| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কবি জয়নাল আবেদিন, কবিতার ফেরিওয়ালা : অমৃতাভ দে

Reporter
অমৃতাভ দে / ৮০২ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪

“এসো, পিছিয়ে এসো, নতুন জীবন নাও

পুরানো সব চিন্তাটিন্তা তুলে রাখো,

কাঁসাবাসনের মতো আবার বেজে ওঠো

সাক্ষী থাক নদীতীর, সাদা বক, উলুধ্বনি।”

ঝকঝকে রোদ উঠেছে, রাত শেষ হয়েছে।হাত বাড়িয়েছি তোমার দিকে। অভিমান নিয়ে বসে নেই আমি।যা বলতে চাও শুনবো সব। এসো কবি, কবিতার ফেরিওয়ালা। চোখ মেলে তাকাও। দেখো খেত জুড়ে দেখো অক্ষর ঘুমোয়। তুমি ক্ষেতের সব অক্ষর সাজিয়ে তুলতে চেয়েছিলে কবিতাপাতায়। শোনো মন্দিরে ঘন্টা বাজছে, মসজিদের আজান ভেসে আসছে। তুমি শুনতে পাচ্ছ? ভালোবাসার মানুষ তুমি। তোমার সব অসুখ নিতে চেয়েছিল তোমার কবিতাপ্রেমীরা। কবিতা থাকতে তোমার মৃত্যু হবে না। তোমার ঘরে কবিতার আলপনা। অভাবে-হাহাকারে কালো অন্ধকারে তুমি তো ছিলে। ডাক আসে, তুমি বলো, ‘আরেকটু দাঁড়াও/ অনেক কাজ পড়ে আছে। ‘কিন্তু কথা দিয়েছো, তাই যেতে হলোই।

তাই কি লিখলে, “কী নিয়ে বাঁচব। /তার চেয়ে মৃত্যুই ঢের ভালো/ শ্মশানের ছাই গায়ে মাখতে ইচ্ছে করছে/ কবরের অন্ধকারে শুয়ে থাকতে ভালো/ লাগছে আমার।”আমাদের হাতে তুমি মেঘ দিয়েছো, বৃষ্টি নামিয়ে চাষাবাদ করতে বলেছিলে। তোমাকে ছাড়া পারবো কী করে জল নামিয়ে নিতে? তুমিই তো লিখেছিলে — “এসেছি যখন তখন কেন যেতে হয়? / বুঝি না বুঝতে পারিনা কিছুই/শুধু পদ্মপাতায় জলের শরীর ছুঁয়ে ফুরিয়ে/ যেতে হয়।”

তাঁর মতো আমারও প্রশ্ন, ‘এসেছি যখন তখন কেন যেতে হয়?’ পদ্মপাতায় জলের শরীর ছুঁয়ে ফুরিয়ে যেতে হয়। কবিও হারিয়ে গেলেন। অসুখ জড়িয়ে ধরেছে তাঁকে। কিন্তু লিখেছেন, ‘অসুখ মানে তো ভেতরকে জাগিয়ে তোলা’। কবি তাঁর জীবনকে জাগিয়ে তুলেছেন,জাগিয়ে তুলেছেন তাঁর ভেতরকে। ডাক আসে, কিন্তু তিনি জানেন অনেক কাজ পড়ে আছে, অনেক স্মৃতি ছোট হয়ে আছে। আমিও জানি সবাই কবি নয়, তুমি কবি। কবি সবার থেকে আলাদা। তাইতো তুমি বলতে পারো “কবরখানার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কুড়িয়ে নিলাম আব্বার মুখ… যদি মাটি হতাম বুকে রাখতাম আব্বাকে।” তোমার বেঁচে থাকতে ভালো লাগে।

তুমিই তো লিখতে পারো ভাঙা বেল বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে আহত সাইকেল।দুই ধারে বিড়ির দোকান, কদম গাছ, সজনে ডাঁটা, এগিয়ে আসছে শিবিরপাড়া, কবিপল্লী, ঘোষ মোর, বড়বাজার, হালদার পল্লী, বারোয়ারি তলা। জলকাদা মাথায় করে চলে যাচ্ছে আহত সাইকেল। আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি কবি। তোমার কবিতা বইয়ের পাতায় পাতায় রঙ ছড়িয়ে আছে তুলোর মতন, রঙ গড়িয়ে পড়ছে, আমি মেখে নিচ্ছি সেই সব রঙ। গাছে গাছে, পাখির পাখায় পাখায়, নদীর জলে, দুব্বো ঘাসে কত রঙ। তুমি কোথায় গেলে কবি?

তুমিই তো বলেছিলে —

“একসঙ্গে থাকতে এসেছি, থাকবও

মৃত্যু হলে বলবো এখন যাও, যাওয়ার সময়

হলে ডাক দেবো — তখন এসো।

জীবনে জীবন জুড়ে কত বড় হয় — সমুদ্র না আকাশ

আমরা সবাই জীবনে জীবন জুড়ে হাজার বছর বাঁচবো।

আর কান্নাকাটি নয় — কাটাকুটি নয়

থাকতে এসেছি — থাকবো, বাঁচতে এসেছি

বাঁচবও।”

ভোরের কুয়াশা ভেঙে আমিও বড় রাস্তায় উঠি, তোমাকে খুঁজতে থাকি। কুয়াশায় হারিয়ে যেতে যেতে তুমি যেন বলে যাচ্ছ —

“এত কাছে তাও চিনতে পারলে না

আমি সেই ফেরিওয়ালা।

 

আমি সেই ভোরবেলা-যে ভোরে পায়চারি করে

আমি সেই দুপুরবেলা,যে দুপুরে ভাতঘুম ডাক দেয়।

 

অন্ধকার ঠেলতে ঠেলতে কাদা ঘাঁটি

শিশির মুছতে মুছতে দরজায় দাঁড়াই,

কথা ফোটা, ডেকে নিই পাখিদের, তারাও বেরিয়ে পড়ে।

 

এত হাঁটলাম তবু ব্যথা কমল কই

ব্যাবসাও হল না ঘরও হল না।

 

শেষমেশ তোমার কাছেই এলাম

তুমি মাথায় জল ঢেলে দাও, হাতে গামছা

তুলে দাও।”

নরম উচ্চারণে কবিতার পঙক্তি বুনে যেতেন তিনি, প্রিয় কবি জয়নাল আবেদিন। খুব ছোটবেলা থেকেই মানুষটাকে চিনি। খবরের কাগজ ফেরি করে চলেছেন দীর্ঘদিন, সঙ্গে হাজার হাজার কবিতা। ভোরের আজানের সাথেই ঘুম থেকে ওঠা, সাইকেলকে সঙ্গী করে চলে আসা আমাদের গ্রাম বড়ো আন্দুলিয়ায়, বাড়ি বাড়়ি পৌঁছে দেওয়া খবরের কাগজ। গ্রামে বাবার কাছে এসে পৌঁছাতে বহু পত্রপত্রিকা। ওল্টালেই মাঝেমধ্যেই চোখে পড়তো জয়নাল আবেদিনের কবিতা। চায়ের আসরের আড্ডায় পেয়েছি তাঁকে। কোনো কোনো দিন সকালে ঘুম ভাঙত তাঁর ফোনে। জীবনযাপনই তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল। শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। তবু কবিতা লেখা থামেনি। মৃত্যুর মৃত্যু দেখে যেতে চান তিনি। অন্ধকার দেখে বারবার ফিরে আসেন। অন্ধকারকে তবে কি ভয় পান তিনি? মৃত্যুকেও? নাকি জীবনকে ভালবাসতে চান। খোঁজেন সেই পথ, যে পথে গেলে আকাশকে ভাসিয়ে দিতে পারেন আকাশে, পূর্ণতার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারেন আমাদের ভিতরে। আমার প্রিয় মানুষটি কবিতার ফেরিওয়ালা হয়ে আরও অনেকটা পথ হেঁটে যাবেন ভেবেছিলাম — হাতে তুলে দেবেন অসুখহীন ভোর, জীবনের ঘ্রাণ। কিন্তু চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে, কবিতাকে ছেড়ে। কবির জীবনাবসান হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর, ২০২২। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। দরিদ্র কৃষিশ্রমিক পরিবারের ছেলে জয়নাল, প্রকৃত অর্থেই ছিলেন শ্রমজীবী এক কবি।

জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯-এ, নদিয়া জেলার চাপড়া থানার বানিয়াখড়ি গ্রামে। বাবার নাম দবিরউদ্দিন সেখ, মায়ের নাম জয়লাপি বিবি। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে জুনিয়র বেসিক ট্রেনিং নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, চাকরি পান নি। সারা জীবন বেকারির রুটি ও দৈনিক কাগজের ফেরিওয়ালা হয়ে রইলেন। কবিতা তাঁর সঙ্গী, তাঁর যাপন। ‘সাঁঝের অনুস্বরে’ কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধে কবি প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছিলেন — “জয়নাল আসলে জীবনের কবি। পেশা যখন কবিতায় ছবি হয়ে ফুটে ওঠে, তখন কবি একেবারেই অকপট। জয়নাল তাঁর পেশাকে মহিমান্বিত করেছেন দ্ব‌্যর্থক ভাষায়। এই কবিতার প্রাত্যহিকতায় হতাশা নেই, আক্ষেপ নেই ভাগ্যকে দোষারোপ নেই — আছে অকপথ স্বীকারোক্তি। প্রকৃত প্রস্তাবে জয়নাল দাহ আর দহনের কবি। দারিদ্র্যের আগুনে তাঁর পাঁজরের হাড়গুলো যেন কঠিন ইস্পাতে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও তিনি রোমান্টিক। আগুন নিভে গেলে ঝলসে যাওয়া পাতারাও মৃদুমন্দ বাতাসে নড়ে ওঠে, আর এক মুহূর্ত বাঁচার প্রত্যাশায় মেঘ প্রার্থনা করে। জয়নাল পুড়তে পুড়তে বাঁচেন, বাঁচতে বাঁচতে পোড়েন, কিন্তু থামেন না।… বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়েও তিনি তাঁর কাব্যের মায়াবী সেতারে বাজিয়ে চলেছেন জীবনেরই সুর।” মনে পড়ছে কয়েকটি লাইন —

“ভোরবেলা কাকে খুঁজছো? নিজেকে?

সে তো বেরিয়ে গেছে জীবন খুঁজতে

ফিরবে সেই বৃষ্টির পর যখন ঝিঁঝিঁ পোকাদের

আসর বসবে।”

বাংলা ভাষার প্রায় সমস্ত উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। দেশ, আনন্দবাজার, আজকাল, যুগান্তর, সংবাদ প্রতিদিন, কৃত্তিবাস, নন্দনে, নবকল্লোল, যুবমানস, সৈনিক সমাচার, উদ্বোধন, কবিসম্মেলন,কবিতা প্রতিমাসে, শুকতারা, আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর কবিতা পাঠককে মুগ্ধ করেছে। ছোটোদের জন্য লিখেছেন অজস্র ছোটোদের কবিতা। অজস্র লিটল ম্যাগাজিনে লিখেছেন। আকাশবাণীর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। আকাশবাণীর বাংলা কথিকা বিভাগে কথিকা বলেছেন। স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরে কবিতা বলেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো —

ঘরেও নেই বাইরেও নেই আমি

ক্ষেত জুড়ে অক্ষর ঘুমোয়

ভুলের মধ্যে ফুলের মধ্যে

পায়ের ভেতর পা

সাঁকোর নিচের জীবন

শিশিরের শব্দ

মেঘ দিলাম বৃষ্টি নামিয়ে নিও

অন্তর্গত বাঁশি

দুধ জমেছে ধানে (ছড়া)

আধুনিক গজলের বই

আল্লা আমার চোখ খুলে দাও (গজল)

গজলের গজল

নাতনির ছড়া

মহরমের জারি গান

সাঁঝের অনুস্বরে

সেতার (কবিতা সংকলন, রামকৃষ্ণ দে ও হজরত আলীর সঙ্গে)

এ তো গেল তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির নাম। অসংখ্য কবিতা অগ্রন্থিত অবস্থায় রয়ে গেছে — বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়ানো ছিটানো সেই সব কবিতা। আসলে কবিতা ছিল তাঁর ঘরগেরস্থালি।

‘ভেতরেও নেই বাইরেও নেই’ আমি গ্রন্থের মুখবন্ধ লেখা ছিল — “মাটির দাওয়া আর খড়োচালের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এক কন্ঠস্বরের ওঠা নামায় বাতাস কী কাঁপছে! মাঠে মাঠে সর্ষেফুল আর প্রজাপতি তাঁর কথা শোনে, তাঁর সঙ্গে কথা বলে। তাঁরর তাপদগ্ধ জীবনে ছায়া দিতে আসে মেঘের আলাপ। অন্যরকম সেসব কথোপকথনে কান পাতে দিগন্ত। সাদা পাতায় সম্পন্ন ভোর। আর অপূর্ব আলোর বন্যায় ভাসে ফুরিয়ে আসা ওষুধের শিশিতে অন্যরকম জীবনরস ভরে পান করা এক রুগ্ন কবির মুখ।”

সেলিম উদ্দিন মন্ডল ও সালমা আহমদকে ‘তবুও প্রয়াস’ পত্রিকার পক্ষ থেকে নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন —

“আমি জীবন ছাড়া কবিতা লিখি না।আমার জীবনের সঙ্গে অন্যের জীবন যদি মিলে যেতে না পারে তাহলে সেটা কবিতা হবে না তো। আরো একটা ব্যাপার সোজাভাবে এক কথায় না বললে তো মেনে নেবে না পাঠক। কলকাতা আর গ্রামের পাঠকের মধ্যে তফাৎ আছে। কিছু কবিতা আছে কলকাতার লোক বুঝবে কিন্তু গ্রামের লোক বুঝবে না।”

‘দেশ’ পূজাসংখ্যা ১৪১৭-এ প্রকাশিত একটি কবিতা শোনাতে ইচ্ছে করছে, কবিতার নাম ‘ইচ্ছে’।

আজ ভোরবেলাতেই ইচ্ছেগুলো ঝরে পড়ছে কুয়াশার ভেতর,

আর আমি দুমড়ে মুচড়ে খানখান হয়ে যাচ্ছি কাপ ডিশের মতন,

এমন চলতে পারে না, চলতে দেওয়া যায়ও না,

তাই সুর্যকে বলেছি সব মুছে দাও, বেলাকে

বলেছি আরও উজ্জ্বল হও, আমার ইচ্ছেগুলোকে

বলেছি সস্তায় ঝরে যেও না।

তিনি বিশ্বাস করতেন, “কবিতা যেদিন শেষ হয়ে যাবে সেদিন পৃথিবীও শেষ হয়ে যাবে।” কাব্যগ্রন্থ ‘অন্তর্গত বাঁশি’ (প্রকাশক : তবুও প্রয়াস, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২০) পড়তে পড়তে মনে পড়ে যাচ্ছিল অনেক কথা। জীবনযাপনই তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল। শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন দীর্ঘদিন। তবু কবিতা লেখা থামেনি। মৃত্যুর মৃত্যু দেখে যেতে চান তিনি। অন্ধকার দেখে বারবার ফিরে আসেন। অন্ধকারকে তবে কি ভয় পান তিনি? মৃত্যুকেও? নাকি জীবনকে ভালবাসতে চান। খোঁজেন সেই পথ, যে পথে গেলে আকাশকে ভাসিয়ে দিতে পারেন আকাশে, পূর্ণতার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারেন আমাদের ভিতরে। কিন্তু উঠোনের নিম গাছটাকে ভেঙে যেতে দেখে কেন নিজের দিকে তাকান? তবে তারও কি ভেঙে যাওয়ার সময় হল?

যাওয়ার সময় হল

ছায়ানীড় দিচ্ছে রোদ, শরীর শুকোতে শুকোতে

তেতে উঠলে খসে পড়ো না পিছন ফিরে দেখে নিয়ো

কেউ আছে কিনা?

কেউ আছে কিনা? (গাছ)

আমিও কবির মতো ‘যেখানেই শুরু করি ফিরে আসি একই জায়গায়। দেখি মাঠের ভেতরের মাঠ ককিয়ে ওঠে, তাকে বলি শান্ত হও, বৃষ্টি নামবে এখুনি।’ সুরের ভেতরে থাকা আলাদা যে সুর খেলে বেড়ায় সব সময় সেই সুরকে খুঁজে চলি। চাওয়া-পাওয়া খেলতে খেলতে হারিয়ে যায় দিন। কিন্তু এতদিনের সম্পর্কগুলোকে টাঙিয়ে রাখি ক্যালেন্ডারের পেরেকে।

‘ছায়া’, ‘দিন’, ‘ছবি’, ‘অপেক্ষা’, ‘ব্যর্থ রাতের ছবি’ ‘গ্রাম থেকে’, ‘পাড় ভাঙার শব্দ’, ‘প্রতিযোগিতা’, ‘আকাশ’, ‘অলক্ষুণে বাতাস’, ‘কিছু শব্দ কিছু কথা’, ‘আড়াল’, ‘নিম গাছ’, ‘জল’, ‘যদি’, ‘বাবা’, ‘সম্পর্ক’, ‘ঘুমের ভেতর’, ‘মৃত্যু’, ‘জলছবি’ প্রভৃতি কবিতা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল কোনো এক নৈরাশ্য, হতাশা, যন্ত্রণা কবিকে ক্ষতবিক্ষত করছে প্রতিটি মুহূর্তে। শূন্য থেকে খসে পড়া জীবন আকাশকে মাথায় রেখে সামনের দিকে হেঁটে চলে।মনে হয় ‘ভালোবাসতে শিখিনি বলে ভালোবাসা অভিমান নিয়ে ফিরে যায়। ‘পাড় ভাঙার শব্দ’ শুনতে শুনতেও নতুন ভাবে পথ হাঁটার কথা ভাবি —

“এসো অন্ধকার ভেঙেচুরে গড়ে ফেলি সংসার

সাদা চশমা ফেলে দিই, সবকিছু সরল দেখি

আড়ালে থাক পাড় ভাঙার শব্দ, এসো হারানো পথ খুঁজে নিয়ে আবার সামনের দিকে হাঁটি।”

২০১৭-এ ‘তবুও প্রয়াস’ প্রকাশ করেছিল কবির একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘ দিলাম, বৃষ্টি নামিয়ে নিও’। কাব্যগ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি আমি আগেও উল্লেখ করেছি — ‘কবরের অন্ধকারে শুয়ে থাকতে ভালো / লাগছে আমার।’কবরের অন্ধকারে শুয়ে আছেন কবি।শব্দের ভিতরের অন্তর্গত বাঁশি শুনতে শুনতে ভাবি ব্যর্থ রাতের ছবি আর দেখব না। বাঁক ঘুরে ঘুরে বেঁচে থাকা ভালো লাগে না। কিন্তু শব্দশ্রমিকের হাত ধরে শব্দ খুঁজে চলি, কথা খুঁজে চলি, জানি বৃষ্টি নামবে, পাতায় পাতায় প্রজাপতি লাফ দেবে, ‘আমি গেয়ে উঠি থই থই জীবন’।

ভালো থাকতে চেয়েছেন কবি, নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করে ভালো থাকতে চেয়েছেন।নিজেকে নিজের জ্বালানো আগুনে পুড়িয়ে ভালো থাকতে চেয়েছেন। ভোরের শিশিরে লুকিয়ে-থাকা গল্পগুলোকে চোখ মেলে দেখেছেন। তাইতো তিনি সে ছবির ভেতরে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। ভোরের কুয়াশা তাঁর সঙ্গী। ভোরের কুয়াশা ভেঙে ভেঙে রাস্তায় উঠতেই বাস চলে যায়। কোথাও কি যেতে চেয়েছেন কবি? প্রেয়সীর কাছাকাছি কিন্তু যাওয়া হয়নি। ফিরে গেছেন ঘরে।

আমার বাবা রামকৃষ্ণ দে’র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। আমাদের জনপদে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক আমাদের প্রজন্মকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর বাবা লিখেছেন —

“দ্বিজেন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শতাব্দীবরণ কাব্য পুরস্কার, বুলবুল ও নতুন গতি পত্রিকার সম্মাননা ইত্যাদি নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন কবি। শুধু দারিদ্র্যের সঙ্গেই নয়, আকৈশোর অসুস্থতার সঙ্গেও লড়াই করেছেন জয়নাল। কিন্তু তাঁর চলে-যাওয়াটা বড়োই আকস্মিক। মৃত্যুর মাত্র দিন দুই আগেও সাহিত্য অকাদেমির ‘গ্রামালোক’ অনুষ্ঠানে একগুচ্ছ কবিতা পড়লেন তিনি। এক অখ্যাত পল্লির, খেটেখাওয়া অতি সরল সাদাসিধে মানুষ হয়েও তিনি তাঁর লেখালেখির সূত্রে আদায় করে নিয়েছেন কবিতার সঙ্গে থাকা মানুষদের সমীহ আর ভালোবাসা। নদিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম বানিয়াখড়ির ভূমিপুত্র জয়নাল আবেদিন চাপড়া জনপদের অন্যতম সম্ভ্রমচিহ্ন। তাঁর সমকালীন নদিয়ার সারস্বত চর্চার ইতিহাসরচনা তাঁকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।”

কবিতায় লিখেছেন ‘ভোর আমারও ভালো লাগেনা’, অথচ প্রতি ভোরে ফসলের ক্ষেত পাশে রেখে কবি পেরিয়ে যেতেন পথ,পৃথিবীর খবর তাঁর মুঠোর ভিতর, পৃথিবীর নানা রং তাঁর চোখে। আসলে যত বেলা বাড়ে ততই ভোর তাঁকে তাড়া করে। তিনি রাতের গভীরে ঢুকে পড়েন। কবিতার উঠোনে লক্ষ লক্ষ শব্দ ছড়িয়ে দিয়ে রাতের গভীরেই চলে গেলেন কবি।

আমার সম্পাদিত ‘জীবনকুচি’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। কবিতা লিখেছেন নিয়মিত। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই তাঁর কবিতা সংগ্রহ নিয়ে কথা হচ্ছিল। তরুণ প্রকাশক শুভদীপ সেনশর্মা তাঁর কবিতা সংগ্রহ সম্পাদনার দায়িত্ব আমার উপরেই দিয়েছে। নিজেই জানিয়েছিলেন সমস্ত কবিতা গুছিয়ে আমার হাতে তুলে দেবেন। কবি আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর কবিতা একত্রিত করা চেষ্টা করে যাবো আমি। ছাত্র দীন মহাম্মদ সেখ তাঁর ‘কাব্যকণ্ঠ’ পত্রিকার উদ্যোগে এ বছর থেকেই ‘কবি জয়নাল আবেদিন স্মৃতি সম্মান’ প্রদান শুরু করেছে। এ বছর এই সম্মান পেলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আনসারউদ্দিন। কবি জয়নাল আবেদীন বেঁচে থাকবেন আমাদের মননে, আমাদের চিন্তনে।

“ওগো, ফেরিওয়ালা কবি, তুমি ঘরে ঘরে কবিতার বীজ রোপণ করে দিও,

ভালোবাসা গাছ হয়ে ফুটবে ঠিকই দেখো।”

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev