ভয়ে জর্জরিত আছি
আর ভয় দেখাও কাহারে…
এই অসুখের সময় তাঁর কবিতার মায়াবী স্পর্শ পেয়ে বহুদিন বাঁচতে ইচ্ছে করছে। অদৃশ্য এক শত্রু যখন ওঁত পেতে বসে আছে তখন এক মায়াময় শীতল বাতাস এসে লাগলো শরীরে, মননে। আকাশলীনা, উঠোন, জীবন, দোলাচল, দেশ, কাটা বটগাছ প্রতিটি কবিতার প্রতিটি ছত্র শুনে মনে হল সত্যিই ‘জীবন কবিতার মতোই এত কারুকার্যে ভরা। ‘এই সময় দাঁড়িয়ে নিজের অসুখের কথা সত্যিই বলতে ইচ্ছে করে না, বলতে ইচ্ছে করে দেশের অসুখের কথা। চোখের জলে আমারও ভিজিয়ে নিতে ইচ্ছে করে কলম। আমারও বলতে ইচ্ছে করে বাবার দেওয়া দুমুঠো অক্ষর গেঁথেই চলেছি যেন রোজ। ‘উঠোন’ কবিতাটা তো আমার কাছে মহাকাব্য, যে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকে মা, শালপাতার পাখা হাতে নিয়ে, সে উঠোন তো প্রতিটি শ্রান্ত-ক্লান্ত সন্তানের কাছে শীতলপাটি। তিনিই লিখতে পারেন এরকম পংক্তি —
“একদিন খেটেখুটে এসে সবে উঠোনে পা রেখেছি/অমনি কোথা থেকে যেন ঠাণ্ডা হাওয়া লাগল গায়ে/তাকিয়ে দেখি মা,/শালপাতার পাখা হাতে উঠোনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। ‘আমিও তো বুঝি উঠোন না থাকলে মানায় না বাড়ি। উঠোন তো গল্পের মতো। কত ছবি উঠোন জুড়ে। উঠোন পেরিয়ে তিনি পৌঁছে যান এমন এক দেশের কাছে যে দেশ মানে শুধু মানচিত্র বা ভূগোল নয়। বলেন দেশের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা। গাছের ছায়ায় আপনি রুগ্ন লালনকে ঝিমোতে দেখেন, তার মাথার পাশে দেখেন অবাক দুপুরকে। চোখ দেখতে পায় কীভাবে সেবাদাসীর স্পর্শে বাঁচে শতসহস্র সুখের অসুখ। কবিতা লিখতে বারণ করার পরেও কেন বলেন, ‘লেখো যদি কবিতাই লেখো। ‘আসলে চাইলেও ভুলে যেতে পারেন না গাছ, ফুল, লতাপাতা, সংসার-সমুদ্র। জীবন লিখতে জানেন, বুনতে জানেন সম্পর্ক। আর তাই তাঁর চোখে — ‘সকলের সঙ্গে সম্পর্ক জলে ভেজা লতায় পাতায়। ‘নাটক’কবিতাটি তো একটি পরিপূর্ণ নাটকই —
“বিদ্যুতের আলো নেই
খুঁজে পেতে হ্যারিকেন জানানো হয়েছে
নিভু নিভু হলুদ আলোয়
হঠাৎ নাটক দেখছি যেন দীর্ঘ অনভ্যাসে
দেখছি মা ও বাবা খোলা বারান্দায়
বাবা খালি গায়ে পাটির উপর বসে
অ্যানাসিন হাতে করণিক
অফিস থেকে সবে ফিরেছে
মা বাবাকে খেতে দিয়ে
তালপাতার পাখা হাতে সামনে বসে আছে
আমরা ভাইবোনেরা বাবার পায়ের কাছে
হাওয়া খাচ্ছি চুপিসারে নিঃশব্দে গড়িয়ে
অন্ধকারে ঠাকমা ঘরে শুয়েই গাইছে
পার কর হে আমারে
ঠাকুমা কী জানতে না
সময় হলেই হরি এসে যাবে”
২০২১-এর ২৫ ডিসেম্বর এইসব কবিতা নিয়ে প্রকাশ পেল বিদ্যুৎ হালদারের কাব্যগ্রন্থ ‘মন তো ধোয়াই ছিল’। এই কাব্যগ্রন্থের পান্ডুলিপির অনেক কবিতাই করোনাকালীন মুহূর্তে শুনেছিলাম কবির কণ্ঠে। চতুর্থ কভারে লেখা রয়েছে, “বিদ্যুৎ হালদার কবিতার এক ভিন্ন স্বর। কবিতা লেখার ছলে তিনি যেন জীবনই লিখে চলেছেন গত তিন দশক ধরে। যাপিত জীবন থেকে উঠে আসা ছোট ছোট বিষয় কিভাবে যে কখন কবিতা হয়ে উঠল তা না পড়লে এভাবে যেন জানাই যেত না। হাল্কা চালে চলতে চলতে কখন যে আমরা কবিতার মর্মে প্রবেশ করে গেছি ধরাই যায় না যেন। সেই প্রবহমানতায় ‘মন তো ধোয়াই ছিল’ কবির দ্বাদশ কাব্যগ্রন্থ।”
সীমান্তে দাঁড়িয়ে আমিও দেখছি এপার-ওপার। দেখি দুপারেরই এই পাহারা পেরিয়ে দোয়েল, শালিখ আর হলুদ বৌ ফিঙে উড়ে যায় অরাজনৈতিক এপার ওপার। স্বপ্নের দেশগুলো ছোট হয়ে আসছে বড্ড তাড়াতাড়ি। তাই তো ধূসর পৃথিবীকে কবি বলেছেন —
“হে ধূসর পৃথিবী তুমি শোনো
জীবনের জন্য কী আর চেয়েছি এমন
কামনা বাসনা জোর শস্যভরা মাঠ
প্যাস্টেলে অথবা জলরঙে আঁকা
সবুজের পদতলে বাড়ি, প্রশস্ত আকাশ
আকাশের গায় তারা,নক্ষত্র সুজন
বেনেবউ,কাক সকলের স্বাধীন উড়াল
চেয়েছি শিশিরে ভেজা পায়ে চলা পথ
প্রকৃতির রূপেগুণে বালকের দুচোখে বিস্ময়
কিশোরীর প্রজাপতি রং সহজাত
তরঙ্গের মতো ঘাসে ঘাসে উড়ে চলার ছুট
গলা ছেড়ে গান গাওয়া ঘরমুখো পথচারি
চেনা কোনো পড়শির দীর্ঘায়িত প্রিয় ডাক — “
এইটুকুই তো চাওয়া আমাদের। পাশে পাশে মানবিক কেউ হেঁটে যাবে কবিতার মতোই। শব্দের আশ্রয়ে থেকে চান কবি। মেয়ে হয়ে ওঠে শব্দপ্রাণ। আমি সেইসব শব্দের কাছে বারবার ফিরে ফিরে যাই, চুপচাপ বসে থাকি, মেঘে মেঘে কত রঙ কত খেলা দেখি, বিকেলের সোনা রোদে পাখি উড়ে যায়। মনে হয় সেই আগের মতোই ভুলে ভরা আমি থাকলে ক্ষতি কী? “ইচ্ছে ছিল ধারেকাছে চড়ুই শালিখ/ কয়েকটা খুঁটির প্রশ্রয়ে চালাঘর/ দুপুরের নিদ্রা ঘাম দাওয়ায়/ ইচ্ছে ছিল শীতলপাটির পরে/নকসি-কাঁথা পাতা/ ঝরা পাতা উঠোনে আমার। “কিন্তু ‘সব সব ইচ্ছে মরে ভূত হয়ে যায়’। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কবির মতো আমিও খুঁজে চলি।
এক অদৃশ্য শক্তির কাছে আমাদের প্রতিমুহূর্তের পরাজয়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের অসংখ্য মানুষ মাথা নত করেছে মারণ ভাইরাসের কাছে। এর থেকে মুক্তি চাই আমরা। চাই আলো। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘পাতায় পাতায় শিশির লেগেছে’ কাব্যগ্রন্থের ‘জীবাণু’ নামের একটি কবিতায় বিদ্যুৎ হালদার লিখেছেন —
আমি তো চেয়েছিলাম ভোর হোক
আলো আসুক পৃথিবীতে-
প্রতিদিন রাত্রি যেমন চায়
*
ভোর হলো সেই অন্ধকার
*
সামান্য যে আলো এলো
তার সবটাই শুষে নিল
অন্ধ জীবাণুরা-
*
অন্ধকারে দাপাদাপি করবে বলে।
এই সকালে যখন বাগান জুড়ে অজস্র পাখি, সবুজ পাম গাছের উপরে রোদ্দুর, করবী গাছে গোলাপি করবী ফুটেছে দু-একটা, পুতুল নগরীর ভাস্কর্যগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে কথার ঘরের প্রাচীর ঘেঁষে তখন কবির মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করছে —
“যত খুশি আনন্দ দিতে পারো দাও
দুঃখ দিও না”
*
‘আমি নেই আমি আছি’র পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে
কবির মতো আমার সামনে ভেসে ওঠে জলছবি। ছবিতে ফলসা ঝোপ, বুড়ি ছোঁয়াছুঁয়ি, পাতার মুকুট মাথায় রাজা-রানি খেলা। গভীর অসুখ এসে যখন আমাদের গিলে খেতে চায় তখনই তো বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ছেলেবেলা আর স্মৃতির গলিটায়। বয়সের বুকে চিরশিশু ছেলেবেলা আর স্মৃতির গলি। ভোলা তো যায় না। অস্থির সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে দেখতে পাচ্ছি সবাই ওল্টাচ্ছেন স্মৃতির পাতা। মৃত্যুর দিকে কি ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। এসময়ের তুমি আর পুরনো অ্যালবামের সেঁটে রাখা অতীতের তুমির মধ্যে পার্থক্য কতখানি? দুঃখের সময়ে সুখের স্মৃতিগুলো বারবার আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে তো আমাদের। আসলে এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার এক প্রবল লড়াই আমাদের। বিদ্যুৎ হালদারের মতো করে বলি —
“ঝরে পড়ে যাওয়ার আগে
অনেক কিছুই রোখার ছিল
অন্তত একটা আত্মহত্যা
*
এক সর্বনাশা রণন।”
অমৃত উৎসবের কথা লেখেন কবি। আঁকেন কালচিত্র। বইয়ের চতুর্থ কভারে লেখা আছে — “কবিতা হয় নির্বিষয় কিংবা আত্মমৌন অস্তিত্বের আবিষ্কার। আমি নেই আমি আছি, এ-ও যেমন সত্য, তেমনই আমি ও আমার স্বপ্নজগৎ। মাঝখানে আছে আনন্দাশ্রু, নদী, ফুল, বৃষ্টি আর স্পন্দমান বাঁচা। কবি ক্রমেই খুঁজে নেন তাঁর একান্ত বিষয়গত পরিসর। “ঝুলন পূর্ণিমার রাতে প্রজাপতি জানলার পাশে লেবু ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। লেবু ফুলের মধু থাকে তাহলে। বাস্তবতা মধুর হয়ে কবিকে ভাবায়, কবি শিহরিত হন। জানালা দিয়েই সানন্দে দূরে চলে যান তিনি। মাঠে হাঁটেন, গাছের ছায়ায় দাঁড়ান। আস্ত একটা প্রাচীর জানালার গা দিয়ে উঠে গেলেও কবির কিছু এসে যায় না, কবির মনে হয় —
‘শব্দ তো নিঃশব্দে চলে, টপকে যায়-
মানুষ অন্ধ হলেও ভাষা বেঁচে থাকে
*
আমি তাই জানলা ছাড়িনি।’
ড্রিমল্যান্ড অ্যাপার্টমেন্ট কবির কাছে পরদেশ। অ্যাপার্টমেন্টের রেলিঙে দাঁড়িয়ে যখন দুঃখভারে জ্বলেন তিনি, তখন তার চোখ আটকে যায় নিচের উঠোনে। গোটা বাড়িটা ঝাড়পোঁছ করে যে মেয়েটা সে তার ছেলেকে কাছে নিয়ে কী যেন বলছিল। মা ও ছেলের ভাষায় ভরে উঠেছিল ড্রিমল্যান্ড। কবি বোঝেন —
“ওদের ভাষাতেই
ওরা সুখে বেঁচে আছে।”
আসলে কবি বিদ্যুৎ হালদারের কবিতা-ভাষা অনেক সহজ। তাঁর দেখার চোখ বহুদূর প্রসারিত। আমরা মগ্ন থাকি তাঁর শব্দে। সাহিত্যের পাঠ নিয়েছি তাঁর কাছে। তাঁর কন্ঠনিঃসৃত শব্দবন্ধ আজও বিভোর করে। তাঁর চোখ দিয়ে দেখেছি অনেক কিছু। আমাদের যাপিত জীবনের ছোট্ট ছোট্ট চিত্রকল্প কাব্যে উঠে আসে। ‘মরণশীতল’ কবিতাটি শোনা যাক —
“আমি কোন ঘরে বাস করি, জানি
তার চেয়ার-টেবিল, বিছানা-বালিশের গন্ধ
আমার নাকে লেগে থাকে
কিন্তু ঠিক কোন্ টা আমার ঘর
কোন্ ঘরে আমার চোখ, মগজ
কিছুতেই বুঝি না
কেউ কি সত্যিই বোঝে —
পাথর, মোজাইক, না শুধুই মাটির
কোন্ ঘর সবথেকে ভালো
মরণশীতল।”
আলো আর অন্ধকারের কাব্য এই গ্রন্থ। লাল-কালো রক্ত, আতঙ্ক, লাশ, ছিন্নভিন্ন দেহ, এত কিছুর পরেও যখন ভোরে অথবা বিকেলে নদীর মুখোমুখি হন, তখন তার চেতনা আধারে ভরসা ফিরে আসে। কবি দেখতে পান —
“সযতনে রক্তরাগ মুছিয়ে দিয়ে উচ্ছল
নদী তার প্রবাহই জানে।”
অন্ধকার দিনে তাপসী চলে যায়, ঝড় জলের রাতে আনত হতে কারো কাছে, বোধের কোন মন্ত্র পেতে। এই অন্ধকার সময়ে আমরাও রাস্তা খুঁজি-শান্তি মন্ত্র উচ্চারণ করি।
‘পার হয়ে যাই’ “জীবনপর্যটনের এক মেধাবী মাইলস্টোন। সে জীবনের চারিদিকে প্রাকৃতিকতার বেষ্টনী। সেখানে চেনা গ্রাম রূপকথা বলে, জলের আয়না আর গাছের নতুন পাতা জাগে, ধুলো চলে যায় ধুলো হয়ে ধুলোরই অন্দরে। “রৌদ্রের ধোঁয়ায় দিগন্তকে অচেনা লাগে। মন্দির মসজিদের চূড়া পার হয়ে অফুরন্ত সবুজের ঢেউ স্বার্থপর মানুষের চোখে পড়ে না। আরণ্যক মদিরতা কিংবা ফেলে আসা শষ্য সোনাগুলো পেতে ইচ্ছে করে কবির। উচ্চারণ করেন —
‘জ্বলে পুড়ে শেষ হোক
শুষ্ক নীতি, নাগরিক অস্থিরতা
নগ্ন ভাষা, শাসকের ক্রোধ।…
*
ছুঁড়ে ফেলো ছাই ভস্ম বিষ’
ধুলো ওড়া পথে পথে হেঁটে বেড়ানোর দিন নেই আর। পায়ে-পায়ে দিনকাল ওঁত পেতে আছে বাঁকা চোখে। ধানক্ষেত থমকে থাকে। অচেনা হাওয়ায় তার হাসি চলে যায়। বহুদিন পর চেনা গ্রামে ফিরে গিয়ে মনে হয় মাঠ-ঘাট গাছগাছালি বটতলা নির্জন চাতাল আগের মতোই রূপকথা বলে। কিন্তু,’সামনের রাস্তা দিয়ে আলো-অন্ধকারে/
রহস্যময় যাচ্ছে আসছে যারা/তাদের সকলেরই মুখ ও মুখোশ/ হাঁটাচলা দেখেও চিনতে পারছি না/ হয়তো এখানকার মানুষগুলোও দ্রুত বদলে গেছে খুব।’দূরত্ব বেড়ে যায় এভাবেই, জনপদাবলী পাল্টে যায়। সম্পর্ক দহন হয় ঘরে ঘরে।
কোমল মায়াবী সব কাব্যগ্রন্থ, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া নাম তাদের। পাহাড় পেরোলেই নদী, বললেই আলো জ্বলে না, নৌকা ভেসে যাচ্ছে, বিদ্যুৎ যাচ্ছে ওপারে, লেখাটাই কাল, আমি নেই আমি আছি, পুঁইমাচায় লাফাচ্ছে টুনটুনি, পাতায় পাতায় শিশির লেগেছে, পার হয়ে যাই, বসন্ত বরষা, স্রোত ভেঙে ভেঙে।”
আলো পৃথিবীর অবাক দৈনন্দিন জীবনের কী অনুপম উৎসার! কবি তার থেকে ছেনে নেন পুঁইমাচা টুনটুনি, অমল বালিকাদল, না-গাওয়া গানের বেদনা। এসে যায় মেকি হাসি, চাপা কান্না আর কবেকার বিছানা-চাদরের স্মৃতিগাথা। মাঠে মাঠে চলছে বিষবর্ষণ, দেখছে আতঙ্কিত এক পাখি।”
কবি বিদ্যুৎ হালদার জানেন ‘শিকড় উপড়ে ফেললেও আমৃত্যু কিন্তু/ শিকড়ের কষ্ট-টান থেকে যায়। ‘তাই তাঁর কবিতায় বারবার সেই শিকড়ে ফিরে যাবার কথা আছে। যে একবার গ্রাম দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও বসত গড়েছে/ সে সহজে হাঁটাহাঁট মাটিতে ফেরে না/ সাপখোপ, লতাগুল্ম নিয়ে তিন পুরুষের ভিটেমাটি/খকখক কেশে কেশে অন্ধকারে একা পড়ে থাকে। ‘বেনেবউ ত্রিতলের দাঁড়ে বসে একা আকাশ খুঁজে চলে, কেননা কয়েক বছর বৃষ্টি নেই, জমিটাও শুকিয়ে মরে কাঠ।অথচ কিছুদিন আগেও বর্ষায় পোড়াজমি ভরে যেত জলে। উড়ে আসত ফড়িঙের দল পড়ন্ত রোদে অদ্ভুত হলুদ লাগতো তার গায়ে। ছোট ছোট মাছেদের লোভে মাছরাঙা, বক সারাদিন খুব। মাঠের খেলাটাও বদলে যায় দ্রুত। বড় বড় পিলার ওঠে ছাদের উপর। টুকরো টুকরো অনেকগুলো ঘরে সেজে ওঠে একালের সুউচ্চ খাঁচা। সরল অঙ্কে এভাবেই লিখে ফেলেন পরিবর্তনের কথা, বদলে যাওয়া পরিবেশের কথা। চল্লিশ বছর আগের বাড়ির উঠোনে থাকা বেলি গাছ কাব্য হয়ে ওঠে। সেই বেলি গাছ আজ আর নেই। ঘরের উষ্ণতা গেছে বেড়ে।
পুঁইমাচায় লাফাচ্ছে টুনটুনি
মাচার উপর লতানো পুঁইয়ের
রোগা লিকলিকে সবজে ডগাগুলো
মাথা উঁচু করে নাচছে দুলে-দুলে
*
আয় আয় জলমেঘ বৃষ্টি দিয়ে মা
ডালপালা আরও বাড়ুক রেখে ছেঁটে খা-
বারোমাস্যা গৃহস্থের রূপকথা না
*
রাজবাড়ি খান খান হয়ে ভূমিতলে
রাজার নাককাটা ইতিহাসে চলে।
দলিত মানুষের কথা লেখেন অন্য সুরে,পায়ের নিচে পড়ার যন্ত্রণা যে আজীবন। আমাদের যৌথ অভিনয় পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে, আসলে আমরা সকলেই একক মানুষ। পক্ষী জীবনের মতো মনুষ্যজীবনেও একটা গাছের বড় প্রয়োজন। গাছ ভেঙে পড়লে যুদ্ধ শুরু হয়। হিরোশিমা নাগাসাকির মতোই ভয়ঙ্কর তখন বিকলাঙ্গ ছানা আমৃত্যু মাটিতে ঘষটায়। বয়স বেড়ে গিয়ে আমরাও কেমন দীন হয়ে যাই। মনে পড়ে ছেলেবেলাকে।
“এই কবি সময়কে এড়িয়ে নয়, পেরিয়ে, রচনা করেছেন সেই ভাষাবিশ্ব — যাতে আছে স্বপ্ন, শৈশব, নিসর্গ, মানবজমিন। আত্মপরিহাসের দুর্লভ অবলোকন এবারকার লেখনীতে অন্যতর স্বাদগন্ধ আনলেও অন্তর্মনা কবিত্ব আনন্দ-সৌরভে আপ্লুত। কাল সন্ধির স্বরূপসন্ধানের মননশিল্পে ছত্রে ছত্রে দীপ্র। একটা চেয়ার, একটি চড়ুই, লৌকিক মেলা, শেষ চিঠি আর কাক-ময়ূরের প্রচ্ছদে অপরূপ এক সংসার পাতা যেন।” একটি কবিতা গ্রন্থের চতুর্থ মলাটে লেখা এই কথাগুলি বুঝিয়ে দেয় কাব্যগ্রন্থটি কীভাবে হয়ে উঠেছে জীবনের কারুশিল্প। ‘অন্যকথা’ থেকে প্রকাশিত কবি বিদ্যুৎ হালদারের লেখা ‘লেখাটাই কাল’কাব্যগ্রন্থের কথা বলছি। যে গ্রন্থের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকে মায়া। এই মায়া জীবনের প্রতি। হয়তো নতুন কিছু নয়। জীবনের প্রতি লেখার প্রতি, বাবা, মা, সংসার, প্রতিবেশ, পরিজন, অরণ্য, বাদল, মেঘ, তারা,ঝোড়ো হাওয়ার প্রতি মায়া সকলেরই হয়তো থাকে। এই কবিরও আছে। কিন্তু এ কবি জানেন, “ছিন্ন ধ্বংসস্তূপে/ হতবাক মানুষ চিরকাল/ ভাঙা ঘর সারানোর/ শক্তি খুঁজে চলে অবিরাম।” আসলে একটা ঝোড়ো হাওয়ায় অনেক কিছুই এলোমেলো হয়। ঝড় সরে গেলেও ক্ষত তার সহজে সারে না। মানুষ ঘর সাজিয়ে তোলে, বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা তার। কত সহজ উচ্চারণ কবির, অথচ কত গভীর। দড়ির উপরে অনুক্ষণ হেঁটে চলেছি আমরা। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই দড়ির উপরে হাঁটা। সফেদ ব্যান্ডেজ জড়িয়ে মন প্রাত্যহিক বেঁচে থাকে। কবির কবিতায় এভাবেই শরীর ও মন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখলে একটা মানুষকে সত্যিই চেনা যায় না। ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায় শরীর, বলা ভালো মন। মা যতদিন ছিলেন ততদিন গাছ হয়েই ছিলেন। দিনে যতবার তার সাথে মার কথা হতো, ততো বারই মা বৃষ্টি হবে কিনা জিজ্ঞাসা করতেন। কবি জানতেন, ‘গাছ বাঁচলে বৃষ্টি নামবেই’। মাকে নিয়ে কী অসামান্য এক কাব্যনির্মাণ! ছাদ ফেটে জল গড়ায় ঘরে, জল-হাওয়ার ঝাপটায় জানলা দরজা খুলে যায় বারবার।বিদ্যুতের আলো থেকে থেকে যেন ক্যামেরাবন্দি করে ঘটি-বাটি হা-অন্ন সংসার। চল্লিশ-পেরোনো মা নিভন্ত উনুন নিয়ে রান্না ঘরে বসে থাকেন, ছেঁড়া-ফাটা ছাতি হাতে এ-ঘর ও -ঘর সামলান বাবা। বাবা নেই, বৃষ্টিদিনও ফুরিয়েছে। আর তাই পরিবর্তনের ছবি আঁকা হয় শব্দে —
“জলঙ্গির পাড়ে আবর্জনা জমে আছে প্রচুর
বাবা, আজ বড্ড খরা হয়ে গেছে।”
একটা ঝড়ো হাওয়ায় অনেক কিছুই এলোমেলো হয়। ঝড় সরে যায় ক্ষত তার সহজে সারে না। ছিন্ন ধ্বংসস্তূপে হতবাক মানুষ চিরকাল ভাঙা ঘর সারানোর শক্তি খুঁজে চলে অবিরাম। দুটো মানুষ যে সহজে মেশে না, একে অন্যকে আপাদমস্তক মাপে — সে কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না। না-বলা কথাই বাঁচিয়ে রাখে আমাদের। পথের দু’পাশে শাল শিমুল দেবদারু ঐতিহ্যস্বরূপ অথবা অমলিন স্নেহ-অধিকার। কবিয়াল ভাইকে ডেকে জিজ্ঞাসা করি, ‘এত ছোট জীবনকে আরো ছোট করে নেওয়া কেন। ‘ক্রমান্বয়ে হেরে যাওয়ার কাছেই আমাদের হেরে যেতে হবে একদিন, তবুও আমরণ কবির কবিতা-বিলাস। সব কথা শোনার জন্য কেউ না থাকলেও আমাদের সঙ্গে থাকে আমাদের ছায়া, ‘ভেবে দেখি ছায়াই মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
বাতাসে বৈরাগী এক গান রেখে গেছে। বাতাসে কীর্তন ভাসে, গোরাচাঁদ আকাশ ছেয়েছে। ‘বসন্ত বরষা কবিতাগুচ্ছে কবি বিদ্যুৎ হালদারের প্রবণতা হলো প্রকৃতিলীনতা। সেইসঙ্গে নদী নৌকা দৌড় সন্ধ্যে সকাল আকাশ বৈরাগী বাতাস। গোরাচাঁদ আকাশ আর পিচকারী’ হাতে স্বয়ং গোপাল ধরা দেয়। বরষার অন্তরে বসন্ত ঘুমায়। ‘সব আলো নিভে গেলে অন্ধকার ই থাকে গাছে গাছে জোনাকিরা জ্বলে আর নেভে। দুটো চোখ অন্ধকারে তারা হয়ে যায়। ফাল্গুনী পূর্ণিমা রাতে চাঁদ ওঠে গোল হয়ে। জানলা দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে এসে পড়ে। খুব দূরে নয়, কদম্বের ডালে বসে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে কানাই। সকাল থেকেই ছুটে ছুটে রং মেখে রঙ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে রাই। একটা গাছ মাটি কামড়ে এই বসন্তে দাঁড়িয়ে থাকে। আষাঢ় শ্রাবণ এলে তখনই বিশ্বাস হয় সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে আসলে সে একটাই কাজ। মানুষ আর গাছ দৃশ্যত এভাবেই শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পৃথিবীতে এক থেকে একশো হয়ে আছে। বসন্ত ও বর্ষা- দুই ঋতুর অন্তরেই আছে বিরহ বেদনার অবিশ্রান্ত ধারা। এই দুই ঋতুর টুকরো টুকরো কিছু অনুভবচিত্র কাছাকাছি এনে দিয়েছেন কবি। বসন্তের ভেতরে অন্তঃশীল বর্ষার অশ্রুবারি চোখে পড়ে।
প্রকৃতি ভিজে নতুন হলে
ঘাম-রক্ত মুছে ফের
বাঁচতে ভালো লাগে।
“ঘাসের মধ্যে অদ্ভুত আঁধারের দ্রষ্টা কবি বিদ্যুৎ হালদারের কাব্যপ্রত্যয় হালের কম্পিউটার-বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন থেকেও পত্রালিতে শিশিরস্পর্শী হতে চায়। উত্তাল শ্রাবণ আর অযান্ত্রিক মানবতার সচল বিশ্বাস তাকে একসঙ্গে আকর্ষণ করে রাখে। বৈষ্ণবীর রসকলি আর ফাল্গুনের তাপময় নিসর্গ তুলে আনে ঋতুর বর্ণমালা পাঠরত কিষাণ-কিষাণীর অন্তর্বাষ্পভরা কথকতা। জেগে ওঠে নতুন কবিতার শস্য-আলিম্পন।” পাতায় পাতায় শিশির লেগেছে। ফাল্গুনের তাপে মাথা তুলে থাকে চারা ধান। একটানা ঘট ঘট আবহে ক্ষেতময় কতগুলো রমনী ও পুরুষ একপাশে সমরেখা ধরে নিচু হয়ে কিছু বনে চলে। জনা চার আলের উপর পাশাপাশি বসে বিড়ি ধরায়, ধোঁয়ায় গল্প উড়ে যেতে থাকে। ‘মাটি থেকে উঠে আসা হীরক ধারায় কৃষাণ কৃষাণী মহানন্দে দুইজনে। ‘পৃথিবীর সব সোনাই’ কবির-
‘পাতায় পাতায় সোনা
সোনা পাকাধানে
আমি রেণুকণা
পৃথিবীর সব সোনাই আমার।’
একটু পিছনে ফিরে তাকায়। সালটা ১৯৯৩। সুপ্রকাশ প্রকাশ করল বিদ্যুৎ হালদারের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বললেই আলো জ্বলে না’। চতুর্থ প্রচ্ছদে লেখা হলো, “বিদ্যুৎ হালদার তরুণ প্রজন্মের কাব্যকর্মী। অথচ এই প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর স্বভাবগত প্রভেদ বিস্তর। জীবন তাঁর কাছে বড়ো, কবিতা তুলনামূলকভাবে গৌণ। ফলত তাঁর প্রতিটি উচ্চারণ নিরলঙ্কৃত, সরল ও গভীরতম তলদেশ থেকে উৎসারিত। বানানো কথার মধ্যে যে আপাত-গম্ভীর ফল্গু তারল্য থাকে,তা বিদ্যুতের কবিতায় কখনো মিলবে না। উন্মার্গ উৎকেন্দ্রের সমস্ত বয়সোচিত প্ররোচনা এড়িয়ে বিদ্যুৎ লিখে চলেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যপুস্তিকা ‘পাহাড় পেরোলেই নদী’ জীবন ও কাব্যপ্রেমী মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল, সেই ভরসায় ক্রমশ রোবট হয়ে যাওয়া কাব্যকলার সোচ্চার দাপাদাপির মধ্যেও বিদ্যুতের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটি আমরা নম্র-দার্ঢ্যে পেশ করছি।” হলুদ হয়ে যাওয়া ৩২ এই কাব্যগ্রন্থটি ওল্টাতে ওল্টাতে আবিষ্কার করছিলাম দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চেনা আমার সেই মানুষটাকে। ‘জীবন আর নিসর্গের অমলিন আত্মীয়তা’। কাজলপাতি চোখ মেলে দুর্গা চেয়ে আছে আজও, যে চোখের ভিতর জ্বর নয় জীবনের উষ্ণতা লেগে আছে। স্বদেশ, সময়, স্বপ্ন একাকার হয়ে যায়। শিকড়ের পর শিকড় চালিয়ে পাতা ভরা গাছ দোল খায়, কিন্তু টোল খায় না। সে যে বনস্পতি, প্রতিটি স্নায়ুজাল ঋজু হয়। অথচ জালের আড়ালে থেকে রাজা পাল্টে দেন সব। সময় বদলের কালো ইতিহাস প্রচ্ছন্ন থাকে শব্দশরীরে। আমরা যাঁরা খুব কাছ থেকে কবি বিদ্যুৎ হালদারকে দেখেছি তারা উপলব্ধি করেছি একটা বিরাট শব্দবৃক্ষকে। তাঁর ছায়ায় আমরা আশ্রয় নিয়েছি, তাঁর সমস্ত কথাকে বুকের ভিতরে আগলে রেখেছি আমরা, তাঁকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছি। তাঁর মতো কথা বলতে চেয়েছি, তাঁর মতো উচ্চারণ করতে চয়েছি, তাঁর মতো ডুবে থাকতে চেয়েছি বাংলা সাহিত্যে, ভালোবাসতে চেয়েছি গানকে, আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে, জনজীবনকে। বন্ধু আকাশ লিখেছিল — “বিদ্যুৎ হালদার… প্রজ্ঞা, মেধা, জ্ঞান, ত্যাগ কথার কথা নাকি? না…কখনো তা ধৃতির অবয়ব …শরীর ধারণ করে হেঁটে বেড়ায় বৈরাগ্যের দেহে… আমার স্যার… কৃতবিদ্য পন্ডিত…ছন্দশাস্ত্রে গবেষণা…কোনোদিন নামের আগে ডক্টরেট উপাধি জুড়তে দেননি। বলেন, “ওরে আমি কবি…তোদের পড়িয়েছি, সেই আমার ভূষণ”…স্যারের ক্লাস শোনার জন্য, সায়েন্স, আর্টস, কমার্স জানলা ধরে দাঁড়িয়ে আছে…ঘরে জায়গা নেই…স্যার পড়াচ্ছেন, “অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়…আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়” …স্যার আজো চমৎকার? আজো??? সাইকেলটাও বদলাবেন না? গায়ের চাদরটা?? এখন তো অভাব নেই?? এতোগুলো কবিতার বই প্রণোদনা দেবে না “ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার “…আপনার চোখে রবীন্দ্রনাথের শ্রাবণের গান… হাসিতে পৌষের রোদ্দুর…ছাত্রদের লেখা বই থেকে অনর্গল কবিতা বলে যেতে পারেন…শঙ্খ ঘোষের কবিতার নতুন বই বেরুলে আপনি আমাদের বসন্তউৎসব…রাতের পর রাত জেগে ছাত্রদের লিটল ম্যাগাজিনের প্রুফ…কেন স্যার? কিসের বিপন্ন বিষ্ময়? ….তিন সন্ধ্যার শূন্য ক্রোশের পর আপনি সেই পুরনো সাইকেলটা চালিয়ে কতো জনের বাড়ি গিয়ে গিয়ে বলেছেন…থাক…দরকার নেই সেসব কথার…কোনো গল্প তো অপ্রকাশেই সুন্দর…পৃথিবীর নতুন গল্পগুলো এখন বাজারের বাটখারার ওজনে নিজের যোগ্যতা মাপে…আর একটি গাছ আপনার মাথা ভেদ করে উঠে যায় আকাশে… সে গাছের ছোখে বর্ষার গান, হাসিতে পৌষের রোদ্দুর…আপনার শুধু আমাদের মাস্টারমশায় হওয়ার আনন্দ…না মাস্টারমশায়, আপনি সত্যিই কিছু দেখেননি…এই লেখাটি আপনাকে ট্যাগ করা যাবে না… আপনার ফেসবুকের দেওয়াল নেই…আপনি এখনো কাগজের ওপর ঝুঁকে লেখেন…না স্যার, আপনি সত্যিই কিছু দেখেননি…আপনার নতুন কবিতার বইটায় তবু দেখলাম, সন্তানকে নদীর রাস্তা চিনিয়ে দেবার স্বপ্ন উড়ছে…”
তাঁর কবিতার বই আমাদের রাস্তা চিনিয়ে দেয়। বেঁচে থাকার প্রবল আকর্ষণে বারবার ছুটে যায় নদীর কাছে,ফুলের কাছে পথের কাছে, মাটির কাছে, মানুষের কাছে। দেখতে পাই ‘পাহাড় পেরোলেই নদী’। তাঁর প্রথম কবিতার বই আলো-অন্ধকারে মোড়া অপূর্ব এক পৃথিবীর দিকে নিয়ে যায়। ফিসফিস কথা বলে নদী,পাহাড়ের সূত্র পেরিয়ে সে-কথা সতেজ সরল — –
“পাহাড় পেরোলেই নদী
স্পন্দন,ভালোবাসা,অভিযান-অভিলেখ তার
সবাক নিসর্গ যেন — –
এই নদীই মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ করেছে।”
“কবি বিদ্যুৎ হালদারের সংগোপন আত্মধর্মে আছে বোঝা না-বোঝার তাপ। অথচ চলমান জীবন ধর্ম তাঁকে ভাবায় — চেতনার নৌকো তাই দূরজানী স্রোতে ভেসে আছে। আপাতভাবে ভেসে আছে কিন্তু তার অন্তরমহল লগ্ন হয়ে আছে গহন শামুক-ঝিনুক মণিরত্নের গন্ধে যা গতিময় নদীধারার সংলগ্ন। তাঁর কবিতার বিশ্ব স্বতন্ত্র এবং স্বতন্ত্র বাণীময়তায় আত্মগত।” বিদ্যুৎ হালদারের কাব্যগ্রন্থ ‘নৌকো ভেসে আছে’ সম্পর্কেই কথাগুলি লেখা। ২০০৯ সালে এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পায়। বৈশাখ তাঁর কাছে অশেষ নীরবতা, প্রকৃতি নারীর মনের মতোই — স্বচ্ছন্দে স্বর্ণময় আঁধারে-আলোয়। কৃষ্ণচূড়া হেসে ওঠে হাওয়ায়, আমিও ছায়া খুঁজি,গভীর ছায়া — ভালোবাসা।
২০০৯ সালেই প্রকাশ পেয়েছিল ‘বিদ্যুৎ যাচ্ছে ওপারে’। এই গ্রন্থ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল “আত্মভাষাই স্বপ্নের জনয়িতা — সেই স্বপ্ন যেন প্রচ্ছন্ন স্বদেশ। কবিতার সঙ্গে নিগূঢ় সংলাপের অন্তর্ময় আবেষ্টনীতে স্পর্শ রেখে যায় একাকিত্বে, শূন্যতা আর অভিমান। তবু কবির থাকে অন্তর্লীন বিদ্যুৎ যা চকিত ক্বচিত ভরে দেয় আপন অভিজ্ঞানকে। দীনবেশে সেজে আসা দিন পরে নেয় প্রত্যাশার স্বর্ণমুকুট।” দুপুরের ক্লান্ত গলিটায় রংবেরঙের ফিরিওয়ালা হেঁকে ডেকে ফিরে যায়। ছোটরাও এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। এক উন্মাদ এই গলিতেই স্তম্ভ হয়ে আকাশ দেখে আর বলে এসো বৃষ্টি ধুয়ে-মুছে কবিতা বানাও। এভাবেই বোধহয় একটা গলি কবিতা হয়ে ওঠে।
‘স্রোত ভেঙে ভেঙে’ বিদ্যুৎ হালদারের সদ্য সাম্প্রতিক কবিতাগুচ্ছ। আটচল্লিশটি মিতায়তন অভিব্যক্তিতে ধরা আছে নিরলংকার সুন্দর আর নিরহংকার সত্য। বিভাজন আর বিশিষ্টতা এখনকার কালধর্ম। কবি তার অসহায় দ্রষ্টা আর পরাজিত প্রতিবাদী। মনখারাপের মায়াবী প্রলেপ-মেশা মাতৃহীন সত্তা খোঁজে হারিয়ে যাওয়া দিন — এদিকে গর্জে উঠছে ডিজিটাল দেশ। সবকিছু নিয়ে এই অপরূপ কবির সংসার।দ্ব্যর্থময়,বিক্ষত তবু আত্মাভিমানী। যখন নিয়ত আছড়ে পড়ছে ঝড়,লোকটা কবিতা লিখেই বাঁচে। কবিতা ঝড়ের মুখে শক্তিশালী হয়। কবি তো স্বপ্নই দেখে। শান্ত চরাচর, ঘরবাড়ি, পথ-ঘাট, গাছপালা, নদী — রংবেরঙের পাখি আর পাখির উড়াল ছবির মতন শুয়ে থাকে বুকে। এভাবেই গড়ে ওঠে কবির সংসার। মা যতদিন ছিল বাড়ি ছিল। উঠোন, উঠোনে গাছপালা। জানলা দরজা খোলা। কত আলো কতই বাতাস। সাদা শাড়ি সাদা মাথা এক প্রাণ থেকে থেকে নাম ধরে ডাকে। কাছে এসে বসে পিঠে হাত রেখে বলে ‘কী হয়েছে তোর, আয় দেখি দেখি…’ বাড়ি বলতে অফুরন্ত স্নেহছায়া, একের মধ্যে অনেক অন্যকিছু।সত্যিই মা না থাকলে বাড়ি থাকে নাকি! মাকে নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলেন কবি। মা জড়িয়ে থাকেন তাঁর সঙ্গে —
“কী আর দখল নেবে বলো
সবই বেদখল হয়ে আছে
*
আমি বলতে চাই কথা
ফুটোফাটা সামান্য আশ্রয়
*
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর
এক জামবাটি জীবনের ভাত
তাতে নুন লঙ্কা, একটু তেল ও পেঁয়াজ
কথায় কথায় প্রবচন, মঙ্গল কামনা
প্রাণখোলা হাসি,সাদা মন — –
আর আমৃত্যু কষ্টকথা তোমার”
কবিতা পাতায় উঠে আসে ডিজিটাল দেশের কথা আবার শুকিয়ে যাওয়া নদীর কথা ভেবে কান্না পায় কবির, মহাজীবনের কাছে জীবনের রহস্য বুঝে নিতে চান। এতো লেখা পড়বেই বা কে? তবু লিখে যেতে ইচ্ছে করে, হয়তো তাঁর মতোই কেউ অক্ষরে অক্ষরে ভিজে একদিন অন্তর্লীন হবে। শ্যাওলাধরা ভাঙা কার্নিস, ফাটাচটা পলেস্তারা, গোলাপী রোদ্দুর, আলো আলো আর আলোর জীবন দেখতে ইচ্ছে করে আজও। প্রকৃতি অপার, আর তাইতো দুকথা বলার জন্য লেগে-থাকা কাঙালপনা আমাদের সবার।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ‘মুদ্রা’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে বিদ্যুৎ হালদারের ‘কাব্যসংগ্রহ’। ১৯৮১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত বারোটি কবিতাগ্রন্থের সমস্ত কবিতা সংকলিত হয়েছে এই ‘কাব্যসংগ্রহ’-এ। এই গ্রন্থের ব্লার্বে লেখা হয়েছে — “বারোটি কবিতার বইয়ে পরিব্যাপ্ত তাঁর চারদশকের কবিতাযাপন। এতবছরের এই নিরন্তর পরিক্রমা মূলত জীবনের কথাই নানাভাবে, নানাভঙ্গিতে বলে। জীবনের বিচিত্র সন্তান এবং সৌন্দর্যকে কবিতার মুঠোয় ধরতে চায়। সেই জীবনভাষ্য স্বভাবতই সময়ের বাঁকবদলে ভেঙেচুরে এই নানা রকম আদল পেয়েছে। এই ‘কাব্যসংগ্রহ’-এ বাঁকবদলের রূপরেখাটি স্পষ্ট। অবশ্য পরিবর্তনের সত্ত্বেও বিদ্যুতের কবিতায় আমরা নির্ভুলভাবে চিনে নিতে পারি তাঁর নিজস্বতার চিহ্ন। তাঁর কবিতায় দেখি, পরিচিত জগৎ থেকে রহস্যময় বিশ্বপ্রকৃতি — সবকিছুর প্রতি এক মরমী দৃষ্টিপাত, এক প্রণত পর্যবেক্ষণ। তাঁর কবিতায় শুনি অনুভবের এক গভীর অথচ মৃদু, আত্মসংবৃত উচ্চারণ।” স্রোত ভেঙে ভেঙে এগিয়ে চলেন কবি বিদ্যুৎ হালদার। ইচ্ছে ছিল তাঁর দুঃখে-সুখে সরল সাদা স্বপ্নতরি অন্ধকারে পার করে দেওয়ার। বুঝতে পারেন ‘মানুষ একা, সবটা ফাঁকি’। দেশের মতন হৃদয়ও ভাগ হয়ে যায়। তবু লেখেন, লিখে চলেন, অক্ষরে অক্ষরে ভিজে অন্তর্লীন হন।
শীতরোদ্দুর খেলা করছে আমাদের পুতুলনগরে। কথার ঘরের চারপাশে সবুজ গাছগাছালির পাতায় পাতায় শিশির লেগেছে। আমি উল্টে চলেছি ‘আঁধারেই আলো খুঁজি রোজ’, কবি বিদ্যুৎ হালদারের নতুন কাব্যগ্রন্থ যা অন্ধকারের মধ্যে আলোর দ্যুতিময় ভাষ্য।
পথ চেয়ে বসে থাকি
অকুল পাথারে ভাসি
আঁকড়ে ধরি খড়কুটো গান
কী করে বাঁচাই বলো, আমি সাধারণ
আমাদের স্বপ্ন ছায়া শান্তিনিকেতন
গানের ভেলায় বেলা অবেলায়
প্রেমের পাশে প্রাণের আশে
চেতনার পাড় ভাঙে, কবি দেখেন। কবি দেখতে পান প্রতিদিন রাত্রিদিন বিভেদের বাজনা বাজে বাংলার গ্রামে,লাশ পড়ে আদিম উল্লাসে। ‘মানুষ মানুষ মারে কত অন্ধ হলে’। ঢেউ তো উঠবেই, পাড় ভাঙবে, ভেঙে ভেঙে জীবনেরই অস্তিত্ব জানায় সে। “নির্জন একক ভালো কিন্তু কতটুকু ভালো/ যার জ্বালা সেই বোঝে সজন হারালে।” এই আঁধারের মধ্যেই একা মানুষ, বোকা মানুষ গান ধরে, আলোর গান, চেতনার অন্ধকারে সুর বাজে, রঙের প্রলেপ লাগে। নরম রোদের আলো ছাদের কার্নিশে এসে পড়ে। মন ভালো নেই কবির। প্রকৃতিকে অচেনা মনে হয় আজ। বিদ্যুৎ চমকালে মা বলতো ভয় কী? বৃষ্টি নেমে সবই অনন্য শীতল। কথায় কথায় জাদুবৃষ্টি নামতো। মন ভালো হয়ে যেত মন ছুঁয়ে। আজ মা নেই, মন খারাপ সকাল বিকেল। মৃত্যু তাঁর কাছে গান হয়ে বাজে। বাবার চলে যাওয়ার পরে গানের সুরেই বাবা ফিরে আসতেন সংসারে, মার চোখ ভেজা ভেজা তখন। অখিল বন্ধুর গান বাজতো ঘরে, আজ শীতে মা নিজেই কুয়াশায় কুয়াশায় ধূসর সঙ্গীত, লতায় পাতায় গান শুনতে পান কবি। এই কাব্যগ্রন্থ এক অন্ধকার সময়ের চালচিত্র। অন্ধকার, ঘোর অন্ধকার। সর্বভুক অন্ধকার এলো। কাব্য মুখ ঢাকে, তাকে ঘিরে ধরে রঙ একটাই হয়তো বা রং নয় হতাশা ও শোক। তিলোত্তমাকে অত্যাচারিত হতে দেখেন কবি, শোকের পাথর সরিয়ে বাতি জেলে হেঁটে চলেন পথে। তিলোত্তমা তোমার আমার আমাদের অনিবার্য ব্যথার উপমা। ‘মহাকাব্য তিলত্তমা সম্মিলিত দ্রোহে/ স্বরে সুরে তুলি ও কলমে।’ কবিতা বাঁচার আগুন। দিশাহীন,ভবিষ্যৎহীন অন্ধকারের মধ্যে আলো খুঁজে চলেন কবি। তাইতো ঘুম থেকে উঠে রোজ ফুল এনে দেবেন কারো হাতে। ফুলের সৌরভে শোকতাপ ভুলে নৌকো ভাসাবেন। মুঠো মুঠো বীজ ছড়িয়ে দেবেন, বিভূতিভূষণ হয়ে কেউ তা ছড়িয়ে দেবে উঠোনে, শিশিরে শিশিরে ভিজে যাবে মন। ঘাসের নরম স্পর্শে হেঁটে যাব আমরাও সূর্যোদয় থেকে আর এক সূর্যোদয়ের দিকে!
ভরসা করি প্রাণে ধরি
মরুতাপ আগুন বৈশাখে
দাঁড়াবার জায়গা আছে পাশে
আমাদের প্রেমের রবীন্দ্রনাথে
নীতিহীন রাজনীতি ছড়িয়ে দিয়েছে বিষ। ভালো নেই, ভালো থাকা যায় না। রক্ততৃষ্ণা খুনোখুনি লাফিয়ে বেড়ায়, ঘর পড়ে, ছাই ওরে। ‘সকলেই বলে কালো — গানে গানে/তুমি যেন তবু বলো জলভরা মেঘ।’
ক্লান্ত স্বপ্নগুলো বাঁচতে চায়, ভেঙে ভেঙে গড়ি নিজের প্রতিচ্ছবি।
কবি তো পর্যটক। উঠে যান পাহাড়ে। দেখতে পান ছন্দে বর্ণে দুনিয়ার ভাস্কর্য অপরূপ আলো-অন্ধকারে পাথর থেকে পাথরে। কবির সঙ্গে আমিও দেখতে পাচ্ছি —
অনেক উঁচুতে ঘন্টা বাজছে গীর্জায়
বন-জঙ্গলের অন্ধকার ছুঁয়ে মেখে
এক সিস্টার একা নির্ভয়ে
উপরে উঠছেন যেন পরী উড়ে উড়ে,
আর কিছুক্ষণ পর শুরু হবে
প্রার্থনা সংগীত ঈশ্বরের
*
পাহাড়ের সাথে থেকে আমি
শিখে নিচ্ছি ঠিক পৃথিবীর উচ্চতায়
কোথায় কতটা অমৃত মানুষ
কবিকে লিখতেই হবে। বলতে না পারলে কথা লিখে রাখতে হয়। কোনদিন কেউ এসে শব্দে ছন্দে মেতে যায় যদি, জল মাটি ঘাস টুনটুনি চড়ুই এদের কত না না বলা কথা থাকে, সেই না বলা কথার কিছু কিছু হয়তো তারাও কবির লেখায় পেতে পারে। তবু কেন তিনি বলেন, বলার মতো কথা নেই আর। আসলে ব্যস্ত সময় এসে দূরত্ব বাড়িয়ে বসে মাঝে মাঝে। কেউ শোনার নেই, কবি ভাবেন তাঁর কথা মরমে পৌঁছায় না কারো। তাইতো তাঁর উপলব্ধি, ফাঁকা কথা রোজ রোজ অনেক হয়েছে, কথা দিয়ে কথা রাখা হোক।
কে তুমি সুজন আমাকে লেখাও
আমি তোমাকে দেখিনি
*
তুমি কে গো তুমি সেই মানস জননী
*
আমি ঘুমোলে জাগাও,বলো লেখো
আমি কষ্ট পেলে বিদ্রোহী হলে থামাও
বলো লেখো, সব শব্দ শব্দে গেঁথে রাখো
না লিখে পারি না তাই লিখি
এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি বড় মায়াময়। সময়স্মৃতির এক বিরাট ক্যানভাস। আমিও ভাবি এত আলো যদি এত অন্ধকার কেন। আমারও মাথা ঝিমঝিম করে, ধাঁধা লাগে চোখে। ঘরবাড়ি বোঝা মনে হয়, ইচ্ছে হয় ঘুরি পথে পথে। কিন্তু পথেরও তো মৃত্যু হয়, পথস্রষ্টা বুঝি দেখে চেয়ে চেয়ে। অন্যপথে অন্যথায় আমরা চলি গান সঙ্গে করে নিয়ে। সব ভুলে গেলে হয়তো ভালো থাকা যেত। দহন কমে না বলেই নির্জনতা খোঁজে একাকী মানুষ। পোড়ো বাড়িটাকে জাপটে ধরে সবুজ আগাছাগুলো আরো সবুজ হয়ে ওঠে। তাইতো কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় বৃষ্টি ঝরে, আলোর বৃষ্টি।
কাব্যগ্রন্থের ব্লার্বে লেখা হয়েছে —
আমাদের ঘরে — বাইরে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকারের ভিতর যখন আলো খোঁজ করতে করতে এক কবি লিখে রাখেন অকাল বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া অচেনা বসন্ত, তখন শব্দহীন নৈঃশব্দের পর্যটনে আলোর খোঁজ করে চলে প্রতিটি শব্দ। শব্দের ভিতরে যতিচিহ্নের আলো আর অন্ধকার মিশেমিশে এক নিখুঁত ছবির সন্ধান দেয় কবিতায়। ছবিকে কাহিনিও বলা যায়। বারোমাস, বাহান্ন সপ্তাহ, সাত দিন আর চব্বিশ ঘন্টার এই আলোর খোঁজ কখন কীভাবে কবিতা হয়ে ওঠে তা বিদ্যুৎ হালদারের এই কাব্যগ্রন্থে খুব সহজ, সরল, প্রাণবন্ত ছন্দে পরিষ্কার হয়ে উঠবে পাঠকের কাছে ।
সময়ের অন্ধকার থেকে আলোর মুখোশ সরিয়ে কবি লিখেছেন জীবনকাব্যের প্রতিটি নীরব অধ্যায়। মিলেমিশে যা এক উপন্যাসের রেখা আঁকে পঙক্তির ফাঁকে ফাঁকে।
আসলে কবি বিদ্যুৎ হালদারের কবিতা-ভাষা অনেক সহজ। তাঁর দেখার চোখ বহুদূর প্রসারিত। আমরা মগ্ন থাকি তাঁর শব্দে। সাহিত্যের পাঠ নিয়েছি তাঁর কাছে। তাঁর কন্ঠনিঃসৃত শব্দবন্ধ আজও বিভোর করে। তাঁর চোখ দিয়ে দেখেছি অনেক কিছু। আমাদের যাপিত জীবনের ছোট্ট ছোট্ট চিত্রকল্প কাব্যে উঠে আসে।
তোর কবিতা-আলোচনার ভাষা সুতীব্র কাব্যময়। পড়তে পড়তে সেই ছন্দে একেবারে বিভোর হয়ে যাই।…