রাতের গাঢ় অন্ধকারেই গঙ্গার ধারে এসে দাঁড়ালেন কবীর। পৈঠায় তারাদের ছায়া নেই, জলে ভাসে তারাদের ফুলছায়া।
ঘাটের পৈঠা সার সার পার হয়ে নেমে গেছে পানিতে। বারাণসী ঘাটের পৈঠায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন কবীর নবীন।
তিনি আসবেন। নিশ্চয় আসবেন। ঠিক সময়ে আসবেন। স্থির জানে জোলা কবীর।
আহ্! প্রায় এক আশ্চর্য প্রশান্তিতে যেন নিদ এসে যায় নবীনের। আসলে কবীর তাঁর এই ছলনার আর এক অর্থ খুঁজে পান। বড়ো চওড়া আর গাঢ় সেই অর্থ। সেই প্রাপ্তিতেই, প্রাপ্তির সেই শান্তিতেই যেন ঘুম এসে যায়। এই যে তিনি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন পৈঠায়, এই যে তাঁর বুক পাতা হয়ে গেল ঘাটের পৈঠায়, বুক মুখ নাক, কত মানুষের পায়ের ছাপ আঁকা হয়ে গেল তাঁর বুকে। হাজার মানুষের, যে মানব কাকভোর থেকে সারা দিনমান রাম, হরি আর শিবাজির নাম নিয়ে পৈঠা ধরে নেমেছে গঙ্গায়, নেয়েছে গঙ্গায়। তাঁর বুকে আঁকা খোদার নাম আর রাম-হরি-শিবনামের ছাপ পাশাপাশি বসে গেল অযুত। খোদার নামের পাশে তাঁর ছিনায় খোদাই হয়ে গেল মানবের পায়ের ছাপ।
কবীরের নাক-মুখ, শ্বাসনালী, খাদ্যনালী, রক্তনালী-জালিতে যেন ঢুকে যাচ্ছে হিন্দুস্থানের হাজারো মানুষের পদতলের আঘ্রাণ।
অপেক্ষার সেই অবসরে কবীর শুনছেন জলের চলার শব্দ। বারাণসীতেই বেড়ে-ওঠা, কতদিন এসেছেন গঙ্গার ঘাটে, তবু এমন করে কখনো জল-চলার শব্দ শোনা হয়নি। এই এখন যখন শেষ রাতের গাঢ় অন্ধকারে বারাণসী ঘাটের পৈঠায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। তাঁর কলিজার তালের সঙ্গে যেন তাল মেলাতে চাইছে ভাটির দিকে চলা জলের ধ্বনি। অথবা তাঁর কলিজাই তাল মেলাতে চাইছে জলধ্বনির সঙ্গে। তাঁর রক্তের সোঁতায় মিশে যাচ্ছে নদীর তান। আহা নদীর এই তাল লয় ধ্বনি যদি তাঁর গানে ধারণ করা যেত!
শোন চুপ করে কবীরা, আঁধারজোড়া তাল লয় তালের এই খেলা! শব্দের জগৎজোড়া ঘরকন্না। শব্দ, শব্দ নিয়ে একখানা গান রচতে হবে, শব্দ সব, শব্দই বিশ্বসার, শব্দ আকার, শব্দই নিরাকার।
শব্দের এই সংসার মুহূর্তে বদলে যায়। কবীর স্পষ্ট শুনতে পান নদী তীরের পথে তাঁর পদধ্বনি। তিনি আসছেন। জলে, মাটিতে আলোর বীজ পড়ার আগেই তিনি আসছেন। যেমন তিনি প্রত্যহ আসেন। কবীর জানতেন তিনি আসবেন। তীরে তাঁর তন্ময় চরণধ্বনি, এ পদধ্বনি চেনে কবীর, বিলক্ষণ চেনে। ক্রমশ এগিয়ে আসছে চরণধ্বনি। এবার পড়বে পৈঠায়। যেন কালের পদধ্বনি, পৈঠার ইট পাথর নদী জল মাটি বৃক্ষকে শান্ত ডেকে বলবে, জাগো চরাচর, এবার সুপ্তি সাঙ্গ করো মেদিনী। ঘাটের পৈঠায় তাঁর পা, চরণধ্বনি বাজছে কবীরের বুকের পাঁজরের সব সিঁড়িতে, শ্বাসবায়ু পৈঠায় পৈঠায়, কলিজার জিয়ন স্পন্দনে। কতদিন অপেক্ষা করেছি বলো তোমার সেই পরম পরশের জন্য। তুমি দাওনি। আর তুমি পার পাবে না।
২
রামানন্দ কাশীতে আসার পর থেকেই সে লহর এসে বেজেছিল কবীরের বুকে। দল দল মাউষ রামানন্দের পিছু হেঁটে রামনাম গেয়ে ভক্তির লহরে ভেসেছে। মনবের সে লহরে মুসলমানও যে কয়েক জন ছিল না, তা তো নয়। কবীর চেয়েছিলেন রামানন্দ তাঁকে দীক্ষা দিন। কিন্তু হিন্দু শিষ্য ছাড়া কাউকে দীক্ষা নিজে হাতে দেননি। কবীর মুসলমান। কবীর জোলা। কবীর কমিনা। তাঁকে কী করে দীক্ষা দেবেন গুরু রামানন্দ। তাঁর ভক্তদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু দীক্ষা যে কেবলমাত্র তিনি হিন্দুদেরই দেন। দিনের পর দিন সেই দীক্ষা ভিক্ষা চেয়েছেন কবীর। বসে থেকেছেন তাঁর দুয়ারে, শুনিয়েছেন গান। মন যে টলেনি রামানন্দের তা-ও নয়। তবু দীক্ষা তিনি দিতে পারেননি এই নওজোয়ান জোলাকে। হয়তো কাশী-বারাণসীর পণ্ডিত সমাজের বাধা ছিল।
কিন্তু রামানন্দের কাছে দীক্ষা যে কবীরকে পেতেই হবে। উপায় বার করলেন কবীর জোলা। দিনের পর দিন তিনি নজর রাখলেন রামানন্দের উপর। নজর রাখলেন খুনির মতো, দেখলেন কীভাবে রামানন্দ দীক্ষা দেন তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিকরদের। আততায়ীর মতো সেই নজরদারিতে কবীর দেখলেন, আলো ফোটার আগে প্রতিদিন রামানন্দ গঙ্গার ঘাটে আসেন, নেমে যান গঙ্গায়। তাঁর স্নানের পর আসে ঊষা।
৩
রাতের অন্ধকারে নবীন কবীর টানটান শুয়ে আছেন উপুড়, গঙ্গার সেই ঘাটের পৈঠায়। প্রতীক্ষায়।
পৈঠায় ধরে নেমে আসছেন রামানন্দ। কবীর শুনছেন। প্রতীক্ষা টানটান। আর মুহূর্তকাল অপেক্ষা হে অনন্ত শব্দ, যেন ঘটে সে সংযোগ!
অন্ধকারে পৈঠা দিয়ে নামতে নামতে পা চাপিয়ে দিলেন রামানন্দ কবীরের পিঠের উপর। অন্ধকারে না দেখতে পেয়ে মানুষ শরীরের পিঠের উপর পা দিয়েই আঁতকে উঠলেন রামানন্দ। রাম, রাম বোলো! কোনও মানুষ ঘুমিয়ে ছিল নাকি ঘাটের পৈঠায়! তার পিঠে পা পড়ল! রাম, রাম বোলো! মড়া নয়তো, খিদেয় রোগে বারাণসীর ঘাটে এসে মরেছে! রাম, রাম বোলো! কাউকে ফেলে দিয়ে যায়নি তো! রাম, রাম বোলো!
পিঠে রামানন্দের পা পড়তেই, এবং সেই ‘রাম, রাম বোলো’ শুনে সটান খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়ালেন কবীর সেই আঁধারে।
কে? কে উঠে দাঁড়ালো আঁধারে? প্রেত না আততায়ী! অবশ্য তিনি দুটোর কোনওটাকেই ভয় পান না। তবু ভয়ই রামানন্দ পেলেন হঠাৎ, বলে উঠলেন, রাম! রাম!
কবীর বললেন, ‘এবার আপনি আমায় এড়াতে পারলেন না!’
‘কে তুমি? জিজ্ঞাসা করলেন রামানন্দ।’
‘জোলা কবীর।’
‘এখানে কি করছিলে?’
কবীর সহসা নতজানু হয়ে মাথা রাখলেন রামানন্দের পায়ে। বললেন, ‘আর আপনি আমায় এড়াতে পারলেন না। আমি দেখেছি আপনি কীভাবে দীক্ষাদান করেন। প্রথমে বলেন, রাম রাম বোলো, তারপর হাত রাখেন দীক্ষাপাত্রের মাথায়। এই আপনার পায়ে আমার মাথা, আপনি আগেই আমার শরীর ছুঁতেই উচ্চারণ করে ফেলেছেন, রাম রাম বোলো।’ আপনি আমায় দীক্ষা দিয়ে ফেলেছেন, গুরু রামানন্দ।
রামানন্দ দু-হাতে তুলে ধরলেন কবীরকে। টানলেন বুকে। দু-জনের চোখেই নদী। সেই আঁধারেও মহাগুরু আর মহাশিষ্য দেখছেন স্পষ্ট সেই পবিত্র জলধারা।
‘তুমি কি সারারাত জেগেছিলে এই ঘাটে, আমার জন্যে?’ জিজ্ঞাসা করলেন রামানন্দ।
উত্তরে কবীর গুণগুণ করে গাইলেন তাঁর পদ, ‘না শবম, না শব পরস্তম…আমি তো রাত নই, রাতের উপাসকও নই যে আমার ঘুম আসার কাহিনি শোনাবো। আমি সূর্যের বান্দা, আমার প্রতিটি শব্দ সূর্যের মতো ফুটে ওঠে।’
সে গানের কলি ধরে জবাকুসুমের বীজ পড়ল জলে স্থলে চরাচরে।
রামানন্দ তাকিয়ে আছেন পুবে, বীজময় সেই আবাদের দিকে। তারপর তিনি উঠলেন গেয়ে, আমার মতোই আত্মা যদি পাই কোনো/হৃদয় আমার….। চমকে উঠলেন কবীর এ তো তাঁরই গান। এ গান গলায় তুলে নিয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত গুরু? এ আহ্লাদ তিনি রাখবেন কোথায়?
রামানন্দ গেয়ে চলেছেন আপনমনে তন্ময়, রামকথা আমি যতই বলি দরদ দিয়ে/….
সে গানে এবার গলা মেলায় কবীর, কেউ তো বসত করে না পিরিতি নিয়ে।
দুজনে পৈঠা ধরে নেমে গেলেন গঙ্গায়। কাকভোরের জলে, উচ্চারণ করলেন প্রার্থনা, দেশ হোক পিরিতি বসত। দুনিয়া হোক পিরিতি বসত। খোদার নামে, রামের নামে আর ভেঙো না মানব, মানবের ঘরবসত।