বাতিল ব্যর্থ ছেঁড়া ভাঙা অক্ষরসমষ্টি আর শব্দপুঞ্জের কাছে অনেক রাত্রে চোখ জ্বেলে বসে যে কবি ভাবেন কিছু হয়নি, যার বুক অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরে ওঠে, সেই কবি চাঁদের আলো দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েন- সকাল বেলায় ঘুমের বাইরে কুড়িয়ে পান লক্ষ লক্ষ চাঁদের টুকরো-আর সেই টুকরোগুলো জড়ো করে লিখে ফেলেন ‘চাঁদের বই’।এতদিন পরে তার সেই অক্ষরের আলোয় আমরাও একটা চরিতার্থ চাঁদের বই হয়ে গেলাম — দেখতে পেলাম এক শ্যামায়মান পৃথিবী। সত্তরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শ্যামলকান্তি দাশ এই ভাবেই নির্মাণ করেন ‘লাল রঙের স্বর্গ’ আমাদের গাধাজীবন, গরুজীবনে কখন সরল কবিতা হয়ে আরও একটা রূপকথা তৈরি করে। জীবনখাতার কয়েক পাতা জুড়ে ফুটে ওঠে না, রাজহাঁস, এঁটেল মাটি কিংবা ব্যাঙ, কালো ভগবান, অন্য এক ভূখন্ড। ছোট শহরের হাওয়া চৈত্রের কবিতা শোনায়- নির্মিত হয় কথাশিল্প —
“পেয়েছি অঢেল সাদা, লিখি আমি কাগজ কাগজ
লিখে লিখে কাগজ ফুরিয়ে গেল শুরু করি বই
বই সমাপন হল, এইবার কী করি কী করি
কিছুই করার নেই কথার কুহক ভেঙে ভেঙে
ঘাটে ঘাটে সারাদিন কাগজের আধখানা বাড়ি
আমি যেন এক মনে বই-খাতা লিখে যেতে পারি”
শ্যামলকান্তি দাশের জন্ম মেদিনীপুর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সংবাদপত্র প্রকাশন সংস্থায় কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করছেন। আছে অনেকগুলো কবিতার বই। ছোটদের জন্য লিখেছেন ছড়া কবিতা। সম্পাদনা করেছেন নানা ধরনের পত্রিকা, সংকলন গ্রন্থ। তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ব্লার্বে লেখা হয়েছে—
“বাংলা কবিতায় এক অভূতপূর্ব ভূ-খণ্ডের প্রণেতা শ্যামলকান্তি দাশ। বাংলা কবিতার অন্তরে চিরস্থাপন করে গেছেন মেদিনীপুর গ্রামের নামে এক আশ্চর্য চিত্ররূপময়তা। সজল বাংলার অন্তঃস্থলে যে তথাকথিত অরূপ, তা একেবারে শালুক-শাপলা গেঁড়ি-গুগলির মতো থ্যাবড়া হাতে তুলে এনেছেন কাদামলিন জল থেকে, আর অনায়াস সাবলীলতায় বসিয়ে দিয়েছেন কবিতার কাগজে।”
যিনি নিজেই তাঁর কবিতায় বলেন ‘পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আমি গ্রামের ছেলে’, তিনি তো গ্রামজীবনের উপলব্ধি করবেনই। তাই ম্রিয়মান সন্ধেবেলায় তার ঠান্ডা জীবনের উপর অদ্ভুত অদ্ভুত সব পাতা ঝরে পড়ে, তিনি দেখতে পান তার ছায়া শিকড়-বাকড় এবং শীতলতা নিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। শহরজীবনের তাপ-উত্তাপে তাই লাগাতে চেয়েছেন গ্রামজীবনের শীতলতা। এই কবি উচ্চারণ করেন ‘আমাদের কবিজন্ম ঢেকে রাখে/ শালুক পদ্মের কিছু পাতা।’ রাঙা ধুলোয় মিশে থাকা পথিকস্বভাব কবি তাই সহজেই লিখেছেন চৈত্রের কবিতা। চৈত্রের কবিতা লিখতে লিখতে দেখেছেন বাতাসে রঙ ধরেছে। কবি জানেন ‘এ সময় কারো মনে দুঃখ দিতে নেই।’ আর তাই কবিতায় রূপকথার গল্প শোনান। রূপকথার গল্পে যদি ডালিমকুমার তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলতে পারেন শ্রেণিশত্রুর মাথা, কবির প্রশ্ন ‘বিপ্লবী প্রতিবিপ্লবীদের ভয়ে আমরা কেন দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকবো?’
হিংসা-প্রতিহিংসা রক্তপাতের মধ্যে রূপকথার রাজ্যের স্বপ্ন দেখতে পান কবি। শত্রুশিবিরের সবকটা গলিঘুঁজি দেখার পর কবি বলেন —
“এসো আজকের রাতটা বরং আমরা গাছের তলায়/ শুয়ে বসে কাটিয়ে দিই।”
শ্যামলকান্তি বাংলার অপরূপ রূপ দেখেছেন, দেখেছেন বাংলার মানুষকে, প্রকৃতিকে তুলে এনেছেন নিজস্ব ঢঙে। সত্তরের উত্তাল হাওয়া তাঁকে আলোড়িত করেছে ঠিকই কিন্তু তাঁর কবিতাপাতায় উঠে আসেনি সেই সময়ের তাপ কিংবা ভাপ,বরং ঘুরে ফিরেছে গ্রামজীবনের হাওয়া। অথচ সময় যত বদলেছে, তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে কালের নির্মমতা।
কী করে ধরবে তুমি। এত অস্ত্র। চরিত্রের ভর।
দুপাশে নতুন শত্রু। মুখোশ। মুখোশ।
শ্যামলকান্তির ছবিতে সত্যকাহিনী- ছবিতে অগ্নিসংযোগ, খুন, সন্ত্রাস, দাঙ্গা, চিরুনি-তল্লাশি। শ্যামলকান্তি ছবিতে রক্ত, হাড়গোড়ের সত্যকাহিনি, ছবিতেই মৈত্রী, ছবিতে জনতাই ঝলমল, ছবিতেই প্রেমিক নির্দোষ। আর এই ছবিতেই গণধর্ষণ। শ্যামলকান্তি ধ্বস্ত সময়ের কথা লেখেন,যেখানে দুপাশে নতুন শত্রু মুখোশ, মুখোশ।
‘বন্ধুর মুখোশে বন্ধু। বোঝাপড়া চাই/ শত্রুর শেষ রাখতে নাই।’আর তাই ‘জব্দ করে ধরো টাঙি। ভোজালি। চপার।’ এসবের পরেও তাঁর ছবি শেষ হয় এইভাবে —
“ছবিতে আকাশ আয়না
দূষণমুক্ত পরিবেশ
বহুতল ভাঙে দুদ্দাড়
লেখা সমাপ্ত, ছবি শেষ।”
এইভাবেই কবি বুঝতে পারেন ‘ঘরের পথ হয়ে উঠছে এখন বনের পথ’ যদিও ওই বনের ভেতর বিভূতিভূষণ ভুল করে ফেলে গিয়েছিলেন কয়েকটি শ্যামল শব্দ আর কয়েকটি নির্দোষ প্রতীক। কবিও চূড়ান্ত ভ্রমণের জন্য পাগলের মতো তাই খুঁজতে লাগলেন। চলাচল শেষ হয় না। মজা নদী পেরোতে পেরোতে চলেন কবি চলেছেন কাঁটাতারের বেড়া পেরোতে পেরোতে, দেশ ফুরিয়ে আসলেও আবছা গাছপালার মতো একটু একটু বিদেশ দেখতে পান করি। লক্ষ লক্ষ কথা কবিকে সাজিয়ে দেয়।
আর লক্ষ লক্ষ শব্দ বুনে বুনে, অক্ষর জুড়ে জুড়ে শ্যামলকান্তি লিখে ফেলেন- কাগজকুচি, আমাদের কবিজন্ম, লাল রঙের স্বর্গ, ভূতের চরণে, ছোট শহরের হাওয়া, দূর থেকে লিখি, খড়ের মানুষ, শত্রুরা বাড়ি নেই, সরল কবিতা, রাক্ষস, পুলকিত যামিনী, মধুপুর, নির্জন চায়ের দোকান, একলা পাগল, আমাদের দেখা, জন্মেছি মায়ের দেশে ,অপমানের শেষ দিন, ভাঙা বাড়ির জানলা দেশভাগের মতো, ডাইনোসরের অমর কাহিনি, রূপকথার রাস্তায় বাড়ি ফিরছি, অনিশ্চিত হাসিখুশি।
“সত্তরের রাজনৈতিক স্লোগান ছিল গ্রাম দিয়ে শহর-ঘেরাও রক্তক্ষয়ী অঙ্গীকার। বাংলা কবিতাও সে-সময়, ঐতিহাসিকভাবেই, হয়ে উঠেছিল একই শপথের সমান্তরাল প্রতিভাস। মেদিনীপুর থেকে মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া থেকে জলপাইগুড়ির কবিরা চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছিলেন নাগরিক কবিতার সার্বিক অনুশাসন। আর, এই অভিযানের সর্বাগ্রে ছিলেন শ্যামলকান্তি দাশ। বাংলা কবিতায় তিনি জ্বেলে দিয়েছিলেন প্রশান্ত খড়ের আগুন,যা ধিকধিক করে ছড়িয়ে গিয়েছিল শ্যামবাংলার আলো হয়ে। মেদিনীপুর নামে ভূখণ্ডটি হয়ে উঠেছিল বাংলাভূমিরই পরমাত্মা। গ্রাম ও গ্রামীণ জীবন হয়ে উঠেছিল অনুষঙ্গাতিরিক্ত চরিত্রই যেন। কিন্তু সেই কবিতায় মিশে গিয়েছিল নাগরিক বৈদগ্ধ্যও।” শ্যামল ও সবুজ সবুজরঙয়ের সেই সব কবিতার সংকলন সত্যিই পাঠকদের অভিভূত করে। শ্যামলকান্তি দাশের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘অনিশ্চিত হাসি খুশি’র ব্লার্বের কথাগুলি শ্যামলকান্তির কবিতা সম্পর্কে পুরোপুরি সত্য। তাঁর কবিতায় আমরা পতনের শব্দ শুনতে পেলেও একটা আলো দেখতে পাই। চাঁদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে,চাঁদকে বলতে ইচ্ছে করে ‘আমি আর এখন থেকে দুষ্টুমি করব না।’আর তখনই চাঁদ আমাকে একটা স্তিমিত ফুঁ দিয়ে শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, আমি দক্ষিণারঞ্জনের রূপকথা হয়ে যাব।
আমার আরেক প্রিয় কবি মৃদুল দাশগুপ্ত শ্যামলকান্তি দাশ সম্পর্কে বলেছিলেন, “সেদিন সে ছিল জল কাদা শ্যাওলা-মাখা অপরূপ।… সূচনাকালেই এই বাংলা কবিতায় সে নিয়ে আসে এক আশ্চর্য ভাষা। সোঁদা গন্ধ তাতে, শ্যাওলার,জলজ ঝাঁঝির, আবার কখনও তাতে ঘ্রাণ নবান্নের। গ্রামীণ বাংলা ভাষা গমগম করে ওঠে শ্যামলকান্তির নবীন সবুজ সোনালী কবিতায়”।
“গমের উপর ভারী হয়ে পড়েছে
তাল তমালের নিবিড় ছায়া
ভেতরে ক্ষীরের মতো নরম শাঁসে
কল কল করে ছুটে চলেছে গঙ্গাভাগীরথী”
ধান চালের মতো পুরুষ্ট গম নিয়েও একদিন দারুণ দারুণ কবিতা লেখার কথা ভেবেছিলেন। তরুণ কবিদের জীবন ধন্য হয়ে উঠবে সেই সব কবিতা পড়ে- এরকম মনে হয়েছিল যাঁর, তিনি তো লিখবেন —
কুলু কুলু জলধারা ফুলুফুলু নদী
মনমাঝি দাঁড় টানে, এপার-ওপার
‘জীবন খাতার কয়েক পাতা’ এক মহাকাব্য। জীবনের চালচিত্রে চোখ রেখে বুঝি, ‘আমি শূন্য।আমি শূন্য।’ বিদ্যা তো বিনয় দেয়নি, মাথার মধ্যে ঠেসে দিয়েছিল কাঁড়ি কাঁড়ি ক্রোধ, আর সেই ক্রোধের আগুনেই ভস্ম হই আমরা, রিপুর তাড়না থেকে শত হাত দূরে থেকেও আমরা চিনে ফেলি গোলাবারুদ, খড়খড়ে ভাতের থালায় শূন্য হয়ে যায় দুপুর বেলার নুন। আর তাই মনে হয় — “এখন যদি দুটো-চারটে খিদের কবিতা লিখতে না পারিস/ লোকে যে গায়ে থুথু দেবে ছোটোভাই।”
আসলে শ্যামলকান্তি শালবনির শ্যামল কান্তিকে খুঁজতে চান, আনন্দজল মাখতে চান। ঠিক একশোবছর আগে যেখানে মশাল জ্বেলেছিলেন কবি, রাজদর্শন করেছিলেন, শুনেছিলেন কাড়া-নাকাড়ার শব্দ, সেখানেই কুলু কুলু করে গড়িয়ে পড়েছে কালো রক্ত… পাথর সরালেই উঠবে আমাদের পুঁতে রাখা চোখ। তবু কবি লিখে ফেলেন —
সেই মহাপথে
বসে থাকি আয়
আলো প্রত্যুষে
কালো সন্ধ্যায়
বসে থেকে থেকে
জগাই মাধাই
গৌরব গেছে
প্রদীপ জ্বালাই।
ব্যথিত বেদনগুলি টুকে রাখতে জানেন শ্যামলকান্তি। ক্রমাগত রক্তপাতে মাঠ ভিজে যায় তবে আশ্রয়দান আকাশের কোন এক কোণে।
২০১৫ সালে আদম থেকে প্রকাশিত হয়েছে শ্যামলকান্তি দাশের ‘ডাইনোসরের অমর কাহিনি’। অসাধারণ এক কবিতা সংকলন। প্রথম কবিতার নাম ‘মানুষ’- ডাইনোসররূপী মানুষ।এই ‘মরপৃথিবীতে’ কত বছর জ্যান্ত হয়ে থাকা। তার ডানা আছে, ডানার জোরেই সে উড়ে যায় মাঠ-প্রান্তর, গফুর জোলার বাড়ি, মেঘ, সূর্যাস্ত, ছায়াপথ। উড়তে উড়তে উড়তে উড়তে শেষ হয়ে যায় আর একটা রূপকথা, সম্পূর্ণ হয় অবর্ণনীয় মহাকাশ অভিযান। কবির মনে হয় সেই ডাইনোসরের হৃৎপিণ্ড শিরদাঁড়া আর থলথলে চর্বিওয়ালা শরীর ব্যবহার করে তৈরি করেছি দিগন্ত ছাপানো সড়ক। লিকপিকে ধারালো হাড় আর আঙুল দিয়ে বানিয়েছি অপূর্ব সুঠাম সেতু। তারপর তার পিঠে জুড়ে দিয়েছি সাদা খয়েরি সবুজ পালক আর লম্বমান ডানা। এই ডানার জোরেই সে উড়তে পারে। আসলে পৃথিবীতে এত আনন্দ আছে আনন্দ দেখবে বলেই হয়তো আজও মানুষ লুপ্তপ্রায় ডাইনোসরের মতো বেঁচে থাকতে চায়।কয়েক লক্ষ যুগ পেরোবার পর ধোঁয়ার মতো, ধূমকেতুর মতো কবি তাকে আবিষ্কার করতে পারেন।একটা স্বাধীন সম্পূর্ণ দেশের এক কোণে নিঃসঙ্গ হওয়ার মতো আজও ঘুরে বেড়ায়। খাদের উপর দাঁড়িয়ে কবি দেখেন ডাইনোসর আসছে। তার পেটে কচি কচি বাচ্চা নড়ছে, দুধে ভর্তি স্তন লাফাচ্ছে। দুচোখ ভরে তিনি দেখছেন তার হাত পায়ের গঠন, দেখছেন তার ভোঁতা ঠোঁটের জৌলুস। দিন দিন তার নারী হয়ে ওঠার রহস্য তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন। তার থলথলে মাংসে গভীর হাত রেখেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন এতদিনে ডাইনোসর ঠিকমতো রাস্তা চিনতে পেরেছে। কাব্যের পাতা জুড়ে ডাইনোসরের কথা। বহু যুগ আগে লুপ্ত হয়ে যাওয়া ডাইনোসর আবার ফিরে ফিরে আসে তাঁর কাব্যের পাতায়, ‘এক লক্ষ বছর পরে দাক্ষিণাত্যের গ্রামে/ তুমি বেড়াতে এসেছ ডাইনোসর!’
‘ডাইনোসরের অমর কাহিনি’ লিখতে লিখতে কবির চোখ জলে ভরে আসে।লক্ষ লক্ষ বছর আগে একটা ডাইনোসরকে মেরে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। সেই ডাইনোসরের দেহাবশেষ রক্ত আর হাড়ের ছিবড়ে এখন একটি মাঠের আকার নিয়েছে। মাঠের উপর উঠেছে অহংকারী মানুষের জয়-বিজয়, একশো দুশো তিনশোতলা বাড়ি। এসব বাড়ির কাঁচের মত স্বচ্ছ ছাদে নামছে লোহার টুকরো পেরেক আর কাঁটাখোঁচায় ভর্তি বেটে বেটে রাত্রি। খুব ভালোভাবে লক্ষ করলেই রাত্রি ভিতর দিয়ে সর্বস্ব পৃথিবীর সামান্য একটু ঘুরে দেখা যায়। আর কবির মনে হয় সেই টুকরো টুকরো পৃথিবীতে কোন মানুষ নেই, খরগোশ বিড়াল নেই, শুধু চাঙড় আর চাঙড়।চাঙড়ের মধ্যে দুলছে শ্যাওলা আর প্রজাপতি। ফাটল এরমধ্যে দুলছে ক্যাঙ্গারু আর অ্যানাকোন্ডা। তিমিমাছের চোয়াল আর বাইসনের ফাঁপা হাড়ের মধ্যে দিয়ে হাজার-হাজার ছায়াপথ মিলিয়ে যাচ্ছে। ডাইনোসরের চোয়াল নাড়িভুঁড়ি আর হৃদয় মিলিয়ে তৈরি একটা প্রকাণ্ড মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা হাঁ হয়ে যায়। আমাদের সরু চোখে বিদ্যুৎরশ্মি ঝাপটা মারতে থাকে অনবরত অবিশ্রাম। তাই হয়তো বারবার ডাইনোসরের অমর কাহিনি লিখতে হয় আমাদের।
শ্যামলকান্তির কবিতায় এক শ্যামল মায়া থাকে, ছায়া থাকে। খুব সহজেই গভীর অনুভূতির জগতে নিয়ে যায় তাঁর কবিতার ভাষা বড়ো তির্যক। ধাক্কা থাকে। পাড়ার এক কালো মেয়ে, সেও বনের মধ্যে কুড়িয়ে পেয়েছে ভাঙা চাঁদ। চাঁদ হয়ে ওঠে ডাগরডোগর, মনে ধরে জেল্লা, রং। সে আর আকাশে পালাতে চায় না। মাটির বাড়ি, তা হোক।কালো মেয়ের পায়ের তলায় চমৎকার শান্ত নিবিড় এক জায়গা পেয়ে যায় ভাঙা চাঁদ।কী চাই!’সারা পৃথিবীর আনন্দে একটা আস্ত চাঁদ ডুবে যায়’। আমিও চাঁদ বুকে ঘুমিয়ে পড়ি। সারারাত মাঠের শিশির-খাওয়া চাঁদ, যে ভেঙেভুঙে রাস্তায় পড়ে আছে,ভিজে ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে-তাকেও বাড়ি নিয়ে আসে কেউ কবির মতোই।চাঁদ পোষ মানে,সোনার চাঁদ সংসারের পূর্ণানন্দে দিব্যি হাত-পা ছড়িয়ে ভেসে বেড়ায়।এই কাব্যগ্রন্থে চাঁদের অনুষঙ্গ বারবার এসেছে। চাঁদের ভিতরে সরু কাঁটা-কাঁটা পাথুরে রাস্তা ধরে নীরব রাত্রিবেলা আমিও হেঁটে যাই। আমিও সেখানে বুঝাতে চেয়েছি পীরিতি সত্যি সত্যি কাঁঠালের আঠা কিনা, দেখতে চেয়েছি ধানের ক্ষেত, পাটের আড়ত, কারখানার ধোঁয়া, জঙ্গলের কিনার, চুল্লুর ঠেক। চাঁদ আমাকে প্রান্তরের মতো বিশাল একটা অতিথিশালা খুলে দেয়। অসীমের সিংহদরজা দিয়ে হুহ করে অফুরান আসে। আমি এক পা এগিয়ে আবার এক পা পিছিয়ে যায়। আগন্তুকের মতো আমারও ঠোঁট থেকে ঘন ঘন খসে পড়ে দিগ্বিজয়ীর আলগা হাসি।
‘পতনের শব্দ’ শুনি। জেগে উঠি। দেখতে পাই ‘বাংলার মাটি বাংলার জল চোখের নিমেষে বাষ্প হয়ে গেল।’বার বার পতনের স্বপ্ন দেখি কেন?পতন অলীক, মায়াময়, পতনের মধ্যে জমাটি সরু, জমকালো দেখি আমি।কিন্তু ‘আমার পতন-অভ্যুদয় কেউ খোলা চোখে দেখতে পায় না।
‘অনিশ্চিত হাসি খুশি’র ব্লার্বের কথাগুলি শ্যামলকান্তির কবিতা সম্পর্কে পুরোপুরি সত্য। তাঁর কবিতায় আমরা পতনের শব্দ শুনতে পেলেও একটা আলো দেখতে পাই। লেখেন, ‘মরা গাছে অফুরান স্বপ্ন জেগে আছে’।এই কাব্যগন্থেই কবি মণীন্দ্র গুপ্তকে নিয়ে একটি অসামান্য কবিতা আছে। একটি অংশে লিখেছেন —
আপনার বিশাল লেখা। অক্ষয়, অগাধ
লেখা,পড়া হল কতটুকু!
মহাবই ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি।
শব্দের আঁচড়গুলি আজীবন রক্ত মনে হয়।
সহজ কবিতা লেখেন তিনি কিন্তু গভীর আঁচড় রেখে যান।
সময়, সমাজকে ভোলেন না তিনি। ‘সহজ’ কবিতার দশটি টুকরো আমার কাছে দাঁড়ায় এসে চুপিচুপি, বছর বছর। দৃশ্যপট প্রশ্ন করে আমাকেও। আমিও অনেকের মতো নির্বিকার থেকে যাই।
অমৃতাভ দে, ‘কথার ঘর’ শিবতলা লেন, ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।
সত্যিই অনবদ্য উপস্থাপন। অনেক অনেক। শুভেচ্ছা