ঐরাবত গুলো আওয়াজ তুলছে অহরহ। স্বর্গোদ্বারটায় সাজানো পুষ্প, হিল্লোলগন্ধার পাতা। তারামণ্ডলের সমারোহে সমৃদ্ধ আজ দেবরাজ ইন্দ্রের রাজধানী। সমাবেশে হাজির ব্যক্তিরত্নরা তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষামান রত্নশ্রেষ্ঠর। চেয়ারে বসে খুবই চিন্তিত রহিম সাহেব—‘প্রদীপ আসতে পারবে তো সাবধানে? হাজার হোক ভারতের ফুটবলার তো, মুক্তিশ্রদ্ধা নাও পেতে পারে।’ ….তারপর কিছুসময় অতিবাহিত। পুষ্পচন্দনে সমৃদ্ধ হয়ে আগমন ঘটল রত্নশ্রেষ্ঠ কোহিনূরের। গায়ে ৬২’ এশিয়ান গেমস জয়ী কোটটা। ঐরাবতগুলো ডেকে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো অমল দত্ত, কৃষাণু দে, জার্নেল সিংরা। দাঁড়ালেন না শুধু রহিম সাহেব। হাজার হোক শিক্ষক তো। দেবরাজ ইন্দ্র বরণ করে নিলেন ফুটবল শ্রেষ্ঠ ভারতরত্নকে। রহিম সাহেব বলে উঠলেন—
—‘কোর্টটা আর ছাড়িস নি?’
—‘না রহিম সাহেব। স্মৃতি বড়োই দুর্বল। বলেছিলাম না, সেই রাতে, পারলে আমরাই পারবো। দেখুন আজ পঞ্চাশের বেশী বছর কেটে গেল। তবুও আমাদের জেতা এশিয়ান খেতাব আজও ধ্রুবক। আর তো কেউ পারলনা। কেন পারলনা গো?
—সত্ত্বা, বুঝলি প্রদীপ সত্ত্বা। আচ্ছা তুই তো সাতটা স্তর পেরিয়ে অমরাবতীতে পোঁছালি। কেন পারলি বলত? তোর সত্ত্বার জন্য। তুই, জার্নেল, চুণী, বলরামরা সেবার একটা তিনরঙা সত্ত্বা নিয়ে মাঠে নেমেছিলিস। মনে পড়ে রাত্রে তোরা কেউ ঘুমোতে পারিসনি।
—মনে পড়ে গো। জাকার্তাতে তখন লক্ষ মানুষ। পাকিস্তানের হকি টিম ছাড়া আমাদের কেউ সমর্থনই নেই। তুমিই বলেছিলে —‘attack attack and attack’, তারপর পেলুম বল চুনীর থেকে, ব্যাস গোল। তবে জার্নেল না থাকলে বাকীটা হতোনা। আর সেই ম্যাচে অসুস্থ জার্নেলকে ডিফেন্স থেকে তুলে স্ট্রাইকারে খেলানোটা মাস্টারস্ট্রোক।
—ওটা চুনী আমাকে বলেছিল রে।
পাশ থেকে জার্নেল চাপড় মারল পি.কের পিঠে…. ‘মে ব্যাণ্ডেজ লেকার খেলা থা পি.কে। মেরে লিয়ে স্রিফ দেশ থা। মেরে খুন মে আবভি যো তেজ হে, উও দুনিয়া হিলাঙ্গে কে লিয়ে কাফি। ‘রহিম সাহেব আবার বলা শুরু করলেন—তবে বুঝলি পি.কে জাকার্তার এশিয়ান গেমস ফাইনালের থেকেও ফ্রান্সের জালে বল ঢোকানোটা আরো বেশী ঐতিহাসিক হতে পারত। পেরুর কাছে হারটাই না….উফফ, আফসোস হয়।’
—কী হবে আর ওসব ভেবে। কজন আর মনে রাখে। এখনকার ছোকরারা জানেই না ওদের প্রিয় জিরু-পায়েত-পোগবাদের বাপ ঠাকুরদাকে আমি গোল দিয়েছিলাম।
কথাবার্তার মাঝেই আড়চোখে পি.কে দেখলেন হীরের চেয়ারে মনমরা হয়ে বসে একটা বৃদ্ধ
—কিগো অমলদা? দূরে কেনো? আসবেনা কাছে? এই দেখ, এখানেও তোমার সাথে লড়তে চলে এলাম। সেখানে মনে আছেতো, তোমার আর আমার কোচিং যুদ্ধে ৩০টা ম্যাচের ১৫টা তেই আমার জয়, তোমার মাত্র ৬টা। দেখি এখানে হারাতে পারো কি না।
—মন টা খারাপ রে প্রদীপ।
—কে নো গো কি হলো?
—বাড়িটা ভেঙে দিলো। ওই বাড়িতেই কত ছক কষে ছিলাম। দেবদারু গাছের তলায় বসে সত্যকে (সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়) ডায়মন্ড বুঝালাম, দেশ তোলপাড় হলো, অথচ দেখ এই তার প্রতিদান।
—হা হা, তুমি ভুলে গেলে নাকি যে, তুমি ভারতে ছিলে। তুমি যে কাজগুলো করেছিলে, অন্যদেশ হলে ফুটবলের চিত্রনাট্যটাই পাল্টে যেত।
—ছাড় ওসব। তাও ভালো তুই কিছুটা হলেও সম্মান পেয়েছিস। নাহলে জার্নেল, বলরাম, অরুণ ঘোষ, সুকুমার, পিটার থঙ্গরাজদের কেইই বা মনে রাখে। সিনেমা না হলে কেউ জানতোই না রহিম সাহেব কি!
—আর আমার দুঃখ কি জানো অমলদা? তোমাকে কেউ জানলোনা ঠিকভাবে। তোমার আবিষ্কার এখন ইউরোপে খেলানো হয়। কদর পেলেনা গো কদর পেলেনা।
‘কেমন আছিস রে পিকে?’—অজ্ঞাত গম্ভীর গলার প্রশ্নে পিছন ঘুরে হকচকিয়ে পি কে বলে ওঠে—
—আরে বাঘা দা, তুমি?
—মনে রেখেছিস তাহলে।
—ময়দানের বাঘা সোমকে আমি ভুলব!! তুমি না থাকলে ফুটবলারটাই হওয়া হতো না গো। ৫৭’ এর সেই ইস্ট ট্যুরে সেই হংকং-এর কোচ যখন আমাকে চাইল, তুমি বললে—’ ও বিক্রির জন্য নয়, ও দেশের গর্ব’—ব্যাস, এইখানেই আমার বাকী জীবনের সঞ্জীবনীটা পেয়ে গেছিলুম। বাবা, কোথায় গো?
—প্রভাত বিশ্রাম নিচ্ছে এখন।
হঠাৎএকটা থমথমে ভাব চারিদিকে। ঐরাবতগুলো ডাকা বন্ধ করে দিয়েছে। বিষণ্ণ মুখে বসে অমল, রহিম সাহেব, কৃষাণুরা। জীবনে কিছুই পায়নি তারা। নাম পেয়েছে, দাম নয়। জাতির জন্য কাজ করেছিল তারা, প্রতিদান পেয়েছে খুবই সামান্য, কেউ বা পায়ইনি। এমন সময় গুমোট ভাঙালো পি কের সেই পেপটক—
‘কী হে বন্ধুবর। ওঠো, জাগো। প্রতিদানের জন্য কি আমরা কাজ করতাম? তাহলে কেনো বিমর্ষ? এই ফুটবলটা আমাদের কলজে, আর জার্সিটা আমাদের মা, আমরা এদের জন্য কাজ করতাম। চলো সবাই, এখানেও ফুটবলার তৈরী করব আমরা। আমি, অমল আর রহিম দা কোচ, বাকীরা অ্যাসিস্টেন্ট। কৃশানু, ছেলেগুলোকে তুই ড্রিবলিং আর হোল্ডিংটা শিখিয়ে দিস, অমলদা, তুমি স্ট্র্যাটেজিটা,…. আর বাকীর জন্য আমি আর রহিম সাহেব আছেই। চলো সবাই, We have to work, work & work।’
—তা জার্সিটা সবুজ-মেরুনই হবে তো? (পাশ থেকে প্রশ্নধারী আগন্তুক)
—ধীরেন দা তুমিও এসে গেছ। অবশ্যই সবুজ-মেরুন, কিংবা নীল। চলো ধীরেন দা, সভাপতি তুমিই হবে।
তারপর সবাই উঠে দাঁড়িয়ে চলতে আরম্ভ করল অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তির উদ্দেশ্যে। আর গাইতে থাকল—
‘ওঠো গো ভারতলক্ষ্মী, ওঠো আদি জগত-জন-পূজ্যা’।
অমরাবতীর ফ্লাডলাইটগুলো আস্তে আস্তে জ্বলে উঠল। শুরু হলো স্বর্গের অভ্যন্তরে নতুন ফুটবল দুনিয়া গড়ার কাজ। কি জানি, হয়তো এতগুলো তারার আগমনে সেই দুনিয়ায় ভারতই বিশ্বজয়ী….