| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

তরুণ সান্যালের কবিতা — প্রত্নপুরাণ-চেতনা ও আর্কিটাইপের ব্যবহার : আনন্দগোপাল হালদার

Reporter
আনন্দগোপাল হালদার / ১৫১৪ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫

মিথ কী, কীভাবে তার জন্ম, বোধকরি এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার নয়, সেই সঙ্গে এটাও জানতে হয়, যে, বাংলা কবিতায় কেন মিথ নানা কবির রচনায় ফিরে ফিরে আসে। কবিরা শেষপর্যন্ত কবিতার মিথিক্যাল স্ট্রাকচার-সর্বস্বতায় আটকে থাকে না, তাকে অতিক্রম করতে পারে, সেই ব্যাপারটাও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। এককথায় মিথের সংজ্ঞা সম্ভব নয়। Chambers তাঁর ‘19th century dictionary’-তে লিখেছেন, ‘‘An ancient traditional story of gods or heroes, esp. one offering an explanation of some fact or phenomenon: a story with a veiled meaning: mythical matter: a figment: a commonly held belief that is untrue or without foundation.’’ অর্থাৎ প্রাচীন গ্রিক ‘‘Mythos’’ থেকে মিথ কথার উৎপত্তি, যার অর্থ সত্য কিংবা মিথ্যা যে-কোনও কাহিনি। কালপ্রবাহে উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তমানে উত্তীর্ণ হয়েছে নানা পুরোনো ঘটনা বা বিশ্বাস, যা, বাস্তব আর কল্পনা মিলেমিশে এক অদ্ভুত যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখায় না-আনতে পারা সত্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে চলেছে। তরুণ সান্যালের কবিতায় এই মিথের সার্থক অনুসরণ আমাদের ভাবনাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয় এই কারণে যে, মিথ একদিকে রূপকথা, জনশ্রুতি এবং ইতিহাসের পরম্পরাগত ধারাবাহিকতায় মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে যা তাঁর কবিতায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে বারবার, যেহেতু মিথের এই ইতিহাসগত উপাদান তরুণ সান্যালের ইতিহাস-মথিত চিন্তা-প্রবাহকে বারবার নিয়ন্ত্রণ করেছে বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে। ফলে মিথের মধ্যে মিশে থাকা লেজেন্ড অর্থাৎ লোকশ্রুতি পুরাণগত ইতিহাসের আখ্যান তরুণের কবিতায় বিনির্মিত হয় যুগোচিত ভাবনা-ভাষ্যের নবায়ন প্রক্রিয়ায়। অধ্যাপক জগন্নাথ ঘোষ ‘চন্দ্রভাষ’ জানুয়ারি ১৯৯৭ সংখ্যায় ‘বাংলা কবিতায় মিথ’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

‘‘মানব সাধারণের ছড়িয়ে থাকা সময় ও স্থানের গর্ভ থেকে আহৃত সম্মিলিত অভিজ্ঞতাই হলো মিথ। এই অভিজ্ঞতার আদিম নিদর্শন আমরা পাই মহাভারতে, রামায়ণে ও নানাবিধ পুরাণে ও লোককথায়। সমগ্র জাতির কল্পিত জগতের কাহিনী নিয়ে মিথ গড়ে ওঠে। তাই তার মধ্যে থাকে একটি সর্বজনীন রূপ ও রেখা। মিথের নরনারী বাস্তব জগতের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়। তাতে আরোপিত হয় সত্যমূর্তি।”

আমরা এই সত্যের প্রমাণ পাই বাংলা আধুনিক কবিতার ভগীরথ মাইকেল মধুসূদন দত্তকৃত মিথের ব্যবহারে। যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ ‘মেঘনাদবধ মহাকাব্য’। মূলতই যা রামায়ণের কাহিনি নিঃসৃত ও বিনির্মিত। কবি তরুণ সান্যাল পাঁচের দশকের আধুনিক কবিতায় সমকালীন বাস্তবতার নিরিখে এই মিথের অসাধারণ বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন এ বিষয়ে কোনও দ্বিরুক্তি নেই। ‘পুরাণ কথন’ (১৯৮৩) কাব্যের ভূমিকা-সমার্থক গদ্যে কবি তরুণ সান্যাল তাঁর পুরাণ কেন্দ্রিক ভাবনা-ভাষ্যের যে-ইঙ্গিত দিয়েছেন তার সমার্থক প্রমাণ পাওয়া যায় এই কাব্যের বেশ কিছু কবিতায়। যেমন ‘পুরাণ কথন’ শীর্ষক টানটান গদ্যে লেখা কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন:

‘‘এক চক্ষু সাইক্লোপস-এর দ্বীপ থেকে ওদেসিয়ুস তাঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে পালালেন। হোমার লিখছেন, ক্ষুধার্ত তাঁর সহনাবিকেরা যারা ইলিয়ামকে মিশিয়ে দিয়েছে ধুলোয়, বিশাল লবণদ্রবণ্যের ক্ষার…।’

অর্থাৎ সাইক্লোপস ও ওদেসিয়ুস-ই শুধু নয়, গীতা-রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদি মন্থন করে যে-চিরন্তন জীবনসত্য নিষ্কাশিত হয়েছে তাঁর কবিতায় তা মূলতই তাঁর পুরাণচেতনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যদিও একটি বিষয় বিশেষভাবে আমাদের খেয়াল রাখতে হয় যে তরুণ সান্যাল পাঁচের দশকের অন্যান্য কবিদের মতো পুরাণ প্রসঙ্গ ব্যবহার করেননি, তাঁর কবিতায় বরং বাঙালির সমাজজীবন ও সংস্কৃতি বোধ, সর্বোপরি বাস্তব যাপন ঘিরে যে বহুমাত্রিক ভাবনার বিকিরণ তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে তা তাঁকে বিশেষ স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত করে। কবি ও অধ্যাপক গণেশ বসু তরুণ সানাল্যের কবিতায় মিথ ব্যবহারের এই বহুমাত্রিকতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানাচ্ছেন:

‘‘এবাঙালির উপনিবেশ-পূর্ব সংস্কৃতিবোধ, বহু মিথ, পুরাণ-কথায় বড়ো হয়ে রবীন্দ্র শিক্ষায় শিক্ষিত ও বিশ্ব ভাবনায় আন্তর্জাতিক বিধায়, পূর্ণ বাঙালি বিশিষ্টতায় বামপন্থী তিনি। শ্রীচৈতন্যের বামপন্থী বা সমাজমনস্ক ধারাসহ পরবর্তী জনপ্রীতিতে যুক্ত সাহিত্যধারায় তাবৎ গণতান্ত্রিক বোধের সঙ্গে সংযুক্ত তাঁর আন্তর্জাতিকতা। পৃথিবীতে যে কোনো দেশের লোকচৈতন্য, মিথ, মহাকথা, এপিক ইত্যাদির অনুরাগী হয়ে, পশ্চিম ইউরোপীয় মনোভঙ্গিতে নয়, বিশ্বভাবনায় ও শিল্প সামর্থ্যের অধ্যায়নে যুক্ত থেকেছেন। তিনি রবীন্দ্রোত্তর রবীন্দ্র বিরোধী নন। অন্তত তাঁর রচনা সেরকম কথাই বলে। কিন্তু রবীন্দ্র ঘরানার উদারনৈতিক ইউরোপীয় নন মোটেই। নিছকই বিশ্বভাবুক বাঙালি। প্রবলভাবেই বাঙালি। ভারতবোধে তাঁর রচনায় যেন বলতে চায়, আনন্দ থেকেই ব্যক্তি বিশ্ব ও মানবতার উৎসার। ওই আনন্দবোধই ব্যক্তিকে বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে। আর, মুক্তিই তো দেয় আনন্দ। সে মুক্তি তো অন্ধ প্রকৃতি, শ্রেণিভিত্তিক সমাজ ও ব্যক্তিপরায়ণতা থেকে। মুক্তিই তো সুন্দরের অবগুণ্ঠন উন্মোচন করে।’’

‘কায়া নৌকায়’ (১৯৮৯) কাব্যে ‘রামকাহিনী’ কবিতায় রামায়ণের প্রসঙ্গে কবি নিয়ে যাচ্ছেন পৌরাণিক চেতনায়। এমনকি বাল্মিকী বা ক্রৌঞ্চ প্রসঙ্গে, যেন চিরকালীন জীবনসত্যের মর্মমূলে দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন কবি এভাবেই:

‘‘নিষাদে ক্রৌঞ্চে খুনসুটি করে সেই যে লেখাল খত তার গুনাগার দিতেই সবার জান-মান খেসারত

সাত কাণ্ডের জাব্দা শেখাতে ছাটে ও টিভি-র টিকি

বল্মীকে ফিরে যাবে কি যাবে না ভাবখানা বাল্মীকির

বাবরি ও রাম জন্মভূমির ঘটালি বিকট বিয়ে

রাম বা প্রয়াম বা গিলগামেশ সে কী আজকের কাণ্ড লঙ্কা না ট্রয় ঘেরাও করল গ্রীক কুরু নাকি পাণ্ডব তারপর হলো কী কী?’’

আসলে অতীত এবং বর্তমানের সেতুবন্ধন, অর্থাৎ বাস্তব জীবনের প্রেক্ষিতে পুরাণ-প্রসঙ্গে ফিরে আসা ছাড়া গত্যন্তর নেই। যে-রাম জন্মভূমি বা বাবরি মসজিদ একদিকে অতীত-প্রসঙ্গ অন্যদিকে এই একুশ শতকের প্রেক্ষিতে কীভাবে বর্তমান বাস্তব প্রসঙ্গ হয়ে ফিরে আসছে এবং রাজনীতি সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে তার বিশ্লেষণ অবধারিত এই কবিতাটি অবশ্যই পুরাণের বিনির্মাণ, এ বিষয়ে কোনও বিতর্ক থাকতে পারে না। শুধু কবিতার দর্শন বা বক্তব্য গড়ে তোলার প্রয়োজনেই নয়, সমকালকে দেখতে, দেখাতে ও ভাষা দিতে পুরাণ বা পুরাবৃত্ত কীভাবে কবিতায় সংলিপ্ত হতে পারে বোধকরি তরুণ সান্যালের মতো তা আর কারও কবিতায় দেখা যায় না। তিনি পুরাণকে অতীতের গর্ভেই আটকে রাখেননি, তুলে এনেছেন বর্তমানে, জীবন ও জাগতিক সত্য ব্যাখ্যানের এক বিজ্ঞাননিষ্ঠ প্রকৌশলে। আমরা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মহাভারতের কর্ণের ও কুন্তির বিনির্মাণ দেখেছি, এমনকি পাঁচের দশকের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাতেও। সেক্ষেত্রে কবিতা তাঁদের নিজস্ব জীবনদর্শন ও বাস্তব বোধের প্রেক্ষিতে যেভাবে মিথের ইন্টারপ্রিটেশন ঘটিয়েছে, নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে কবি তরুণ সান্যালও সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাঁদের সমগোত্রীয় এবং বোধ করি, নিজস্ব স্বাতন্ত্রে চিহ্নিত অবশ্যই।

উক্ত বক্তব্যের সমর্থনে ‘মাটির বেহালা’ নিয়ে ‘কবি এক জাগে’ নামক গদ্যে দিলীপ চক্রবর্তী তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধের এক অংশে লিখেছেন:

‘‘তরুণদার অনেক কবিতাতেই থাকে মিথ বা পুরাণের চিত্রকল্প। এ-বিষয়ে তিনি বলেছেন, কোনো কোনো পুরাণ প্রতীক বালক বয়সেই তাঁকে নাড়া দিত। ক্রমশ তিনি বোঝেন ভারতীয় মানসের বাঙালির শিকড় এত পুরনো যুগ পর্যন্ত শক্ত মাটিতে প্রোথিত যে এই পুরনো প্রতিমার সূত্র ধরে বর্তমানকে চিনতে শিখি। তাঁর মতে, কবির কাজ শব্দকে বাহন করে শব্দকে ছাড়িয়ে যাওয়া। শুধু তো যাওয়া নয়, অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে আরেক জগৎ নির্মাণ কার। …শৈশব থেকে পৃথিবীর পাঠশালায় যে-শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাঁর প্রজ্ঞা নিয়েই সে পাঠশালাতেই ছুটে গেছেন। এরই মাঝে কখনো নিমগ্ন ভেবেছেন, আবিষ্ট হয়ে ভাবেন, তাঁর কাব্যনাট্যে আধুনিককালের সঙ্গে মিশে যায় গ্রিক মিথ আর মহাভারত।’’

আধুনিক বাংলা কবিতায় আর্কিটাইপ বা আদি রূপকল্প ব্যবহারের চূড়ান্ত নিদর্শন লক্ষ করা যায় তিরিশের দশকের বিশিষ্ট কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। বোধ করি তাঁর সমসাময়িক কালে বা পরবর্তীতে এই বিষয়ে খুব কম কবিই তাঁর কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে পাঁচের দশকের সমাজ মানবতা ও চূড়ান্ত জীবন-চেতনার কবি তরুণ সান্যালের কবিতায় আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করি প্রত্নপুরাণ বা আদি রূপকল্পের প্রয়োগ এবং তাঁর কাঙ্ক্ষিত বক্তব্য ও দর্শনের প্রেক্ষিতে যা অত্যন্ত যুক্তিসম্মত ও সাবলীল। জীবনানন্দের সঙ্গে তাঁর তুলনা নয়, জীবনানন্দ যে অবচেতনের গভীরে নেমে মানব-মস্তিষ্কের নিউরন কোষে মুদ্রিত নানা স্মৃতি ও সংস্কারের জগৎ থেকে ভাবনার উপাদান সংগ্রহ করেছেন কবিতায় এবং যে বিশেষ স্বাতন্ত্র্যে তাকে স্বতন্ত্র মাত্রায় মূর্ত করে তুলেছেন হয়তো ঠিক সেই পথে কবি তরুণ সান্যাল সচেতনভাবেই যেতে চাননি। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন এই প্রত্নপুরাণ বা আদি রূপকল্পের ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন কবিকে যেমন সচেতন ও সাবধানী হতে হয় তেমনি সেই যোগ্যতাও থাকা তাঁর একান্ত জরুরি, অন্যথায় দীর্ঘকালের বিচিত্র মানব-সমাজের স্মৃতির ভাণ্ডারে সঞ্চিত নানা সংস্কার ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর উপর অসাবধানী আলোকপাতের মধ্য দিয়ে সমূহ বিপর্যয় ঘটতে পারে, কারণ ঘুমন্ত স্মৃতিকে জাগিয়ে দেওয়া মানেই কোনও মানব প্রজাতির সেন্টিমেন্টকে আঘাত করা, যে-পথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবতারণা হতে পারে। স্বীকার করতেই হয় জীবনানন্দ প্রত্নপুরাণ বা আর্কিটাইপের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতনভাবেই এই পথে হাঁটেননি কিন্তু কমিউনিস্ট মানসিকতার সমাজ-চৈতন্যবাদী কবি তরুণ সান্যাল বিশেষভাবে ভেবেছিলেন যা তাঁর প্রত্নপুরাণ প্রকল্প প্রয়োগ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের মধ্যেই প্রমাণিত।

সুতরাং তরুণ সান্যালের কবিতায় মিথ বা প্রত্নপুরাণ প্রসঙ্গ এসেছে বক্তব্যের প্রয়োজনে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা শ্রেণিবিভক্ত ও শ্রেণি শোষণমূলক সমাজ কাঠামোর অন্তর্গত সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী ধ্যান-ধারণার বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে। তিনি এক্ষেত্রে সবসময় সচেতন এবং মানসিক দৃষ্টি-সংবেদ্যতায় কবিতার বক্তব্যের প্রয়োজনে পুরাণ প্রকল্পের কাছে হাত বাড়িয়েছেন কেবল মাত্রই বক্তব্যকে বোঝাতে এবং তাঁর কবিজনোচিত দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি সমন্বয়বাদী প্রেক্ষাপটে তুলে ধরবার প্রয়োজনে। আমরা বাংলা কবিতায় মিথ ব্যবহারের এই নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক সর্বোপরি নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি পাঁচের দশকে তো বটেই তার পরবর্তী আর কোনও কবির ক্ষেত্রে তরুণ সান্যালের মতো শিল্প-সাফল্যে প্রয়োগ করতে দেখিনি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, তাঁর কবিতায় রামায়ণের মিথোলজিক্যাল চরিত্র হিসেবে বারণের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, ‘বল্গায় রাবণরৌদ্র’ শীর্ষক রচনায়। যেখানে রাবণ রৌদ্র সমার্থক। আসলে রৌদ্র অর্থে সূর্যের তেজরশ্মি যা পৃথিবী ও মানুষকে এমনকি জীবজগতকে প্রাণ ধারণে শক্তি জোগায়। ফলে এই ‘রাবণ’ প্রসঙ্গটি রূপক কর্মধারায় সমাসবদ্ধভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন ‘রাবণরৌদ্র’ কথাটি। একদিকে তিনি প্রকৃতির রৌদ্র বা তেজ অন্যদিকে রাবণ—দুটি বিষয়কে বিরোধাভাষের মধ্য দিয়ে মিলিয়ে দিয়ে যেমন পুরাণ প্রসঙ্গকে টেনে এনেছেন তেমনি বাস্তবতার গভীরতর সত্যটি বাত্ময় করে তুলতে চেয়েছেন।

সংস্কৃত রামায়ণে রাবণকে আমরা যেভাবে দেখি মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ দেখি অন্যভাবে, আবার এ যুগের করি তরুণ সান্যাল রাবণকে তাঁর কাব্যে বা কবিতায় ব্যবহার করেছেন নতুন ইন্টারপ্রিটেশনে, যা আমাদের পুরাণ আশ্রিত কাব্য রচনার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র দিক-নির্দেশিকা হিসেবে বিশেষভাবে ভাবায়। তরুণ সান্যাল দেশি-বিদেশি প্রত্নপুরাণ প্রকল্পের আশ্রয়ে যে কাব্যিক বাচন গড়ে তুলতে চেয়েছেন বারবার সেখানে তাঁর স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে। প্রত্নপুরাণ বা মিথের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে একটি জাতি ও তার অভ্যন্তরীণ ইতিহাস ঐতিহ্যকে বর্তমানের নতুন মাত্রা দিতে গিয়ে তিন যথেষ্ট সচেতনতার আশ্রায় নিয়েছেন।

জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর মানুষের সমস্যার সঙ্গে আত্ম-সংযুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে কবি তরুণ সান্যালের কবিতার ভূগোল ও বক্তব্যজগৎ অনেক বেশি ব্যপ্ত হয়ে উঠেছে। অভিজ্ঞতার ক্রমসম্প্রসারণ, রূপগত কল্পনা, প্রকাশগত ভঙ্গি ও কবিতার অবয়বগত পরিবর্তনের দিকগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাঁর কবিতার কোনও কোনও উচ্চারণ অবশ্যই সহজবোধ্য নয়, দুরূহ। পাঠকের কাছে অনেক ক্ষেত্রে তা মনে হয় যে উপনিষদের স্তোত্র। আসলে তরুণ সান্যাল ‘কবিতা’ বলতে যা লিখতে চেয়েছেন তা যেন প্রচলিত অর্থে সেই কবিতা নয়, তা আসলে মানবসংহিতা। আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘চতুর্থ পেরেক’ কাব্যে। যেখানে পরম প্রেমময় প্রভু যিশুর মানব প্রেমের আদর্শ কবি তরুণের বাচন ও নির্মাণকে এমনতর মাত্রায় উত্তীর্ণ করে দিয়েছে। তিনি প্রত্নপুরাণ লোকায়ত জীবনের অন্তঃসার তুলে এনে কবিতার অভিমুখকে কখনও মন্ত্রের দিকে কখনও অস্ত্রের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছেন, নিজের মনোগঠনের সাদৃশ্যে ও বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে। ফলে স্বাভাবিক কারণে পাঁচের দশকের মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় কাব্য কবিতার ধারার মধ্যে তাঁর বন্ধু-কবিদের একমাত্রিক কাব্যযাত্রার বিপ্রতীপে তাঁর কাব্যচর্চা ও লিখন প্রক্রিয়া স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব জীবন-সম্পৃক্ত বলে সহজেই চিহ্নিত হতে পেরেছে।

তরুণ সান্যাল কবিতায় মিথ প্রয়োগ সম্পর্কে কতখানি সচেতন ও সাবধানী তা তাঁর ‘‘অন্তরালে ধীর গঙ্গা বহে মধ্য ধারা’’ শীর্ষক প্রবন্ধে সে কথা বলেছেন—এককথায় মানুষের অতীত-স্মৃতি ও সংস্কার জড়িত হয়ে থাকে এই মিথে। ফলে তা যেমন স্পর্শকাতর তেমনি এক স্মৃতি-রোমান্টিকতাও বটে, কিন্তু কবিতায় যখন কোনও পুরাণ-প্রসিদ্ধ ঘটনা বা প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে তুলে আনতে গিয়ে সেই জনগোষ্ঠীর সংস্কারে অসাবধানতাবশত আঘাত করা হয় তখনই যেন বিসুভিয়াসের মতো অগ্নি উদ্‌দ্গীরণ সংঘটিত হয় বর্তমানের বাস্তবতায়, ঘটতে পারে রক্তাক্ত বিপ্লব—মিথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমনই ভাবনা কবি তরুণ সান্যালের, যেহেতু তিনি মার্কসীয় বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী, প্রখর ইতিহাস-সচেতন এবং মানুষের শ্রম-নির্ধারিত শৈল্পিক নন্দনতত্ত্বে বিশ্বাসী একজন কবি।

বিষ্ণু দে তাঁর ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ কাব্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিথের রসায়ন ঘটিয়েছেন সম্পূর্ণ মার্কসবাদের দার্শনিক বীক্ষায়, নতুন এক সমাজ যেখানে প্রেমের এক অভিনবত্ব নিয়ে উপস্থিত হবে, তিনি লিখেছেন:

‘‘আমি নহি পুরূরবা। হে উর্বশী,
ক্ষনিকের মরালকায়
ইন্দ্রিয়ের হর্ষে, জান গড়ে তুলি আমার ভুবন?
এসো তুমি সে ভুবনে, কদম্বের রোমাঞ্চ ছড়িয়ে।
ক্ষণেক সেখানে থাকো,
তোমার দেহের হায় অন্তহীন আমন্ত্রণবীথি
ঘুরি যে সময় নেই- শুধু তুমি থাকো ক্ষণকাল,
ক্ষণিকের আনন্দাঅলোয়
অন্ধকার আকাশসভায়
নগ্নতায় দীপ্ত তনু জ্বালিয়ে যাও
নৃত্যময় দীপ্ত দেয়ালিতে।’’

বিষ্ণু দে যেহেতু মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী সে-কারণে তিনি রোমান্টিক প্রেম-ভাবনায় বিশ্বাস স্থাপন করেন না আর এখানেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সাদৃশ্য খুঁজে পাই দু’দশক পরে অর্থাৎ পাঁচের দশকের কবি তরুণের মিথ-আশ্রিত কবিতায়। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যযাতিকে নিয়ে লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা কিন্তু সেখানে তিনি যযাতি মিথ বা কাহিনি শুধু কাহিনির কারণেই গ্রহণ করেছেন। এইভাবে তিরিশের বা তার পরবর্তী দশকের কবিদের কবিতায় মিথ ব্যবহারের প্রেক্ষিত ও প্রকরণের নিরিখে কবি তরুণ সান্যালের কবিতার মিথিক্যাল আইডিওলজিকে বুঝে নিতে পারি।

‘নাস্তিকের দেবীবন্দনা’ (১৯৯৩) কাব্যে মহাভারতের অভিমুন্য মিথ উঠে এসেছে তাঁর কবিতার কেন্দ্রীয় থিম হিসেবে, যা পড়তে গিয়ে মনে হয় এ যেন এ যুগের মিথ, কেননা তরুণ সান্যাল মিথকে শুধু ব্যবহারের জন্যই ব্যবহার করেননি তিনি তাঁর উদ্দিষ্ট কাব্য-লক্ষণের প্রয়োজনেই মিথকে ব্যবহার করেছেন। ফলে ‘অভিমন্যু’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:

‘‘বাবা গিয়েছেন বনবাসে মা রয়েছেন ঘরে

রাজরানি মা’র মুখে তাকিয়ে মন কেমন করে

প্রাসাদ ভরা লোক লস্কর সোনা রুপোর বাটি,

বাবার আছে নিরুদ্দেশে বালিশ-বিছানা-মাটিই

মনের মধ্যে ছায়ায়-কালোয় ঝিকোয় বর্শাফলা এ কোন বৃহ্য এগোই-পিছোই রথচলা পথচলায়

চতুর্দিকে বাজ-বিজলির অস্ত্রে ঝনৎকার বাঁ ডানে যাই পথ কোথা পাই বাইরে বেরোবার

রক্ত উঠছে লাফিয়ে ডাঙায় নদী উঠছে ফুলে বাণ ছুটেছে শান দিচ্ছে খঙ্গে কূলে-কূলে

ঘরের মধ্যে ঘর বানিয়ে ফেলে গেলেন বাবা দেখতে পাচ্ছি বাঘ না স্মৃতির দারুণ হাঁ-মুখ থাবা

ফুল ঝরছে বন পুড়ছে অসহ্য দুর্যোগ তাড়িয়ে ফিরছে নিশান ছিঁড়ছে মহাকালের রোখ

বাবা গিয়েছেন বনবাসে মা জননী ঘরে বুকের মধ্যে দুঃখী তৃণীর ঝিকির মিকির করে।’’

মার্কসীয় দর্শনের মূল কথা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। কবি তরুণ সান্যাল মার্কসীয় দর্শনঋদ্ধ কবি বলেই মিথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্কসবাদের এই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী আদর্শকে ভোলেননি, তার প্রমাণ এই কাব্যগ্রন্থের নামকরণ— ‘নাস্তিকের দেবীবন্দনা’। নাস্তিক কি করে দেবী বন্দনা করেন-এ শুধু জিজ্ঞাসাই নয়, বিরোধাভাস এমনকি বিরোধাত্মক ব্যাপারও বটে, যা আমাদের ভাবায়। এইভাবে কবি তরুণ সান্যাল তাঁর কবিতার পরিধি ও দর্শনকে সময় থেকে সময়াতীতে নিয়ে যান, অতীতকে ভাষা দেন বর্তমানের কণ্ঠে। কী অসাধারণ তাঁর সেই ভাবনার কাব্যায়ন:

‘‘বাবা গিয়েছেন বনবাসে মা জননী ঘরে

বুকের মধ্যে দুঃখী

তৃণীর ঝিকির মিকির করে।’’

কবি শিবশম্ভু পাল তাঁর ‘তরুণ সান্যাল সম্পর্কে দু-একটা ব্যক্তিগত’ শীর্ষক গদ্যে লিখেছেন:

‘‘ওর কবিতা প্রায়শয় দীর্ঘ হয়, কারণ ওর চালচিত্রটা বেশ বড়োসড়ো। স্বদেশ-বিদেশ, সমকালীনতা, রাজনৈতিক-সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সেই দায়বদ্ধতায় জড়িয়ে যাওয়া মানবিক শুভবোধ, পুরাণ ও লোকোকথার লাগসই যোজনা ওর কবিকৃতিকে চিহ্নিত করে থাকে। পরন্তু ভাবানুগ ছন্দো-প্রযুক্তির ব্যবহার, পদ্ধতি-প্রকরণের দিক থেকেও ওর কবিতা বেশ সম্ভ্রান্ত।… ওর গ্রহণ ক্ষমতার ঔদার্য ও কবিতার অনেকান্তবাদে বিশ্বাস না হোক, অন্তত একটা নান্দনিক কৌতূহল তো বটেই।’’

এই ‘নান্দনিক কৌতূহল’ থেকেই ফিরে তাকাতে হয় কবি তরুণের কবিতার অন্তর্ভুবনে, যেখানে পুরাণকথাও তাঁর মার্কসীয় ভাবনায় জারিত হয়ে নতুন মাত্রায় কাব্যের শরীর লাভ করে।

তরুণ সান্যালের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র অন্তর্ভুক্ত ‘বাঁশি ও সুদর্শন’ কবিতায় কল্পনা ও বাস্তবের দ্বান্দ্বিকতায় মূর্ত কবির কাব্য-ভাবনা কীভাবে মিথের নতুন প্রয়োগ সাফল্য চিহ্নিত হয়ে ওঠে তার নিদর্শন পাই তাঁর এহেন উচ্চারণে:

‘‘বৃদ্ধ সন্ন্যাসীটি সভা জন্মাষ্টমীরই ডেকেছিলেন, হৃষ্টমন, শুনতে স্তোত্র ও ভজন, অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চক্রধারী গীতার ব্যাখ্যাতা, মধুকৈটবের অরি, কিন্তু কুজা-সত্যভামা রুক্মিণী বা জাম্বুবতী সে অধ্যায়ে প্রক্ষিপ্ত ক’জন, ভুলেছেন ব্রজবালক, সেই রাধারও ঝুলন সঙ্গী, যেহেতু তিনি নাকি হরি, অর্থাৎ মানুষ, সেই কালো যুবাটি হয়ে ওঠেন কল্পনা বাস্তবে মিশে স্বয়ং ঈশ্বরই।

ভান শুধু তাঁরিই নয়, ভান তো কৃষ্ণেরও, আর ভক্তদেরও প্রয়োজন গ্রহণ বর্জন, বিশ্বাসও আরেক ভান, সে ভানে ভাঙে না কারও ঘর কিংবা ঘড়ি, উপরন্তু দশে বিশে পালা গাওয়া চব্বিশ প্রহর প্রীতি ভক্তিতে আতুর যতক্ষণ।

বৃদ্ধ সেই সন্ন্যাসীটি সভা শেষে ফিরে যাচ্ছেন ধীর পায়ে মঠের বিশ্রামে, এতক্ষণ কৃষ্ণ তাঁকে শেখাচ্ছিলেন সুখে দুঃখে স্থিতপ্রজ্ঞ বীতস্পৃহ হতে,.. কেন যে বুকের মধ্যে হুহু করে ঝড় উঠছে ব্রজকুঞ্জ শ্রীরাধার নামে, কিশোর বয়সে এক ভোরবেলায় শেফালি কুড়ানো কোন বালিকার কাঁটা বেঁধা বাঁ পায়ের ক্ষতে

এমনই শরৎ দিনে রক্ত দেখেছিলেন, তাঁকে কি-তখন জাগিয়েছিল, তুলসী ও চন্দনে পার্থসারথীকে আজ অর্থ দিতে সমুদ্রের বুক চিরে মরুভূমির হাওয়া নাচালো ঢেউগুলিকে বহু বহুদিন পরে যেন তাঁর নিভৃতে নিভৃতে।”

আপাতভাবে পুরাণ-কথন নির্ভর একটি ন্যারেটিভ কবিতা এটি। মহাভারতের, গীতার এবং বৈষ্ণব সাহিত্যের চরিত্র ও নানা অনুষঙ্গে নির্মিত কবিতায় কবি ষড়ঋতুর শরৎ প্রসঙ্গ যেমন এনেছেন তেমনি কিশোর বয়সের নস্টালজিয়ার বর্ণময় অনুষঙ্গও। সব মিলিয়ে এটি কবির স্বার্থক পুরাণ আশ্রিত একটি কবিতা, যেখানে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট উচ্চারণে বলতে পারেন:

‘‘বিশ্বাসও আরেক ভান, সে ভানে

ভাঙে না কারও ঘর কিংবা ঘড়ি’’—

এ এক ভিন্নতর কাব্য উচ্চারণ কবির।

প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী তাঁর ‘কবির দ্বিধা কবির নির্দ্বিধা’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

‘‘তরুণ সান্যালের অধ্যাপনা জীবন এবং অধ্যাপনা বহির্ভূত মননী জীবন বিভিন্ন বিষয় ও সাহিত্যের পঠন-পাঠনে পরিপূর্ণ। তাঁর ভাবনার, উপলব্ধির ও সৃষ্টির ভাষা বিশ্বমানবের সাংস্কৃতিক পৃথিবী থেকে স্বতই আহরিত হবে- এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু তরুণ সান্যাল কবিরূপে এই বৈদগ্ধ্য-জারিত ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ-ও তাঁর সৃষ্টি-কলার এক প্রবণতাই।’’

যথার্থই বলেছেন প্রাবন্ধিক সুমিতা চক্রবর্তী। তরুণ সান্যালের ‘নিজস্ব জীবনবোধের ভাষা’ তাই মেধাবী পাঠকের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, যেহেতু প্রাচীন ও আধুনিকের যৌগপত্যে তিনি তাঁর কবিতার ডিসকোর্স গড়ে তোলেন বিভিন্ন মাত্রায়।

সাধারণভাবে পুরাণ বলতে প্রাচীন কোনও বিশ্বাস, দেবদেবী কিংবা অবতার পুরুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা যুগ পরম্পরায় নানা বিশ্বাস-অবিশ্বাস কল্পনা পল্লবিত কাহিনি নয়, একেবারে লোক-জীবনের অন্তর্গত সামাজিক ও ধর্মীয় নানা রিচ্যুয়াল সংবলিত ধ্যান-ধারণাও এক ধরনের পুরাণ, যাকে লোক-পুরাণ বলা হয়। বাংলা কবিতায় ত্রিশের দশকে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবিদের কবিরা তাঁদের কাব্যচর্চায় যে মিথের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তার বেশিরভাগই পাশ্চাত্যের এবং অবশ্যই সেই পুরাণ লোক-পুরাণ নয়। যেমন গ্রীক পুরাণ কিংবা ইউরোপ-আমেরিকান মাইথোলজি ফলে সেগুলোর সঙ্গে যখন প্রাচ্য এমনকি ভারতীয় পুরাণ যখন সংমিশ্রিত হয়েছে তখন একটা যোগসূত্র তৈরি হয়েছে আর যখন সেই পুরাণ কেবলমাত্র পাশ্চাত্য পুরাণ রূপেই থেকে গেছে তখন বাংলা ভাষার পাঠক সহজে তার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারছে না, কারণ সেটা বিদেশি পুরাণ। কিন্তু বিষ্ণু দে যখন ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ লিখছেন কিংবা সুধীন্দ্রনাথ যখন ‘যযাতি’ লিখছেন তখন বুঝতে পারি ভারতীয় পুরাণ ও পাশ্চাত্য পুরাণ সংমিশ্রিত একটা ডিসকোর্স তৈরি করছে। প্রসঙ্গত ‘‘North American Indian Mythology’’ গ্রন্থে বলা হয়েছে:

‘‘Myths and legends are found the world over, and their origin and purpose form a special part of the story of the development of the human race. Some of these myths embody people’s early explanations of the world they lived in, the forces governing their lives and the need to provide some account of the good an evil that befell them. Many of these forces were personalities given names and personified the first step to the formalisation of belief in ritual and religion. A galaxy of gods, devils, heroes and monsters emerged, as varied as the societies from which they sprang and the appeal of their actions. Mythology has often provided the foundation of the loftiest and most abstract thought in art and religion-of Milton’s Paradise Lost and the Hindu Bhagavad Gita; equally the legends of the lesser spirits have been retained in folk tales familiar to us all in fairy tales.’’

গ্রন্থটির এই বক্তব্য বিশেষ প্রাসঙ্গিক অন্তত কবি তরুণ সান্যালের কবিতার পুরাণ-প্রেক্ষিত আলোচনার ক্ষেত্রে। আমরা উল্লিখিত গ্রন্থে ষোড়শ শতাব্দীর Tribal Society-র জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, কৃষি-জীবন, শিকার-বৃত্তি এবং নৃতাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণা উৎসব ইত্যাদির কথা জানতে পারি। যেগুলো কবি তরুণ সান্যালের কবিতার পৌরাণিক ভাবনা-ভাষ্যের পরিসরে নানাভাবে উঠে আসতে দেখি। কারণ, তরুণ সান্যাল মিথ চর্চায় ও তার প্রয়োগে ভারতীয় বা প্রাচ্য দেবদেবীর কাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, পৌঁছে গেছেন ইন্টারন্যাশনাল মাইথোলজিক্যাল অ্যাফেয়ার্সে। বিশেষ করে লোক-পুরাণের শিকড় প্রবাহে। চর্যাপদের যে সমাজ-জীবন ও জনজীবনের শ্রেণিবিন্যাস, নিম্নেতর জীবনধারা সেখান থেকেই কবির পুরাণ ভাবনার উপাদান সংগৃহীত, যা বিদেশি পুরাণ বা পুরাকাহিনির সঙ্গে মিলে গেছে অদ্ভুত রসায়নে।

তিনি ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি গ্রহ-নক্ষত্র ও ঈশ্বর বিশ্বাস কেন্দ্রিক পুরাণ-বিজ্ঞানের নানা ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন যেগুলোর মধ্যে ‘ঈশ্বরস্তোত্র’ একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। কবি তরুণ সান্যাল লিখেছেন:

‘‘হাওয়ায় সমুদ্রে সূর্যে বালুতে ঢেউয়ের কোটি দাঁতে

যে দেবতা তাকে নমস্কার

হরিণীর অতি কাছে বাঘের কোমল পদপাতে যে দেবতা তাকে নমস্কার ওহে পাতাঝরা গাছ তরুণী স্তবকে বিষফুল ফোটালে যে দেবতা প্রণাম পুরুষের মৃত্যু হয়ে কে সে অস্ত্র বেঁধানো আমূল যে দেবতা নারীতে প্রণাম এতো ঠিক মন্ত্র নয় উচ্চারণ তবু উঠে আসে।’’

এই দেবতা বা সূর্য দেবতাকেন্দ্রিক মিথ একাধারে বিজ্ঞানও বটে, আর তা যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে মানুষের বিশ্বাস ও প্রজন্ম পরম্পরায়। আবার তিনি ‘দেবীপক্ষ’ কবিতায় লিখেছেন:

‘‘বিনিসুতো দিয়ে মালা গাঁথবার জন্যে বজ্রমানিকে শ্রাবণও খানিক সাজালে মিছি মিছি ছিলে কূটকলহেও ঝাঁঝালো কম্বলে আঁশ বাছায় তন্ন তন্ন এবং আমায় তরুণ তরীতে নাচালে তখন শুখাও ভাসে গৈরিক বন্যায়

চাপা পড়ে যাই ঘোর বৃষ্টির আঁচলে

সে কী ভান ছিল কিরাতিনীবেশী গৌরীর বুকে ছিল ধ্যানে বটে ও পাকুড়ে রুদ্র দক্ষিণমুখ বেগুনিবরণ ধুতরোয় নেশা ধরা মনে নিছকই দৌড়োদৌড়ি ভেবেছি বুঝি বা মাথা হলো সাফসুতরো ঝরঝরে দেহ জলে ডুবে পানকৌড়ি

দেখেছি আকাশে নীল নেই এক টুকরোও হাতে ধরে কেউ এলো না তো কই তুলতে অথচ ডাঙায় ঠেকল না ডিঙি নৌকা বড়ো মানুষের শখটখও বড়ো শৌখিন সময় যায় না বেগার মজুরও ভুলতে শুধু হেঁকে-হেঁকে চোর ঠেকাবার চৌকি বয়সেয় বিষগিঠ জেরবার খুলতে

হলো না হলো না খড়কুটো ধরা মওকাও

এবং তখনি জয়-জয় জনারণ্যে ঢোল করতালে কাঁসিতে শিঙায় ডঙ্কায় শরৎ মেঘের বাঘে হাঁকেডাকে টঙ্কার দেবী চলেছেন মহালে ধন্যধন্য আমারি নৌকা পচনে ধুচুনি গঙ্গায় পতিতপাবনী এমনি জহ্নুকন্যা

আমার ঘাড়েই পা রেখে মুনিরও ওঙ্কার

বিনিসুতো নয় আসন পঞ্চমুণ্ডীর ডাকিনীসিদ্ধ সাজালো পদাতি অশ্ব ডেউলে ঘন্টা পথে সার দিয়ে দর্শক বেকুব আমার চোরাবালি ঘেরা গণ্ডী সাধ ছিল দেখা ঘুচিয়ে মদনভস্ম বিবাহের রঙে রাঙা আকাশের চণ্ডী

দেবদৈত্যের মিশল ভারতবর্ষে

নদীর অঙ্গে রণরঙ্গিনী উল্কি কে দাগ এঁকেছে অমন সে নামও উহ্য বরং দেখছি এমনকি জলও পুড়ছে ঢেউয়ের মাথায় করাল নটিনী উল্কার দেখছি সন্ধ্যা অস্তমেঘের মূর্ছায় আর স্রোতে যায় তারা চাঁদ ভাসা কল্কা

পুব থেকে গেলে পশ্চিম ঘাটে সূর্য মুখ ঘসে দিল আহা রে বীর্যশুল্কা।।’’

এই কবিতায় ডাকিনী-পঞ্চমুণ্ডী-চণ্ডী ইত্যাদির প্রসঙ্গের মধ্যে দিয়ে ‘দেবদৈত্যের মিশল ভারতবর্ষে’-র পুরাণ-প্রতীতীতে নিয়ে যান কবি।

তরুণ সান্যালের কবিতায় ‘দেবী’ শব্দটির পাশাপাশি ‘স্তোত্র’ বারবার ফিরে এসেছে এমনভাবে যা তাঁর পুরাণ ভাবনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। যেমন গঙ্গার কথা এসেছে তেমনি দেবী হৈমবতী কিংবা দেবাদিদেব নীলকণ্ঠ বা শিবের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে যা মূলতই পুরাণ এবং তা ভারতীয় পুরাণই বটে। তিনি ‘আয়ুস্তোত্র’ কবিতায় লিখেছেন:

‘‘উত্তরে গেলেন দেবী হৈমবতী দক্ষিণাস্যা যিনি গঙ্গাধারা স্নিগ্ধ জল দক্ষিণে গেছেন দেব নীলকণ্ঠ উত্তরাস্য তিনি পাথরে তুষারে ধবল

শব্দের টঙ্কারে ছিলা ছিঁড়ে গেলে ধুলো ছুঁলাম

মুখ থুবড়েছে আশরীর তীর অহো তীরন্দাজ তবে একে বলো নক্ষত্র খসানো বা মুহূর্ত চুরচুর শিশির পেছনে যে গাছে গাছ ডালে কাণ্ডেঘষা খেয়ে আগুন বেনাবন বা বটগাছ ছাই বীজ বুনেছো বীজ ছড়ালে লাফিয়ে উঠল সবুজ শিখায় এসব ছবি দেখতে দেখতে যাই।’’

মহাদেবের জটা থেকে নেমে আসা গঙ্গা বা হৈমবতী প্রসঙ্গই শুধু নয় এসেছে কালিদহ এবং নটরাজের কথাও। অন্যদিকে উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম কোণ এবং প্রতিটি কোণের দেবদেবীর উল্লেখ—এ সবই পুরাণ ছাড়া আর কিছু নয়, যা কবি তরুণ সান্যালের কবিতার টেক্সট বা দার্শনিক পরিসরকে বৃহত্তর ব্যঞ্জনায় নিয়ে যায়।

গ্রীক পুরাণের দেবী আর্টেমিস বিষ্ণুদের কবিতায় ভারতীয় পুরাণ উর্বশীর সঙ্গে মিলে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের একটা মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল যে ধারা, আশির দশকের বিশিষ্ট কবি অজিত ত্রিদেবীর ভাবনার জগতকেও স্পর্শ করেছে কবিতার পুরাণ প্রয়োগে। তিনি তাঁর ‘জ্যোৎস্নানগরে যুদ্ধজাহাজ’ (১৪১৮) কাব্যের ‘পালঙ্ক পাহাড়ের মেঘ’ কবিতায় গ্রীক পুরাণের দেবী আর্টেমিসের কথাও এনেছেন এইভাবে:

‘‘প্রকৃত পালক বৃক্ষকে নয় শুধু তার ভেতরে বাস করেন যে-দেবী আর্টেমিস, তাকেও নিহত ক’রে…’’

এই একই আর্টেমিস পুরাণ কী অসাধারণ কাব্য-সত্যে নতুন মাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে কবি তরুণ সান্যালের কবিতায়। কাব্যসমগ্র পাঁচ-এর ‘আর্টেমিস ভেনাস’ কবিতায় তরুণ লিখেছেন:

‘‘আয়নাটিকে মুছে নিস, শ্রীচৈতন্যের ওটি কিন্তু মার্জিত দর্পণ, ওখানে বিম্বিত হবি ভুষো মাখা সূর্যে তুই আর্টেমিস দেবলীনা ভেনাস, ষোড়শী তরুণী হয়ে বাকল ভেঙে গড়ে উঠলি ক্লাস টেন গড়ন, প্ল্যানেটরিয়াম পিছু দশ পঞ্চাশ টিকিটে ছিল ভাষণ সন্ন্যাস। তা তুই সুন্দরী তারা সূর্যের সমুদ্রে হলি ডলফিন সাঁতারু, তোকে দেখবো ভরসন্ধ্যায়, দেখবো ভোরে সপ্তর্ষির রূপসী বালিকা- ঘরবার তখন তোর, শাস্ত্রী দলে দিবি ছোঁয়া নীল পাথর চারু চোখ যখন ভূঙ্গ হয়, কপালে ঘামের রেখা হয়ে ওঠে জয় ললাটিকা।’’

বিশেষভাবে লক্ষ করতে হয় উল্লিখিত কবিদের কবিতায় আর্টেমিস পুরাণ তাঁদের নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যে ব্যবহৃত হয়েছে যেমন তেমনি কবি তরুণ সান্যালের কবিতায় সম্পূর্ণভাবে এক নতুন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে এই একই পুরাণের দেবী আর্টেমিস। কী অসাধারণ উচ্চারণ কবির—‘‘ওখানে বিম্বিত হবি ভূষোমাখা সূর্যে তুই আর্টেমিস দেবলীনা ভেনাস।’’ বোধকবি এই পুরাণ প্রয়োগগত নিজস্ব ধারার ক্ষেত্রে তরুণ সান্যাল তাঁর দশকের কবিদের মধ্যে একেবারেই স্বতন্ত্র। কবিতার রসব্যঞ্জনা ও ইঙ্গিত-ইশারাকে বহুমাত্রিকতায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবিধ পুরাণের প্রয়োগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরাণের কাহিনিটাই প্রলম্বিত পুনরাবৃত্ত হয়েছে সেই অর্থে কাব্যধর্ম সংশ্লিষ্ট হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তরুণ এক্ষেত্রে সফল তাঁর কবিতায় মিথের প্রয়োগ কখনওই কাব্যের রক্তমাংস বিচ্ছিন্ন ব্যাপার হয়ে ওঠেনি, তিনি কবিতার শর্তকে অক্ষুন্ন রেখেই পুরাণের ভাবনাকে অদ্ভুত নৈপুণ্যে শিল্পমণ্ডিত করে তুলেছেন।

বাংলা কবিতায় মিথের প্রয়োগ সব যুগেই ছিল, আছে এবং থাকবেও। সুদূর ভবিষ্যতে কিন্তু সময়কে ভাষা দিতে ও জীবনের নিগূঢ় সত্যকে তুলে ধরতে মিথ্যের আশ্রয় কবিভেদে নতুন নতুন মাত্রায় চিহ্নিত হয়। ফলে বোঝা যায় কে মিথকেন্দ্রিক কবিতায় কতখানি উত্তীর্ণ কিংবা অনুত্তীর্ণ। তবে এ কথা সত্য যে সচেতন-অবচেতনভাবে বাংলা কবিতার অস্থিমজ্জায় মিথের অনুসরণ বা আগ্রাসন কোনওভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার নয়—একজন প্রকৃত কবির ক্ষেত্রে যা বিশেষ অনস্বীকার্য। কবি তরুণ সান্যাল নিজের পুরাণ-প্রাজ্ঞতার কথা নিজের অধ্যয়নের জগতটিকে জাহির করতে নয়, কবিতার অন্তর্গত বেদ ও বোধকে বিস্তৃতি দিতে মিথের প্রয়োগ করেছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই।

একজন মার্কসীয় ধারণার মানবতাবাদী কবি হয়েও কীভাবে কবিতায় শোষণমুক্তির কথা বলার পাশাপাশি দেশ-জননীকে দেবীর অভিধায় উত্তীর্ণ করে ভারতবর্ষের প্রত্ন-পুরাণের আধারে নতুন ভাষ্য রচনা করা যায় তার প্রমাণ তরুণ সান্যালের কবিতা। যে কবি ‘নাস্তিকের দেবীবন্দনা’ কাব্য লেখেন সেই কবির একাধারে নাস্তিক্য ও আস্তিক্যবাদী দর্শনের সারাৎসারে পুরাণ-প্রকল্পের পুনর্নির্মাণে কতখানি সচেতন সেই বিষয়টিও দৃষ্টির অগোচরে থাকে না। ভারতবর্ষ একটি দেশ শুধু নয়, কবির দৃষ্টিতে ভারতমাতা বা দেবী—এই দেবী-ভাবনার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতাবাদী ভারতবর্ষের বৃহত্তম মানবের ধর্মীয় বিশ্বাস নিহিত পুরাণের দেবদেবীদের মিথক্রিয়া ঘটে যায়। একজন বস্তুবাদী কবি যিনি মূলতই নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী, অস্তিত্ববাদ তাঁর কাছে ঈশ্বর-চেতনার ঊর্ধ্বে মানবতাবাদেরই নামান্তর। তিনি অস্বীকার করতে পারেন না দেবী-ভাবনাকেও। মার্কসবাদীরা ধর্ম বা পূজার্চনা ইত্যাদিতে বিশ্বাস রাখেন না, দেবদেবী তাদের কাছে বড়ো নয়, মানুষই বড়ো। যে-কারণে মার্কস ধর্মকে ‘‘আফিম” বলেছেন—সেই মার্কসবাদে আমৃত্যু স্থিত থেকেও কবি তরুণ সান্যাল তাঁর কবিতায় আস্তিক ও নাস্তিক্যবাদকে মিলিয়ে দিলেন মূলতই পুরাণ-ভাবনার নবায়নের মধ্যে দিয়ে। বাংলা কবিতায় আর কোন মার্কসবাদী দর্শনে বিশ্বাসী কবি এই কাজ করেছেন, জানা নেই। এখানেই তরুণ স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রমী।

তাঁর কবিতার মধ্যে জারিত হয় পুরাণ আধারিত মানবতাবাদী দর্শন। মিথের অলৌকিকতা শেষ পর্যন্ত লৌকিকতার বাস্তবতায় নতুন মাত্রা লাভ করে। কবি বিষ্ণু দে-র কবিতায় সেই ত্রিশের দশকে একই মার্কসবাদী চেতনার সঞ্চার সত্ত্বেও যেভাবে মানবতাবাদের দিকটি পুরাণের সারাৎসারে মিলেমিশে গিয়েও প্রখর বাস্তবতায় চিহ্নিত হয়, তরুণ সান্যালও এক্ষেত্রে একই পথের অনুসারী। জন-দেবতা অর্থাৎ মানুষ যেমন শেষ পর্যন্ত তাঁর মার্কসবাদী বীক্ষাকে অন্বিত করেও দেবোপম মর্যাদায় অভিষিক্ত তেমনি তাঁর জন্মভূমি দেশ বা লালনভূমি বর্তমান ভারতবর্ষও। এক্ষেত্রে কিয়ের্কেগার্দ-এর কিংবা জাঁ-পল সার্ত্র-এর অস্তিত্ববাদের প্রসঙ্গে এসে যায়।

নাস্তিক বলতে সাধারণ অর্থে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বোঝানো হলেও এই ধারণা শেষ পর্যন্ত টেকে না। উল্লিখিত অস্তিবাদী দর্শনের নিরিখে সর্বোপরি কবি তরুণ সান্যালের অস্তিত্ববাদী বীক্ষায়—সেখানে নাস্তিক অর্থে ন অস্তি বা যে নিজের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করে না সে-ই। ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই সেটা চির বিতর্কিত বিষয় আর মার্কসবাদীদের কাছে গুরুত্বহীন। তাদের কাছে বস্তুগত ভাবনায় যা দৃশ্যমান তাই অস্তিত্ব এবং সেই অস্তিত্ববাদে তারা বিশ্বাস স্থাপন করেন।

এই অস্তিবাদী দর্শনের সূত্রে পুরাণ এবং মানবতাবাদী ভাবনা খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ায় বিশেষ করে লোকপুরাণে। মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যের দেব-দ্রোহী চাঁদ সওদাগর যে অর্থে মানবতাবাদী ও ঈশ্বর-বিরোধী, কবিশেখর কালিদাস রায়ের ‘চাঁদ সদাগর’ কবিতায় যিনি জানিয়েছেন— ‘মানুষই দেবতা গড়ে…’। তরুণ সান্যাল সেই বিশ্বাসে নিজেকে আমৃত্যু অনড় রেখে বুঝিয়ে দিতে চান দেবতার অস্তিত্ব মানুষের কল্পনায়, ভাববাদী বিশ্বাসে-যার বস্তুগত অস্তিত্ব নেই। কিন্তু মানুষ যে নিজে দেবতাকে নির্মাণ করে বিশ্বাসের পৃথিবীতে সে-ই বড়ো এবং অস্তিত্বমান। ফলে প্রচলিত পুরাণ-ভাবনা প্রয়োগের পথে তরুণ সান্যাল হাঁটেননি তাঁর কবিতায়, আর এখানেই তিনি নিজস্বতা চিহ্নিত, মার্কসবাদে বিশ্বাস রেখেও মানবতাবাদের দেব-অতিক্রম বিশ্বাস স্থাপনে অনতিক্রম্য।

রম্য রহিম তাঁর ‘মিথের জাতবিচার ও মিশরীয় মিথ প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধের এক জায়গায় মিথের প্রয়োগ-সীমারেখা, যুগপথ ইতিহাস ও তার সাহিত্যমূল্য সম্পর্কে বলছেন:

‘‘মিথ (Myth)-এর ব্যপ্তি বা সীমারেখা স্থান-কাল, মত-দর্শনভেদে কিংবা ইতিহাসমূল্য ও সাহিত্যমূল্য ভেদে হরেকরকম। বিশ্বজুড়ে খুঁজে পাওয়া বিবিধ মিথের উৎস যেমন আলাদা, তেমনি এর বিস্তার ও বিকাশ সম্পর্কেও রয়েছে নানাবিধ দৃষ্টিকোণ। আর এ কারণে একে যেমন একসূত্রে গাঁথা অনায়াসসাধ্য তেমনি তর্কাতীতভাবে উপস্থাপনও প্রায় অসম্ভব। এর উৎস ও বিস্তার প্রসঙ্গেও সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্দেশ করা যায় না। কখনো কখনো এসব মিথ-কাহিনীর ধারাবাহিকতার অনুসন্ধানে মতবিভেদের গোলকধাঁধায় পড়তে হয়। বিবিধ বিপত্তিকে মেনে নিয়েও আমাদের নিয়ত একটা ইচ্ছেই হলো মিথ-পুরাণের অন্তর্গত উৎসারকে সুবিন্যাস্ত আকারে পরিব্যাপ্ত করা।’’

কবি তরুণ সান্যাল এই ‘বিপত্তি’-কে সবসময় মনে রেখেছেন মিথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে, কারণ তিনি জানেন মানুষের দীর্ঘদিনের সংস্কার ও বিশ্বাস একত্রিত হয়ে যে মিথের আকার পায় সেখানে তার এক অনড় সংস্কার এমনভাবে শিকড় গাড়ে যেখানে আঘাত লাগলে সে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাই মিথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবিকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। তরুণ সান্যালের ‘কাব্যসমগ্র ৬’ (পৃ. ১৪-১৫)-এর কবিতায় কীভাবে তিনি মিথ ব্যবহার করছেন দেখা যাক, যেখানে বৌদ্ধ বা থেরি প্রসঙ্গের সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতি জগতের থ্যাচার, ইন্দিরা, সরজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখের অদ্ভুত একত্রিত সহাবস্থানে তিনি কবিতার টেক্সট গড়ে তুলেছেন। লিখছেন:

‘‘বৌদ্ধ মঠে নাকি থেরি প্রাধান্যেই চলে গেছেন থের, স্তূপের মাথায় দেশবিদেশে উড়তে থাকে কাযায় পতাকা, এক রাতে বুনন হবে রঙ লাগবে শুকনো হবে ঢের, নারী ছাড়া ঘোরন কে কঠিন চীবরে ধর্মচাকা। মার্কিন দেশে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প লড়েছেন- ইন্দিরা, থ্যাচার বা গোল্ড মেয়ার হয়েছেন জুড়ি, বহু মরা বিষনদী বালুভূমি সিমুম, অধুনা হয়ে ট্যাঙ্কের পিস্টন, কোনো দেবী পিছিয়ে যাননি, শক্ত তক্তে বসেছেন বহুড়ি।

ভারতের স্বাধীনতা যুগে মাদাম কামা সরোজিনী অরুণা ছিলেন বহুজন এমন কি মাতঙ্গিনী, নাগা গান্ধী বুড়ি, প্রীতিলতা কত কত না সংখ্যায় প্রতিভার আঁচে পুড়িয়ে কঠিন চীবর কতই গড়েছেন কাষায় এমন আছে হিমবন্তে ঘুরতে থাকা সংখ্যাতীত উপল বীক্ষায় একজন যোয়ান আর্ক, আরেকজজন রোজা-যুগে যুগে জনকন্যা থেরি হয়েছিলেন সুজাতার পায়সান্নে বুদ্ধ, খ্রীষ্টের জননী ও মা-মেরী।’’

ভারতীয় রাজনীতি বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কীভাবে নারী উত্থান ঘটেছিল সে কথাই এই কবিতায় মিথিক্যাল ডিসকোর্সে উঠে এসেছে। থেরি হল বৌদ্ধ মিথ এবং ভারতীয় রাজনীতিতে নারীশক্তির জয়গান বর্তমান কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

আরেকটি কবিতা ‘শুভোদয়া কাহিনী’-তে তিনি লিখছেন:

‘‘হলায়ুধ ভেবেছিলেন মহাযানী নালন্দা শেষ করে বেঁটে বামন জয় করে নেবেন নদীয়া বা লখনা কসবাটি সেই শুভোদয়া খাড়াখাড়ি মহাস্থানে গড় দিলেন গড়ে ভুসুক বেয়ে এসেছিলেন পদ্মাখাল, পেয়েছিলেন মাটি।’’ (দ্যাখো বেলেঘাটার খাল ক্যাওট বামুন করে দু পাড়েই বাস, ঐ তো পৈতা ফেলে কৃষ্ণ জালিক কিশোরী নাকি ঊর্ধ্ববাহু নাচে, শ্রমে গুরুনিতম্বিনী স্ফীতস্তনী গোড়ালিতে গা মাটি ছাইপাঁশ বংশীবাদন ওরা শুনেছে অদৃশ্যও কালা, খেল কদম গাছে।)

চণ্ডীদাস জ্ঞানদাস পদে পদে শুনেছেন মাধুকরীর সুর, খর খঙ্গ হাতে তাঁরাও, ভুলেছেন নারী-স্বভাবী অপাঙ্গের ব্রীড়া-লিখছে ওদিকে ব্যাস লিখন তুষানলে পুড়তে পুড়তে হলায়ুধ বল্লালী বাহানা আছে অগ্নিস্থলে বৈধব্যের পীড়া।

নালন্দার শেষে, বগুড়, মহাস্থান গড়ে, গুঁড়িয়েছে পুরুলিয়ায় স্তূপ, বুদ্ধ-জীন হয়েছেন শান্ত শিব, যা ছিল-বা ভাস্কর্যে নিরূপ- বালি নয় পাথরও নয়-গঙ্গা মাটি হয়েছেন পূজ্য লিঙ্গরূপ রামচরিতে গৌড়িয়া বালা দেন চুলে সুগন্ধীতে ধূপ

দ্যাখো তিনিই দোতলায় গবাক্ষে দেখছেন লাল গামছা কাঁধে বঙ্গবাসী, ওয়পস সোমনাথে, বেঁটে বামন শুভোদয়া লিখছে ভবিষ্যত মাপ, সেও নাকি সিরিয়াক কপটিক সুন্নী, ইরাকে পড়িয়ে দিচ্ছে ফাঁসি, শুনি নদিয়ার গোরা দশকেই দোজখ থেকে হয়েছেন পাপ।

হলায়ুধ পরিয়ে দেবেন কণ্ঠসূত্রে ভক্তদের বঙ্গশ্রী খেতাব।’’

লক্ষ করার বিষয় ইতিহাস-বৈষ্ণব সাহিত্য-জিনতত্ত্ব-বৌদ্ধ ও শাক্ত দর্শন ভাস্কর্য শিল্প সর্বোপরি চৈতন্যদেব প্রভৃতির উল্লেখের মধ্যে দিয়ে তাঁর কবিতার এই মিথ প্রয়োগ এক আশ্চর্য বহুমাত্রিকতা লাভ করেছে এবং বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্বে বঙ্গীয় কৃতি সন্তানদের সম্মানিতকরণ ও খেতাব প্রদানের মধ্যে দিয়ে তাঁদের প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানানোর বিষয়টিও অনুল্লেখ থাকেনি, কবি লিখছেন—‘‘হলায়ুধ পরিচয় দেবেন কণ্ঠসূত্রে ভক্তদের বঙ্গশ্রী খেতাব।’’ ফলে কবি তরুণ সান্যালের কবিতায় মিথের নবনির্মাণ ও প্রয়োগ, অতীত ও বর্তমান ইতিহাস রাজনৈতিক-সামাজিক স্তর থেকে সংগৃহীত অভিজ্ঞতা ও অনুষঙ্গের মধ্যে দিয়ে নতুনভাবে নির্মিত বা বিনির্মিত হয়েছে।

মিথের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে পুরাণের চরিত্রগুলি সমকালীন বাস্তবতার ভাষ্যের সম্পর্ক ও প্রকাশ-সূত্রে নতুন হয়েছে উঠেছে। একজন বহু অধ্যয়ন-সমৃদ্ধ কবি-ব্যক্তিত্ব হিসেবে কবি তরুণ সান্যালের প্রজ্ঞা-পরিধি বিস্তৃত ও অনেক সমৃদ্ধ। রামায়ণ-মহাভারত-বেদ উপনিষদ এবং পাশ্চাত্য পুরাণের নানাবিধ ঘটনা বিষয় ও আনুষঙ্গ তাঁর কবিতার ভূগোলকে যেমন বিস্তৃতি দিয়েছে তেমনি তাঁর কবিতার ভাষ্যকে বহুমাত্রিক ও শিল্প-সিদ্ধ করে তুলেছে। ‘ইলিয়াদের ষোড়ষ কাণ্ড থেকে রণক্ষেত্রে সমবেত যুযুৎসব’ নামক কবিতায় পাশ্চাত্য মহাকাব্যের প্রসঙ্গ ও হোমার ভার্জিল প্রমুখ মহাকবির উল্লেখ বুঝিয়ে দেয় কবি সময়কে ভাষা দিতে বা সম-সময়ের সমাজ বাস্তব ও জীবনদর্শনকে তুলে ধরতে কীভাবে মিথের প্রয়োগরে মধ্য দিয়ে তার কবিতাকে স্বতন্ত্র করে তুলছেন। লিখেছেন:

‘‘ইস্পাতের নীলে এসে বসেছে বাতাস দিনের আলোও যেন ঘন হয়ে মেঘে ফাঁক ফোকরে

নেমে এসেছে শিঙার শঙ্কুতে রোদ্দুরেরে একটি দীঘল রেখা যেন ফাঁস ঝুলে রয়েছে, শার্পেদনের শব শুইয়ে রেখে রোদ সমাজ তিনকোনা জমিনে জলদর্চি তীব্রতা তখন শঙ্কু পথে দু-হাত দু’পাশে ছাড়ানো মোম্-মোর শরীর যেন দেবতা ঘুমাচ্ছেন রক্ত তার গড়িয়ে যাচ্ছে হায়াসিস্থ বালি জমাট পিছল শ্যাওলায় তখন গ্লুকাস বললো কত সহজেই তুমি বন্ধুদের ভুলেছ, হেকতর? ওরা রক্তে মাখামাখি আর তুমি রোদ খাওয়াচ্ছ হাঁটু

তোমার ভ্রুক্ষেপও নেই—

ওরা মরছে গা থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে বিদেশিরা বর্ম-সাজপোশাক বন্ধুদের লাশ ওরা বিকৃত করছে, আমাদের শহীদদের হেনস্থা করছে, তুমি হুঁশিয়ার, তাই আমাদের মৃতদের এত অপমান আর কত সহজেই… অবহেলায়… শুওরমাথা কশাই দেবতাটি গ্রীক ব্রোঞ্জ বল্লমে খুঁচিয়ে আমাদের ঢেরজনাকে পেড়ে ফেলেছে, শার্পেদনও মারা পড়ল, হায় হায় হেকতর। একিলিসের তরুণ সাগরেদ তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করলো আর তুমি কিচ্ছুটি করলে না, কদিন আগেই তুমি শার্পেদনের মদত চেয়ছো। বলেছিলে ‘বাধিত’ হবো।’’

পাশাপাশি ‘ইনিডের পঞ্চম পুস্তক থেকে পলিনুরাসের ঘুম’ কবিতায় লিখছেন:

‘‘…চোখ না তুলেই পলিনুরাস জবাব দিলো তার,

‘‘সমুদ্রে শান্ত মুখ দিগদিন্ত তরঙ্গে বিস্তার বিশ্বাস কোরো না। সে তো এই নিবাত, এই ঝড়ো তুফান সমুদ্র দানব নেয় কী রূপ তা অজানা ব্যাখ্যান। ইনয়াসকে বোঝাতে হবে মন্দ মন্দ হাওয়ার চালাকি পিছে আছে ঝড়ঝঞ্ঝা সামনে নিস্তরঙ্গতার ফাঁকি। বিশ্বাস করেছি কতো সমুদ্রে ঢেউয়ের শান্ত নাচে নির্মেঘ বিশাল নীল যেন জলে গুলে মিশে আছে।’’

সে বজ্রবাহুর ঘেরে এই বলে চেপে ধরলো হাল দূর নক্ষত্রের দিকে ভারি চোখ, কিছুটা বেতাল, বৈতরণী থেকে দেতা ডাল এনে চামর দোলায়, সে শিশির সিক্ত হাওয়া বিস্মরণে অস্তিত্ব ভোলায়, ঢেউ ভাঙছিল ভ্রু-পাটায় ঢেউ ভাঙছিল মুদে আসা চোখে এক পা এক পা ঘুম এগোয়, ঢাকছে স্নায়ু ঘুমের নির্মোকে। আলস্যে কেমন যেন ভারি হয়ে উঠলো কেডুয়াল দড়িদড়া ছিঁড়ে জলে পড়লো, হাতে ছিটকে গেল হাল, গোলুই ডহর পাল কাছি ছাড়িয়ে ছুঁড়ে ফেললো জলে সেই ঘুম অগাধ ঘুম ভাসিয়ে দিলো ছল ছল কল্লোলে। “বাঁচাও বাঁচাও” বলে পলিনুরাস যতই দেয় হাঁক ঘুমে কাদা নাবিকেরা, চোখ ছুঁয়েছে ঘুম-পরীর পাখ। হোক তা প্রথম যাত্রা, জলযান হোক ভাসমান, দেবতা নেপচুন তাও টেনে নেন, যদি তিনি চান। সাইরেন পাহাড়ে ভেসে যায় জাহাজ ঘুম ঘুম মাতাল খাঁড়িতে যেখানে জমা কত কত, জাহাজী কঙ্কাল। হালে কোনো মাঝি নেই জাহাজ চলেছে কোনখানে নেপচুনের চোখে জল নিশি পাওয়া জাহাজের টানে! পলিনুরাস পাড়ি দিয়েছিল এসব সমুদ্র কতবার শুকোবে সৈকতে কিন্তু তার এবার শুকনো সাদা হাড়।”

প্রত্ন-নদীমাতৃক বাংলার মাঝি-মাল্লার জীবন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ভব সমুদ্রের পারাপারের চিত্রকল্পে কবি মিথের অনুসঙ্গ ব্যবহার করেছেন। ‘দেবতা’ শব্দানুষঙ্গে কীভাবে মিথের ব্যবহার করেছেন তা লক্ষণীয়।

ফলে এইসব কবিতার বক্তব্যবিশ্ব থেকে আমরা সহজেই বুঝে নিতে পারি তরুণ সান্যালের কবিতায় মিথ কখনই একমাত্রিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। মিথ ব্যবহারের পারস্পেকটিভ বা প্রেক্ষাপট নির্বাচনে তিনি সব সময় সচেতন এবং বহুমাত্রিক বক্তব্য প্রকাশের প্রতি মনোযোগী। শ্রেণি-বিভাজন ও ধর্ম কেন্দ্রিক এ দেশীয় বাস্তব রাজনৈতিক দ্বন্দু-সংকুল সামাজিক প্রেক্ষাপটে কবি তরুণ সান্যাল মিথ চয়ন করেছেন এবং সব সময় নিজের বক্তব্যকে সর্বজনীন জীবন ও সমস্যার অঙ্গীভূত করে তোলার দক্ষতাকে প্রমাণ করেছেন। প্রত্যেক কবির কাব্য রচনায় সচেতন এবং অবচেতন উভয়ভাবেই মিথের প্রসঙ্গ উঠে আসে। অবচেতনভাবে যে মিথ আসে তা যে চেষ্টাকৃত নয়, এবং ভেতর থেকে সতঃস্ফূর্তভাবে কাব্যরসের সঙ্গে মিলেমিশে আসে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু যখন সচেতন চেষ্টার মধ্যে দিয়ে মিথ আসে তখন তা কতটুকু কাব্যগত বক্তব্যের সম্পূরক হতে পেরেছে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়—কিন্তু কবি তরুণ সান্যালের ক্ষেত্রে তা হয়নি, তিনি বাস্তব এবং মিথের সমীকরণে কাব্যের শৈল্পিক নান্দনিক ধর্মকে অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছেন। বাংলা কাব্যে ত্রিশ দশকের কবি বিষ্ণু দে-র ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’, কাব্যে এমনকি রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘নাটক’ কবিতায় উর্বশীর কথা এসেছে। কিংবা তাঁর ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ কবিতায়ও। কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষেত্রে উর্বশী নির্মাণ যেন আলাদা। নজরুল ইসলামের কবিতায় গানে যেন একই উর্বশীর নবতর তাৎপর্যে বিনির্মাণ লক্ষ করা যায়—তাঁর ‘সুরলোকে বিহারিনী হে উর্বশী’ (গানের মালা) ইত্যাদিতে। কিন্তু এই মিথ প্রয়োগের ঐতিহ্যসূত্রে তরুণ সান্যাল তাঁর কবিতায় মিথকে আনলেও তাঁদের মতো নিরক্ত অনুভবে আটকে থাকেননি, বাস্তবের চরিত্রগুলিকে সংরক্ত করে তুলেছেন। এখানেই পাঁচের দশকের বাংলা কবিতার মিথ ব্যবহারে তরুণ আলাদা, বহুমাত্রিক। ‘কবিতাসমগ্র দুই’-এর ‘দেবীপক্ষ’ করিতায় তিনি ‘দেব দৈত্যের মিলল’ ভারতবর্ষের আশ্চর্য রসায়ন ঘটিয়েছেন:

‘‘চাপা পড়ে যাই ঘোর বৃষ্টির আঁচলে সে কী ভান ছিল কিরাতিনীবেশী গৌরীর বুকে ছিল ধ্যানে বটে ও পাকুড়ে রুদ্র দক্ষিণমুখ বেগুনিবরণ ধুতরোয় নেশা ধরা মনে নিছকই দৌড়োদৌড়ি ভেবেছি বুঝি বা মাথা হলো সাফসুতরো ঝরঝরে দেহ জলে ডুবে পানকৌড়ির’’

এই কবিতায় মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের দেবখণ্ড, নরখণ্ডের মধ্যে দিয়ে যে কিরাত-কিরাতিনী প্রসঙ্গ এসেছে তারই পুনর্নিমাণের মধ্যে দিয়ে লোকপুরাণের আশ্রয় নিয়েছেন কবি।

‘‘বিনিসুতো নয় আসন পঞ্চমুণ্ডীর ডাকিনীসিদ্ধ সাজালো পদাতি অশ্ব দেউলে ঘণ্টা পথে সার দিয়ে দর্শক বেকুব আমার চেরাবালি ঘেরা গণ্ডী সাধ ছিল দেখা ঘুচিয়ে মদনভস্ম বিবাহের রঙে রাঙা আকাশের চণ্ডী’’

এখানে তন্ত্রের ডাকিনী-যোগিনী বা পঞ্চমুণ্ডী সাধনার আধিভৌতিক পুরাণ কাহিনি উঠে এসেছে।

‘‘নদীর অঙ্গে রণরঙ্গিনী উল্কি কে দাগ এঁকেছে অমন সে নামও উহ্য বরং দেখছি এমনকি জলও পুড়ছে ঢেউয়ের মাথায় করাল নটিনী উল্কায় দেখছি সন্ধ্যা অস্তমেঘের মুর্ছায় আর স্রোতে যায় তারা চাঁদ ভাসা কল্কা পূব থেকে গেলে পশ্চিম ঘাটে সূর্য মুখ ঘসে দিল আহা রে বীর্যশুল্কা।’’

আলোচ্য অংশে দেখা যাচ্ছে সূর্যাস্তকালীন নিসর্গের বর্ণনায় আদিবাসী সমাজের প্রচলিত উল্কি প্রথার অনুষঙ্গ যা অরণ্যবাসী আদিবাসী লোকপুরাণের ঐতিহ্যকে স্মরণ করায়।

‘নাস্তিকের দেবীবন্দনা’ কাব্যের ভূমিকা জাতীয় গদ্যটিতে তিনি কিভাবে তাঁর কবিতায় নানাভাবে মিথের সংযোগসূত্র গড়ে তুলেছেন সে বিষয়ে লিখছেন:

‘‘এই কবিতাগুলির হয়ত কোন সংযোগ সূত্র আছে। বহু বছর ধরে এ-বাংলায় ও বাংলায় উপাসকদের ফেলে যাওয়া ভাঙাচোরা পাথরের প্রতিমা, বা উপাসিত পারিবারিক বা মন্দিরের বিগ্রহ, অথবা সাধারণ মৃৎপ্রতিমা দেখে আসছি। ভক্তের চোখে দেখা আর আমার মতো মানুষের চোখে দেখায়তো তফাত রয়েছেই। নদী পাহাড় অরণ্য বনভূমি দেখতে দেখতে, জানা প্রতিম-প্রতিমায় মানষ-মানুষীকে এর পরম সামঞ্জস্যে রূপ দিতে দিতে, এক সময় কাব্যবন্ধে শ্লোকে ছন্দস্পন্দনে আদি মাধুর্যে জেগে ওঠে এক মহাদেশ বন্দনা। আর তখন দেখতে থাকি কোনও শিল্পী কত ধ্যান, কত তীব্র অনুভব, আবেগঘন অভিজ্ঞতাকে সংহত করে, প্রকৃতিকে মানবায়িত করে, দেবমূর্তি দেবীমূর্তি গড়েছেন। বিশ্বচরারের মানবিক রূপ তিনি জেনেছেন। মন্দির মসজি গীর্জার গড়নেও তাই। মাথা তাদের মেঘ ছাড়িয়ে উড়ে যেতে চায়, কোন মহা ভাবনার পরমের দিকে। যারা এসব ভাঙে, কলুষিত করে, তারা সব যুগেই নিন্দাই। ‘নাস্তিকের দেবীবন্দনা’ এটুকুই। আর ঐ বন্দনার মধ্যেই রয়েছে পাথরের সঙ্গে পাথরের, রংয়ের সঙ্গে রংয়ের, এক অঙ্গের সঙ্গে অন্য অঙ্গের ছন্দিত সুষমা। এক পরম অনুশীলনে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব আদিম গুহা বা অরণ্যবাসীর বিস্ময়ে তখন শিল্পী হয়। বিশ্ব চরাচরকে তিনি দেখেন, অনুভব করেন, আপ্লুত হন, যার কেলাসিত রূপ তিনি আমাদের দেখান, যা মন্ত্র। আমি সে প্রাজ্ঞ নই, কিন্তু দেবী দর্শন করেছি, বন্দনাও করেছি। আমার সে দর্শনে যে বন্ধুরা সঙ্গী বা সঙ্গিনী ছিলেন, অথবা এখনও আছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার মত ভাষা খুঁজে পাই না।’’

এইভাবে তরুণের কবিতা থেকে কবিতায়, কাব্যগ্রন্থ থেকে কাব্যগ্রন্থে সর্বোপরি নানা বিষয়ের গদ্যেও কাব্যনাট্যে তিনি আসাধারণভাবে বাস্তবসম্পৃক্ততায় দেশবিদেশের নানা মিথের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, পাঁচের দশকের বাংলা কবিতায়। এভাবেই তিনি তাঁর নিজস্ব অবস্থানকে দৃঢ় ও অনতিক্রম্য করে তুলেছেন।

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev