অবশেষে অভিনেত্রী পরীমনির ঘটনায় বিবৃতি দিলেন বাংলাদেশের ১৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্যাডে লেখা ওই বিবৃতিতে তারা বলেছেন, এক অভিনেত্রীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের যে সামাজিক চেহারা ফুটে উঠেছে তাতে তাঁরা গভীরভাবে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়, সাম্প্রদায়িকতা এবং নারীবিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিকতার বিস্তার যেভাবে ফুটে উঠেছে তা আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন করেছে। চলচ্চিত্র জগতের এক অভিনেত্রীকে কেন্দ্র করে যে চেহারা ফুটে উঠেছে তা আমাদের গভীরভাবে চিন্তিত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ করেছে। অর্থ-বিত্ত-প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অশুভ আঁতাতের প্রতিফল যখন ন্যাক্কারজনকভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে তখন নারীর ওপর এর দায়ভার অর্পণের বিশাল আয়োজন প্রত্যক্ষ করা যায়। পুরুষতান্ত্রিক কুপমুন্ডক চিন্তার এই দাপট সামগ্রিকভাবে সমাজকে এবং বিশেষভাবে নারীকে নানাভাবে নিগৃহের শিকারে পরিণত করে। যারা নারীর সাংস্কৃতিক অধঃপতনের শিকার হয়ে ওঠার জন্য দায়ী, যারা এর ইন্ধনদাতা তাদের মুখোশ উন্মোচনের দাবি করছি এবং এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সাংস্কৃতিক সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করছি’।
প্রসঙ্গত, বনানীর বাড়ি থেকে পরীমনিকে আটক করা হয়। র্যাবের অভিযানে সেখান থেকে মাদক পাওয়া যায়। তার বাসায়। বনানী থানায় পরীমনির বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা করা হয়। পরীমনিকে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে ফের দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস।
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে, চালানো হয়েছে শারীরিক নির্যাতন-এই অভিযোগ করেছেন পরীমনি। নিজের ফেসবুকে এই কথা লেখেন পরীমণি। বিচার চেয়ে আবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। তিনি লেখেন, ‘আমি পরীমণি। এই দেশের একজন নাগরিক। আমার পেশা চলচ্চিত্র। আমি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে রেপ এবং হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।’
এরপর তিনি নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আমি এই বিচার কোথায় চাইবো? কে করবে সঠিক বিচার? আমি খুঁজে পাইনি গত চার দিন ধরে। থানা থেকে শুরু করে আমাদের চলচ্চিত্রবন্ধু আমি কাউকে পাই না ‘মা’। যাদেরকে পেয়েছি সবাই শুধু ঘটনার বিস্তারিত জেনে, চুপ হয়ে যায়! আমি মেয়ে, আমি নায়িকা, তার আগে আমি মানুষ। আমি চুপ করে থাকতে পারি না। আজ আমার সাথে যা হয়েছে, যদি আমি মেয়ে বলে, চুপ হয়ে যাই, তাহলে তো অনেকের মতো আমিও কেবল দল ভারি করবো। আমি তাদের মতো চুপ কি করে থাকতে পারি মা? আমি তো আপনাকে দেখিনি চুপ থেকে কোনও অন্যায় মেনে নিতে! আমার মা যখন মারা যান তখন আমার বয়স আড়াই বছর। কখনও মনে হয়নি আমার মাকে খুব দরকার। আজ মনে হচ্ছে, মাকে ভীষণ রকম দরকার, একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরার জন্য দরকার। আমার আপনাকে দরকার মা। আমার এখন বেঁচে থাকার জন্য আপনাকে দরকার মা। মা আমি বাঁচতে চাই। আমি নায়িকা বলে কি এমন ঘটনা স্বাভাবিক? আমি এর বিচার চাই।’

গত কয়েকদিন ধরে পরীমণি ট্রমার মধ্যে আছেন। তিনি বিচার পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সর্বত্রই এ বিষয়ে অদ্ভুত নীরবতা। কোথাও বিচারের এতটুকু আশ্বাস নেই। প্রশ্ন পুরো ঘটনাটি কী এরকমই? কে বা কারা এমন ঘটনা ঘটালো? এই প্রশ্নের জবাবে পরীমণি নিজে বলেন, ‘এখন যদি নাম বলি, আপনারা হয়তো খবর করবেন। কিন্তু আমার জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবুন একবার। আমি তো যাদের কাছে নাম বলার সেটা গত চারদিন ধরে বলেছি’।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বহু সংগঠন রয়েছে। কিন্তু অভিনেত্রী পরীমনিকে আটক করার পর কাউকেই তাঁর পাশে দেখা যায়নি। বরং জরুরি বৈঠক করে অভিনেত্রীর সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। যেখানে পরীমনির অপরাধই প্রমাণিত হয়নি, সেখানে সদস্যপদ স্থগিতের বিষয়টি আসে কিভাবে? কেউ কেউ পরীমনি বিষয়ে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির এই সিদ্ধান্তকে ন্যক্কারজনক বলে জানিয়েছেন। তবে তাঁর সদস্যপদ বাতিল করার আগে তাঁর অপরাধটা কি, সে প্রশ্ন তোলেন নি। অনেকে আবার পরীমনির ব্যাপারটি পুরোপুরি আইনি, তাই এই বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি কিছু ভাবছে না, এমনটাও বলেছেন।
তাহলে আজ হঠাৎ কেন ১৭ জন বুদ্ধিজীবীর টনক নড়লো? বাংলাদেশের ”বিশিষ্ট নাগরিকেরা” চলচ্চিত্র শিল্পী পরীমণির ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেন? বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য, বিশিষ্ট নাগরিকেরা সব সময়ই ক্ষয়ক্ষতি ঘটে যাওয়ার পর কিছু লোকের ক্রমাগত চাপে এবং অনুরোধে মাথা তোলেন। বেশ কিছুদিন ভাবনা চিন্তা করার পর বিবৃতিতে নাম যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হন। তার আগে অবশ্য নিশ্চিত হয়ে নেন, অন্য কোন ‘বিশিষ্ট’রা বিবৃতিতে সই করেছেন। বা এ থাকলে ও সই করেন আবার অনেক সময় ও সই করেছেন বলে এ সই করেন না। পরীমণির বিষয়ে তসলিমা অবশ্য এর আগেও মুখ খুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পরীমণিকে ফাঁদে বা বিপদে ফেলা হচ্ছে।
তিনি একটা কথা ঠিকই লিখেছিলেন, কোনও মেয়ের বিরুদ্ধে যখন লোকেরা ক্ষেপে ওঠে, তাকে দশদিক থেকে হামলা করতে থাকে, এমন উন্মত্ত হয়ে ওঠে যেন নাগালে পেলে তাকে ছিঁড়ে ফেলবে, ছুঁড়ে ফেলবে, পুড়িয়ে ফেলবে, পুঁতে ফেলবে, ধর্ষণ করবে, খুন করবে, কুচি কুচি করে কেটে কোথাও ভাসিয়ে দেবে…। বিগত বেশ কিছুদিন প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশের নায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে কুৎসিত সব মন্তব্য উড়ছিল আকাশে বাতাসে।
তবে ফের জানা বোঝা গেল বিশিষ্ট নাগরিক বা বুদ্ধিজীবীরা খুব জরুরি কথা বলতে বড্ড বেশি দেরি করেন। ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়। আসলে একই সঙ্গে সমাজ-রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভাবতে তাদের ঘুম আসে আনেক দেরিতে, পাশাপাশি ঘুম ভাঙেও অনেক দেরিতে।
এটা সত্যি যে কোন মেয়ের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠলে মানুষ যে হিংস্রতার কোন পর্যা্য়ে চলে যেতে পারে, তা ধারণা করা অসম্ভব।