বিদ্রোহ, প্রতিবাদ আর আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান খেজুরি। জন্মলগ্ন থেকেই বিদ্রোহ আর আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূলবর্তী খেজুরি। ১৮০৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত নুন শ্রমিকদের বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে খেজুরির যে সংগ্রামী আন্দোলনের সূচনা, পরবর্তীকালে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, বিলেতি বর্জন, লবণ সত্যাগ্রহ, আগষ্ট বিপ্লব বা ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী জমিদারি প্রথা বিলোপ ও তেভাগা আন্দোলনে বারবার উঠে এসেছে খেজুরির জন্মসিদ্ধ প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী মনোভাব।
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও খেজুরির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। স্বাধীনতা আন্দোলনে খেজুরির অগ্রণী ভূমিকার জন্য খেজুরিকে ‘বাংলার হলদিঘাট’ বলে অভিহিত করেছিলেন চারণকবি মুকুন্দ দাস।
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও খেজুরির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
১৯২১ সালে খেজুরির কলাগেছিয়ায় জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপন ছাড়াও ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো ‘আন্দোলনে খেজুরিতেই থানা দখল করে গঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম জাতীয় সরকার। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের আগে টানা তিন মাস জাতীয় সরকারের দ্বারা স্বাধীন ভাবে পরিচালিত হয়েছিল খেজুরি। স্বাধীনতা আন্দোলনে খেজুরিতে ক্ষুদিরাম বসু, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আগমন ছাড়াও স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রসারিত করতে খেজুরিতে এসেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও চারণকবি মুকুন্দ দাস। খেজুরির আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক প্রবালকান্তি হাজরা’র ‘নিমক মহালের মলঙ্গি বিদ্রোহ’ প্রবন্ধে জানা যায়, ১৮০৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে কোম্পানির লবণ শ্রমিকদের নায্য মজুরি আর কাজের সময় কমানোর দাবিতে দল হাজারের বেশি লবণ শ্রমিক জোটবদ্ধ হয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে খেজুরির মাটিতে প্রথম বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন। ইতিহাসে যা ‘মলঙ্গী বিদ্রোহ’ বলে পরিচিত।

খেজুরির প্রবীণ সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক ‘খেজুরি’ পত্রিকার সম্পাদক পার্থসারথি দাশের লেখা ‘খেজুরির স্বাধীনতা সংগ্রাম ‘প্রবন্ধ সূত্রে জানা যায়, ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ প্রশাসনের বঙ্গভঙ্গ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই খেজুরিতে সর্বপ্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। সেই সময় খেজুরির হেঁড়িয়া থানার অধীন জুখিয়া আর ঠাকুরনগর ও ভগবানপুর থানার মুগবেড়িয়াতে অনুশীলনী সমিতির হয়ে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর নিয়মিত যাতায়াত ছাড়াও কুস্তির আখড়া তৈরি করে ছোরা ও লাঠিখেলার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বদেশী যুবকদের অনুশীলনী সমিতির হয়ে মাতৃভূমির মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত করার কাজে ব্রতী ছিলেন। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর’ বইয়ের অন্যতম লেখক ও মুগবেড়িয়া কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ হরিপদ মাইতির লেখায় জানা যায়, ১৯২১ সালে খেজুরির কলাগেছিয়া গ্রামে স্থাপিত হয়েছিল বঙ্গদেশের প্রথম জাতীয় বিদ্যালয়। ১৯২১ সালে গান্ধীজির বিদেশি বর্জন আন্দোলনে উত্তাল খেজুরিতে ব্রিটিশ অনুমোদিত স্কুল ছেড়ে দলে দলে কলাগেছিয়া জাতীয় বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিল ছাত্রছাত্রীরা।
১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেস সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। মেদিনীপুর সফরকালে সুভাষচন্দ্র খেজুরির জরারনগর গ্রামবাসী অখন্ড মেদিনীপুরের জাতীয়তাবাদী বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী ও রাষ্ট্রপতি পদক পাওয়া জাতীয় শিক্ষক প্রয়াত ঈশ্বরচন্দ্র প্রামানিকের আন্তরিক আবেদনে ১৯৩৮ সালের ১২ এপ্রিল সুভাষচন্দ্র খেজুরির জরারনগর গ্রামে আসেন। জরারনগরে ওই দিন সুভাষচন্দ্র জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে এক জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ব্রিটিশ পুলিশের দমন পীড়নে অত্যাচারিত খেজুরিবাসীর দুর্দশা স্বচক্ষে দেখতে ১৯৪৬ সালে গান্ধীজি হিজলি টাইডাল ক্যানাল ধরে জলপথে নৌকা যোগে খেজুরির কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন। কৃষ্ণনগরে গান্ধীজির উপবেশন করা আসন ও সুভাষচন্দ্রের উত্তোলিত জাতীয় পতাকা আজও খেজুরির সুভাষ শিল্প ভারতীর সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।