গত ৫ অগস্ট আরামবাগ থেকে এই সেতুর উপর দিয়েই মুখ্যমন্ত্রী কামারপুকুর হয়ে ঘাটালে গিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ সেতু দিয়ে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের সঙ্গে আরামবাগ, বর্ধমান ও কলকাতা যাতায়াত করেন অজস্র মানুষ। যাত্রিবাহী বাস থেকে পণ্যবাহী ট্রাক, চার চাকার গাড়ি থেকে বাইক, প্রত্যহ হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে এই সেতু দিয়ে। দ্বারকেশ্বর নদের উপর রামকৃষ্ণ সেতু নিয়ে উদ্বেগ আরামবাগ জুড়ে। সেতুর বয়স হয়েছে। একাধিকবার স্বাস্থ্য পরীক্ষাও হয়েছে। ইতিমধ্যে গত শনিবার রাতে ব্রিজের রেলিংয়ের একাংশ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে।
দ্বারকেশ্বরের উপর নড়বড়ে এই ‘রামকৃষ্ণ সেতু’র উপর দিয়েই যাতায়াত করে দক্ষিণবঙ্গের অনেকগুলি জেলার বাস, মালবাহী গাড়ি-সহ হাজার যানবাহন। এরই মধ্যে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে সেতুর পাটাতনের ফলক, কোথাও সিমেন্টের স্ল্যাবে গর্ত তৈরি হয়েছে, কোনটি আবার ভাঙা। নীচের স্তম্ভগুলিতেও স্পষ্ট দেখা যায় ফাটল, কোথাও বেরিয়ে লোহার রড। আরামবাগের দ্বারকেশ্বরের উপর নড়বড়ে এই ‘রামকৃষ্ণ সেতু’র উপর দিয়েই যাতায়াত করে দক্ষিণবঙ্গের অনেকগুলি জেলার বাস, মালবাহী গাড়ি-সহ হাজার যানবাহন। কিছুদিন আগেই অবশ্য শুরু হয়েছে সেতুটি সংস্কারের কাজ। মাঝেরহাট সেতু ভেঙে পড়ার পর বুধবার তড়িঘড়ি রামকৃষ্ণ সেতুর উপর দিয়ে মালবাহী গাড়ি যাতায়াত বন্ধের বিজ্ঞপ্তি জারির জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করল পূর্ত দফতর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেতুর বয়স এবং ভারবহন ক্ষমতা অনুপাতে গাড়ির সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। তাই সংস্কার করেও যে তেমন কোনও লাভ হবে এমন আশ্বাস দিতে পারেননি। “স্থানীয় মানুষের দাবি মেনে বিকল্প সেতু নির্মাণ নিয়ে সরকারি স্তরে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।” পূর্ত দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, রামকৃষ্ণ সেতু ১৯৬৫ সালে তৈরি। লম্বায় ৩২৫ মিটার এবং ৭ মিটার চওড়া। দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দুই মেদিনীপুর জেলা ও ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে কলকাতা, তারকেশ্বর এবং বর্ধমান যোগাযোগ হয় এই সেতুর উপর দিয়েই। প্রতিদিন প্রায় আট হাজারের উপর লরি যাতায়াত করে। এর বাইরেও প্রায় ১০ হাজার বেশি গাড়ির ধকল সইতে হয় সেতুটিকে। কর্তা বলেন, সেতুর সাধারণত পূর্ব মেদনীপুর, নজেলা ও ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে কলকাতা, তারকেশ্বর এবং বর্ধমান যোগাযোগ হয় এই সেতুর উপর দিয়েই। প্রতিদিন প্রায় আট হাজারের উপর লরি যাতায়াত করে। এর বাইরেও প্রায় ১০ হাজার বেশি গাড়ির ধকল সইতে হয় সেতুটিকে। দফতরের এক কর্তা বলেন, সেতুর সাধারণত আয়ুষ্কাল ধরা হয় ৩৫-৪০ বছর।
ধারাবাহিক সংস্কার করলে বড় জোড় ৫০ বছর অটুট থাকে। সে ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণ সেতুর বয়স হল ৬০ বছর। ফলে জরা ধরেছে বটে। ফলে কলকাতার দুর্ঘটনার পর রামকৃষ্ণ সেতুর ভগ্নদশা নিয়ে মহকুমাতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিকল্প সেতুর দাবিতে সরব হয়েছেন মানুষ। এটা অবিলম্বে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এই যে চেয়ে দাবীকরেছে।। গোঘাটের প্রাক্তন বিধায়ক মানস মজুমদার বলেন, “সেতুর ভবিষ্যৎ আশঙ্কা করে আমরা ২০১৭ সাল থেকেস্থানীয়েরা জানাচ্ছেন, গার্ডওয়ালের যে অংশ ভেঙে পড়েছে, ঠিক তার পরের অংশেও ফাটল ধরেছে। যে কোনও মুহূর্তে সেটিও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেশ কিছু দিন ধরেই ওই সেতুর স্বাস্থ্য ভেঙেছে। কিন্তু মেরামতের বিষয়ে প্রশাসন উদ্যোগী হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
প্রায় ছয় দশক আগে রামকৃষ্ণ সেতু তৈরি হয়। উদ্বোধন করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্ৰ সেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে চাকুরিজীবীরা জানাচ্ছেন, দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সেতু বন্ধ হলে স্কুল-কলেজ, অফিসে যাতায়াত কষ্ট সাধ্য হবে ওই এলাকার বাসিন্দাদের। অন্য দিকে, সেতুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করতে এবং গার্ডওয়াল ভেঙে পড়ার কারণ খুঁজছেন পূর্ত দফতরের আধিকারিকেরা। তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। আরামবাগ পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা বর্তমান কাউন্সিলর এবং আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান স্বপন নন্দী বলেন, “নবান্ন থেকে পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়ারেরা এসেছিলেন। তাঁরা ব্রিজের তলায় নেমে ভাল করে দেখেছেন। সিসিক্যামেরা আছে। সেটিও পরীক্ষা করে দেখছেন। কেন গার্ডওয়াল ভেঙে পড়ল, তার কারণ খোঁজা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আপাতত একটা হাইট বার বসিয়ে ওভারলোড গাড়ি চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। তবে বাস ও ছোট গাড়ি চলবে। আমরা বলেছি, দ্রুত সংস্কার করতে। ওই সেতুর পাশে আর একটি সেতুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল আগেই। সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে।”
উল্লেখ্য, এই রামকৃষ্ণ সেতু দিয়ে নিত্যদিন দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া, দুই মেদিনীপুরের সঙ্গে আরামবাগ, বর্ধমান ও কলকাতার যোগাযোগকারী বাসগুলি যাতায়াত করে। রাতের বদলে দিনের বেলায় সেতুটি ভাঙলে, প্রভৃত প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল বলে মনে করছেন এলাকার লোকজন। ভেঙে পড়ার মুহূর্ত থেকেই সেতুতে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারাই নিরাপত্তার জন্য ব্যারিকেড করে দিচ্ছে। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন পুলিশকর্মীরা। এক দিক থেকে যাতায়াত করানো হচ্ছে। তাতে যানজট হলেও, সেটাই এখন মেনে নিতে হয়েছে নিত্য যাতায়াতকারী মানুষজনকে।
উল্লেখ্য, দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সেতু বন্ধ হলে, হায় গোটা দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি, এই মহকুমা ও তার আশপাশের অঞ্চলের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব স্তরের নিত্যযাত্রীর যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। প্রাচীন সেতুটির ভার নেওয়ার ক্ষমতা কমেছে। অথচ এর স্বাস্থ্যের হাল ফেরেনি। আগে যে ভাবে যান চলাচল করত, এখন তার দ্বিগুণ বেশি যান চলাচল করে প্রতিদিন।তাই চাপ কমাতে বার বার আরামবাগের মানুষজন, ব্যবসায়ী, বাস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিকল্প একটি সেতু নির্মাণ করার দাবি তোলা হয়েছে। কিন্তু সরকারের এই দপ্তরের আধিকারিকরা কর্ণপাতই করেননি। এ সব কিছুর পরে অন্ধকারে চলে যায় গোটা বিষয়টি। এই সেতু নির্মাণের সময়ে এক রাজমিস্ত্রি কাজ করেছিলেন। তিনি আরামবাগের কোর্ট পাড়ার বাসিন্দা শেখ সামসের আলম। তিনি বলেন, ‘তখন সরু সরু রড দিয়ে তৈরি হয়েছিল। তখন এত যান চলাচলে চাপও ছিল না। এখন প্রচুর চাপ বেড়ে গিয়েছে। রেলিংগুলো ভেঙে যাওয়ার পরে এখনকার ইঞ্জিনিয়াররা মোটা মোটা রড দিয়ে দিয়েছেন। তার উপরে ঢালাই। এতে আরও মাথা ভারী হয়ে গিয়েছে সেতুর। আমার এই বয়সের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আর অপেক্ষা নয়। এ বার পাশেই অন্য একটা সেতু নির্মাণ করা আশু প্রয়োজন।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ‘পুলিশি তৎপরতায় বড় বিপদ থেকে মুক্তি মিলেছে। যদি পুলিশ এত তৎপর না হতো, আজ হয়তো বড় দুর্ঘটনা ঘটত। আমাদের চোখে ওঁরাই আজ নায়ক।’ বছরের পর বছর ধরে সেতুর বেহাল দশা নিয়ে পুলিশের সতর্কতা উপেক্ষিত হয়েছে।
৩ মার্চ এসডিও মারফত পূর্ত দপ্তরকে হাইট বার বসানোর জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু তৎপরতা দেখা যায়নি। অবশেষে রাতে পুলিশের চাপেই জরুরি ভিত্তিতে হাইট বার বসাতে বাধ্য হয় দপ্তর। এর আগেও আরামবাগ মহকুমা পুলিশ দপ্তর ও হুগলি জেলা গ্রামীণ পুলিশের পক্ষ থেকে হাইট বার বসানো, বেহাল সেতুর হাল ফেরানো ও জনজীবনে যাতে বিপদ না নেমে আসে তার জন্য বেশ কয়েক বার চিঠি দেওয়া হয়। পুলিশের আধিকারিকরা তৎপর হলেও, পূর্ত দপ্তর একেবারেই উদাসীন ছিল। তাতেই ক্ষোভ বেড়েছে জনমানসে। আরামবাগ বাস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মধুমিতা ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমাদের একটাই অনুরোধ, পাশে সেতু নির্মাণ করুন। বড় বিপদ ঘটে গেলে, হাহুতাশ করা ছাড়া আর যা কিছুই করার থাকবে না।’ তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক তথা পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন নন্দী বলেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, ইঞ্জিনিয়াররা এসেছিলেন। পাশে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব আছে। আমরা দেখছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেতুটি নির্মাণের ব্যবস্থা করব।’ বিজেপি বিধায়ক বিমান ঘোষের অভিযোগ বলেন, ‘এই সরকার অপদার্থ। বড় ক্ষতি না হলে, এদের ঘুম ভাঙে না। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সেতু। আমরা চাই অবিলম্বে এই সেতুর হাল ফেরানো হোক। না হলে, নতুন সেতু নির্মাণ করা হোক পাশে।’