মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
(১০ এপ্রিল স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের জন্মদিন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো লেখা পুনঃপ্রকাশ করা হলো—সম্পাদক)
১৯৮৪ সাল। ৩১ অক্টোবর। দুপুর প্রায় দেড়টা। মর্মান্তিক খবর এল রেডিওতে—গুলিবিদ্ধ ইন্দিরা গান্ধী।
সেদিন আমরা সকলেই রাজীবজির সঙ্গে মেদিনীপুরে। সফর কাটছাঁট করে রাজীবজি ফিরে গেলেন। সন্ধ্যায় সরকারিভাবে ঘোষণা হল—ভারতরত্ন ইন্দিরাজি আর নেই।
গোটা দেশের কাছে চরম দুর্দিন। কিন্তু কংগ্রেস বরাবরই দেশের সংকটে ঐক্যবদ্ধ। সেদিন রাতেই সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়ে রাজীবজি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। তারপরেই এসে গেল দেশ জুড়ে অষ্টম লোকসভা নির্বাচন।

যাদবপুর সিপিএমের ‘লালদুর্গ’। আমাদের দলের তাবড় তাবড় নেতারাও সেখানে দাঁড়াতে রাজি ছিলেন না। প্রস্তাব এল আমার কাছে। কী করি—কী করি?
বিষ্ণুপুরের রশিদ গাজি বললেন, ‘আপনাকেই দাঁড়াতে হবে। আমরা অন্য কাউকে চাই না।’
শেষ পর্যন্ত আমি যাদবপুরের কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলাম। জিতব, এমনটা ভেবে নামিনি। কিন্তু এই জেদটা ছিল যে, বিনাযুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব না। জিতলাম। আমার অগোচরেই। একটা রিকশায় মাইক বেঁধে বৃদ্ধবয়সে প্রফুল্লচন্দ্র সেন তাঁর স্নেহের পাত্রী খুকুদিকে নিয়ে আমার হয়ে রাস্তায়-রাস্তায় প্রচার করে বেড়িয়েছিলেন। ভোটে জেতার পর প্রফুল্লদার আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য তাঁর মিডলটন রোডের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে সেদিনই প্রথম দেখা হল। মনে হল, তিনি এক আশ্চর্য মানুষ। যিনি পরের মুখাপেক্ষী হয়ে, পরের ফ্ল্যাটে থাকতেন। জীবনে নিজের জন্য কিছু করেননি। ইনিই তো আদর্শ মানুষ। রাজনীতিরও আদর্শ।

দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হল। প্রফুল্লদা প্রাণভরে আমায় আশীর্বাদ করলেন। বললেন, ‘মমতা, আমি ৯০ পেরিয়ে গিয়েছি। আমার বয়স কম হলে নতুন করে আরও একবার সুযোগ নিয়ে দেখতাম। তোমায় দেখে আশার আলো পাচ্ছি।’
প্রফুল্লদা জোর করেই আমায় খাওয়ালেন। তারপর একটা সিল্কের শাড়ি আমার হাতে গুঁজে দিয়ে খুকুদিকে বললেন, ‘মমতাকে বলো এই শাড়িটা পরে আমায় দেখাতে।’

প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়েছিলাম সেদিন। গুরুজনের কথা অমান্য করার সাধ্য নেই। প্রফুল্লদা জানতেন না, ছোটোবেলায় কখনও সখনও সিল্কের শাড়ি পড়ে থাকলেও সক্রিয় রাজনীতিতে আসার পর থেকে আমি আর সিল্কের কাপড় পরতাম না। কিছুতেই প্রফুল্লদাকে বোঝাতে পারছিলাম না। বাধ্য হয়ে খুকুদিকে বললাম, ‘প্লিজ। তুমি দাদাকে বোঝাও। আমি পরে পরব। এখনকার মতো আমায় বাঁচাও।’

খুকিুদির বুদ্ধিমত্তায় সেদিন রেহাই পেয়েছিলাম। তারপর থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই প্রফুল্লদার কাছে যেতাম। তাঁর উপদেশ শুনতাম। উনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, ‘মমতা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল সিপিএমকে মাথায় করে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। আমি এর প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। এ যে আমার কী মানসিক যন্ত্রণা, বলে বোঝাতে পারা কঠিন। জানি না, আমার জীবদ্দশায় ওদের পতন দেখতে পারব কি না।’

১৯৯০ সালের ষষ্ঠীর দিন চলে গেলেন প্রফুল্লদা। হঠাৎ। ভেবেছিলাম, প্রফুল্লদা শতবর্ষে পৌঁছোবেন। খুব স্নেহ করতেন আমায়। তাঁকে আমি শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়, এক সহৃদয় মানুষ হিসেবে দেখেছি। ১৯৮৯ সালে হুগলির আরামবাগে একটা সভা করতে গিয়েছিলাম। সেদিন প্রফুল্লদা তাঁর আরামবাগের বাড়িতেই। কোনওভাবে জানতে পেরেছিলেন, সেদিন আমার মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত ছিল। ছোটোবেলা থেকেই আমি জ্যৈষ্ঠমাসের মঙ্গলবার দিনটা পালন করি। আমাদের পরিবারের সব মেয়েরাই করে। দেখলাম, প্রফুল্লদা একজনের হাতে আমার জন্য একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। তাতে লেখা, ‘মমতা, আজ তোমার মঙ্গলচণ্ডী আমি জানি। বাইরে তো খাওয়া হবে না। আমি শসা-মুড়ি রেখে দেব। ফেরার পথে আমার বাড়িতে একটু খেয়ে তারপর বাড়ি যাবে।’

সেদিন মনে হয়েছিল, এই প্রফুল্লদাকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়েছিলেন বামপন্থী বন্ধুরা। শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য তাঁর বাস্তব কথাগুলোরও বিকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর স্বরূপ কাউকে বুঝতেই দেওয়া হয়নি। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন স্বর্গীয় প্রফুল্লদার কথা বারবার মনে পড়বে। তাঁর জীবনের শেষ স্বপ্ন ছিল, সিপিএমকে সরে যেতে দেখা। তিনি দেখে যেতে না পারলেও আমাদের অন্তরের শপথ দিয়ে প্রফুল্লদার সেই বাসনা আমরা পূর্ণ করতে পেরেছি। এতদিনে নিশ্চয়ই প্রফুল্লদার আত্মা খানিকটা শান্তি পেয়েছে। আজ নিশ্চয়ই তিনি আমাদের আশীর্বাদ করছেন।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ৭ এপ্রিল ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত