‘এসো সুসংবাদ এসো’- উচ্চরিত প্রার্থনার কবি
নিতান্তই অকালবয়সে
চলে গেল ঠিক যেদিন ভোর-ভোর ঘোরে
বাজিয়ে আলোর গানে বিদায়-ভৈরবী
সেই দিনই প্রথম
মনে হল, কবিতার সব চাওয়া ভুল। পন্ডশ্রম।
সে আজ অনেক কাল। সেই থেকে আজও আছি বসে।
গোপন দুরাশা: হবে সফল প্রার্থনা
কোনো একদিন।
ফের বুঝি, মিথ্যে দিন গোনা।
দেখি, ঘোর দুঃসময় কেবলই ঘনাচ্ছে চারপাশে!
এক কণা বৃষ্টি নেই; না আষাঢ়ে, না শ্রাবণমাসে-
সব আশা বিফলে!
সব-কিছু ছাপিয়ে তপ্ত দুঃসংবাদে ঝুলি ওঠে ভ’রে।
‘সত্য যে কঠিন’- জানি। কিন্তু তাই বলে
এতটা কঠিন!
(ভাস্কর চক্রবর্তীকে মনে পড়ছে)
‘কেমন আছে এই পৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতাটি পড়তে পড়তে আমারও মনে পড়ছে কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়কে। যে সময় পৃথিবী ভালো নেই একটুও, যখন এক মারণ ভাইরাস পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, যখন আমরা পরস্পর পরস্পরের থেকে একটা বিরাট সামাজিক দূরত্ব তৈরি করেছি, যখন আমরা প্রতিটি মুহূর্ত ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকার কথা ভাবছি, তখনই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়। হয়তো পৃথিবী গ্রহের বাইরে থেকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন ‘কেমন আছে এই পৃথিবী’। দীর্ঘদিন ধরে কবিতাযাপন করেছেন তিনি। লিখেছেন অনেক কবিতা।
আমার খুব প্রিয় তাঁর লেখা একটি গদ্যে তিনি লিখেছিলেন —
“প্রতিটি মানুষ যদি দুটি করে জীবন পেত, আক্ষেপ শব্দটি অভিধান থেকে বোধ করি হতো বর্জিত। আমার এই জীবন শুধুই আক্ষেপের। গান গাইতে পারতাম, গায়ক হইনি। ম্যাজিক শিখেছি, কাউকে সেভাবে দেখাইনি। ছবি এঁকেছি, ধাঁধা নিয়ে পড়ে থেকেছি, অঙ্কের মজায় ডুবে থেকেছি, গো-গ্রাসে পড়েছি হাতের কাছের বই, কিন্তু কিছুই হয়ে উঠিনি। সাগরদা আমায় সংগীত-নাটক সমালোচক করে দিয়েছেন, রমাপদ চৌধুরী করেছেন ফিচার-রাইটার, বিমল কর দায়িত্ব দিয়েছেন গ্রন্থ-সমালোচনার, বাদল বসু ডেকে নিয়েছেন বিজ্ঞাপন-লেখক হিসেবে — সংসারে ধার কমেছে, শৃঙ্খলা এসেছে এইমাত্র। কিন্তু যে কাজ করার দায়িত্ব আমি স্বেচ্ছায় বরণ করেছিলাম, যে কাজ সম্পূর্ণভাবে আমার একলার, যে-কাজ করে উঠতে পারলে জীবনের অস্তিত্ব হয়ে উঠত অর্থময়, সে-কাজ আমার কোনোকালেই মন দিয়ে করা হয়নি।”এই প্রসঙ্গে একটি কবিতার কথা বলেছিলেন। কবিতাটির নাম ‘চাবুক’, বেরিয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকায়। প্রসঙ্গত বলি, যখন থেকে কবিতা বুঝতে শিখেছিলাম পড়তে শিখেছিলাম, দেখেছিলাম শারদীয় দেশ, আনন্দবাজার এবং অন্যান্য কবিতার পত্রিকা মানেই প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় কবিতা থাকবেই। একবার দেখে নিই ‘চাবুক’ কবিতাটি —
“পুরনো কবিতা চোখ ঠার দিয়ে ডেকে যায়, বলে —
ভালো আছো?
শাদা পাতাগুলি অবিকল শাদা থেকে যায়, বলে-
ভালো আছো?
রক্তে কে জানো হু-হু শূন্যতা এঁকে যায়, বলে- ভালো আছো?
ঘুমন্ত মুখে আলো ফেলে এসে দেখে যায়, বলে-
ভালো আছো?”
শাদা পাতাগুলি অবিকল শাদা থেকে যায়নি কিন্তু। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত এই আত্মজীবনীর (তবু কবিতা) পরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনেকগুলি গ্রন্থ। পেয়েছি ‘অপেক্ষার রঙ’, পেয়েছি ‘জল’, ‘তবু দগ্ধ-করা’, ‘শো-কেসের ফুলবাবু’, ‘এত মায়া এত মোহ’, ‘কেমন আছে এই পৃথিবী’ এবং ৮০ বছরের জন্মদিনে পেয়েছি সিগনেট প্রেস প্রকাশিত ‘কবিতা সমগ্র’। পাশাপাশি পেয়েছি দে’জ থেকে প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা। নিজের কবিতার নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,
‘একটি কবিতা কীভাবে তৈরি হয়ে ওঠে, তার পুরো রহস্য বোধ করি কোন কবিই জানেন না। একটা অস্পষ্ট আদল থাকে মাথায়, সেটা কখনো বিচ্ছিন্ন পঙক্তি হয়ে ফুটে ওঠে কখনো-বা পুরো একটি কবিতাও হয়ে উঠতে পারে। প্রতিমুহূর্তের অভিজ্ঞতা, দৃশ্য, ছবি, ঘটনা, সম্পর্ক, সংলাপ ভেতরে-ভেতরে কাজ করতে থাকে। সেটা কখন, কীভাবে, কী কবিতা হয়ে বেরুবে আগে থেকে আঁচ করা যায় না আবার শুরু করার পর লেখার গতি অন্যদিকে নিয়ে গেছে রচনাকে, চকিত বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠেছে অভাবিত শব্দ-উপমা- চিত্রকল্প-এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কবিতার নির্মাণ-রহস্য আমার বহু কবিতার প্রিয় বিষয়।’
আর এই কথা মনে রেখেই বোধহয় সৃষ্টি করে গেছেন একের পর এক কবিতা। উচ্চারণ করেছেন —
‘দশ আঙুলে বাঁধা পড়ে গেছে দশটি দিগন্ত
একটি যুগ, এক যুগান্ত, অনন্তকাল।
আমরা ছুঁয়ে আছি পরস্পর পরস্পরকে।
একটি হাত ছুঁয়ে থাক অন্য একটি হাতকে।’
বিয়ের অ্যালবামের ছবিটা মনে পড়ে যায়। বিয়ের মন্ত্রটাই যেন কবিতা হয়ে ওঠে। তিনি মনে করতেন —
‘বিচ্ছিন্ন পঙক্তিতে নয়, কবিতার সামগ্রিকভাবে একটি আবেদন থাকা যে জরুরী, অর্থাৎ সব-মিলিয়ে কবিতার মধ্য দিয়ে একটি দৃশ্য, বার্তা কিংবা অভিজ্ঞতাকে যে পৌঁছে দিতে হবে কবিকে একথা আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। সেই দৃশ্য, সেই বার্তা, সে অভিজ্ঞতা বিশেষ একটি কবির নিজস্ব দৃষ্টিকোণের প্রতিফলন, সে-কথাও যেন বোঝা যায়। মামুলি কথা কবিতার কথা হতে পারে না। নতুন কবিতাকে হতে হবে যথার্থই নতুন।’
তাই প্রতিমুহূর্তে কবিতাকে নতুনভাবে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন কবি।কোন্ কথা যে বলার ছিল শব্দে শব্দে জুড়তে জুড়তে। হাত থেমে যায়, আবার কিছুক্ষণের জন্য তা ভাসিয়ে রাখে, আবার কিছুটা ঘোর অতলে পৌঁছে যায়। নতুন স্রোতে হাত-পা ছুঁড়তে তাঁর ইচ্ছে করে।কবিতায় বলেন-
‘সকাল হলে তাকাই। দেখি,
অন্যমনে ডাঙার প্রান্তে
নিজের ছবি দেখছি ঝুঁকে-
মিথ্যে- হওয়া সেই মুহূর্তে!’
কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পরে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘হরপ্পা’র বৈদ্যুতিন যে গ্রন্থ ‘মহালয়ার জাতক’ নামে প্রকাশ পেয়েছে তাতে সম্পাদক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের সূচনাটি কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে একটি অসামান্য রচনা। কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘হরপ্পা’র পত্রিকার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সৈকতদার লেখা থেকে জানতে পারি শারীরিক সমস্যা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল। জীবনের শেষ এক মাস অনিশ্চয়তা নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। সৈকতদার লেখাতে আছে — ‘শেষবার বাড়ি ফেরার পর যখন আমফান ঝড়ের তাণ্ডবে চারপাশে সকলে দিশেহারা তখন তিনি বোধহয় শুনতে পাচ্ছিলেন অশেষের ডাক-
হাওয়া এসে শুনিয়ে যায় অচেনা স্বর।
চমকে উঠে চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখি
বিশাল কালো স্তব্ধ আকাশ মাথার উপর।
তারপর একসময় ঝড় থেমে যায়, থেমে যায় প্রকৃতির প্রলয় নাচন। নিষ্প্রদীপ অবরুদ্ধ কলকাতা যখন তাণ্ডবের পর স্বাভাবিক হতে লড়াই চালাচ্ছে ঠিক তখনই থেমে গেল কবি প্রণবকুমারের যাবতীয় যুদ্ধ, ভেঙে পড়ল রোগের বিরুদ্ধে যাবতীয় প্রতিরোধ। সে দিনটা ছিল ২২শে মে ২০২০।”
১৯৩৭ সালে জন্ম কবি প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর জন্ম বেড়ে-ওঠা এবং শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন সবই কলকাতা শহরে। এই কবিকে জানতে গেলে বুঝতে গেলে ১৯৮০ সালে দেশ সাহিত্য সংখ্যার তাঁর আত্মজীবনীমূলক ‘তবু কবিতা’ শীর্ষক দীর্ঘ লেখাটি পড়তে হবেই। আসলে কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন শক্তিমান গদ্যকার। অসামান্য তাঁর গদ্যশৈলী। দীর্ঘদিন ‘দেশ’ পত্রিকায় কবিতা লেখার পাশাপাশি করেছেন পুস্তক-পর্যালোচনা, সংগীত নিয়ে আলোচনা। তাঁর সম্পাদনায় বেরিয়েছে টেনিদা সমগ্র। তাছাড়া আরও অনেক ছদ্মনামে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন নানা ধরনের বই।
মামা বাড়িতে থেকেছেন অনেকদিন। ঠিকানা ২৪ বি নূর মহম্মদ লেন, কলিকাতা-৯। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর বড়ো মামার বড়োছেলে, মেজমাসীর ছোটোছেলে ছিলেন দেবদাস পাঠক, যাঁকে তিনি রাঙাদা বলতেন। এই বাড়িতেই কেটেছে তাঁর আদিতম রচনার সময় থেকে শুরু করে চাকরি জীবনের গোড়ার দিক। তাঁর লেখা থেকে জানতে পারি —
“আমার বাল্য ও কৈশোর কেটেছে দু’রকম পরিবেশে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি নিত্য অশান্তিময় এক পারিবারিক পরিবেশ। পড়াশোনার অনুকূল আবহাওয়া ছিল না আমার পিতৃগৃহে। মাঝে- মাঝেই মামা বাড়িতে চলে আসতাম আমরা। একেবারে উলটো পরিবেশ সেখানে। প্রচুর বই, পত্র-পত্রিকা, গ্রন্থাবলী, সাহিত্য নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, রবীন্দ্রনাথের গান। যেমন খুশি পড়ো, লেখো, গান গাও, আঁকো, আবৃত্তি করো, উৎসাহদাতার অভাব নেই । মামাবাড়ির এই পরিবেশ আমাকে ছোটবেলা থেকেই গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল।”
‘ঊষা’ নামের একটি দৈনিক কাগজ তাঁর মামা বাড়িতে আসত। যখন তিনি ক্লাস সিক্সে পড়েন তখন সেই পত্রিকাতে তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন একটি জ্বালাময়ী পদ্য। ‘ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিয়ে লেখা সমিল এক ছেলেমানুষি’। ছাপা হয়। কিন্তু মনের ভিতরে ছিল উত্তেজনা আর ভয়। নিজের বাড়িতে কাউকে দেখান নি, মার খাবার ভয়ে। একদিন ‘দেশ’ পত্রিকার ঠিকানা পাঠিয়ে দিলেন একটি লেখা ‘দেওঘরে কটা দিন’। বহুদিন কেটে গেলেও যখন লেখাটা বের হচ্ছিল না, যখন তিনি হতাশ হয়ে পড়ছিলেন, তখনই ঘটল সেই আশ্চর্য ঘটনা।১৯৫২ সাল, একদিন আনন্দবাজারে দেখলেন ‘দেশ’ পত্রিকার বিজ্ঞাপনের তাঁর নাম জ্বলজ্বল করছে। ।তারপর একদিন আলোক সরকার ও দীপঙ্কর দাশগুপ্ত তাকে ডেকে পাঠান
প্রশংসা করেন তাঁর কবিতার। বলেন তাঁর কবিতায় নাকি অমিয় চক্রবর্তীর প্রভাব রয়েছে। এই কথাই প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়কে অন্য জগতে নিয়ে গেল। কবিতার বইয়ের তাক উজাড় করে পড়তে শুরু করলেন।রাঙাদার কাছে আসতো সিগনেট বুক শপ-এর ‘টুকরো কথা’। সিগনেটে খুঁজে পেলেন তিনি স্বপ্নলোকের চাবি। তারপর কৃত্তিবাস।তখন তিনজন সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দীপক মজুমদার আনন্দ বাগচী। আনন্দ বাগচী তাঁর কাছ থেকে একটি সাত লাইনের কবিতা নিয়ে গেছিলেন কৃত্তিবাসের জন্য। আসলে সাক্ষাৎ আলাপের নিমন্ত্রণ এসেছিল কলেজের দেওয়াল পত্রিকায় লেখা চাওয়ার দৌলতে।কৃত্তিবাস পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় তার সেই কবিতা ছাপা হয়। তাঁর ভাষায় বলতে হয়- “সাতটি লাইন সাত রাজার ধন হয়ে এল আমার জীবনে।” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদারের সঙ্গে তারপর তিনি হয়ে উঠেছিলেন কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর অন্যতম। সম্পাদকমণ্ডলীতে জায়গা পেলেন। পরে সহযোগী সম্পাদক হয়েছিলেন। কৃত্তিবাসের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় তরুণতর এবং সমসাময়িক সকলের সঙ্গে। কৃত্তিবাস থেকেই প্রথম বেরিয়েছিল তার কবিতার বই, নাম ‘অতলান্ত’। শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ বেছে দিয়েছিলেন কবিতাগুলো। তারপর রেডিও থেকে ডাক পান, পরিচয় হয় প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ‘পূর্বাশা’য় লেখার মাধ্যমে। বিষ্ণু দে-র সঙ্গেও পরিচয় হয় । বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ডাকে লেখা পাঠিয়েছেন, ছাপা হয়েছে। কৃত্তিবাস পত্রিকা পৌঁছে দিতে আলাপ হয়েছে সাগরময় ঘোষের সঙ্গে। ১৯৫৬ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে শারদীয়া সংখ্যা দেশ ও আনন্দবাজার পত্রিকার লেখক তিনি।
তাঁর জীবনের গল্প পড়তে পড়তে অবাক হচ্ছিলাম। আসলে এমন একটা সময়ে প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায় কবিতা চর্চা করেছেন সেই সময় বাংলা সাহিত্যকে শাসন করছেন যাঁরা তাঁরা আমাদের কাছে সাহিত্যের মহারথী। বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী এরা তখন দেশ আনন্দবাজারের সাথে যুক্ত। এঁদের সান্নিধ্য পেয়েছেন প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়। আনন্দবাজার পত্রিকায় অঙ্কের মজা নিয়ে অদ্ভুত ফিচার লিখেছিলেন তিনি ‘বুদ্ধির্যস্য’। মাসিক আনন্দমেলায় ধাঁধা করার ভার তিনি পেয়েছিলেন। পারিবারিক জীবনে বহু বিপর্যয় নেমে এসেছে। উদয়অস্ত রোজগারের নানান পথ বেছে নিয়েছেন। বিয়ের পরবর্তী সময়ে তিনি কিছুটা ধাতস্থ হন।স্ত্রীর সম্পর্কে লিখেছেন, —
‘কবিতা লেখাতেই যে আমার সব থেকে বড়ো তৃপ্তি, সব-কাজের ওপরে যে এই ঐশী ক্ষমতার অনুশীলন, এ-কাজেই যে জীবনের সব-থেকে বড়ো সম্মান, তাঁর এমনতর নানা ধারণার কথা নানাভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। নিজের চাহিদাকে সঙ্কুচিত রেখে, পার্থিব স্বাচ্ছন্দ্যকে বড়ো করে না-তুলে আমাকে অন্যভাবে অবসর দেবার চেষ্টা করেছেন।’
১৯৫৫-এ ‘অতলান্ত’ নামক কাব্যগ্রন্থের পর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে ১৯৭৭ সালে, নাম — ‘এসো হাত ধরো’। আসলে দীর্ঘ সময় লেগেছে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেতে। আসলে মাঝখানে অনেক দিনের শূন্যতা ছিল। কবিতার বইটির নামও দিতে চেয়েছিলেন অনেক দিনের শূন্যতা। ‘এসো হাত ধরো’ ছিল নির্বাচিত কবিতার সংকলন।
‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় কবি সুজিত সরকার কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। মূল্যবান একটি সাক্ষাৎকার এটি। দীর্ঘসময়ে প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ সংখ্যা খুব কমই, এই প্রসঙ্গে সুজিত সরকারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা আমার নিজেরই ঔদাসীন্য। আমার লেখা হারিয়ে যায়। নিজের বই সম্পর্কে আমি খুব একটা ধারাবাহিকভাবে ভাবিনি। কবিতা লিখতে হবে- এটা যেমন আমার কাজ, বের করার ব্যাপারটাও আমাকেই ভাবতে হবে… সেভাবে ভাবা হয়নি। একেবারে প্রথম দিকে অবশ্য ভেবেছিলুম। তার পেছনেও অবশ্য অন্য একটা ছেলের তাগিদ ছিল। সে-ই প্রথম কাব্যগ্রন্থের জন্য টাকা-পয়সা দিয়েছিল। তাছাড়া, বই যে নিয়মিত বের করে যেতে হয়, এই ভাবনাটা আমার মাথায় কখনো আসেনি।’এই সাক্ষাৎকার যখন নেওয়া হয় তখন অবশ্য প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা কিংবা নির্বাচিত কবিতা অথবা কবিতা সমগ্র বেরোয়নি।এই সাক্ষাৎকারে তাঁর একটি কবিতা পাই ‘বর্ণপরিচয়’। প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের নিজের খুব প্রিয় কবিতা —
‘আমার সমস্ত বর্ণমালা আমি তোমাকে দিলাম,
তুমি অন্যভাবে শুরু করো।
ইচ্ছে হয় রাখো, নইলে ছুঁড়ে ফেলে দাও একটানে,
দুমড়ে,মুচড়ে, ভেঙেচুরে
নিতান্ত তোমার করে নাও।
প্রতিটি বর্ণের সঙ্গে মিশে ছিল
আমার নিজস্ব বোঝাপড়া,
আনন্দ এবং দীর্ঘশ্বাস।
একান্ত গোপন কিছু অভিজ্ঞতা, অহংকার, স্মৃতি,
অভিমান-পরাজয়
কিছু-কিছু।
কিছু ব্যর্থতার গ্লানি আর কিছু সফল প্রণয়।
তুমি নিজস্ব পছন্দের তাকে রাখ কিংবা ছুঁড়ে ফেলে দাও
যাই করো,
রেয়াত করো না।’
এই কবির সবসময়ই মনে হয়েছে, তিনি তখনই লিখবেন, যখন তাঁর ভিতরে বলবার মতো কথা জমে উঠবে।’পাথরের চোখ’ নামে একটি কবিতা পড়েছিলাম। বেশ অন্যরকমের। যেখানে কবি লিখেছিলেন —
“যে অন্ধতা নিরুপায় ব্যাধি, তার শুশ্রূষা তোমার বাঁদিকের পাথরের চোখ।
তুমি তাকে সহজ ভাবোনি।”
যার সামনে খোলা ছিল অর্ধেক পৃথিবী, সেই অক্লেশে ভুলে যায় সমস্ত নিরুদ্ধ অভিমান। অবলীলায় খিল খিল হেসে উঠে চারিদিক কাঁপিয়ে দেয়। আসলে এক চক্ষু মানুষের ভিড়ে-ঠাসা এই-যে পৃথিবী, সেখানে সে হয়ে ওঠে একক। আর তাই সে অন্যদের থেকে একেবারেই আলাদা।
কবি শঙ্খ ঘোষকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর একটি কবিতা ছিল ‘গুরুপ্রণামি’। সেখানে তিনি লিখছেন —
“যদি কোনওদিন পারি! একবার শুধু একবার ছুঁতে পারি সেই বিন্দু-যা কিনা অমর্ত্য জয়টিকা,
উদ্বেল উদ্ভাস যার পথ দেখায় নীহারিকা থেকে।”
‘চন্দ্রাহত’ কবিতাটি আমার খুব প্রিয়। সুন্দর নির্মাণ কবিতাটির।
“দিন চলেছে, বালিতে পা উটের মতো
সারবন্দি, মন্থরতায় আত্মগত
ন্যুব্জদেহও বোঝার ভারে ঈষৎ নত।
নিজের দিকে নিজেই অবাক তাকিয়ে থাকি-
এই-যে বোঝা, এ-বোঝা কার? আমার নাকি!
বিনিময়ের পাওনা সেরেফ দিন-খোরাকি?”
দূর ভবিষ্যতের ঠিক-ঠিকানা থাকে না, হাজারখনেক শর্ত মানতে হয়। তবু মুখ বুঝে বোঝা টানতে হয়। সত্যিকারের কারণ খোঁজাটা খুবই কঠিন।
“সারাজীবন বালিতে — পা, চন্দ্রাহত,
পথ-পেরুনো, পথ ছাড়িয়েও, অনেক বাকি।”
‘ও’ নামে একটি কবিতা আছে। প্রতিমার কথা। যুবতি মাকে কোন এক কালে ভাসিয়ে দিয়েছেন ভাসানের নৌকাতে। কখনো আবার চুপিসার আবডালে ভরা উজানের স্রোত। রঙখস, মাটি-ওঠা শুকনো কাঠামো ফিরেছে ডাঙায়। অথচ সাধের প্রতিমা হয়ে মনে মনে কাছে আসে সে। সে আসলে মূর্তিমতী সান্ত্বনা এই সমূহ দুঃসময়ে। তুমুল সর্বনাশেও সে একাকী কবির পাশে।

শারদীয় ‘কবি সম্মেলন’-এ প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের এর কবিতা গুলি পড়তে পড়তে
বারবার মনে হচ্ছিল জীবন সম্পর্কে তাঁর অনুভূতির কথা।
এক জীবনেই তিন জীবনের খেলা
দেখা হলো বটে! আজ সায়াহ্নবেলা
ফেরাচ্ছে বহু অপমান, হেলাফেলা।
চোখ বুজে ভাবি কোনখানে ছিল ভুল
আঁকড়ে ধরেছি যখনই যার আঙুল,
ভেঙেছে আস্থা। সরেছে লক্ষ্যমূল। (শূন্য হাতে ফিরি হে)
‘অনেক ভুল ছিল ভাবনাতে’- ক্লান্ত ধ্বস্ত অস্থির দিন রাতে তিনি ভেবেছিলেন এইসব কথা। তাঁর মনে হয়েছিল পথচলা কেবলই পথ হারাতে। তাই বোধহয় লিখেছিলেন মুঠো খুলে ফিরি কাঙালের বেশে। রিক্ত, নিঃস্ব হাতে।
‘ওলট পালট’ কবিতায় তিনি লেখেন, ‘মনের ভিতরে তাড়া করে ফেরে মন’। আসলে কোনো কোনো দিন নিজেকেই চেনা যায় না। নিজেকে মনে হয় পুরো ভিন্ন কেউ অথবা বেমানান। নিজের পুরনো অবস্থানকে খুঁজে পাওয়া যায় না। যুগের হাওয়ায় স্মৃতি সত্তার আমূল বিসর্জন হয়ে যায়। বিস্ময় জাগে মনে। একেই বোধহয় বলে পরিবর্তন।
আবার এই পরিবর্তনের কথাই ধরা পড়ে তাঁর অন্য একটি কবিতায়। যেখানে উঠে আসে একটি চড়ুই পাখির কথা। যে চড়ুই পাখি জানলার শিকে বসে ফ্যালফ্যাল তাকায় কবির দিকে। সে যেন প্রশ্ন করে, কেন নেই ভরা বাগানটা টগর চাঁপার নিমের বাহারে। কেন সারসার উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট সবকিছু ঢেকে দেয় চারিদিকে? এ কলকাতায় এখন শালিক- চড়ুই ছবি-বইয়ের পাতায়, স্মৃতির খাতায়। মনে পড়ে যাচ্ছে ‘রসদ’ কবিতাটির কথা। যেখানে তিনি লিখেছেন —
‘তখন ছিল। ছিলই কেন বলছি খালি?
উঠছে নতুন বসত যতই গ্রাম-শহরে-
হারিয়ে যাচ্ছে রোজই একটু-একটু করে
বাঁচার রসদ। গাছগাছালি, পাখপাখালি।’
তখন ছিল শরৎকাল, শিউলিতলা। ছড়িয়ে থাকতো মাটির উপর ইতস্তত স্বপ্নে-পাওয়া সব ভাবনারা ফুলের মতোই। সন্ধানী মৌমাছি গুনগুন সুর তুলত বেহাগে-ললিতে। আর সেই সুরটুকু নিয়েই ছোট্ট পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছে ছিল কবির। পাশাপাশি দুটো গাছের বাঁচার ধরন মুগ্ধ চোখে দেখেন কবি। গাছেদের ভেতর থাকা প্রাণরস সঞ্চারিত করে দিতে চান নিজেদের ভিতরেও, বাঁচার মতো করে বাঁচতে চান। বুঝতে পারি গাছ কবির ভীষণ প্রিয় ছিল। অনেক কবিতাতেই এসেছে গাছের অনুষঙ্গ। করবী গাছ তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে হাত। অলস সময়ে দুঃসময়ে রক্তকরবীর ফুলে পাঠিয়েছে হাত-চিঠি তার। বর্ষায়, বসন্তে, শীতে, গ্রীষ্মে কি শরতে জানলার ওপার থেকে হঠাৎ- হঠাৎ চুপিসারে মেলে ধরত বন্ধুতার হাত। ‘ঋতুরঙ্গ’ শীর্ষক কবিতায় একটি গাছের বেঁচে থাকাকে মিলিয়ে দেন মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গে —
‘যেমন এখন। শীতের কঠিন
আলিঙ্গনে পত্রালিহীন
ডালপালারা জানিয়ে দিচ্ছে:
এই যে বাঁচা,এই-যে যে মরা-
অনন্ত এক পরম্পরা
বাঁচায় শুধু বাঁচার প্রবল ইচ্ছে।’
আসলে দিনযাপনের রৌদ্রছায়া তাঁর স্মৃতির ভেতর আলতো মায়া ছড়িয়ে দিয়ে যায়। ছন্দে-থাকা জীবন কঠিন গদ্যে ফিরে গেলেও বাঁচার প্রহরকে নতুন করে ঘোর কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতেই হয়, কারণ বাঁচার মধ্যে হাজার দ্বন্দ্ব দ্বিধা থাকলেও চতুর্দিকে বহতা জীবনস্পন্দ। এভাবেই কবির কাছে কবিতা হয়ে ওঠে যাপনচিত্র।
একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘ব্যতিক্রমী’ নামে। যেখানে লিখেছিলেন মুছে যাওয়া কত পত্রিকার কথা। একমাত্র ব্যতিক্রম আনন্দ- দীপক-সুনীলের তারুণ্যের কৃত্তিবাস। কতবার বন্ধ তবু ঠিক আলো-করা আবির্ভাব। ত্রৈমাসিক, বার্ষিক, মাসিক- নবকলেবরে ফেরা-ফের।
‘ব্যাকুল বকুল’ কবিতাটি গেরস্থালিতে ছড়িয়ে দেয় অদ্ভুত ব্যাকুলতা। ঘরে ফেরার আকুল বাঁশি শুনতে পাই । শুক্লপক্ষ কৃষ্ণপক্ষ রাতজনপদ অন্যমনে ছাড়িয়ে আসি আমরা। দেখতে পাই, নীল বাদামী চিঠির বেলা দরজা খুলে হাপিত্যেশ অপেক্ষাতে একটা দুটো বকুল ইতস্তত ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সারাজীবন ধরে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন।কবিতা আসলে কবির পরিত্রাণ। কবিতা কবিকে বাঁচায়। কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় লেখেন, ‘কবিতা বাঁচিয়েছে অনেকবার, অনেকদিন। বহু অপ্রস্তুত মুহূর্তে, বহু বিহ্বল অপমানে, বহু গ্লানিময় পরাজয়ে, বহু নির্দয় শোকে, নিষ্করুণ আঘাতে, নিরুদ্দেশ অস্থিরতায়, নির্জীব একাকিত্বে, নিষ্ফল প্রয়াসে, নির্মম ঔদাসীন্যে, নিশ্চল স্থবিরতায় হঠাৎ এসে উদ্ধার করেছে আমায় কবিতা। আমি তাকে ভুলে থেকেছি অনেকবার। সে আমায় ভোলেনি। কখন যেন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, মাথায় বুলিয়েছে শুশ্রূষার আঙুল, নিদ্রাহীন চোখে মাখিয়েছে মায়াবী অঞ্জন, শব্দের পর শব্দ গিয়েছে যুগিয়ে। নতুন সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমি ভুলে গিয়েছি সব অপমান, অস্থিরতা,শোক, পরাজয়, আঘাত, স্থবিরতা, ঔদাসীন্য, একাকিত্ব। কবিতা আমার প্রথম ও শেষ প্রেমিকা। আমার তৃষ্ণা, বাসনা, নিঃশ্বাস। আমার নিয়তি।’
তাই বোধহয় স্পষ্ট উচ্চারণে লিখে যান —
‘রোজই সে-চাপাভয়,
তবুও অভিনয়,
অলীক সংলাপে দিনানিপাত-
কেন না, চাই রোজই কিস্তিমাত।’
কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় বলতেন, ‘কবির নিজস্ব অনুভূতি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে পাঠককে আমন্ত্রণের একটি খোলা দরজা। সেই দরজাটি লেখককেই করে দিতে হবে।’
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমাদের জন্য সেই দরজা উন্মুক্ত করে ‘মহালয়ার জাতক’ দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
অমৃতাভ দে, কথার ঘর, শিবতলা লেন ঘূর্ণি কৃষ্ণনগর নদিয়া।
ডহজ, স্বচ্ছন্দ, সাবলীল ভঙ্গীতে আঁকা এক কবির ছবি, যাঁর চোখ,মুখ,চুল খুব সযত্নে বিম্বিত, এমন কি নিঃশ্বাসটুকু। ভালো লাগল। খুব ভালো লাগল।