১৯৮২ সালের জুন মাস। তখন মমতা ব্যানার্জীকে সেইভাবে কেউ চেনে না, ছাত্রপরিষদ করা ছাড়া অন্য কোনও পরিচিতি নেই। সেই সময় লোকসেবক বলে একটা কাগজ বার হতো। সুব্রত মুখার্জী তার মুখ্য সম্পাদক। মুকুল রায়চৌধুরী নামে একজন এক্সিকিউটিভ এডিটর ছিলেন। কাগজটার অফিস ছিল জেম সিনেমার উল্টোদিকে। আমায় বলা হল, যেহেতু সুব্রত মুখার্জী আইএনটিইউসির প্রেসিডেন্ট, তাই আইএনটিইউসির খবর করতে হবে। বহু কাগজে আইএনটিইউসির খবর হয় না। আমায় বলা হল সপ্তাহে আপনি অন্তত দু-তিনদিন আইএনটিইউসির অফিসে যাবেন। তার পরের দিনই আমি কাগজের অফিস থেকে হেঁটে চলেগেলাম রিপন স্ট্রিটে আইএনটিইউসির অফিসে।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠছি। সিঁড়ির তলার ঘরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের জনা ১৫ মহিলা বসে আছেন, আর একটা শাড়ি পরা বাচ্চা মেয়ে সেখানে বক্তৃতা দিচ্ছেন— মেয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছেন। আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমি শুনছি— সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়তে হবে…, ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে…, এই সব জ্বালাময়ী বক্তৃতা করছেন উনি। আমি দু-তিন মিনিট দাঁড়িয়ে যাওয়ায় মেয়েটি এগিয়ে এসে বললেন, আপনি কাউকে খুঁজছেন? আমি বললাম, আমি লোকসেবক কাগজের সাংবাদিক। আমি আপনার ভাষণ শুনছি। তিনি বললেন, কাগজটা সুব্রতদার; আমি বললাম হ্যাঁ তাই। আমি তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন— আমার নাম মমতা ব্যানার্জী। আমি বললাম, আপনি যদি অনুমতি দেন, তো আমি আপনার এই ভাষণটা কাগজে লিখতে পারি। তিনিও সম্মতি দিলেন।
পরের দিন প্রথম পাতায় একটা কলমজুড়ে খবর বেরোল। লোকসেবকের খুব বেশি সার্কুলেশন ছিল না কিন্তু বিভিন্ন কংগ্রেসি অফিসে রেগুলার যেত। পরের দিন তার কাছ থেকে দারুন রিসেপসন, আপনি দারুন লিখেছেন ইত্যাদি। লোকসেবক কাগজে দু-চারদিন অন্তর তাঁর খবর বেরোতে লাগল। বাড়িতে একদিন তিনি আমায় নেমন্তন্ন করলেন। কালিঘাটের বাড়িতে গেলাম, মায়ের সঙ্গে পরিচয় করালেন। অনেকগুলো তরকারি, মাছ, ডিম দিয়ে দুপুরে ভাত খেলাম। ১৯৮৩-তে প্রদেশ কংগ্রেসে পরিবর্তন হল। অজিত পাঁজার জায়গায় আনন্দমোহন মুখার্জী সভাপতি হলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ক্রমশ খবরে আসছেন, কিন্তু নানান নামে, কেউ রায় লিখছে, কেউ চ্যাটার্জী ইত্যাদি লিখছে।
কাগজ লিখছে, প্রদেশ কংগ্রেসের নতুন কমিটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসতে পারেন, জল্পনা চললেও, অধিকাংশ কাগজ তার নাম মমতা জানলেও ঠিক নাম জানত না। দু-জন সিনিয়ার রিপোর্টারকে আমি বললাম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আইএনটিইউসির মহিলা সেলের সম্পাদিকা। আমার সাংবাদিকতার দীক্ষাগুরু মিহির গাঙ্গুলি এবং অন্যজন নরেন মুখার্জী, কীর্তিবাস ওঝা নামে লিখতেন, তাদের আইএনটিইউসির অফিসে নিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করালাম। ৮২ আর ৮৩-র মাঝামাঝি অজিত পাঁজা যখন সভাপতি ছিলেন, বা হয়ত ৮৪-র প্রথম দিকেও হতে পারে, কংগ্রেসের ধর্মতলায় একটা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ৩/৪ জন মারা গিয়েছিল। সেদিন আমি ওখানে ছিলাম না; মিহরদা ছিলেন; মিহিরদা বলেছিলেন ভবানীপুর টেন্টে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যে কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে হাতে ফ্ল্যাগ ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সময় কোনও নেতা নেত্রী আশেপাশে নেই; পুলিশের তাড়ায় সব ছত্রভঙ্গ; তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে মিহিরদা বললেন, সেই মেয়েটিতো তুমি! উনি উত্তর দিয়েছিলেন হ্যাঁ। এই ছিল মমতা ব্যানার্জীর রাজনীতির প্রাদপ্রদীপে আসার আগের কর্মকাণ্ড।

তারপরে তিনি ভোটে দাঁড়ালেন। কেউই তাঁর ওপর ভরসা করতে রাজি নন– সকলেই গালিগালাজ করছেন। ৮বি বাসস্ট্যান্ডে একটা ভোটের প্রচারের পথ সভায় দেখলাম মিটিং যখন শুরু হল শ-দুয়েক মানুষ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ বক্তৃতা চলতে চলতে দেখলাম বিরাট সংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে গেল। এই খবরটা আমি বর্তমানের সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্তকে বললাম। বললেন, আমার মনে হচ্ছে, মেয়েটি বড় ফাইটার, ও কিন্তু সোমনাথ চ্যাটার্জীকে বেগ দেবে। তিনি আমাদের বললেন, আপনারা যারা সাংবাদিক, মমতা যাদবপুরের কোথায় কী করছে না করছে একটু খোঁজ রাখবেন। আমি একদিন বেহালায় গেলাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিছিল কভার করতে। সেটা গ্রামীন বেহালা– শকুন্তলা পার্ক। মিছিলে দেখলাম একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে বলছেন, দিদি মিছিল নিয়ে ওদিকে যাবেন না, সিপিএম ওই সব বুথে কাউকে বসতে দেয় না। ভয়ঙ্কর জায়গা। মিছিল নিয়ে গেলে আমাদের মেরে পাট করে দেবে।
মিছিলে দেখলাম মাত্র ১০/২০ জন রয়েছে; কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, সে জন্যেই যাব। মিছিলের সঙ্গে হাঁটা শুরু করলাম আমি আর আমার ফটোগ্রাফার। বেশ ভয় ভয় করছে। তখন তো ওই অঞ্চলটা সিপিএম অধ্যুষিত। আমি দেখলাম সকলেই আড়াল আবডাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখছে। একটা যে ভয়ের, সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে বুঝলাম। মিছিল করে যখন ফিরে আসছি, তখন চায়ের দোকান থেকে একটা ছেলে টিপ্পনি কাটছে, পরের বার এলে পা ভেঙে দেব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে বলল, তুমি আমাদের কিছু বলছ? দেখলাম ছেলেটা ঘাবড়ে গিয়ে পালিয়ে গেল। সেটা মিছিলের মানুষদের মনোবল বাড়িয়ে দিল। তারপরে ইলেকশন হল; সেটা একটা ইতিহাস। কংগ্রেস সেবার ১৮টা সিট পেয়েছিল। শুধু সেবারেই নয়, ৮৩-র নির্বাচনেও লক্ষ্মী সেন বেলগাছিয়া পশ্চিম কেন্দ্রে হেরেগিয়েছিল। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে তখন একটা হাওয়া বইতে শুরু করছে। ৮৩-তে ৪০% আসন পেয়েছিল এবং ৩টে জেলা পরিষদও দখল করেছিল কংগ্রেস।
ভোটের পরে মগরাহাট অঞ্চলে কংগ্রেসের নেতারা বিডিওকে বা এসিডিওকে একটা স্মারকলিপি দিয়েছিল; সেটির একটি কপি কাগজে দিতে এসেছিল। যারা দিতে এসেছিল, তাদের একজনকে আমি চিনতাম। স্মারকলিপির শেষ দাবিটা ছিল, এক কংগ্রেস কর্মীর মুণ্ডু নিয়ে যারা ফুটবল খেলেছে, তাদের শাস্তি দিতে হবে। আমার হাতে যখন ওটা এল, তখন ওরা বেরিয়ে গেছে। আমি ছুটে বেরিয়ে দেখলাম ওরা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলে জানলাম মগরাহাটের নেতড়া অঞ্চলে ঘটনাটা ঘটেছে। তখন বর্তমান নতুন কাগজ। আমি নেতাদের খুব ভাল চিনিও না। আমি কংগ্রেসের অফিসে গিয়ে ঘটনাটা বলছি জায়গাটা সম্বন্ধে খোঁজ নিচ্ছি– যদি কোনও নেতা সে অঞ্চলে যায়। শুধু বুঝলাম জায়গাটা ডাকাত অধ্যুষিত ভয়ঙ্কর এলাকা। দেখলাম কংগ্রেসের একটা নেতাও খবরটা গ্রাহ্য করল না। সবাই কমবেশি পাশকাটিয়ে গেল।
আমি সেদিন হাজি মহম্মদ মহসিন স্কোয়ারের প্রদেশ কংগ্রেসের অফিসে গেছি একটা কাজে। কাজ সেরে ওপর থেকে আমি নামছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। দেখা মাত্রই আমাকে বললেন, কি খবর প্রবীরদা, ইলেকশনের পর থাকে আপনার সাথে আর দেখাই হচ্ছে না। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, নেতড়া অঞ্চলটা কিন্তু যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে। আমি ওনাকে সমস্ত ঘটনাটা বললাম। দেখলাম আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন, আমি শুনেছি, আপনি যাবেন? বললাম চলুন, মমতা বললেন কালকেই চলুন।
পরের দিন একটা ঢগঢগা এম্বাস্যাডার গাড়িতে আমি, আমার ফটোগ্রাফার গৌতম ওর টাইটেলটা ভুলেগেছি আর সঙ্গে একজন নিরাপত্তারক্ষী, তিনি সিভিল ড্রেসের একজন পুলিশ। এই হচ্ছে আমাদের টিম। আমরা রওনা হলাম। গিয়ে দেখলাম নেতড়া ওই অঞ্চলটা অত্যন্ত অনুন্নত অঞ্চল, রাস্তা-ঘাট বলে কিছু নেই; গাড়ি ছেড় আমরা ওই কয়েকজন তিন-চার কি.মি হেঁটেই গেলাম।
কি ভয়ঙ্কর সেই জায়গা বলে বোঝানো যাবে না। বেহালার শকুন্তলা পার্কের মতই ওখানেও সামনে কেউ আসছে না— এদিক ওদিক থেকে সব উঁকিঝুঁকি মারছে। সামনে কেউ আসছে না। এত আতঙ্কের একটা জায়গা। আমরা কলকাতায় বসে বা ওই ছেলেগুলোর মুখথেকে যা শুনেছিলাম, ঘটনাটা তার থেকেও ভয়ঙ্কর। গিয়ে দেখলাম টেকপাজায় যাকে মেরেছে যার মুণ্ডু নিয়ে সিপিএম ফুটবল খেলেছে, তার বাড়িটা… গরীব মানুষ, মাটির বাড়ি। তার বউ রোকেয়া বিবিকে সিপিএম কর্মীরা গ্যাং রেপ করেছে। তিন-চারটে ছেলে মেয়ে নিয়ে সেই মহিলা বাড়ি ছেড়ে প্রাণের ভয়ে গাছের তলায় ত্রিপল খাটিয়ে থাকে। ওই অঞ্চলে কেউ ওর পাশে দাঁড়াবার নেই, কেউই তাকে সাহায্য করতে আসছে না। মমতা রোকেয়া বিবিকে জড়িয়ে ধরে সে যুগে ৫০০ টাকা সাহায্য করে বললেন আমি তোমার পাশে আছি। এই ঘটনাটা তখন বর্তমান কাগজে ছবি দিয়ে বেরোনোর পরে বিরাট প্রতিক্রিয়া হয়েছিল— কেসফেস হয়েছিল, এসডিপিও বদলি হয়েছিল ওই ছেলেগুলো এ্যারেস্ট হয়েছিল সে এক হইচই ব্যাপার। এর পরে কলকাতার প্রথম সারির সব কাগজ এই সংবাদটাকে ফলোআপ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই প্রথম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী মুখটা মানুষের সামনে এল।
এর পরে যেখানেই অন্যায় হত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছুটে যেতেন। একবার ওনার সঙ্গে খিদিরপুরে গিয়েছিলাম। এখন যিনি বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় সেই দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি চালাচ্ছিলেন, সংখ্যালঘু এলাকায় সেই গাড়ির ওপর ভয়ঙ্কর আক্রমন হলো। কিভাবে যে ওখান থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছি সে একমাত্র ভগবানই জানেন। মাইতিবাবু বলে একজন সিকিউরটি ছিল, আশেপাশে রক্ষা করতে কাউকে পাওয়া যায় নি। তখন ওই অঞ্চলটা কলিমুদ্দিন শামসের এলাকা। কয়েকদিন আগে বিনদ মেহতা মারা গেছেন।
সেই সময় থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামে-গঞ্জে যেখানে যা অরাজকতা হচ্ছে, উনি সেখানেই ছুটে যাচ্ছেন আর কংগ্রেসের নেতারা কলকাতায় বসে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। এই সময় থেকেই কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ঈর্ষা কাতর হতে শুরু করলেন। আমি তখন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী। বর্তমান কাগজ থেকে আমায় এসাইন করা হয়েছিল, মমতা যেখানে যাবেন, আমি সেখানে তার সঙ্গে যাব। ধীরে ধীরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিটিং-এ প্রচুর লোক জড়ো হতে শুরু করেছে, আমি লিখতাম; কিন্তু বরুণবাবু পুরোটা বিশ্বাস করতেন না। বিশ্বাস করলেন যখন ১৬ই আগস্ট হাজরা মোড়ে লালু আলমের লাঠির বাড়ি মমতার মাথায় পড়ল। কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠলো। তখন বরুণবাবু বুঝলেন মমতার জনপ্রিয়তা।

একটাদিন তো এমন হলো যমে মানুষে টানাটানি চলছে; তখন মোবাইল ফোন আসে নি; সন্ধ্যেবেলা বরুণদার ঘরে বসে আছি। একটা ফোন এল। উনি আমায় ইশারায় কথা বলতে বারন করলেন। ফোনটা রেখে উনি হাসলেন। তারপর উনি উঠে নিউজরুমে এলেন। বললেন, মমতার ব্যাপারে সিপিএম খুবই চিন্তিত। সেখান থেকে ফোন এসেছিল, পরের দিন যেন কাগজে মমতার সঙ্কটের খবর হেডিং না করা হয়। বোঝা গেল উদ্বিগ্ন আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে ফোন এসেছিল। কেননা তখন গোটা রাজ্য এতই উত্তপ্ত হয়ে আছে, সে সময় যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কোনও লিড খবর বেরত তাহলে রাজ্যকে সামলানো মুশকিল হত। এটা সিপিএম জানত। তবু নিউজ করা হলো। বরুণবাবু আমার নাম দিয়ে লিখেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে বরুণদা সবাইকে বললেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়য়ের জনপ্রিয়তা আমি বিশ্বাস করতাম না; প্রবীর ঘোষাল আমায় এর আগে বলেছে, আমি বিশ্বাস করি নি, এই ঘটনায় আমার ভুল ভাঙল।
সেই ঘটনার পর যারা ভেবেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভয় পেয়ে যাবেন, বসে যাবেন, ঘটল উল্টো ঘটনা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জঙ্গী হয়ে উঠলেন। কংগ্রেসের ভেতরে সিপিএমের ইঙ্গিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে থামিয়ে দেওয়ার খেলা চলতে লাগল। সিপিএম জানত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিপিএম একা আটকাতে পারবে না, কংগ্রেসের নেতাদের সমর্থন লাগবে। তাই ঘটল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৯-তে হেরে গেলেন, তারপরে চলে এলেন দক্ষিণ কলকাতায়। তখনও সাবোতাজ হয়েছে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের উদ্যমেই সারভাইভ করে গেলেন। তাকে আর রোখা গেল না।
এইরকম এক ঘটনা চমকাইতলা। গড়বেতা চমকাইতলা পুরো কারগিল হয়ে আছে। পরের দিন চমকাইতলায় মিটিং; আমরা হুগলী জেলাপরিষদের বাংলোতে উঠলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেলা সভাধিপতির থাকার ঘর দেওয়া হল না। এমপিকে আমাদের মত একটা সাধারণ ঘরেই থাকতে হল। আমরা রাতে বারান্দায় বসে আছি; সেটা কামারপুকুর না কারগিল বুঝতে পারছিলাম না। দূরের মাঠে বোমের ফ্ল্যাশ দেখছি, গুলির আওয়াজ শুনছি। গোটা এলাকাটাই যুদ্ধেক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। সেখানে দুজন রক্ষী নিয়ে রাত কাটাচ্ছি; গোটা এলাকা টেররাইজড হয়ে আছে; ওই ধরণের জায়গায় রাত কাটানো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পক্ষেই সম্ভব। আমরা ভয়ে শিঁটিয়ে আছি, যে কোনও সময় আমাদের ওপর আক্রমন হতে পারে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কোনও ভয়ডর নেই। পরের দিন মিটিং হল, গণ্ডগোলও হল।
তৃণমূল তৈরি হওয়ার পর ২০০০-এ পাঁশকুড়ার উপনির্বাচন। ততদিনে তৃণমূল বড় শক্তি। তার আগে উপনির্বাচন মানে নির্বাচনে সিপিএম প্রায় ওয়াকওভার পাবে। আমি ১১ দিন ছিলাম পাঁশকুড়ায়। রোজই বরুণবাবুকে রিপোর্ট করতে হত। আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার কথা বলতাম; কিন্তু বরুণবাবু হেসে উড়িয়ে দিতেন। আমি বলতাম, আমি তো গ্রামে গ্রামে ওনার সঙ্গে ঘুরছি, দেখছি ওনার জনপ্রিয়তা। আমি দেখেছি যে সব এলাকা সিপিএম টেররাইজড করে রেখেছিল, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছে যেত পায়ে হেঁটে। উনি সারাদিন এলাকায় চরকিপাক খাচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝেছেন, এইভাবেই মানুষের ভয় ভাঙ্গাতে হবে, মনোবল বাড়াতে হবে, না হলে এই সব এলাকায় ভোট হবে না। বরুণবাবু ভোটের আগের দিন পর্যন্ত আমায় বলেছে তোমার মাথা খারাপ হয়েগেছে; দেখো সিপিএম রিগিং করবেই; আমি বলেছিলাম, বেশিরভাগ জায়গায় পারবে না। তিনি বিশ্বাস করেন নি। কিন্তু জনজাগরণ ঘটে গিয়েছিল। বরুণবাবুর আশংকাকে মিথ্যে প্রমান করে পাঁশকুড়ায় তৃণমূল উপনির্বাচনে জিতে গেল।
মা ছিল ওর অভিভাবক, বন্ধু সব কিছু। বাড়ির বাইরে বেরোলে ও মাকে ১০ টাকা হাত খরচা দিয়ে যেতেন। ওটা ছিল ওনার সংস্কার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেরোবার আগে ওনার মা দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেন। আর যতবারই কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতেন, মাকে নিশ্চই কেউ আড়াল করেছিলেন। মা ছিলেন তাঁর আশ্রয়। মা আমার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে নানান ধরণের আলোচনা করতেন। তার জ্ঞান শুনে আমি অবাক হয়ে যেতাম।
অনুলিখন বিশ্বেন্দু নন্দ