সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁচরাপাড়ার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু মানুষের চোখে পড়ল বিনোদনগর খেলার মাঠ সংলগ্ন নেতাজির মূর্তিটি কে বা কারা ভেঙে দিয়েছে। মূর্তিটির মাথার অংশটি বেদির উপর ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যান্য অংশেও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বিনোদনগর খেলার মাঠে নেতাজির মূর্তিটি সবুজ রেলিং দিয়ে ঘেরা। এই মাঠে এলাকার ছেলে মেয়েরা খেলাধুলো করে। অনেকে প্রাতঃভ্রমণ করতে আসেন। একে একে সবাই এই দৃশ্য দেখার পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকেরই একই প্রশ্ন, যে মানুষটি দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে আত্মত্যাগ করলেন, আসমুদ্র হিমাচল যাঁর নাম উচ্চারিত হলে মাথা নত করে, সেই মানুষটির মূর্তি কে বা কারা ভাঙ্গল? কি কারণে তারা এমন দুঃসাহস দেখাল? একদিকে এইসব প্রশ্ন অন্যদিকে নিন্দার ঝড় উঠেছে চারপাশে।
এর আগেও ২০১৯ সালের ৩ আগস্ট হুগলির উত্তরপাড়ার নেতাজি ভবনের সামনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তি ভাঙা অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় মানুষ। প্রসঙ্গত; ১৯৩৮ সালের ১৭ জুলাই হুগলির উত্তরপাড়া থানা লাগোয়া আদি পুরভবনে এসেছিলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। পরবর্তীতে উত্তরপাড়ার প্রবীণ নাগরিকদের দাবি অনুসারে ‘নেতাজি ভবন’ নামে স্মারক মিউজিয়াম গড়ে ওঠে।

এই ঘটনার এক বছর আগে ২০১৮ সালের ৩ মে রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা রাজাবাজারে ক্যানাল ইস্ট রোডে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি মূর্তি ভেঙে ফেলে। নেতাজির মূর্তির ওপর আক্রমণ ঘটেছে স্বাধীনতা দিবসেও। ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট বীরভূমের খয়রাশোলের পাঁচড়া পঞ্চায়েত ভবনের সামনে নেতাজি মূর্তিতে কালি মাখানো অবস্থায় দেখেন স্থানীয়রা। কালি মাখানোর পাশাপাশি মূর্তিটির নাকও ভেঙে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য; ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে বিদ্যাসগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় গোটা রাজ্যে জুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। ঘটনার জেরে সরগরম হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি।
সাম্প্রতিককালে মূর্তি ভাঙার একটা হিড়িক লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কয়েক বছর আগে যখন বামেদের হটিয়ে বিজেপি ত্রিপুরা দখল করতে চলেছে সেই সময় প্রতিবেশি রাজ্যে লেনিনের মূর্তি ভাঙার কাজ শুরু হয়েছিল। তারপরেই তামিলনাড়ু। সেখানেও ভেঙে ফেলা হয় অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করা দ্রাবিড়ীয় নেতা তথা সমাজসেবী ই ভি রামস্বামীর মূর্তি। তাকে সে রাজ্যের মানুষ পেরিয়ার নামেই জানে। এরপর মূর্তি ভাঙা যেন সংক্রামক রোগের মতো ছড়াতে শুরু করে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে। বাদ গেল না বাংলার মত রাজ্য। এখানে কালি মাখানো হল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে। এরপর উত্তরপ্রদেশের মীরাটে আক্রান্ত হলেন ভারতীয় সংবিধান প্রণেতা ড. বি আর আম্বেদকর। এখানেও ভাঙা পড়ল তাঁর মূর্তি। মূর্তি ভাঙা বা মনিষীর মুখ বিকৃত করা থেকে বাদ গেলেন জাতীয় বীর থেকে খ্যাতনামা কবিও। আসানসোলে রং মাখানো হল ‘মেঘনাদ বধ’ রচয়িতা মাইকেল মধুসূদনের মুখে।
মূর্তিভাঙার রাজনীতি বা সংস্কৃতি নতুন ঘটনা নয়। তবে সেদিনের মূর্তিভাঙার সঙ্গে সাম্প্রতিক মূর্তি ভাঙার ঘটনার বিরাট ফারাক রয়েই যায়। বাংলাতেও বিগত শতকের সত্তরের দশকে মূর্তিভাঙা শুরু হয়েছিল সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখা বেশ কিছু তরুণের হাতে। তাঁদের প্রশ্ন ছিল দেশের স্মরণীয় মহাপুরুষ অসাধারণ যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; তিনি অসাধারন ক্ষমতাসম্পন্ন একজন মানুষ হওয়া স্বত্বেও উনিশ শতকের কৃষক বিদ্রোহগুলির সঙ্গে কোনওভাবে সংযুক্ত হওয়ার কথা ভেবেছিলেন কি? অর্থাৎ তাঁরা সমাজের বৃহত্তম উৎপাদক শ্রেণির সঙ্গে সংযোগ না থাকার প্রশ্ন তুলেছিলেন। যদিও তার জন্য মূর্তি ভাঙার কোনও প্রয়োজন ছিল না। যে কারণে সেই তরুণরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সহানূভূতি হারিয়েছিল।

আজ যারা এ কাজ করছে তারা কি রাজনীতির লোক? যাদের মূর্তি ভাঙছে তারা কি আদৌ জানে কাদের মূর্তি কেন ভাঙছে তারা? আমরা সবাই তাদের দুষ্কৃতি বা ওই দলের লোক বলে দাগিয়ে দিচ্ছি। তার মানে রাজনৈতিক দলগুলি দুষ্কৃতিদের যে একটা বড় জায়গা সেকথা বহুকাল আর গোপনীয় নয়। পাশাপাশি একথাও আজ আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আর পাঁচটা অন্যায় কাজের মতোই মূর্তি ভাঙার কাজটাও সেই সব দুষ্কৃতিদের দিয়েই করানো হচ্ছে। মূর্তি ভাঙার এই ইতিহাস তাই কম বেশি সারা পৃথিবীতেই রয়ে গিয়েছে।
তালিবানরা আফগানিস্তানের বমিয়ানের বুদ্ধমূর্তিগুলি ধ্বংস করেছিল। মূর্তিগুলি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় ইসলামিক কনফারেনন্সের চুয়ান্ন জন মূর্তি ধ্বংসের প্রতিবাদ জানায়। সৌদি আরবের মতো কট্টর ধর্মপন্থী দেশও এই কাজকে বর্বোরচিত আখ্যা দেয়। মূর্তি ভাঙা বা বিকৃত করার কাজ নানা ভাষা-নানা মত-নানা পরিধানের দেশেও আশা করা যায় না।