আরামবাগের গান্ধী, বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের ১২৭ তম জন্মতিথি পালিত হল তাঁর আরামবাগের বাসভবন মায়াপুর কল্যাণ কেন্দ্র। এখানকার প্রফুল্ল চন্দ্র সেন স্মৃতি রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে এই উপলক্ষে একটি বর্ণময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হুগলি জেলা পরিষদের সভাধিপতি আলহাজ্ব সেখ মেহেবুব রহমান, আরামবাগের প্রাক্তন পুরোপিতা স্বপন নন্দী, আরামবাগের প্রাক্তন বিধায়ক কৃষ্ণ চন্দ্র সাঁতরা, জেলা পরিষদের সদস্য শিশির সরকার, পলাশ রায় প্রমুখ। আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন, স্মৃতি রক্ষা কমিটির সম্পাদক সলিল চ্যাটার্জী, যুগ্ম সম্পাদক দেবাশিস শেঠ, সহ-সভাপতি আজিজুল ওহাব, কোষাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ বেরা প্রমুখ।

আরামবাগ প্রফুল্ল চন্দ্র সেন স্মৃতি রক্ষা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দেবাশিস শেঠ জানিয়েছেন, “প্রফুল্ল চন্দ্র সেন-এর জন্ম ১০ ই এপ্রিল। এই দিনটি তার অনুরাগীরা আরামবাগ মহকুমা তথা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পালন করেন। প্রফুল্ল চন্দ্র সেন এর জীবদ্দশা থেকেই এখানে কল্যাণ কেন্দ্রে তার জন্মতিথি পালিত হয়। সেই রীতি মেনে চৈত্র মাসে নীলের দিন আমরা তাঁর জন্মতিথি পালন করে আসছি। এদিন এখানে উপস্থিত অতিথিরা এই মহান দেশপ্রেমিকের জীবন আদর্শ, তাঁর অনাঢ়ম্বর জীবনযাপন, মূল্যবোধ ইত্যাদি প্রসঙ্গে আলোচনা করেন ও স্মৃতিচারণ করেন। প্রফুল্ল চন্দ্র সেন এর স্মৃতিকে সামনে রেখে আগামী দিনে কিভাবে জনসেবামূলক কাজকর্ম করা যায়, এই এলাকার উন্নয়ন ও তাঁর স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষণ ইত্যাদি প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়।”

হুগলি জেলা পরিষদের সভাধিপতি মেহেবুব রহমান এই স্মৃতি ভবন ও এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেন। এদিন তিনি অপূর্ব সংগীত পরিবেশন করেন।

প্রসঙ্গত, প্রফুল্ল চন্দ্র সেন এর জন্ম ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে। শনিবার নীল তিথির দিনে জন্ম বলে বাড়ির বড়োরা তাঁকে অনেকে নীলু বলে ডাকতেন। এ দিনটি ভূতনাথ অর্থাৎ শিবের তিথি বলে মা তাকে ভূতো নামেও ডাকতেন। পিতার কর্মসূত্রে বিহারের সাসারামের তাঁর শৈশব কেটেছে। পরবর্তীকালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিএসসি পাশ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা এই সময় গান্ধীজীর আহবানে সাড়া দিয়ে সবকিছু ছেড়ে স্বদেশী স্কুল হুগলি বিদ্যামন্দিরে শিক্ষকতার কাজে যোগ দিলেন তিনি।

সেখান থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সংগঠন গড়ে তুলতে প্রথমে আরামবাগে এলেন ১৯২১ সালে। সেই সময় আরামবাগ মহকুমা অত্যন্ত দুর্গম আশ্বাস্থ্যকর এবং অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন হুগলি থেকে কেউ আরামবাগে আসতেই চাইতেন না। প্রফুল্ল চন্দ্রের হাত ধরেই সবদিক থেকে আরামবাগের উন্নয়ন শুরু হয়। রাজা রামমোহন রায়ের জন্মভূমি ও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মভূমি আরামবাগ কে প্রথম সম্মান জানিয়েছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। পরবর্তীকালে আরামবাগ মহকুমা কে কেন্দ্র করে এক সময় হুগলি জেলার স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের নেতৃত্বে।

স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে অসামরিক ও পরে খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর অনাঢ়ম্বর জীবনযাত্রা, রাজনৈতিক সততা ও নিখাদ দেশপ্রেম আজও অনুপ্রাণিত করে আরামবাগের মানুষকে।