জানুয়ারি মানেই পৌষ-মাঘের হিমেল হওয়া, মিঠে রোদ আর জমিয়ে পেটপুজো। মরশুমটা পিঠের। চালের গুঁড়ি, নলেন গুড়, নারকেল, ক্ষীর সহযোগে ঘরে বানানো পিঠের কদর আজো অমলিন।
পিঠে শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ শব্দ থেকে। যার অর্থ চূর্ণিত, দলিত। ধান থেকে চাল ও চালের গুঁড়ি হলো পিঠের মূল উপাদান। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠের সঠিক প্রচলন কবে থেকে হয়েছে তা বলা সম্ভব নয় তবে বাংলা ভাষায় লেখা কৃত্তিবাসি রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল ইত্যাদি থেকে অনুমান করা যায় প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো এই পিঠেপুলি।
কৃষিনির্ভর দেশ আমাদের বাংলা। নতুন ধান গোলায় তুললে নবান্নের পরই শুরু হয় এই পিঠে পার্বণের উৎসব। মূলত মাঘ ও ফাল্গুন মাসে জমিয়ে পিঠে খাওয়া হয়। কারণ, নতুন ধান থেকে তৈরি চালে যে সুঘ্রাণ ও আর্দ্রতা থাকে, পুরাতন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। পিঠের মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় পিঠের নাম পাটিসাপটা। ষোল শতকের শেষের দিকে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত চন্ডিকাব্যে পাটিসাপটার উল্লেখ পাওয়া যায়। একসময় বাংলাদেশের ঢাকায় পিঠেওয়ালি মহিলারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিঠে বিক্রি করতো এবং সেই সঙ্গে মজার মজার নানা গল্পও বলে আসতো। দেবী ঘোষের বইতে এত উল্লেখ পাওয়া যায়।
মাটির সরায় বানানো আসকে পিঠে বা ঘিয়ে ভাজা পাটিসাপটাই হোক,উপাদেয় পদগুলোর স্বাদই আলাদা হয়ে ওঠে বাড়ির মা-ঠাকুমার দৈহিক পরিশ্রম আর মনের আনন্দের স্পর্শে। আজ আমি ঘরে খুব সহজেই বানিয়ে ফেলতে পারবেন পাটিসাপটার রেসিপি বলবো। কখনো কি বানিয়েছেন নেসলে মিল্কমেড দিয়ে পাটিসাপটা! ট্রাই করে দেখতে পারেন।

উপকরণ :
আধ টিন (২০০গ্রাম) নেসলে মিল্কমেড
২ টেবিল চামচ ঘি/সাদা তেল
দেড় কাপ কোরা নারকেল
১০টি কুচানো কাজুবাদাম
২ চামচ কুচানো কিশমিশ
২ চামচ ভিজে চাল
১ কাপ ময়দা
১ চিমটি বেকিং সোডা
প্রথমে নেসলে মিল্কমেড, নারকেল, কাজুবাদাম, কিশমিশ ভালোভাবে মিশিয়ে রেখে দিন। তারপর ভেজা চালকে বেটে পেস্টের মতো করে ফেলুন। এবার একটি বাটিতে চালবাটা, ময়দা, বেকিং সোডা এবং তাতে সামান্য জল মিশিয়ে পাতলা ব্যাটার তৈরি করুন।
এবার একটি ননস্টিক ফ্রাইপ্যান ওভেনে গরম করুন। তাতে অল্প পরিমাণ ঘি/ সাদাতেল দিন। এরপর ফ্রাইপ্যানে তিন চামচ মতো ব্যাটার ঢালুন, তারপর প্যানে সামান্য ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সরুচাকলি বানিয়ে ফেলুন।
এরপর যখন সরুচাকলির রঙ সোনালী-বাদামী হবে তাতে বানানো পুর খানিকটা একপাশে দিয়ে দিন। এবার সরুচাকলিটিকে এপাশ থেকে ওপাশে মুড়ে ফেলুন। ব্যস, পাটিসাপটা তৈরি। এবার গরম গরম পরিবেশন করুন।

স্বাদে একটু নতুনত্ব আনতে হলে নিজের মতো করে অন্যকিছু ট্রাই করতে পারেন। পাটিসাপটার পুর সুজি, নারকেল, খোয়া ক্ষীর দিয়েও বানাতে পারেন। শুনেছি মালদায় আমের পাটিসাপটা বানানো হয়। অনেকেই আবার নোনতা খেতে পছন্দ করেন। তারা পুর শীতের সব্জি দিয়ে বানাতে পারেন। আজকে বলবো বিটের মালাই পাটিসাপটার রেসিপি। ট্রাই করে দেখতে পারেন।
কিছুটা বিট সেদ্ধ করে মিক্সিতে বেটে নিন। চালের গুঁড়ো, দুধ, চিনি, পাটালি গুড় ও বিটবাটা মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। কিছুটা বিট কোরা, নারকেল কোরা, খোয়া ক্ষীর, চিনি, কাজু, পেস্তা, কিসমিস একসঙ্গে মিশিয়ে কড়াইতে পাক দিয়ে পুর তৈরি করে রাখুন।
গরম ননস্টিক প্যান বা চাটুতে ঘি/সাদা তেল দিয়ে মিশ্রণ দিয়ে বানিয়ে ফেলুন বাইরের খোলস আর মধ্যে পুরে দিন বিটের পুর।
কনডেন্সড মিল্কের সঙ্গে অল্প দুধ মিশিয়ে ঘন মালাই তৈরি করে ঠান্ডা করে রাখুন। এরপর একটি পাত্রে পাটিসাপটাগুলো সাজিয়ে তার উপর ঘন মালাই ঢেলে পরিবেশন করুন বিটের মালাই পাটিসাপটা।
সময়টা সতেজ সবুজ পালংশাক-ধনেপাতা, নতুন ফুলকপি, চকচকে বেগুন, পাটালির সুগন্ধ ……নেই নেই করেও বনভোজন, ভোরের সাদা কুয়াশা আর একটু উষ্ণ রোদে গা ঠেকানোর আকুলতা। নতুন বছরের এই আবহে সপরিবারে উৎসবের মেজাজ ধরে রাখতে সহজে ঘরেই বানিয়ে ফেলুন পাটিসাপটা।
তথ্যঋণ : উইকিপিডিয়া, নেসলে মিল্কমেড পিঠের রেসিপি।
পাটিসাপটা ও কি দারুণ খেতে। আমার দিদিমা বানাতো। আজও মনে হচ্ছে।
চমৎকার লেখা।