দেবাশিসদা নকশালবাড়ির রাজনীতি করতেন। পরিচিত ছিলেন ‘শিবাজী’ নামে। তখন তাঁকে চিনতাম না। পরের সময় পশ্চিমবঙ্গে বন্দীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম মূল সংগঠক হিসেবে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। ৭০ পরবর্তী পর্বে বহুদাবিভক্ত রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষদের সংগঠিত করে সেই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন দেবাশিসদা-সুজাতদা’র মত মানুষরা। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমিও তাতে যোগ দিয়েছিলাম। শুধু বন্দীমুক্তি আন্দোলনই নয়, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথাও মানুষ মনে রাখবেন।
সাদামাটা জীবনযাপন আর আন্তরিক কথাবার্তা ছিল দেবাশিসদার সিগনেচার স্টাইল। এই স্টাইল তিনি আমৃত্যু বজায় রেখেছিলেন, ক্ষমতা তাঁকে পাল্টে দিতে পারেনি। মৃদুভাষী এই মানুষটিকে সবাই বলতেন, তথ্যের ভান্ডার, বিশেষ করে আমার সাংবাদিক বন্ধুরা। তথ্য সত্যে পৌঁছে দেয় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে এবং থাকবেও। কিন্তু রাজ্যের বামপন্থী শাসকদের স্ববিরোধ ও মিথ্যাচার নিয়ে দেবাশিসদার লেখাগুলি একসময় মানুষের কাছে একটা আই ওপেনার হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষ করে, ‘বামপন্থীরা মহাকরণে গিয়ে যা করছেন’ এর মত লেখাগুলি।

পরবর্তীকালে দেবাশিসদা আজকাল সহ নানা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাজ করেছেন। তখনও তাঁর তথ্য নিষ্ঠা কমেনি। সাধারণ জীবনযাপন ও আন্তরিক কথাবার্তায় দেবাশিসদা সবাইকে কাছে টেনে নিতেন, এমনকি তাঁর সঙ্গে যাদের মতে মিলতো না তাদেরও। দেবাশিসদার পরবর্তীকালের রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কিন্তু তাতে তাঁর কাজগুলি ও মানুষ হিসেবে গুরুত্ব মোটেই খাটো হয় না। ক্ষমতার অলিন্দের এতটা কাছাকাছি আসা দেবাশিসদা নিজেই কতটা ভাবতে পেরেছিলেন, তা নিয়ে তাঁর নিজেরই সন্দেহ ছিল। কিন্তু মানুষ দেবাশিসদাকে তা বদলে দিতে পারেনি।
অনেকের সঙ্গে মতে না মিললেও বিশ্বাসের একটা নিজস্ব জোর ছিল তাঁর। অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাঁকে তাই অস্বীকার করা যায়না। তিনি সম্পূর্ণ এক রাজনৈতিক মানুষ, যার ওপর রাগ করা চলে, তর্ক করা চলে কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায়না। দেবাশিসদা বেঁচে থাকবেন তাঁর নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে।
আমি দুই দেবাশিস কে দেখলাম। এটাই
পরিতাপের বিষয়।খন্ড কে পূর্ণ মর্যাদা
দিতে অপরাগ।