স্বাধীনতার সংগ্রাম বলতে যদি আমরা জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা বুঝি তবে আরামবাগ মহকুমায় তার সূচনা হয়েছিল ১৯২১ সালে। আরামবাগের মাটিতে প্রফুল্ল চন্দ্র সেন পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এই অধ্যায়ের শুরু। কিন্তু একটা প্রদীপ জ্বলে ওঠবার আগে তার সলতে পাকানোরও তো একটা ইতিহাস থাকে। শুধু আরামবাগ মহকুমাই নয় সারা ভারতবর্ষের মানুষের মনে একটা রাজনৈতিক নবজাগরণের বিষয়ে যদি আলোচনা করতে হয় তবে তার অগ্রপথিক রাজা রামমোহন রায়ের কথা দিয়েই শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে সারা ভারতবর্ষকে একবার মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়াতে হবে খানাকুলের রাধানগর গ্রামের কাছে। আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসেও তেমনি সূত্রপাত হয়েছে রামমোহন রায়ের নামের সঙ্গে। রামমোহনের সময়ে ব্রিটিশ শাসনের বিষবৃক্ষ তার ভয়ংকর ডালপালা ছড়িয়ে মহীরুহে পরিণত হয়নি, অথচ সেই সময়েও কী আশ্চর্যভাবে রামমোহন বুঝেছিলেন একটা জাতির রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষের কতখানি প্রয়োজন! সংগ্রামের বীজ এখান থেকেই পোঁতা হয়ে গিয়েছিল। আর সেই মাটিতেই প্রফুল্ল সেনের উত্থান। আরামবাগ মহকুমার স্বাধীনতা সংগ্রামের যাঁকে প্রাণপুরুষ বলা যায় তিনি হলেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। পরবর্তীকালে এখানকার মানুষের কাছে আরামবাগের গান্ধী। যিনি এক সময় এ রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী ও পরে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। বাংলাদেশের খুলনা জেলার সেনহাটিতে জন্ম হলেও সিংহভাগ কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে। তাও স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা হিসেবে। ৭৫ বছরের স্বাধীনতা দিবসে বাংলার মানুষ আজও তাঁকে স্মরণে — মননে গেঁথে রেখেছে।
প্রসঙ্গত, উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যাওয়ার সব ঠিকঠাক। এমনকী জাহাজের টিকিট পর্যন্ত কাটা। এমন সময় সারা দেশ জুড়ে ধ্বনিত হল স্বদেশী আন্দোলনের আহ্বান। সব কিছু ছেড়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন দেশের কাজে। সালটা ১৯২১। হুগলিতে একটি জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে হুগলি বিদ্যামন্দির। বাল্যবন্ধু রবি পাতিল ছিলেন হুগলি জেলা কংগ্রেস কমিটির প্রথম সম্পাদক। তিনিই তাঁকে হুগলি বিদ্যামন্দিরে ডেকে পাঠালেন। শুরু হল প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের নতুন জীবন।অধ্যাপক জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ, ভূপতি মজুমদার, নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, গৌরহরি সোম, বিনয়কৃষ্ণ মোদক তখন সেখানে থাকতেন। কবি নজরুল ইসলামও মাঝেমধ্যে এখানে এসে বসবাস করতেন। এই বিদ্যামন্দিরেই সর্বপ্রথম হুগলি জেলা কংগ্রেসের কার্যালয় স্থাপিত হয়।
সালটা ১৯২১, জুন মাস। গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফৎ আন্দোলন সফল করার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে সভা হচ্ছে। শ্রীরামপুর ও সদর মহকুমায় কমিটিও তৈরি হয়েছে। কিন্তু আরামবাগে কিছু হয়নি। আরামবাগ অত্যন্ত দূরবর্তী এলাকা, রাস্তাঘাটের যোগাযোগ নেই। তারকেশ্বর থেকে হাঁটা পথে যাতায়াত করতে হয়, তাই সেখানে তখনও সংগঠন করা যায়নি। একদিন হুগলি বিদ্যামন্দিরে সবাই আলোচনায় বসলেন। আরামবাগে কাকে পাঠানো হবে সেই নিয়ে। কে আরামবাগে যাবে? আরামবাগের নাম শুনেই অনেকে আঁতকে উঠলেন। প্রফুল্ল সেন এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন। পরের দিনই যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেদিন তাঁর সেই সিদ্ধান্ত যেন আরামবাগ মহকুমার কপালে রাজটিকার মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। আরামবাগে এসে ডোঙ্গলে তিনি স্বদেশী কেন্দ্র স্থাপন করেন। প্রফুল্ল সেনের নেতৃত্বে আরামবাগ মহকুমা-ই কালক্রমে হুগলি জেলার আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে গেল। দলবল নিয়ে প্রফুল্ল সেনের আরামবাগে আগমন — এই কথা শোনার পরই মহকুমা শাসক ১৪৪ ধারা জারি করলেন। চারদিকে ভয় ও থমথমে ভাব। এরই মধ্যে প্রফুল্ল সেন তাঁর দলবল নিয়ে আইন অমান্য করে সভা করলেন। সর্বত্র আশাতীত সাড়া মিলল। বড় ডোঙ্গলের অনুকূল চক্রবর্তী তাঁর বাড়িতে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন স্বদেশী যুবকদের।
প্রফুল্ল সেনকে সবচেয়ে বেশি যেটা নাড়া দিয়েছে তা হল আরামবাগ — খানাকুলের ভয়াবহ বন্যায় মানুষের দুর্গতি। প্রফুল্ল সেন এখানেও পাশে দাঁড়ালেন। দুর্গতদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করলেন। একদিকে বন্যার্তদের সেবা, অপরদিকে স্বদেশি আন্দোলনকে জোর দেওয়া। এখানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়লেন। ঘণ্টেশ্বর মন্দিরের কাছে একটি নির্জন শ্মশানে আশ্রয় নিলেন। ইতিমধ্যে এখানে থাকাকালীন প্রফুল্ল সেনের জ্বর এল। জীবনে প্রথম ম্যালেরিয়া হল। এরপর ফিরলেন হুগলিতে। সুস্থ হতেই আবার আরামবাগে ফিরে এলেন। খানাকুল, গোঘাট, পুরশুড়া ও আরামবাগে আন্দোলন আরও জোরদার করে গড়ে তুললেন। গ্রামে গ্রামে সদস্যদের নিয়ে আন্দোলন কমিটি গড়ে তুললেন। শুরু হল আন্দোলন।
উল্লেখ্য, স্বদেশীরা মশার জ্বালায় গায়ে কেরোসিন মেখে পড়ে থাকতেন ঝোপজঙ্গলে। প্রফুল্ল সেন সাগরকুটিরে থাকতেন। নেতৃত্ব দিতেন এখান থেকেই। দুর্গম, ম্যালেরিয়া আকীর্ণ আরামবাগে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর সেইসঙ্গে আরামবাগের উন্নয়নের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। ডোঙ্গলের বিখ্যাত কংগ্রেস জেলা সম্মেলনের তিনি সম্পাদক হয়েছিলেন। এরপর তিনি হুগলি জেলা আইন অমান্য পরিষদের সম্পাদক হন। স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে বহুবার তাঁকে কারাদণ্ড ও পুলিশের নির্যাতন ভোগ করতে হয়।
প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তারও আগে ১৯৪৮ সালে তিনি অসামরিক ও পরে খাদ্যমন্ত্রী হিসাবে এ রাজ্যে মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। অত্যন্ত সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং আজীবন এই গান্ধীবাদী নেতাকে বলা হয় ‘আরামবাগের গান্ধী’। আজকের দিনে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে আরামবাগ তথা বাংলার মানুষ সশ্রদ্ধ চিত্তে আরামবাগের গান্ধী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে স্মরণ করছে।