সকলেই কবি নন, কেউ কেউ কবি। তবে কবি না হয়েও কবিপ্রাণ হত বাধা নেই। কিন্তু রাজনীতির কবি? রাজনীতির জগতের সঙ্গে কবিতার বড় বিরোধ। সে জগৎ বড় কাঠখোট্টা। সেখানে আবেগের স্থান বড় কম। সর্বদাই সেখানে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ক্ষমতা দখলের লড়াই, প্রতিপক্ষকে আঘাত, নকল আবেগের লীলাখেলা। তাহলে রাজনীতির কবি বলছি কাকে? বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানকে। রবীন্দ্রনাথকে যেমন ‘বিশ্বকবি’র পরিচয় দিয়েছে বিদেশ, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনৈতিক কবি’র আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পত্রিকা। সে পত্রিকার নাম ‘নিউজ উইক’। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল এই পত্রিকায় লেখা হল : “The magic of the speech is that it never becomes monotonous . Therefore, it is erroneous to regard it simply as a politician’s speech; rather it can be compared with the tune pf the Pied Piper of Hamelin, behind whom successive generations run being overwhelmed by its magical power. It is not an address of 19 minutes, but a reservoir of the ideology Bangabandhu had professed throughout his career and instilled in us a powerful national political emotion. We should assemble every march 7 at the Suhrawardy Uddyan to rejuvenate ourselves in the spirit of the Liberation War .” প্রতিবেদক বলতে চেয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ম্যাজিক বা জাদু ছিল, সে যেন হ্যামেলিনের সেই বাঁশিওয়ালার সুরের আবেশে ছিল ভরপুর। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্বীকার করেছেন যে বঙ্গবন্ধুর মতো স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের কবিতা রচনা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয় :
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি
সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুথ্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালোবাসার সুকণ্ঠ সঙ্গীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।
আমরা কি তাঁর মতো কবিতার কথা বলতে পারব?
আমরা কি তাঁর মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারব?
(আমি কিংবদন্তির কথা বলছি )
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ১১০৭ টি শব্দে গাঁথা যে ভাষণ বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন তা আসলে ছিল ছিল একটি অগ্নিমশাল, যা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধের দাবানল, যে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই ভাষণ সুধু বাংলাদেশের মানুষকে নাড়া দেয় নি, সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল।… ৯০টি বাক্যে সংলাপের পর সংলাপে ছিল দ্বন্দ্ব ও রসের নানা প্রকরণ। দুঃখ, ক্ষোভ, উত্তেজনা, শান্তি, শৌর্যের বার্তা পৌঁছে দিতে ভারতের নাট্যশাস্ত্রের বিভিন্ন রসের সমাহার দেখা গেছে ভাষণে। (কেন তিনি রাজনীতির কবি / পরীক্ষিৎ চৌধুরী)। বিশ্বের বেশ কিছু রাজনীতিবিদের ভাষণ জনমানসে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল, যেমন :
ক] প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের ১৮৬৩ সালের গেটিসবার্গ ভাষণ
খ] মার্টিন লুথার কিংএর ১৯৬৩ সালের ভাষণ (‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’)
গ] জওহরলাল নেহেরুর ১৯৪৭ সালের ভাষণ (‘আ ট্রাইস্ট উইথ ডেস্টিনি’)
ঘ] উইনস্টন চার্চিলের ১৯৪০ সালের ভাষণ (‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস’)
কিন্ত এই সব কালজয়ী ভাষণকে কেউ কাব্যমূল্য দেন নি।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ
“ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহি, রংপুরে আমার ভায়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।
“আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম, নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামি লিগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলব, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করবার ইতিহাস। …
“১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে পারি নি। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান দশ বছর আমাদের গোলাম করে রাখল। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা দেয়া হল এবং এরপর এ অপরাধে আমার বহু ভাইকে হত্যা করা হল। ১৯৬৯ সালে গণ অন্দোলনের মুখে আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান এলেন। তিনি বললেন, তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, শাসনতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।
“তার পরের ঘটনা সকলেই জানেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা হল। আমরা তাকে ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করলাম। কিন্তু মেজরিটি পার্টির নেতা হওয়া সত্বেও তিনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন সংখ্যালঘু দলের ভুট্টো সাহেবের কথা। … ভুট্টো সাহেব বললেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন ডাকতে, তিনি মার্চের ৩ তারিখে অধিবেশন ডাকলেন।…
“কিন্তু পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দিলেন। দোষ দেওয়া হল বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হল আমাকে, বলা হল আমার অনমনীয় মনোভাবের জন্যই কিছু হয় নি।
“এরপর বাংলার মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল। আমি শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য হরতাল ডাকলাম। জনগণ আপন ইচ্ছায় পথে নেমে এল।…
“কিন্তু কি পেলাম আমরা? বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর অস্ত্র ব্যবহার করা হল। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। …
“আমরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখনই দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে চেয়েছি, তখনই যড়যন্ত্র চলেছে, আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
“এদেশের মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝেশুনে চলবেন। দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেওয়া হবে। আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। যদি একটিও গুলি চলে তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলবেন। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। রাস্তা ঘাট বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারব, পানিতে পারব। হুকুম দিবার জন্য আমি যদি না থাকি, আমার সহকর্মীরা যদি না থাকেন, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।…
“কিন্তু হুঁশিয়ার একটা কথা মনে রাখবেন, আমাদের মধ্যে শত্রু ঢুকেছে, ছদ্মবেশে তারা আত্মকলহ সৃষ্টি করতে চায়। বাঙালি-অবাঙালি, হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।…
“প্রস্তত থাকবেন, ঠাণ্ডা হলে চলবে না। আন্দোলন ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। …
“আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ।
“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
“জয় বাংলা।”
(আগামীকাল সমাপ্ত)