ভাগ্য যে আছে বা ললাট লিখন যে আছে, একথা অনেকেই মানেন না। কিন্তু পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জীবন লক্ষ্য করলে দেখা যায় কেউ কেউ যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য হয়ে জন্ম নিয়েছেন আবার কেউ একেবারেই অভাগা। বিশেষ প্রতিভা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেও সম্যক খ্যাতি অনেকেরই জীবদ্দশাতে অধরা থেকে যায়। অথচ আশ্চর্য এটাই, বা খানিক হাস্যকরও বটে, যে এই মানুষগুলি মৃত্যুর পর পেয়েছেন অসামান্য খ্যাতি ও প্রশংসা। অথচ বেঁচে থাকতে এঁদের কপালে জুটেছে উপহাস, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা। এঁদের হাঁটাচলা, কথাবলার ধরণ, এঁদের সৃষ্টি সবকিছুই এঁদের জীবদ্দশাতে মর্যাদা পায় নি, কিন্তু যেই এঁরা মারা গেলেন, বা কেউ কেউ তিলে তিলে শেষ হলেন অবসাদে, মৃত্যুর পর তাঁদেরই সৃষ্টি হয়ে উঠল অমৃতময়।
কার নাম নেই এই অভাগাদের তালিকায়!
বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। যিনি রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী যুগে একটি নতুন ধারার জন্ম দিলেন, তাঁর জীবন যদি দেখি তাহলে শুধু ব্যর্থতা আর হতাশা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। জীবিত অবস্থায় প্রাপ্য কোনও সম্মান তাঁর কপালে জোটে নি। তাঁর মৃত্যুর পর জানা গেল যে তিনি কবিতা ছাড়াও একশটি উপন্যাস ও একশো আটটি ছোট গল্প লিখে গেছেন। বেঁচে থাকতে যাঁর কোনও লেখাই সেভাবে আলোচিত হয় নি। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কেটেছে। জীবনানন্দের জীবদ্দশাতে কবি বুদ্ধদেব বসু একক চেষ্টায় ছাপান জীবনানন্দের একশো এগারোটি কবিতা। তবু জনপ্রিয়তা আসেনি।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পাবার পরেই তিনি সিটি কলেজের চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয় ও ছাত্র ভর্তির হার ভীষণ কমে যায়। ফলস্বরূপ আর্থিক সমস্যাগ্রস্ত কলেজ প্রথমে জীবনানন্দকেই চাকরিচ্যুত করে। এর ফলে কবি অবসাদে ডুবে থাকতেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সুখের মুখ দেখেন নি। গৃহগত সমস্যাতেও জেরবার ছিলেন। যে কবিতা তিনি আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলেন সেই কবিতা নিয়েও সাহিত্যচক্রে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সে সময়ের প্রখ্যাত সমালোচক সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠি পত্রিকায় কবির রচনার নির্দয় সমালোচনা করেন। অনেকের উপহাসের পাত্র হতে হয় তাঁকে বহুবার। চাকরির সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে তাঁকে। গৃহশিক্ষকতা করেছেন। কলেজে চাকরি পেলেও বেশিদিন সে চাকরি টেকে নি।
লাবণ্য গুপ্তকে পেয়েছিলেন স্ত্রী হিসেবে। দাম্পত্য জীবনও সুখের হয়নি কবির। ১৯৩১ সালে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। ওই সময়েই তাঁর ক্যাম্পে কবিতাটি প্রকাশিত হয় এবং তীব্র সমালোচনার শিকার হয়। কবিতার আপাত বিষয় ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। এই কবিতাকে অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালে শ্রেষ্ঠ কবিতাগুচ্ছ পেল ‘সাহিত্য একাডেমি’ পুরস্কার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৫৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ‘রবীন্দ্র মেমোরিয়াল’ পুরস্কার। সারাজীবন অবসাদ আর অপমান যাঁর জীবদ্দশাতে নিত্যসঙ্গী। সহলেখক, সহঅধ্যাপকদের কাছেও যিনি সহমর্মিতা পাননি। নিজের কষ্ট কারোর কাছে মন খুলে বলতেও পারতেন না। অবসাদ যাঁকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ মৃত্যু এল কলকাতার সবথেকে ধীর গতির যান ট্রামের ধাক্কায়। এত গুণী একজন মানুষ হয়ত চলে যেতেই চেয়েছিলেন এই নিষ্ঠুর পৃথিবী ছেড়ে।
আরও একজন বিখ্যাত কবির প্রায় সমস্ত কবিতাই ছাপা হয় তাঁর মৃত্যুর পর। একমাত্র ‘ছাড়পত্র’ ছাড়া আর সব কবিতা ছিল অন্তরালে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং কবি ও গীতিকার সলিল চৌধুরী তাঁর কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় দেশাত্মবোধের সঙ্গে মিশেছে সামাজিক চিন্তাধারা ও মানবিক বোধ। জন্ম ১৫ই আগষ্ট ১৯২৬ আর মৃত্যু ১৩ই মে ১৯৪৭। মাত্র একুশ বছর যাঁর জীবনকালের পরিসীমা তাঁর কবিত্ব শক্তি এক অত্যাশ্চর্য উদাহরণ স্বরূপ। স্কুলের একটি পত্রিকায় হাসির গল্প দিয়ে যাঁর পথ চলা শুরু। অসহায় নিপীড়িত মানুষের জন্য যাঁর শানিত কলম বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র স্থান করে নেয়। কোনও কবির আড়ালে তিনি হারিয়ে যাবার নন, তিনি একেবারে স্বতন্ত্র একটি জায়গা করে নিতে পেরেছেন অত কম বয়সেই। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর অত্যাচার তিনি করলেন তার ফলস্বরূপ প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগ বাসা বাঁধে তাঁর শরীরে। মাত্র একুশে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে। মৃত্যু পরবর্তীকালে কিশোর কবির খ্যাতি লাভ।
বাংলার এই দুই হ্রস্বজীবি কবি ছাড়াও বিশ্বের আরও অনেক স্বনামধন্য কবি আছেন যাঁরা নিজের জীবিতাবস্থায় খ্যাতি দূরে থাক, তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাননি।
রোমান্টিকতা ও আবেগের যথাযথ ব্যবহারে কবিতার মধ্যে কল্পনার এক জগতের সৃষ্টি করেছিলেন ইংরেজ কবি জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১)। সমগ্র সাহিত্যজগতে আজ তিনি অত্যন্ত সমাদৃত। কিন্তু বেঁচে থাকতে তিনি শুধু পেয়েছেন সমালোচকদের তীব্র নিন্দা ও প্রকাশকদের বঞ্চনা। ডাক্তারি পড়া ছেড়ে কিটস এসেছিলেন কবিতার প্রাঙ্গণে। কিন্তু তাঁর লেখা কবিতা সংগ্রহ ‘Sleep and Poetry’, ‘Ode to a Nightingale’, ‘On first looking into Champan’s Homer’ ইত্যাদি একেবারে নাকচ করে দিল প্রকাশকরা। একই সময় বায়রন আর শেলি উঠতি কবি। তাঁদের বন্ধু লেই হান্টের সঙ্গে পরিচিত হলেন কিটস। তিনি প্রকাশ করলেন কিটসের বই। কিন্তু ভাগ্যে ব্যর্থতা ছাড়া কিছু জুটল না। এরপরে হান্টের সহায়তায় কিটস নতুন প্রকাশক পেলেন। এই প্রকাশকের মাধ্যমে পরিচয় হল তাঁদের আইনজীবী রিচার্ড উডহাউসের সঙ্গে। রিচার্ড কিটসের লেখার সমঝদার ছিলেন। তিনি সমালোচকদের সমালোচনা সত্ত্বেও কিটসের সমস্ত বই কিনে সংগ্রহে রাখতেন। কিন্তু তবু কিটসের ভাগ্য বদলায় নি। এর কারণ কিছুটা সামাজিক ও কিছুটা রাজনৈতিক। সমাজের উচ্চকোটির মানুষ তাঁকে অযোগ্য ভাবতেন কারণ কিটস কোনো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। তাই তাঁর নাকি শিক্ষার অভাব।
১৮১৯ সালে অসুস্থ কিটস পড়লেন কঠিন অর্থাভাবে। অর্থাভাবে তিনি পেশা বদল করার কথাও ভাবলেন। তবু আবার প্রকাশকের কাছে গেলেন ‘Lamia’, ‘Hyperion’, ‘The Eve of St. Agnes’ নিয়ে। কোনোটাই প্রকাশকদের পছন্দ হল না। সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো সেই একই কালরোগ যক্ষ্মা তখন গ্রাস করেছে কিটসকে। ১৮২০ সালে এতকিছুর মধ্যে ছাপা হল কিছু কবিতা। এই সময় আচমকা সামান্য প্রশংসা পেল তাঁর কবিতা। এইটুকুই তাঁর প্রাপ্তি হয়ত। মাত্র পঁচিশ বছরে চলে গেলেন কবি চরম অতৃপ্তি নিয়ে। শেলি তাঁর স্মরণে লিখলেন ‘Adonois’ নামে একটি কবিতা। টি. এস. ইলিয়ট লিখলেন সর্বকালের সেরা কবিদের মধ্যে কিটস অন্যতম। ১৮৪৮ থেকে ১৮৭৮ এর মধ্যে কিটসের সব সৃষ্টি প্রকাশিত হল। কিন্তু কবি জানতে পারলেন না।
পার্সি বিশি শেলি ইংল্যান্ডের রোম্যান্টিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ১৭৭২ সালে ৪ঠা আগষ্ট ইংল্যান্ডের লন্ডন শহর থেকে চল্লিশ মাইল দূরে ফিল্ড প্লে নামে বর্ধিষ্ণু অঞ্চলের এক অবস্থাপন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সারা জীবনে শুধু অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা আর প্রত্যাখ্যান ছাড়া বিশেষ কিছু পাননি। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টারিয়ান পিতা শেলিকে পড়তে পাঠালেন সেরা স্কুল ইটনে। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে শেলি পেলেন বন্ধু টমাস জেফারসন হগকে। তৎকালীন সমাজ রাজনীতি নিয়ে দুই তরুণের মধ্যে আলোচনা চলে। এসবের মধ্যে শেলি লিখলেন ‘দ্য নেসেসিটি অব এথেইজম্’ এই গ্রন্থটি। শেলির পিতা ক্রুদ্ধ হলেন। যিনি নিজে আইনের রক্ষাকারী তাঁর ছেলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কলম ধরেছে – এটা তো তাঁর কাছে বিড়ম্বনা। শেলি বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিষ্কৃত হলেন।
পিতা ও পুত্রের সম্পর্ক ছিন্ন হল। সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন শেলি। সেই যুগে পিতা পুত্রের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব থাকাই স্বাভাবিক ছিল। তাই পুত্রের মন বোঝার দায় পিতার ছিল না। পুত্রকে আরও দূরে সরিয়ে দিলেন পিতা। রাজপুত্রের মত যাঁর জীবন কাটার কথা, ব্যারনের বংশধর সেই শেলি এখন নিরাশ্রয়। প্রচন্ড অর্থকষ্টে পড়েছেন। কিন্তু লেখার ধরন পাল্টে ফেলেন নি। এত কষ্টের মধ্যেও এল প্রেম। বিবাহ। শেলির পিতামহ বিপুল সম্পত্তি রেখে মারা গেলেন। শেলির পিতা কিন্তু সেই অর্থ পুত্রের হাতে তুলে দিলেন না। এমনকি পুত্রকে বাড়িতে প্রবেশাধিকার দেওয়া হল না। দরজার বাইরে থেকে রিক্ত হাতে শেলি ফিরে এলেন। এদিকে তাঁর নতুন ভাবনাও পাঠক গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে বইও বিক্রি তেমন নেই।
আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে শেলি দাঁড়িয়েছিলেন। ‘হেলাস’ নাট্যকাব্য শেলির বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ। শেলির সর্বোৎকৃষ্ট রচনা ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’। গ্রীক পুরাণ অনুসারে প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে মর্ত্যের মানুষকে দিয়েছিলেন। তাই তাঁকে শাস্তি পেতে হয়। ককেশাশ পাহাড়ে জুপিটারের নির্দেশে তাঁকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। শেলি তাই আশার আলো জ্বালিয়ে লিখলেন ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’। কারণ প্রমিথিউসের মুক্তি মানে সমস্ত মানবজাতির মুক্তি। কিন্তু এই আশাবাদী কবিকে জীবন ক্ষমা করে নি। তাঁকে কষ্টে দুঃখে বলতে হয়েছে — I fall upon the thorns of life, I bleed. সমসাময়িক সমাজ, তাঁর পরিবার কেউ তাঁকে গ্রহণ করেনি। গ্রহণ করেছে ঝড়, গ্রহণ করেছে সমুদ্র। তিরিশ বছর বয়সের আগেই নৌকোডুবি হয়ে শেষ হল তাঁর সমস্ত কষ্টের (১৮২২)। নিজের শহর লন্ডন থেকে অনেক দূরে ইটালির সমুদ্রতীরে তিনি শেষশয্যায় শায়িত হলেন।
Highly informative for those who are not students of literature. Lucid writing attracts attention.
Khub samriddha lekha.anek ajana tathya royeche .