রক্ত জমাট বাঁধার সাথে জড়িত।
১০. আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বলে, আনারস কৃমিনাশক। যাদের এই সমস্যা আছে তাদের নিয়মিত সাত দিন ধরে খেতে হবে। তবে এটি খালি পেটে খাওয়া উচিত নয়।
১১. পাকা আনারসের টুকরো চিনি ও গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে অম্লপিত্ত সেরে যায়।
১২. অল্প পরিমাণ আনারস পিপুলগুঁড়ো ছড়িয়ে খেলে ডায়াবেটিস কন্ট্রোল করা যায়।
১২. আনারস পাতায় টাটকা রস চিনি মিশিয়ে খেলে হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়।
আনারস কি সবার জন্য নিরাপদ?
যদি না আপনার আনারসের প্রতি অ্যালার্জি থাকে, তবে এটি একটি স্বাস্থ্যকর, সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।সাধারণত বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে স্বীকৃত। তবে, বেশি পরিমাণে খাওয়া বা জুস পান করা হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং সেক্ষেত্রে কাঁচা ফল এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে কারণ এটি ডায়রিয়া এবং গলা জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে। তাছাড়া, যদি আপনি অ্যাসিড রিফ্লাক্সে ভোগেন, তাহলে আনারস আপনার লক্ষণগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাচ্ছেন তাদের মনে রাখা উচিত যে আনারসে থাকা ব্রোমেলেন রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং রক্ত পাতলা করার ওষুধের সাথে পরিমাণে খাওয়া হলে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গর্ভবতী মহিলাদের আনারস খাওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়, তবে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। আনারসে ব্রোমেলেন নামক একটি এনজাইম থাকে যা বেশি পরিমাণে খেলে জরায়ুতে ক্র্যাম্পিং বা অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাত হতে পারে এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে, যদিও এর সপক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এছাড়াও, আনারসের অ্যাসিডিক উপাদানের কারণে অম্বল বা রিফ্লাক্স হতে পারে। তাই, গর্ভবতী মায়েদের আনারস পরিমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো। তবে মনে রাখবেন, বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজনীয়।।
আনারস দিয়ে আপনি আনারসের জুস, গ্রিলড আনারস, আনারসের চাটনি, আনারসের মোরব্বা, আনারসের স্যান্ডউইচ, এবং আনারস দিয়ে মুরগির মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরি করতে পারেন। আনারসের জুস তৈরির জন্য আনারস কেটে ব্লেন্ডারে দিয়ে ব্লেন্ড করে ছেঁকে নিলেই হবে। গ্রিলড আনারস তৈরির জন্য আনারসের টুকরাগুলিতে মশলা মাখিয়ে গ্রিল করা যায়। আনারস দিয়ে জ্যাম জেলি মোরব্বা স্কোয়াশ সব কিছুই তৈরি করে ভাঁড়ারে রাখা যায় যখন খুশি খাওয়ার জন্য। তাই হে বাঙালি, এই বর্ষায় আনারসের রসে মজুন কিন্তু পরিমিত পরিমানে।
অনবদ্য লেখনী।
থ্যাঙ্ক ইউ
অনেক কিছু জানতে পেরে খুব ভালো লাগলো।
থ্যাঙ্ক ইউ