আলোর ফুল নয়!! আলুর ফুল, হ্যাঁ হ্যাঁ আলুর ফুলের কথাই বলছি। সময়কালটা ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দ রাজা ষোঢ়শ লুই সবেমাত্র সিংহাসনে বসেছেন। সম্প্রতি সময়ে তার নিত্যদিনের পোশাক-পরিচ্ছেদ ও সাজসজ্জায় নতুন একটি অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে- সেটি হচ্ছে আলুর ফুল। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আলুর ফুল দেখে থাকবেন। কিন্তু যারা দেখেননি তাদের চোখ ও কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের জন্য বলছি আলুর ফুলের পাঁপড়িগুলো হয় ধবধবে সাদার মধ্যে হালকা গোলাপি আভা। মাঝখানে গম্বুজের মতো গাঢ় হলুদ ঈষৎ ছোট্ট ও উচু হয়ে থাকা যেন আরেকটি ফুল। আলু অনেকের কাছে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সবজি হলেও আলুর ফুলের সৌন্দর্য্য কিন্তু অসাধারণ। যাগগে, সে কথা যা বলছিলাম রাজা কোটের ভাজ করা ল্যাপেলে সাধারণত সৌখিন ও কেতাদূরস্থ মানুষগুলো গোলাপ কিংবা কোন ফুল গুজে রূপসজ্জা করেন সেখানে ষোঢ়শ লুই রাজদরবারে আসেন কোটের উপর সদ্য তুলে আনা টাট্কা ও তাজা আলুর ফুল গুজে।
রানি মেরি আঁতোয়াঁনেতও খোপায় পড়েন আলুর ফুল। রাজাকে খুশি করতে রাজআমাত্য ও আমীর ওমরাও গণও কোটের বোতামঘরে আলুর ফুল এঁটে হাসের পালের মতো ঘুরে বেড়ান রাজার চারপাশে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন রাজার হঠাৎ এমন মতি হলো কেন যে, কোটের উপর আলুর ফুল গুজে রাজদরবারে কার্যপরিচালনা করতে শুরু করেছেন তিনি। এর পেছনের কারণটি হচ্ছে ফরাসি কৃষকদের আলু চাষে উৎসাহ ও ধনি-গরিব নির্বিশেষে আলু খাওয়ার জন্য এ ধরনের এক অভিনব বিজ্ঞাপনে নেমেছেন তিনি। হঠাৎ রাজার আলু প্রীতির পেছনেও ছোট্ট একটি কাহিনি আছে।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি ফ্রান্স আর প্রুশিয়ার মধ্যে সপ্তবর্ষীয় এক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ করার মতো আর লোকজন না পেয়ে ফরাসি রাজা দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দড়িবেঁধে যুদ্ধ করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আঁতোয়া পারমেঁতিয়ের নামে এক ফরাসি ঔষধ প্রস্তুতকারকও ছিলেন। তো হয়েছে কি, যুদ্ধকালীন এই সাতবছরে প্রুশিয়া বাহিনি দ্বারা পারমেঁতিয়ের যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন পাঁচবার। কয়েদখানায় তাকে শুধু আলু খেতে দিত। প্রথম প্রথম আলু খেতে বিরক্ত লাগলেও ধিরে ধিরে আলুর প্রতি ভালোবাসা গাঢ় হতে থাকে পারমেঁতিয়েরের। ক্রমে ক্রমে আলুর প্রেমে এতই দুর্দমনীয় হয়ে উঠলেন তিনি যে বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়ে দেশে ফিরে রাজা ষোঢ়শ লুই ও রানি মেরি আঁতোয়ানেত সহ ধনি-গরিব সবাইকে আলুর মাহাত্ম সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন পারমেঁতিয়ের। ফরাসি সাধারণ প্রজাদেরকে আলুর স্যুপ সমেত আলুর নানা উপাদেয় রান্নার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন তিনি। সৌভাগ্যক্রমে আমেরিকার অন্যতম জাতির পিতা ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি থমাস জেফারসন সেসময় প্যারিসে বসবাস করছিলেন। তো হয়েছে কি, আঁতোয়া পারমেঁতিয়ের আলুর মাহাত্ম প্রচারের সময় তিনিও ভীষণভাবে আকৃষ্ট হলেন আলুর প্রতি। পাঠক/পাঠিকাবৃন্দ জেনে অবাক হবেন যে আমেরিকাতে এই জেফারসন সাহেবই আলু জনপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এজন্য ইংলেন্ডে যে আলু ভাজার নাম শুধু ফ্রাইজ, আমেরিকায় সেই আলুভাজা ফ্রেঞ্চফ্রাইজ নামে পরিচিত।
সে যা হোক আগের কথায় ফিরে আসি। আঁতোয়া পারমেঁতিয়ের ভাগ্য বেশ সুপ্রসন্নই ছিল বলতে হয় কারণ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি যখন দেশে ফিরে এসেছেন তার কিছুকাল আগে ফ্রান্সের রাজা হয়েছেন ষোঢ়শ লুই। ক্ষমতায় আরোহনের সঙ্গে সঙ্গে রাজা লুই খাদ্যশ্যষ্যের উপর থেকে মুল্য নিয়ন্ত্রণ কর তুলে দিলেন। ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শুরু হলো ছোট ছোট আকারে গৃহযুদ্ধ। যা ইতিহাসে “ফ্লাওয়ার ওয়ার” অর্থাৎ আটার যুদ্ধ নামে পরিচিত। সবমিলিয়ে ৮২টি শহরে ৩০০ মতো গৃহযুদ্ধ দেখা দিল। পারমেঁতিয়ের মহাশয় নিরলস ভাবে ফ্রান্সের মানুষদের জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করতে লাগলেন এই বলে যে- “রুটির জন্য যুদ্ধ করা তবেই থামবে যদি ফ্রান্সের জনগণ আলু খাওয়া শুরু করে।” আমি আগেই বলেছি জেফারসন তখন প্যারিসে অবস্থান করছিলেন। তিনি প্যারিসে ছিলেন বছর পাঁচেকের মতো। তিনি রাজা ষোঢ়শ লুইকে বোঝালেন ফ্রান্সে দুর্ভিক্ষ ও গৃহবিবাদ থামাতে যে করেই হোক আলুকে জনপ্রিয় করে তুলতেই হবে।
রাজা লুইও জেফারসনের পরামর্শ অনুযায়ী আলু নামের এই সবজিটি জনপ্রিয় করে তুলতে চেষ্টা শুরু করলেন। সেই সঙ্গে রানি মেরি আঁতোয়ানেত ও রাজ আমাত্যগণও। এর-ই ধারাবাহিকতায় রাজা লুই প্যারিস শহরের এক প্রান্তে চল্লিশ একরের মতো জমিতে আলুর চাষ করলেন। এটা জানাসত্বেও যে দুর্ভিক্ষপ্রেরিত প্রজাগণ হয়তো সেগুলো তুলে নিয়ে তাদের খাদ্য চাহিদা মেটাবে। যারা ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস পড়েছেন তারা জানেন ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল খাদ্যশষ্যের অপ্রতুলতা। ক্ষুধার্থ মানুষ না খেয়ে পড়ে থাকতো আস্তাকুড়ের একপাশে। ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে এসময় দলবেধে প্যারিসের সাধারণ মানুষ হানা দিয়েছিল রাজ্যের বিভিন্ন খাদ্য গুদামে। দেশের মানুষ যখন না খেয়ে মরছে অথচ রাজপ্রাসাদে সেসময় চলছে রাশউৎসব। জেল্লাজৌলুসের কোন কমতি ছিলনা। মানুষের হাহাকার, আর্তনাদ, হুল্লোড় শুনে রানি মেরি আঁতোয়ানেত একদিন বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তার কোন এক পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করলেন — “রাস্তা-ঘাটে এতো চেঁচামেচি কি জন্যে?” পরিচারিকা বললেন- ‘ওরা রুটির জন্য আর্তনাদ করছে’। রানি বললেন — ‘রুটি কি নেই?’ প্রতিউত্তরে পরিচারিকা বললেন — ‘না নেই’। রানি বললেন — ‘তাহলে ওরা কেক খায় না কেন? রুটির বদলে কেক খেলেই তো ঝামেলা চুকে যায়’। রাজেনবর্গ কিংবা রাজআমাত্যদের ধারণাও নেই দেশে কি চলছে। তারপর অবধারিত ভাবেই ফরাসি বিপ্লব এবং সেই সঙ্গে রাজারানি দু’জনেরই শিরশ্ছেদ।
ওষুধ প্রস্তুতকারক পারমেঁতিয়েরের কথা মতো ফরাসিদের আলু খাওয়ানোতে যদি অভ্যস্ত করানো যেত তাহলে হয়তোবা দুর্ভিক্ষের এই ভয়াবহতা থেকে ফ্রান্সের জনগণ রেহাই পেত এবং ফরাসি বিপ্লব নাও হতে পারতো।
হঠাৎ আলু নিয়ে লেখার প্রয়াস করলাম এ কারণে যে এবার অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে হঠাৎ করেই আলুর দাম বেড়ে যায়। এ নিয়ে দেশের পত্রপত্রিকাগুলোতেও লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। নভেম্বরের শুরুর দিকে পুরাতন আলু পঞ্চাশ-ষাট টাকা কেজি দরে ও নতুন আলু ১১০ টাকা করে বিক্রি হতে দেখেছি। খোঁজখবর করে জানলাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী দেশে ৪০ লক্ষ টন আলুর চাহিদার বিপরীতে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৮০ লক্ষ টন আলু উৎপাদিত হচ্ছে। সে হিসেব অনুযায়ী প্রতিবছর ৪০ লক্ষ টন আলু উদ্ধত্ত থাকছে এবং আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশগুলোতে বিশ থেকে ত্রিশ লক্ষ টনের মতো আলু আমরা রপ্তানি করছি প্রতিবছর। তারপরও ভোক্তাদের আলুর জন্য উচ্চ মুল্য গুণতে হচ্ছে সেটা কিন্তু বেশ দুঃখজনক।
বিষয়টি নিয়ে আরেকটু অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেল কোন কারণে যে কোন ভোগ্যপণ্যের মুল্য যদি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ- পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ভারতে বেড়ে যায় তবে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ি এদেশে সে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সে হোক পিয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ কিংবা আলু। দুঃখের বিষয় হচ্ছে দেশে এসব দেখার কেউ নেই।
পৃথিবীতে আলু হচ্ছে চতুর্থ স্টেপল ফুড। গম, চাল, ইক্ষুর পর আলুই হচ্ছে বিশ্বে সবচেয়ে প্রচলিত খাদ্য। আলুর জন্ম দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার উচ্চ মালভূমিতে। আলু খাওয়ার ইতিহাস দু’হাজার বছরের পুরোনো। কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কারের সুবাদে আমরা পেয়েছি বেশকিছু পণ্য সেগুলোর মধ্যে- মরিচ, টমোটো, আনারস, কামরাঙ্গা, তামাক, আলু প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসবিদগণ আমাদের জানাচ্ছেন প্রাচিনকালে ইনকারা সবকিছুতেই আলু খেত। সেদ্ধ আলু, পোড়া আলু, ভর্তা আলু প্রভৃতি তো ছিলই। হাড় ভেঙ্গে গেলে কাঁচা আলুর রস লাগাত। আলু খেত খাবার হজম করবার ঔষধ হিসেবে। বাতের প্রতিষেধক হিসেবে সঙ্গে নিয়ে ঘুরত আলু। মাস কিংবা বছর পর্যন্ত গণনা করা হতো আলুর ফলন কবে হচ্ছে সেটা হিসেব করে। সেকালে আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার ছিলনা বলে তারা আলু শুকিয়ে গুড়ো করে পাউডার বানিয়ে সেই আলু মিশ্রিত আটা দিয়ে তৈরি করতো নানারকম উপাদেয় খাদ্য।
সেই দু’হাজার বছর আগে থেকেই ইনকা ও এজটেক সভ্যতার মানুষেরা আন্দিজ পর্বতমালার ভাজে ভাজে আলু উৎপাদন করতো। একেক উচ্চতায় একেকরকম আলু জন্মাতো। সে সময় আলুর এতো প্রকারভেদ ছিল যে একগ্রামে জন্মানো আলু অন্য গ্রামের মানুষ দেখে বলতো- “এ আবার কি বস্তু রে বাবা”। এখনো পেরুর “ইন্টারন্যাশনাল পটেটো সেন্টারে” ৫ হাজার প্রকার আলু সংরক্ষিত আছে। আমার ইচ্ছা আছে যদি কোনদিন দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে যাই তবে আলুর সেই সংগ্রহশালাটি অবশ্যই দেখে আসব। প্রাচিনকালে ইনকা ও আন্দিজদের উৎপাদিত আলুর বেশিরভাগই ছিল বুনো আলু। সেগুলোর অধিকাংশই হতো ঈষৎ বিষাক্ত। তো হয়েছে কি, শরীরের সেই বিষাক্ততা দূর করার জন্য সেকালের ইনকা সভ্যতার মানুষগুলো এক প্রকার মাটি খেত। এ প্রসঙ্গে আমার একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল। পাঠকদের সেটা জানানোর জন্য বেশ উসখুশ হচ্ছে। আমি ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে প্রায়ই গ্রামে যেতাম। আমার বাড়ির সামনেই শতবর্ষী একটি বটগাছ আছে যা আজও বহাল তবিয়তে দন্ডায়মান। তো সেই বটগাছের আশেপাশের বিস্তির্ণ অবারিত জমিতে মরিচের চাষ হতো। আর সেই বটগাছ থেকে ঝাঁকেঝাঁকে টিয়া পাখি মরিচ খেতে নেমে পটাপট মরিচ খেত। মরিচ টিয়া পাখির খুবই পছন্দের একটি খাবার। অন্যকেউ এটি লক্ষ্য করেছেন কিনা জানিনা। বেশ পরিমাণে মরিচ খাওয়ার পর সেসব টিয়া পাখিদের দেখতাম মাটি খেতে। আমার ধারণা মরিচের ঝাল থেকে কিছুটা রক্ষা পেতেই টিয়াগুলো মাটি খেত।
সে যা হোক, ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের পর ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে স্প্যানিশ যুদ্ধবাজদের হাত ধরে অন্যান্য সব পণ্য সামগ্রির মতো আলুও চলে এলো ইউরোপে। আলু ইউরোপে এলো ঠিকই কিন্তু প্রথম প্রথম আলু দেখে মানুষ ভয় পেত।
সে কালের মানুষ মনে করতো, আলু শারীরিক উত্তেজনা ভয়ানক বাড়িয়ে দেয়। তারই পরিণাম সিফিলিস আর কুষ্ঠ রোগ। দীর্ঘদিন ধরে জলে ভাসা নাবিকেরা বিভিন্ন বন্দরে নেমে এই সব রোগের জীবাণু শরীরে নেয়, ঘরে ফিরে সুবোধ ছেলের মতো দোষ চাপায় আলুর ঘাড়ে। কারণ তখনও আলু ছিল একেবারে অপরিচিত। কিন্তু অচিরেই সে ভুল ভেঙে যায়। আলু তার গুণাগুণ দেখিয়ে স্পেনের সেনাবাহিনীর রোজকার রসদে পাকাপোক্ত জায়গা করে ফেলল। ওদিকে স্পেন সাম্রাজ্য তখন বিক্ষিপ্ত ভাবে সারা ইউরোপেই ছড়িয়ে। সেনাবাহিনীর পিঠে চেপে আলু ছড়িয়ে পড়ল গোটা মহাদেশে।
জার্মানির রাজা ফ্রেডরিখ উইলিয়াম আলু খেয়ে ভীষণ মোহিত হয়ে পড়লেন। তিনি সমস্ত প্রজাকে আদেশ দিলেন, আলুর চাষ করে সকাল-বিকেল আলু খেতে। অবাধ্য হলেই নাক কেটে নেবেন তিনি! নাক যাওয়ার ভয়ে সবাই মিলে আলু চাষ শুরু করল। দেশে ও দেশের বাইরেও আলু উপচে পড়তে লাগল। প্রাশিয়ার লোকে যুদ্ধক্ষেত্রেও রসদ হিসেবে আলু নিয়ে যেতে শুরু করল।
যদিও বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার একটি নাটক ‘দ্য মেরি ওয়াইফস অফ উইন্ডসর’-এ লিখেছেন “Let the sky rain potatoes” অর্থাৎ আকাশ থেকে আলু বৃষ্টি হোক। কিন্তু ইংল্যান্ডে আলু জনপ্রিয় হতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল। আমেরিকা থেকে ইংল্যান্ডে আলু নিয়ে আসার কৃতিত্বটা স্যার ওল্টার র্যিলে ও বিখ্যাত নাবিক স্যার ফ্রান্সিক ড্রেকের-ই প্রাপ্য। র্যা লে যখন আমেরিকা থেকে আলু নিয়ে এলেন, ইংল্যান্ডে তখন রাণি প্রথম এলিজাবেদের রাজত্ব। রাণি আলু দেখে বললেন — এটা আবার কি? ঝুড়ি ভর্তি আলু তিনি পাঠিয়ে দিলেন রাজহেসেঁলে। রাণি এলিজাবেদের বাবুর্চি যেহেতু আগে কখনো আলু দেখেনি তাই তিনি ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন আলু দেখে। সে আলু কিভাবে রান্না হবে বুঝতে না পেরে আলুকে আবর্জনা ভেবে ফেলে দিয়ে আলুগাছের পাতাগুলো সেদ্ধ করে সেগুলো তুলে দিয়েছিলেন রাণির পাতে। সেই শাক ভাজা খেয়ে রাণির কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সেটা অবশ্য জানাযায়নি। পরবর্তীকালে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের একদল পাদ্রী গিয়েছিলেন স্পেনের ক্যানারী দ্বীপে। তারা সেখানে আলুর রমরমা দেখে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন আলু।
ভারতবর্ষে কাগজ-কলমে প্রথম আলুর উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে। নুরজাহানের ভাই, মমতাজমহলের পিতা, আসফ খান প্রদত্ত ব্রিটিশ দূত টমাস রো-র ভোজসভায় যেসব খাবারের কথা আছে, তার মধ্যে আলুও ছিল। ১৭৮০ সালেও আলুকে গণ্য করা হত অতি মূল্যবান সবজি হিসেবে। বিশেষ ভোজসভার শেষে ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের নানান মূল্যবান সামগ্রীর সঙ্গে এক ঝুড়ি করে আলুও দিতেন। ১৮৩০-এর দশকে দেরাদুনের উঁচু মালভূমিতে আলুর চাষ করেছিলেন ক্যাপ্টেন ইয়ুনস ও মিস্টার শোর। কলকাতায় ১৭৮০-এর দশকেই ইংরেজদের রান্নাঘরে আলু, কড়াইশুঁটি এবং বিন অন্যতম সবজি ছিল।
কিছু উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলেও সাধারণ বাঙালির ঘরে উনবিংশ শতকের প্রথমে আলু, পেয়াজ ও মুসুর ডাল ছিল ব্রাত্য। যদিও কয়েক দশকের মধ্যেই দ্রুত বাঙালির হেঁসেলে ঠাঁই করে নেয় আলু। প্রাচীন বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘রন্ধন-প্রণালী’ গ্রন্থেও দেখা যায় আলুর কোন ব্যবহার নেই।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য মনসামঙ্গল কাব্যে অনেকে হয়তো আলুর উল্লেখ দেখে ভাববেন, আলু হয়তো বাংলায় সেই মধ্যযুগ থেকেই ছিল। যেমন কবি বিজয়গুপ্ত লিখেছেন- বড় বড় ইচা মৎস্যের ফেলাইয়া তালু/তাহাদিয়া রান্ধিলেক সঙ্কচুর আলু। কিংবা- বড় বড় কই মৎস্য করিয়া ভাগ ভাগে/তাহা রান্ধিল লাউ আলু কচুর লগে। যদিও এখানে সঙ্কচুর আলু বলতে কবি কি বোঝাতে চাইছেন সেটা আমি বুঝতে পারছি না। তবে “আলু কচু” বলতে কবি ছোট ছোট, গোল গোল কচুমুখির কথাই হয়তো তিনি বলছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, আলু আসার আগেই ভারতে আলু শব্দটি প্রচলিত ছিল অন্যান্য আলুর ক্ষেত্রে যেমন আম আলু, খম্ব আলু, পিস্তালু, চুপড়ি আলু, রাঙালু প্রভৃতি। আসলে সংস্কৃত ‘আলু’ শব্দের অর্থে ছোট ঘটি বা গাড়–। আকৃতিগত মিল থেকেই সবজিটির এমন নাম। অনেক পরে ‘আলু’ বলতে সাধারণ আলুও এই নামের সঙ্গে সমার্থ হয়ে যায়। অন্য মতে সংস্কৃত আরু’ শব্দের অর্থ ‘যে মাটি বা জলে গমন করে। গাছের মূলকে আরু বলা হত। গাছের মূল বা কন্দ বলেই আলুকে বলা হত ‘আরু’। আরু-ই পরে আলু-তে রূপান্তরিত হয়েছে।
আলু রপ্তানির সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস কারণ আমদানিকারকরা হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর চেয়ে ফ্রেশ আলুই বেশি পছন্দ করে। আলু সংগ্রহের পর হতে কিছু দিনের মধ্যে আলুর আকারের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক অবস্থা (deformations) দেখা যায়, বিশেষ করে হিমায়িত আলু নির্দিষ্ট তাপমাত্রার নিচে রাখলে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে মিষ্টতা বৃদ্ধি পায় ও অন্যান্য গুণগতমানের অবনতি ঘটে। এজন্য দির্ঘ্যদিন ধরে কৃষকরা সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, আলু হিমঘরে সংরক্ষণ না করে সরকার নিজেই যদি ফেব্রুয়ারি, মার্চে নায্য মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনে তা রপ্তানি করে তবে সরকার ও কৃষক উভয়েই লাভবান হয়। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হচ্ছে সরকার কৃষকের কথা না শুনে শুনছে আলু বিশেষজ্ঞদের কথা। এ প্রসঙ্গে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।
বিখ্যাত সাহিত্যিক দ্বিজেন্দ্র লাল রায়, যাঁকে আমরা ডি এল রায় নামেও চিনি, তখন তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। পরিণিত বয়সে এ দুজনের মধ্যে চরম বিরোধ থাকলেও একসময় তাদের মধ্যে বেশ বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক ছিল। প্রায়ই গড়াই নদী পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন দ্বিজেন্দ্র লাল রায়। রবীন্দ্রনাথ সে সময় শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে বিশাল এক বাগান করেছেন। সেই বাগান দেখে হৈ হৈ করে উঠলেন ডি এল রায়।
ডি এল রায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার আগে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে বিলেতে গিয়েছিলেন কৃষিবিদ হতে। সময়মতো পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এসেছেন তিনি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তখনো ভারতে কৃষিপ্রশাসন গড়ে তুলতে পারেনি। তাই ডি এল রায়কে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। রবীন্দ্রনাথের বাগান দেখে তিনি তাঁকে বাগানের এক কোনায় গোল আলু চাষের পরামর্শ দিলেন। এ দেশে সে সময় গোল আলুর চাষ সেভাবে শুরু হয়নি। তবু শিলাইদহের কয়েকজন চাষি আলুর চাষ করতেন। তাঁদের মধ্য থেকে রবীন্দ্রনাথ এক চাষিকে ডেকে পাঠালেন। সেই কৃষকের কাছ থেকে আলুর বীজ নিয়ে সেগুলো বপন করলেন ডি এল রায়ের পরামর্শ অনুযায়ী। তখন সেই চাষি বললেন, ‘করছেন কী মশাই! এভাবে আলু লাগলে তো আলু জন্মাবে না।’ রবীন্দ্রনাথ তখন পড়লেন ভারি বিপদে। একদিকে অভিজ্ঞ চাষি, অন্যদিকে ডিগ্রিধারী কৃষিবিদ, কার কথা শুনবেন তিনি?
শেষমেশ ডি এল রায়ের পরামর্শমতোই লাগানো হলো আলু। এরপর দেখা গেল, রবীন্দ্রনাথ যে পরিমাণ আলুর বীজ বপন করেছিলেন, সেটাই ফিরে আসেনি। সুতরাং চিরতরে সমাধি ঘটল আলুচাষি রবীন্দ্রনাথের।