আনারস, আলমারি, আলপিন, গির্জা, গুদাম, চাবি, পাউরুটি, পাদ্রি, বালতি, কেদারা, কামরা, বোতল, জানালা, বোতাম, কপি(যেমন বাঁধাকপি), কাজু, আয়া, বিধবা, তামাক, বারান্দা, শব্দগুলো বাংলা শব্দ ভাঁড়ারে কোন ভাষা থেকে এসেছে এই কুইজের উত্তরের কোনও প্রাইজ নেই কারনটা আমরা প্রায় সক্কলেই জানি পর্তুগিজ ভাষা থেকে। বাংলার সঙ্গে পুর্তুগিজদের সম্বন্ধ মুঘলদের আগে থেকে সুলতানি আমলেই। সেই পর্তুগিজদের রক্ত আর বাঙালির রক্ত আজ মিলেমিশে একাকার। আজ দক্ষিণ বাংলার একটা পর্তুগিজ গ্রামের কথা আপনাদের বলব। পর্তুগিজেরা মুঘলদেরও আগে ভারতবর্ষে এলেও বাংলার মানুষ তাদের আজও মনে রেখেছে খুনি লুঠেরা হার্মাদ নামে। চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘাঁটি বানিয়ে তারা নৌকো বেয়ে মগেদের সঙ্গে জোট বেঁধে লুঠতে আসত গঙ্গার খাঁড়ি পেরিয়ে বাংলার অক্ষহৃদয়ে। পর্তুগিজদের বাঙ্গালিরা ফিরিঙ্গি নামে চিনত।
মুঘল আমলে আরাকানি মগেদের সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের লুঠ খুন জখম আর দাসব্যবসার প্রাবল্যে উপকূল জনশূন্য সুন্দরবনের নাম হয়েগিয়েছিল মগের মুলুক। পূর্ব মেদিনীপুরের হলদি নদীর তীরে নরঘাটে একদা পিঠে চাবুক মেরে নিষ্ঠুর দাস ব্যবসা চালাত পর্তুগিজেরা। পর্তুগিজদের আরেকটি বড় ঘাঁটি ছিল পর্তো পেকিনো বা ছোট বন্দর সপ্তগ্রাম আর হুগলীতে। শাহজাহানের রাজত্বে শাহী বাহিনী তাদের হুগলী থেকে উচ্ছেদ করে। তবুও গোটা হুগলীজুড়ে ছড়িয়ে আছে পর্তুগিজ উপাধিধারী বাঙালি নাম। আমাদের এক বন্ধুর নাম ত্রিদিব রিভস, না তিনি কিয়ানু রিভসের কেউ নন, খাঁটি বাঙালি।

যে পর্তুগিজ অধ্যুষিত গ্রামের কথা আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেটির নাম মীরপুর পূর্ব মেদিনীপুরের গেঁওখালি কয়েক কিমি দূরের বসতি। মীরপুরকে কেউ বলেন ফিরিঙ্গি পল্লী কেউ বলেন ফিরিঙ্গি পাড়া। গবেষক বিনয় ঘোষ বলছেন মীরপুরের পর্তুগিজ বাসিন্দারা গেঁওখালির ফিরিঙ্গি নামেও স্থানীয় এলাকায় পরিচিত। পুরোনো বাসিন্দারা তাদের মীরপুরের দুই মৌজা শুকলালপুরের ফিরিঙ্গি বা বেতকুণ্ডুর ফিরিঙ্গি নামেও ডাকে। এই গোটা গ্রাম মীরপুরে পর্তুগিজ বাসিন্দাদের বাস। গ্রামে জমিদার বাড়ি নেই, নেই বড় বণিকের বাড়িও। বাংলার অন্যান্য গ্রামের মতই অধিকাংশ বাড়ি টালির চালের আর কিছু পাকা।

কথিত মহিষাদলের রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায় প্রয়াত হলে মহিষী রাণী জানকী দেবী মগ-ফিরিঙ্গিদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে পর্তুগিজ গোলান্দাজদের বসতির জন্যে মীরপুর মৌজার জমি দান করেছিলেন। গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি তাদের পূর্বজরা গোয়া থেকে গ্রামে এসেছিল, যদিও এই দাবির সমর্থনে কোনও অকাট্য প্রমান নেই। মাথায় রাখতে হবে জাহাঙ্গিরের বাংলা আক্রমণের আগে থেকে বাংলার জমিদারদের বাহিনীতে পর্তুগিজ গোলান্দাজদের নিযুক্তি একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল। সে সময়কার এক প্রখ্যাত সেনাপতির নাম রডা। তবে গবেষক বিনয় ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে গোয়া থেকে আসার মিথ নিয়ে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।কারন মীরপুরে বসতি তৈরির দুশ বছর আগে থেকেই পর্তুগিজদের বাংলায় বাস। স্থানীয় মহিলা পুরুষদের বিয়ে করে অনেকেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ী বাসিন্দা। বিনয়বাবু বলছেন পর্তুগিজদের গোয়া থেকে আনা হলে মীরপুর গ্রামে অবশ্যম্ভাবী গোয়া-কৃষ্টির কোনও না কোনও রেশ থেকে যেত। ৭০ বছর আগে তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির অখণ্ড সংখ্যাটি লিখছেন, তখনও সেখানে গোয়া-কৃষ্টি দেখেন নি – ‘গির্জা ও খৃষ্টান ধর্মাচরণের মধ্যেও যা আছে, তার সবটাই খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতি এবং হিন্দু সংস্কৃতি। এমন কী চেহারাতেও কোন বিদেশী পূর্বপুরুষের কোন ছাপ নেই কোথাও’।

আগেই বলেছি মীরপুর গ্রাম বেতকুণ্ডু আর শুকলালপুর মৌজায় বিভক্ত। ফি বছরের মতই এবছরের ডিসেম্বর মাস থেকেই দুটি মৌজার বাসিন্দাদের মধ্যে খ্রিষ্ট উৎসবের প্রস্তুতি তুঙ্গে উঠেছে। নানা কাজের মধ্যেও চলছে জোর উৎসব প্রস্তুতি। মীরপুরের পেডেরা, লঘু, ডিক্রস, রোজারিও, তেসরা, প্রভৃতিদের মধ্যে বড়দিন এলে তৈরি হয় নতুন উন্মাদনা। চার্চে চার্চে শুরু হয়ে যায় প্রভু যিশুর নামে প্রার্থনা। মীরপুরে দু’টি ঐতিহাসিক গির্জা রয়েছে। যার মধ্যে একটি ক্যাথলিক এবং অপরটি প্রটেস্টান্ট।

রাত পোহালেই খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ উৎসব বড়দিন। ঠিক বারোটা বাজলেই খ্রিস্টীয় অধিবাসীরা চার্চে গিয়ে শুরু করে দেবেন প্রভু যিশুর উপাসনা। শুরু হয় বাইবেল পাঠ। মধ্যরাতের এই অনুষ্ঠানকে খ্রিস্টীয় ভাষায় বলা হয় ‘খ্রীষ্টের জাগরণ’। এরপর ক্যাসিও, ড্রাম সহযোগে শুরু হয় ‘মিশা গান’। যাকে প্রকৃতপক্ষে ক্যারল সংও বলা হয়। তবেই ক্যারল সং এর মধ্যেও মিশেছে বাঙালি সংস্কৃতি। এই গানের ব্যবহার করা হয় বাঙালির অন্যতম বাদ্যযন্ত্র খোল ও করতাল। এরপর ভোরবেলা বের হয় নগর কীর্তন। যেখানে পা মেলান আট থেকে আশির সব বয়সের পর্তুগিজরা। তবে ক্যারলের বাদ্যযন্ত্রে বাংলার সংস্কৃতির ছাপ পড়েছে। তাই খোল কর্তালও বাজানো হয়, বের হয় নগরকীর্তন, চলে কেক বিতরণ। ঠিক যে কথা সত্তর বছর আগে বিনয় ঘোষ লিখেছিলেন ‘যা আছে, তার সবটাই খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতি এবং হিন্দু সংস্কৃতি’।