মানুষের বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্ত গ্রাসাচ্ছাদন। কথায় বলে, ‘পেহেলে পেট পুজা বাদমে সব কুছ’। কোলেস্টরলের চোখরাঙানিতে বাঙালি যতই তার রসনাবিলাসে কাটছাঁট করুক না কেন, সহজলভ্য আলু ভাজাকে সেই লিস্টি থেকে বাদ দিতে পারেনি কোনোদিনই। গরম তেলে পাঁচফোড়ন-শুকনো লঙ্কা দিয়ে লম্বা লম্বা করে কেটে আলু ভাজা বদখত রান্নার মেনু থেকে রীতিমতো উদ্ধারকর্তার কাজ করে।
শ্রাবণের বর্ষার কুঁড়ে খিচুড়ির একমাত্র সঙ্গী এই আলু ভাজা। তবে, গেরস্থের হেঁসেলের গণ্ডি পেরোলেই এই আলু ভাজার ফিগার হয়ে ওঠে স্লিম-অ্যান্ড-ট্রিম। আমাদের ছোটবেলার অনুষ্ঠান বাড়িতে ডালের সঙ্গে থাকতো বোঁটাওয়ালা বেগুন ভাজা। তবে আজকাল কারিপাতা আর বাদামের গার্নিশিংয়ে ঝিরঝির করে কাটা আলু হয়ে উঠেছে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। খেতেও লাগে দুর্দান্ত।
এই ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে নানা মুনির নানা মত। আসলে মানবজাতি ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। বিশেষ প্রমান না থাকলে কোথায়, কে, কখন নতুন কিছু উদ্ভাবন করলো সে নিয়ে ব্যক্তিগত বা দলগত মাথাব্যথা নেই কারোর। কিন্তু কোনওভাবে কোনও ব্যাপারে অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেলে তখন সেই কৃতিত্বে ভাগ বসানোর জন্য ডজন ডজন দাবিদার গজিয়ে ওঠে।

ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নামটার মধ্যে ফ্রান্সের নাম জড়ানো থাকলেও বেলজিয়ামবাসীরা এটিকে নিজের দেশের উদ্ভাবন মনে করেন। বাঙালির মতো বেলজিয়ামের লোকেরাও মাছ খেতে ভালোবাসতো। ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দের আগে সেই দেশের গরিবগুর্বোরা মাছের চর্বি গলিয়ে লম্বা লম্বা করে মাছ কেটে ডিপ ফ্রাই করে খাওয়ার চল ছিল। কিন্তু বাধ সাধলো যখন শীতকালে নদীর জল বরফ হয়ে যেতো।
“দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো”র মতো তারা বুদ্ধি করে আলু লম্বা লম্বা করে কেটে ডিপ ফ্রাই করে খেতে শুরু করলো। এমনিতেও আলু চাষ করা অনেক সহজ ছিলো। তাই সতেরো শতকের শেষের দিকে এইভাবেই ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্ম হয়। যদিও ফ্রেঞ্চ এবং বেলজিয়ানদের মধ্যে ফ্রাই কোথায় উদ্ভাবিত হয়েছিল তা নিয়ে চলমান বিরোধ রয়েছে। বেলজিয়ামের খাদ্য ইতিহাসবিদ পিয়েরে লেক্লারক (Pierre Leclerc) ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ইতিহাস খুঁজে পেয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে “এটা স্পষ্ট যে এটি ফ্রেঞ্চের উৎপত্তি”।
অবশ্য, আধুনিক ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের প্রথম রেসিপিটি ১৭৯৫ সালে ফরাসি রান্নার বই La cuisinière républicaine-এ পাওয়া যায়। অন্য মতে, ১৮০১ সালে ফরাসি রাঁধুনি থমাস জেফারসন (Thomas Jefferson) আলু কেটে নুন জলে ডুবিয়ে রেখে তা ফুটন্ত ডুবো তেলে ভেজে বিশেষ একটি স্বাদু খাবার তৈরি করেন। যদিও তখন এর নাম ফেঞ্চ ফ্রাই রাখা হয়নি।

তবে ফ্রান্সে আলুর জনপ্রিয়তার নেপথ্যে ছিলো সেখানকার সেনাবাহিনীর ডাক্তার অ্যানটেনিও অগাস্টিন পারমেনতিয়ার (Antoine-Augustin Parmentier)। তাঁরই উদ্যোগে আলু চাষের অনুমোদন ও আলু খাওয়ার প্রচলন হয়। ফরাসিরা আলু সরু সরু করে কেটে ভাজতো, নাম দিয়েছিলো ‘ফ্রিটস’ বাংলায় যার অর্থ ফরাসি ভাজা।
বেলজিয়ামের ব্রুজেসের ফ্রিটমিউজিয়ামের কিউরেটর অধ্যাপক পল ইলেগেমস (Paul Ilegems) বিশ্বাস করেন যে স্পেনের আভিলার সেন্ট তেরেসা প্রথম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই রান্না করেছিলেন এবং প্রমাণ হিসেবে ভূমধ্যসাগরীয় খাবারে ভাজার ঐতিহ্যকেও উল্লেখ করেন।
তবে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের বিশ্ব জয়ের নেপথ্যে আমেরিকার অবদান অনস্বীকার্য। ইতিহাস বলে, ১৮৫৬ সালে ‘কুকারি ফর মেইডস অফ অল ওয়ার্ক’ এ ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। শোনা যায়, প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন তাঁর রাধুনীকে ফরাসি ঢঙে আলু ভাজার আদেশ দেন।

কিছু আমেরিকানদের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনী যখন বেলজিয়ামে ছিলো তখন তারা সেখানকার লোকেদের কাছ থেকে এই ধরণের আলু ভাজতে শেখে। সেই সময় আবার বেলজিয়ানরা ফরাসি ভাষায় কথা বলতো। তাই মার্কিন সেনারা এই খাবারের নাম দিয়েছিলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। কালক্রমে মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন ফাস্ট ফুডের অনুসঙ্গ হিসেবে লম্বা লম্বা করে কাটা প্যাকেট ভর্তি আলু ভাজা বিক্রি হতে থাকে।
আমেরিকানদের কাছে এই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এতটাই পছন্দের যে সম্প্রতি দ্য ইধো পটেটো কমিশন (the idaho potato commission) বা আইপিএস এমন একটি অদ্ভুত পারফিউম তৈরি করেছেন যার প্রধান উপাদান হলো আলু ভাজা। দেদার বিকোচ্ছে এই পারফিউম। প্রতিষ্ঠানটি একটি সমীক্ষায় দেখেন যে, প্রায় ৯০ শতাংশ আমেরিকান ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের গন্ধকে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে করেন। এই সুগন্ধ তাদের কাতর করে তোলে।

সে যাই হোক, সতেরো শতকের গোড়ার দিকে পর্তুগিজ নাবিকেরা আমাদের ভারতে আলু নিয়ে আসেন। প্রথমদিকে আলুর চাষ হতো কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলকায়, পরে সেখান থেকে চাষ শুরু হয় চেরাপুঞ্জিতে। সেখান থেকেই হয়তো বাঙালির হেঁসেলে আলু ভাজার জয়যাত্রার ইতিহাস শুরু হয়।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রুমিং সেশনে যায় আলু ভাজা। মার্কিন মুলুকের কায়দায় প্যাকেটজাত হয়ে নাম হয় পটেটো চিপস (Potato chips)। আশির দশক থেকে বিভিন্ন মশলা মিশিয়ে একে আরো লোভনীয় করে তুললো বহুজাতিক কোম্পানিগুলি। প্রচারের জন্য চললো বিজ্ঞাপনের হাঁকডাক। বিপণনের দশচক্রে পড়ে অধুনা প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠলো এই খাবার। সে যাই হোক না কেন, বিশ্বায়নের এই যুগেও রবিবারের সকালে লুচির সঙ্গে, বিকেলে মুড়ি দিয়ে মেখে আলু ভাজার প্রয়োজনীয়তা অপ্রতিরোধ্য। বেচেঁ থাকুক বাঙালির হেঁসেলে ভালোবাসার আলু ভাজা।।
তথ্যঋণ : সম্পর্কিত বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন এবং উইকিপিডিয়া।।
ভেবেই জিভে জল চলে আসে ????
একদম ????
প্রতিবেদন আলুভাজা নিয়ে। দুর্দান্ত হয়েছে।
অনেক ধন্যবাদ জানাই ❤️
দারুণ! আলুভাজার জন্ম বৃত্তান্ত, কুষ্ঠি ঠিকুজির তথ্যে ঠাসা প্রতিবেদন। খুব ভালো লাগল।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????