রাজনীতির পরিসরে সৌজন্যতা যে খুব স্বাভাবিক এবং সুলভ, এমন কথা বলা কঠিন। তবে রাজনীতির চর্চা যে কখনোই সৌজন্যমূলক ছিল না একথাও বলা যায় না। রাজনীতিতে চিরকালই কাদা ছোড়াছুড়ির প্রবণতা ছিল। তবে অসৌজন্যতা বা কুকথা সাম্প্রতিক সময়ে সব সীমাই অতিক্রম করেছে। ভোট প্রচারের সভামঞ্চ থেকে নিউজ চ্যানেলগুলি যেন দর্শক-শ্রোতাদের তাতিতে দেওয়ার জন্যই। ঘটনাটি এমনই যে; কে বা কারা উন্নয়নে কতটা কার্যকরি ভূমিকা নিয়েছে; তার থেকেও প্রতিপক্ষকে কতটা কুকথায় নিকৃষ্ট প্রতিপন্ন করা যায় তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কেবলমাত্র তার ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচন জয়ের ভাগ্য। আর এই অসৌজন্যতামূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছেন রাজনৈতিক নেতানেত্রীরাই।
একটি জাতীয়স্তরের টেলিভিশন চ্যানেলে বেশ কিছুদিন আগে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিৎ পাত্র দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে ‘ঠগ অফ হিন্দুস্তান’ বলে সম্বোধন করলেন। তারপরেই তিনি দেশের আরও দুই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীকে ‘ডাকাত’ বলে সম্বোধন করলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কংগ্রেসের রাজীব ত্যাগী পালটা জবাবে বললেন, ‘চৌকিদারই চোর’।
অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের কুৎসিত মন্তব্য, অশ্লীল ইঙ্গিত, আকথা-কুথার ধারাপাত গত কয়েক বছর ধরে বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলে একটা প্রথা হয়ে উঠেছে। তবে বাংলা বা বাঙালি রাজনীতিকদের পারস্পরিক গালমন্দের রেওয়াজটা একেবারেই নতুন ঘটনা নয়। ঠিক কবে থেকে বা কোন ঘটনার পর শুরু সেটা গবেষণার বিষয় কিন্তু বাম-ডান প্রবীন রাজনীতিকরা একমত যে সৌজন্যতাহীন রাজনীতি চর্চার শুরু বামেদের হাত ধরেই। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে ‘তোজোর কুকুর’ আখ্যায়িত করা থেকে তাদের অসহিষ্ণুতা আর অসৌজন্যতামূলক রাজনৈতিক চর্চার সূচনা।
স্বাধীনতার কয়েক বছর পর ১৯৫৩-র ২ ফেব্রুয়ারি বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী নলিনী সরকারের মৃত্যুতে প্রথানুযায়ী রাজ্যপালের (হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়) ভাষণের পর প্রয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সদস্যরা উঠে দাড়িয়ে নীরবতা পালন করলেও বিরোধী দলনেতা কমিউনিস্ট জ্যোতি বসু বসে থাকেন। মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় প্রশ্ন করলে জ্যোতিবাবু জানান, তেভাগা আন্দোলনের সময় ওঁর নির্দেশে পুলিশ বহু কমরেডকে গুলি করে মেরেছে, একজন খুনির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। হতে পারে এটা প্রতিবাদ কিন্তু বিধানসভার রীতিনীতিতে সেটা সম্মানজনক নয়।
ষাটের দশকের গোড়াতেই বামেরা হটাৎ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় কংগ্রেস নেতা ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন চোর। তিনি বিবাদিবাগ এলাকার স্টিফেন হাউস কিনে নিয়েছেন। কংগ্রেসের আরেক সর্বভারতীয় নেতা অতুল্য ঘোষের একটি চোখ ছিল পাথরের। বামেরা অতুল্য-র আগে কানা কথাটি জুড়ে সর্বসাধারণের মধ্যে চাউর করে দেয়। কেবল তাই নয়, দেওয়ালে দেওয়ালে বামেরা লেখে কানা অতুল্য। শুধু তাই নয়, ১৯৬৭-র লোকসভা নির্বাচনে পুরুলিয়ার আদ্রা কেন্দ্রে সিপিআই প্রার্থীর কাছে অতুল্যবাবু পরাজিত হলে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় বামেরা কানা বেগুন বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়। মানুষের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ব্যাঙ্গ করা কি মনুষ্যোচিত কাজ? কিন্তু অত বছর আগেই বামপন্থী রাজনীতিতে এ ধরণের চর্চা চালু হয়ে গিয়েছিল।
১৯৬৯-এর নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকারকে সরিয়ে রাজ্যপাল ধরমবীর রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী পিডিএফ দলনেতা প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী করলেন সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং সিপিআই(এম) তার প্রতিশোধ তুলল রাজ্য বিধানসভায় প্রবীণ গান্ধীবাদী নেতা প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে পচা ডিম, পচা টম্যাটো এবং দোয়াতের কালিতে কলঙ্কিত করে।
সাতের দশকে পুলিশের গুলিতে কেন আরও নকশাল মারা পড়ছে না, সেই উৎকণ্ঠায় যেন ঘুম হচ্ছিল না প্রমোদ দাশগুপ্তের। তাই তিনি বলেই ফেললেন, ‘পুলিশের গুলিতে কি ‘নিরোধ’ লাগানো আছে। পুলিশ গুলি চালায় অথচ নকশাল মরে না’।
যে ভাষা মানুষের কথ্য নয়, যে ভাষা ব্যবহারের আগে মানুষ চারপাশ দেখে নেয় সাধারণভাবে তাকেই আমরা অকথ্য বলি। অথচ পাবলিক খাবে বলে ভদ্রতা-সভ্যতা-শিষ্ঠতাকে বিসর্জন দিয়ে একদা আরামবাগ রত্ন অনিল বসু থেকে শুরু করে সুশান্ত ঘোষের মতো সিপিএম মহারত্নদের মুখ থেকে প্রকাশ্য সমাবেশে অনর্গল বেরিয়ে আসতে থাকে। আর সেই সব প্রকাশ অযোগ্য ভাষাকে অন্য মাত্রা দিতে অথবা ইন্ধন জোগাতে বিনয় কোঙার থেকে শুরু করে বিমান বসু, অনিল বিশ্বাসদের মতো মার্কসবাদ চর্চা করা নেতারাও ভাষা ব্যবহারের নানা দৃষ্টান্ত রেখে যান। অনিল বাবু একবার কংগ্রেসের অবস্থান বলতে মমতার শাড়ির আঁচলের তলা বলেছিলেন আলিমুদ্দিনে বসেই। আনিসুর রহমানের মতো অভিঙ্গ সিপিএম নেতাও বলেন, ‘দিদিমণিকে জিঙ্গাসা করি ওর ফি তো কুড়ি হাজার, আপনার ফি কত?’ মার্কেজপ্রেমী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কথা কম বলতেন ঠিকই, তবে ঘন ঘন সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছেড়ে চরম উদ্ধত-মারমুখী ভঙ্গিতে কথায় কথায় ‘মেরে মাথা ভেঙে’ দেওয়া অথবা ‘চাবকে সোজা’ করতেন বিরোধী নেতা নেত্রীদের। গেরুয়া বীরপুঙ্গবরা কি আজ সেই পথ অনুসরণ করেই জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি করে দেওয়ার ট্র্যাডিশন তৈরি করতে চলেছেন?
খুবই তথ্যবহুল লেখা, অবশ্যই ভাল এবং জরুরী লেখা।
বিরোধীপক্ষকে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ সেটা এ রাজ্যের রাজনৈতিক চর্চায় যে বাম বিশেষ করে সিপিএম দলের নেতারাই
শুরু করেছিলেন সে বিষয়ে বামপন্থায় বিশ্বাসী মানুষরাও জানেন, সিপিএম তাদের সবার্থে যে কোনও কুকাজ যেভাবে করে
এসেছে কুকথাও সমানতালে চালিয়েছে।
এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে সৌজন্যতাহীন রাজনীতির চর্চা শুরু বামেদের হাত ধরে। সেটা পরবর্তীতে অনেকেই
অনুসরণ করছেন। কখনো বিরোধীপক্ষকে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে কখনো হুমকি দিয়ে।
বামেরা (সিপিএম) কি আজও সেই অভ্যাস বা সংস্কৃতি থেকে নিজেদের আলাদা করতে পেরেছে? মনে হয় নতুন বোতলে
পুরনো মদ রয়েই গিয়েছে, আজ তার হলাহল আরও তীব্র হয়েছে। ওরা এমনই নীচ-হীন-অকথ্য একটি দল যাদের চর্চায়
নর্দমা আর পচা ডোবার দুর্গন্ধ।
বাম বলতে নির্দিষ্ট করে সিপিএম-দের কথা বলা উচিত। সিপিএম মানে নোংরা-আবর্জনা, সভ্যতার কলঙ্ক, তাদের রাজনীতি-
সমাজ সব কিছুই খিস্তিময়, গালাগালাজপূর্ণ। আজ ওরা বিজেপিকে ধরে ক্ষমতায় ফিরতে চাইছে, কাল তৃনমূল ধরবে, পরের
দিন কুকুরের ল্যাজ। শুধু বাম বললে হবে না, উল্লেখ করতে হবে সিপিএম।