১৯৩৯ সালে পক্ষাঘাত হয় কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রীর। স্ত্রী প্রমীলা দেবীকে সুস্থ করে তুলতে কাজী নজরুল ইসলাম নিজের জীবনটাকেই বাজী ধরেছিলেন। অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, কোনওটাই বাদ রাখেননি। তার সঙ্গে সাধুবাবা ও ফকিরদের পরামর্শও নিতেন। এক দরবেশের পরামর্শে এক সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত পচা পানাপুকুরে গা ডুবিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন একবার। তারপর তাবিজ নিয়ে ফিরেছিলেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীকে পরানোর জন্যে। এইসব অনিয়ম কবির শরীরে ও মনে ছাপ ফেলেছিল ভীষণভাবে।
নজরুলের কথা জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রথম খেয়াল করেছিলেন সুরকার নিতাই ঘটক। ১৯৪২ সালের মে মাসে রেডিওর এক অনুষ্ঠানের রেকর্ডিংয়ের সময় নজরুলের কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টি খেয়াল করেছিলেন নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা ও শাশুড়ি গিরিবালাও। চোখ এড়ায়নি কবির প্রতিবেশী বরদাপ্রসাদ গুপ্তেরও। কিন্তু এটিকে তেমন গুরুত্ব দেননি নজরুল, কেউ কিছু বললে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন।
১৯৪২ সালের ৯ জুলাই। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। রাতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা বেতারকেন্দ্রে শিশুদের এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নজরুল। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে হঠাৎ তার ঠোঁট হঠাৎ করে কেঁপে উঠল। আড়ষ্ট হয়ে উঠল জিভ। আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো কথা বলতে পারলেন না। এমন সময় নজরুলের পাশে ছিলেন বন্ধু প্রখ্যাত গীতিকার ও শিশু সাহিত্যিক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। রাত ১০টার দিকে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ই নজরুলকে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। সেদিন রাতে অসুস্থতার কারণে কিছুই খেতে পারেননি কবি। রাতে ঘুমও হয়নি তার, অনিদ্রায় বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেছেন সারারাত।
দেখা যাচ্ছে, স্নায়বিক কারণে কাজী নজরুল ইসলামের সম্পূর্ণরূপে বাকশক্তিরহিত হয়ে যাওয়া ধীরে ধীরে হয়েছিল। ডাক্তারি পরিভাষায় ইনসিডিয়াস অনসেট বলে একে। কলকাতা বেতারকেন্দ্রে তার চরম পরিণতি হয় ১৯৪২ সালে। সম্পূর্ণভাবে বাকশক্তি চলে যায়। ১৯৫২ সালের জুন মাসে নজরুলের চিকিৎসার সাহায্যার্থে বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে গঠিত হয় ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’। সেই সমিতিতে ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, কাজী আবদুল ওদুদ, অতুল গুপ্ত প্রমুখ। সেই সমিতির উদ্যোগেই ওই বছরের জুলাই মাসে নজরুলকে রাঁচির মানসিক হসপাতালে পাঠানো হয়। ওইবার হাসপাতালে ৪ মাস ছিলেন কবি। হাসপাতালে তাকে রাখা হয় ইউরোপিয়ান কটেজে। কিন্তু দীর্ঘ ৪ মাসেও তাঁর কোনো রোগ নির্ণয় করতে পারেননি চিকিৎসকরা। বলাবাহুল্য, সেখানে তাঁর শক থেরাপি (electroconvulsive therapy ) করেছিলেন চিকিৎসকরা। চলিতভাষায় বলত, ইলেকট্রিক শক দেওয়া। হারানো সুর সিনেমায় ডাক্তাররূপী উৎপল দত্ত যেরকম শক দিয়েছিলেন অ্যামনেশিয়ায় আক্রান্ত উত্তমকুমারকে।
অবশেষে ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসে নজরুলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় নজরুল নিরাময় সমিতি। সেই অনুযায়ী গঠন করা হয় মেডিকেল বোর্ডও। ওই বছরের মে মাসে স্ত্রী প্রমীলা দেবী, কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধসহ রকিবউদ্দিন আহমেদ ও নজরুলকে লন্ডনে পাঠানো হয়। ৮ জুন তারা লন্ডনে পৌঁছান।
লন্ডনের হাসপাতালে নজরুলের চিকিৎসায় ৩ প্রখ্যাত চিকিৎসক রাসেল ব্রেইন, ম্যাককিংকা ও উইলিয়াম সারগ্যান্টকে নিয়ে গঠিত হয় মেডিকেল বোর্ড। মেডিকেল বোর্ড শেষ পর্যন্ত নজরুলের রোগ নির্ণয় করতে পারে। তাঁর মস্তিষ্কে এয়ার এনসেফালোগ্রাফি এক্সরে করে দেখা যায়, মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা জানান, নজরুলের মস্তিষ্কে একধরনের স্ট্রোক হয়েছে। এই রোগটি দুরারোগ্য।
ম্যাককিংকা এ সময় নজরুলের মাথায় ম্যাককিস্ক সার্জারি করার বিষয়ে অভিমত দিলেও ডা. রাসেল ব্রেইন অপারেশনের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন।
তখন নজরুলের চিকিৎসার রিপোর্ট পাঠানো হয় অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, জার্মানির বনসহ ইউরোপের বিখ্যাত চিকিৎসকদের কাছে। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন অধ্যাপক রোয়েন্টগেনসমেত বেশ কয়েকজন চিকিৎসকই ম্যাককিস্ক অপারেশনের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন।
সে বছরের ডিসেম্বর মাসে নজরুলকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ভিয়েনাতে। সেখানে বিখ্যাত স্নায়ু চিকিৎসক ও সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. হানস হফের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন নজরুল। ৯ ডিসেম্বর নজরুলের মস্তিষ্কে সেরিব্রাল অ্যানজিগ্রাফি এক্সরে করে বলা হয়, নজরুল ‘পিকস ডিজিজ’ নামের নিউরনঘটিত বিরল এক মস্তিষ্কের রোগে ভুগছেন।
বর্তমানে এই রোগের নাম ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া (FTD)। এই রোগের সঙ্গে অ্যালজাইমার্স ডিজিজের অনেকটা মিল আছে। পার্কিনসনস ডিজিজও কিছুটা কাছাকাছি। কিন্তু পার্কিনসনস রোগে কথা বন্ধ হয় না, Slow slurred speech হয়। তবে পার্কিনসনস ডিজিজে হাতে ট্রেমর বা কম্পন হয়, নজরুলেরও শোনা যায় হাত কাঁপত।
পিকস ডিজিজের কারণে মস্তিষ্কের সম্মুখ ও পার্শ্ববর্তী অংশগুলো সঙ্কুচিত হয়ে যায় (Atropy of frontal and temporal lobe)। তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে সিটি স্ক্যান ও এম আর আই দূর অস্ত।
ডা. হফ বলেন, ‘রোগটি এখন এতদূর অগ্রসর হয়েছে যে এই পরিস্থিতিতে কোনো চিকিৎসা বর্তমান পৃথিবীতে নেই।’ এ সময় কবির রিপোর্ট জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নেও পাঠানো হয়। সেখানকার চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে একই অভিমত ছিল। অর্থাৎ নজরুলের চিকিৎসা অসম্ভব।
এখন দেখা যাক পিকস ডিজিজ ছাড়া তাঁর অন্য কিছু হতে পারত কিনা। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে ডিফারেন্সিয়াল ডায়াগনোসিস। কলকাতার নিউরোসার্জন ডা. অশোক বাগচী কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন তাঁর সাধ্য অনুযায়ী। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতাহেতু তাঁর পক্ষে প্রপার ডায়াগনোসিস করা সেযুগে সম্ভব ছিল না।
পিকস ডিজিজ (Pick’s disease), এখন ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া (Frontotemporal Dementia – FTD) নামে বেশি পরিচিত। তার ডিফারেনশিয়াল ডায়াগনোসিস করতে হলে অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ এবং মানসিক রোগের সাথে তার পার্থক্য নির্ধারণ করা হয় আজকাল।
Alzheimer’s Disease (AD) :
সবচেয়ে কাছাকাছি সিম্পটমের রোগ।
AD-তে সাধারণত স্মৃতিভ্রংশ বেশি প্রাধান্য পায়, কিন্তু Pick’s disease-এ ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ এবং ভাষা সমস্যা আগে দেখা যায়।
Vascular Dementia :
স্ট্রোক বা রক্তনালির সমস্যা থেকে সৃষ্টি।
MRI/CT স্ক্যানে ভাসকুলার পরিবর্তন দেখা যায়।
Lewy Body Dementia :
হ্যালুসিনেশন, পারকিনসনিয়ান লক্ষণ ও ফ্লাকচুয়েটিং কগনিশন থাকে।
Pick’s disease-এ সাধারণত হ্যালুসিনেশন কম থাকে।
Primary Progressive Aphasia (PPA) :
ভাষা-সম্পর্কিত FTD-এর একটি ধরন, Pick’s disease-এর ভাষা বৈচিত্র্যের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে।
Progressive Supranuclear Palsy (PSP) :
শারীরিক চলাফেরায় সমস্যা, চোখের গতির সমস্যা এবং নির্বাকতা।
Pick’s disease-এর behavioral variant-এর সাথে কিছু মিল থাকতে পারে।
Corticobasal Degeneration (CBD) :
একপাক্ষিক মোটর সমস্যা, অ্যপ্রাক্সিয়া ও কগনিটিভ ঘাটতি।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে Pick bodies অনুরূপ প্যাথোলজি থাকতে পারে।
Major Depressive Disorder (with Pseudodementia) :
বয়স্ক রোগীদের মধ্যে হতাশা এবং স্মৃতিভ্রংশের মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে।
Normal Pressure Hydrocephalus (NPH) :
ট্রাইয়াড : গেইট সমস্যা, ডিমেনশিয়া, ইউরিন ইনকন্টিনেন্স।
নিউরোইমেজিং সাহায্যে শনাক্ত করা যায়।
Psychiatric Disorders (e.g., Schizophrenia, Bipolar Disorder):
মাঝে মাঝে ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন বা ভাষাগত সমস্যা থাকায় বিভ্রান্তি হতে পারে।
MRI/CT স্ক্যান : ফ্রন্টাল ও টেম্পোরাল লোবের এট্রোফি।
Neuropsychological testing : এক্সিকিউটিভ ফাংশনের দুর্বলতা ও ভাষার ঘাটতি।
PET/SPECT : মেটাবলিক কম সক্রিয়তা দেখা যায় ফ্রন্টোটেম্পোরাল অঞ্চলে।
বলাবাহুল্য এই পরীক্ষাগুলির কোনওটাই সেযুগে ছিল না। তখন এক্স রে, সেরেব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি, এয়ার এনসেফালোগ্রাফির মতো পরীক্ষা ছিল। সিটি স্কানও তখন আসেনি, এম আর আই তখন দূর অস্ত। লন্ডনের চিকিৎসকরা নজরুলের চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের ফি নিলেও ইউরোপের চিকিৎসকরা কোনো ফি গ্রহণ করেননি। ১৯৫৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর এক রকম বিনা চিকিৎসায় রোম থেকে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। অসুস্থ হওয়ার পর জীবনের বাকি ৩৪ বছর ১ মাস ২০ দিন নির্বাক অবস্থাতেই ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তখন তাঁর কী চিকিৎসা হত, কে তাঁকে নিয়মিত দেখতেন, তা জানি না।
তবে একটা রোগের কথায় কেউ আমলই দেননি। স্ত্রীর দুরারোগ্য পক্ষাঘাত নিয়ে কবি যখন শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখনই তাঁর জীবনে আর এক বিপর্যয় নেমে আসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণে। তিনি ছিলেন বিদ্রোহী কবির ফ্রেন্ড ফিলোজফার কাম গাইড। এই দুটি ঘটনা তাঁর পক্ষে হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছিল। তিনি তখন থেকেই উচ্চ রক্তচাপ ও ট্রানসিয়েন্ট ইস্কিমিক অ্যাটাকের (TIA) শিকার হচ্ছিলেন। এটাও এক ধরনের সেরিব্রোভাসকুলার অ্যাক্সিডেন্ট, তবে ক্ষণস্থায়ী। পরে এটার প্রবল অ্যাটাক হল কলকাতা বেতারকেন্দ্রে ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই রেকর্ডিং-এর দিন। সম্ভবত তাঁর সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস বা সেরিব্রাল এমবোলিজম হয়েছিল। মস্তিষ্কের বামদিকের ফ্রন্টাল লোবের ব্রোকাস এরিয়ায় রক্তসঞ্চালনের অভাবে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই অঞ্চলটিই বাকশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই কবি তৎক্ষণাৎ বাকশক্তি হারান। তাঁর পক্ষাঘাত খুবই নেগলিজিবল হলেও বাকশক্তি সম্পূর্ণভাবে অন্তর্হিত হয়। এম আর আই বা নিদেনপক্ষে সিটি স্ক্যান তখন না থাকায়, রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা যায়নি। ক্যারোটিড অ্যানজিওগ্রাফি তখন প্রাথমিক স্তরে। হয়ত অ্যাসপিরিন ও ক্লোপিডোগ্রেলের মতো ওষুধ তাঁর দরকার হত। অ্যাসপিরিন ১৮৯৭-এ আবিষ্কৃত হলেও তখন তা ব্যবহার করা হত বাতের (Arthritis) মত অসুখে। এর ব্লাড-থিনার প্রপার্টির কথা তখন অজানা ছিল। ক্লোপিডোগ্রেল আবিষ্কৃত হয় ১৯৮২তে। তাই এটা তাঁকে দেওয়ার কথা বাতুলতামাত্র। বিধানচন্দ্র রায় সম্ভবত এই দিকটার কথা ভাবতে বলেছিলেন, নিউরোলজিস্টরা তাঁর মতটাকে গুরুত্ব দেননি।