‘আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর।
গড়িতেছে পিঠে পুলি, অশেষ প্রকার।।
বাড়ি বাড়ি নিমন্ত্রণ, কুটুম্বের মেলা।
হায় হায় দেশাচার, ধন্য তোর খেলা।।’
সেই কোন যুগে পিঠে যে বাঙালির খাদ্য তালিকায় প্রবেশ করেছিল তা হিসেব করে বলা খুব মুশকিল। কথায় বলে ‘পেটে খেলে পিঠে সয়,’ এই প্রবাদ থেকে বোঝা যায় সমাজ সংস্কৃতির সঙ্গে পিঠের আত্মীয়তা বহুদিনের। একদা বাঙালি মিষ্টি বলতে চিনত এইসব পিষ্টক বা পিঠেকেই। শুধুমাত্র পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে নয়, বাড়িতে আচারে-অনুষ্ঠানে, কুটুম্বের আগমনে পিঠে তৈরি করতেন বাড়ির মহিলারা।
ঐতিহাসিকরা বলেন পিঠের জন্ম যিশুর জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। জন্মস্থান হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশকেই ধরেছেন ঐতিহাসিকরা। আর্যরা যবে চাল বা নানাধরনের শস্য পাথরে গুঁড়ো করা শুরু করে, সেটাই ছিল পিঠের আঁতুড়ঘর।
দক্ষিণারঞ্জন রায় অবশ্য পিঠেকে বৈদিক যুগের খাবার বলেছেন। যদিও সেই সময় চালের পিঠের চল ছিলনা, গম আর যব দিয়ে বানানো হতো পিঠে। সম্ভবত ঋকবেদের পরবর্তীকালে চালের পিঠে প্রচলন হয়।
যব দিয়ে যে পিঠা তৈরি করা হয় তাকে বলা হয় ‘পুরোডাশ’। এটি অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য করা হতো এবং যজ্ঞের সময় ব্যবহার করা হতো। মহাভারতে ‘পুরোডাশ’-এর উল্লেখ আছে। কর্ণের অঙ্গরাজ্যের অভিষেকের সময় ভীম কর্ণকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন,’ কুকুর যেমন যজ্ঞের ‘পুরোডাশ’ খেতে পারে না তুমিও অঙ্গরাজ্য কোনদিন ভোগ করতে পারবে না।’

এছাড়া মহাভারতের আদি পর্বে উল্লেখ আছে, ভীমসেন বক রাক্ষসকে বধের প্রাক্কালে পায়েস, অন্ন, পিঠে পেট ভরে ভোজন করেছিলেন।
রামায়ণের উত্তরাকাণ্ডে বর্ণিত আছে সীতাদেবী লক্ষ্মণকে শাক ভাজা ঝোল অম্বল পায়েস দধি ও নানা ধরনের পিষ্টকাদি সহযোগে আহার করিয়েছিলেন।
তালনবমী, দুর্গাষ্টমী, ইতব্রত ইত্যাদি পূজাতে পিঠের ভোগ দিতেই হতো। গীতাতেও কৃষ্ণের পিঠে খাবার উল্লেখ আছে, আর কৃষ্ণের নাম থেকেই হয়তো গোকুল পিঠের উৎপত্তি। এইভাবেই কালে কালে পিঠে জড়িয়ে গেছে সংস্কৃতির পরতে পরতে। কেবল শাস্ত্র পুরাণ নয়, কালের কবিরাও মজেছেন পিঠের রসে। পঞ্চদশ থেকে অষ্ঠাদশ শতাব্দীতে বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে পিঠেপুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন চৈতন্য মঙ্গল কাব্যে বিজয় গুপ্তের কাব্যে..
“খিরি অমৃত গুটিকা খেবাড়া নবাত
মনোহর পুরী দুগ্ধপুলি দুগ্ধজাত….
পিঠা পানা ভোজনে সন্তোষীলা।”
কিম্বা মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সওদাগর পত্নীর প্রস্তুত খাদ্য সামগ্রীতেও লেখা আছে পিঠের গল্প—
“খিড় খিড়িয়া রান্ধ্রে দুগ্ধের পঞ্চপিঠা,
গুড় চিনি দিয়া রান্ধ্রে খাইতে লাগে মিঠা।”
জসীমউদ্দীন তার নকশী কাঁথার মাঠ কবিতায় লিখেছেন —
“তাহার মতন চেরন “সেওই” কে কাটিতে পারে,
নক্সী করা পাকান পিঠায় সবাই তারে হারে।”
ফুল্লরার বারোমাস্যায় শোনা যায়, পৌষ পার্বণের পিঠে পুলির কথা, ‘মাঘে হিমের বাও /সর্ব অঙ্গে কাঁটা লাগে, দুঃখের জীবন যায়।’ পিঠে খাওয়া আনন্দ শুধু নয় খাওয়ার পর কি কি অনুভূতি হয় তা-ও লিখে ফেলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত…
“তাজা ভাজা পুলি দিয়ে আয়েশ পুরে পায়েস খেয়ে।
হেঁকুর হেঁকুর ঢেকুর তুলে শুচ্ছে সুখের ছাপর খাটে।”
বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্য ভাগবত’ এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজে ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ এই দুটি গ্রন্থে মিলে পিঠের উপস্থিতির কথা।
ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবও এই রস থেকে বঞ্চিত হননি। তিনিও ভালোবেসে ফেলেছিলেন মিষ্টি পিঠের পদকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পিঠে পুলি খেতে বেশ ভালোবাসতেন। একবার শান্তিনিকেতনের এক ভদ্রমহিলা একদিন পিঠে তৈরি করে কবি কে পাঠালেন। কয়েকদিন পর তিনি কবিকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ গুরুদেব কেমন খেলেন?’ কবি সরস ভাষায় জবাব দিলেন—
‘লোহা কঠিন পাথর কঠিন আর কঠিন ইস্টক,
তার অধিক কঠিন কন্যে তোমার হাতের পিষ্টক।’
পৌষ মাঘের সন্ধিক্ষণের মুহূর্তটাই মকর সংক্রান্তি। কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সাগর স্নানের জন্য দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে। নানা অঞ্চলের মানুষজন লোকিক উপাচারের মধ্য দিয়ে মকর সংক্রান্তি পালন করে। খাওয়া দাওয়া, গল্প, গান খেলা ছাড়া আলুর পিঠে, ছোলার পিঠে, মুগের পিঠে দুধপুলি মালপোয়া পাটিসাপটা পায়েস ভাপা পিঠা চুষি পিঠে চৈতি পিঠে ইত্যাদি খাবারের মধ্যে দিয়ে মকর সংক্রান্তি পালন করা হয়। মুর্শিদাবাদের পৌষ উৎসবের প্রথম পিঠা উৎসর্গ করা হয় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে।পুরুলিয়াতে পিঠে বানানো হয় পৌষ মাসের শেষের চার দিন। চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর এবং আখান নামে পরিচিত সেই দিনগুলি।

বাংলার গ্রামে গঞ্জে শুধু নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসাম উড়িষ্যাতেও পিঠে খাওয়া দাওয়ার প্রচলন আছে। আসামে বিহু উৎসবে বোরো ধান ও শালীধানের চালে বানানো হয় পিঠে। উড়িষ্যায় আবার যে কোন উৎসবেই পিঠে খাওয়ার চল আছে। উৎসব বাদ দিলে যেকোনো সময়ে পিঠে বানিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করে ওড়িয়ারা।
পোড়াপিঠে শ্রীজগন্নাথ দেবের প্রিয় ভোগ। মাসি গুন্ডিচাদেবীর বাড়ি ন’দিন ধরে তার প্রিয় পোড়াপিঠে খেয়ে জগন্নাথ দেব আসেন নিজের বাড়িতে। জগন্নাথ দেবের অন্নভোগ বা রাজভোগের নানা আয়োজনের অন্যতম হলো মাঠাপুলি ও পিঠা পুলি।
অনেকেই বলেন শহুরে আধুনিকতায় বাংলার এই প্রাচীন সংস্কৃতির সলতে টিমটিম করে জ্বলছে। এখন গেরস্থের হেসেলের পিঠে বিপণনযোগ্য হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত বিবর্তনের যাঁতাকলে বদলে যাচ্ছে পিঠের আদল ও স্বাদ। চালগুঁড়ি থেকে দুধ, নারকেল কোরা গোটা দুনিয়াটাই এখন প্যাকেট বন্দী। নতুন প্রজন্ম পিঠের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে মিষ্টির দোকান বা ফুড কোর্টে। ভাবা হচ্ছে পিঠেকে আরও কিভাবে বিপণনযোগ্য করে তোলা যায়। এ পোড়া বাংলায় ঝুঁকি পিঠে ,যাতাল পিঠে, চিতই, হরষেপুর, পোয়া পিঠে… পান্ডুলিপির পাতায় স্থান পেয়েছে।
তবে আশার কথা হল, শীতে পিঠেপুলির উৎসবে মাতছে পাড়া, আয়োজন হচ্ছে পিঠে নিয়ে প্রতিযোগিতাও। পুরস্কারের ঘোষণাও করা হচ্ছে। তবু ভালো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলছে গোটা দেশটা। পৌষ সংক্রান্তিতে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় পিঠে এই বাংলায়।
পিঠের মতই সুস্বাদু লেখাটি।
খুব খুশি হলাম গো ❤️
অসাধারণ লেখনী
ধন্যবাদ জানাই ????
খুব সুন্দর।