আমাদের বাড়িতে সবাই বেড়াতে ভালোবাসে। হাতে কিছু পয়সা জমলে একটাই চিন্তা, এর পর কোথায় বেড়াতে যাবো। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই ঠিক হলো আমরা আলিপুরদুয়ার যাবো। তারপর টিকিট কাটা, সে তো এক পর্ব, যাই হোক সব কিছু করে চলে এলাম আমরা।
আমার ছোটো ছেলের উৎসাহ সব থেকে বেশী। আজকাল কোথাও বেড়াতে গেলে, তাতাই সব ব্যবস্থা করে। মা বাবার সঙ্গে ছেলে-মেয়েরা যায়, আর আমরা এখন যে বয়েস এসে দাঁড়িয়েছি তাতে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আমরা আসি।
কোন ব্যাগ নেওয়া হবে, কাপর জামা, জুতো, ওষুধ, শুকনো খাবার, জল, মোবাইল, চার্জার, টাকাপয়সা সব দায়িত্ব ও বেচারীর।
সারা রাস্তা, কে কি খাবে? কে কখন ওষুধ খাবে, কে শোবে সব দিকে নজর রাখে ও।
স্টেশনে নেমে দেখি, পল্লব সরকার দাঁড়িয়ে আছেন গাড়ি নিয়ে। এনার কথা একটু বলে নেওয়া দরকার। ইনি পেশায় একজন শিক্ষক, কিন্তু অন্য দিকে বিশিষ্ট একজন কীর্তন গানের শিল্পী।

অরুণাভ রায় যেহেতু দূরদর্শনে ছিলেন, সেই সুবাদে এই শিল্পীকে তিনি বিশেষ ভাবে চেনেন। বহুবার পল্লব সরকার অনুরোধ করেছেন, এইখানে বেড়াতে আসার জন্যে, কিন্তু আসা হয় নি আমাদের। এবারে যখন সব ঠিক হলো, তখন তাকে খবর দেওয়া হয়, যে আমরা আসছি।
স্টেশনে পৌঁছনোর পরে পল্লববাবু আমাদের নিজের গাড়িতে চিলাপাতা নিয়ে এলেন। প্রায় তিরিশ কিলোমিটার রাস্তা আসতে আসতে তার পড়াশুনা, শিক্ষক জীবনের ঘটনা, পরিশ্রম, সংসার, মা-বাবা, পুত্র, পরিবার, দাদার অসুস্থতা ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে কথা বলছিলেন। খুবই ভালো লাগছিল তার কথা। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, মানুষটি নানারকম ঝামেলা নিয়েও নিজের মতোই আছেন, আবার আমাদের জন্যে সময়ও কম দিলেন না। এতটা পথ এলেন, আবার ফিরেও যাবেন একা। মানুষটির গলার স্বর খুবই প্রশংসনীয়। সুন্দর চেহারা। বিশিষ্ট ভদ্র এবং ধীর স্থির ব্যক্তিত্বের অধিকারী। খুব ভালো লাগলো ওনার কথা বার্তা, ব্যবহার।
চিলাপাতায় একটি হোম স্টে-তেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। স্টেশন থেকে আসার পথে, পথের দুধারে শুধু বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত এবং সবুজের সমারোহ মনকে জুড়িয়ে দিল। কলকাতা থেকে বেশি দূর তো নয়, একরাতের ট্রেন জার্নি। রাত এগারটা কুড়ি তে পদাতিক এক্সপ্রেসে উঠে আমরা পরদিন দুপুরে সাড়ে বারটা নাগাদ নেমেছি আলিপুরদুয়ারে।

চিলাপাতা আসার পর খুব ভালো লাগলো এই হোম স্টে। লোকজনের ব্যবহার খুবই ভালো, এদের আদর যত্ন বিশেষ প্রশংসার যোগ্য। নিজেদের ঘরে ঢোকার পরে তো অবাক হয়ে গেলাম। ঘরের বারান্দায় গিয়ে দেখি আদিগন্ত সবুজ আর সবুজ। চারিদিকে ধানক্ষেত, কোথাও ধান কাটা হয়েছে, কোথাও এখনও হয় নি। আর যেখানে ধানক্ষেত শেষ সেখানে জঙ্গলের শুরু।
কি যে অপূর্ব দৃশ্য, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। রাতের বেলা ঠান্ডা লাগলেও একটু বারান্দায় বসার লোভ সামলাতে পারলাম না। চারদিকে ঝুপসি অন্ধকার, আমাদের এখানে আলো জ্বলছে আর রাস্তায় দু একটা আলো। দূরের গ্রামে কোথাও কোথাও আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে। চারপাশে শুধু অন্ধকার। দূরে কোথাও অন্ধকারে একটি ঝোপের মধ্যে জোনাকি জ্বলছে, শেষ কবে দেখেছি জোনাকির আলো, মনে পড়ে না। সেই শান্তিনিকেতনে থাকার সময় সম্ভবত।
আসলে আমরা সবাই তো আলোর জগতের অধিকারী, তাই আলোর নিচের অন্ধকারই আমাদের চিরসঙ্গী। সেই কারণেই অন্ধকারের যে নিজস্ব আলো আছে, তার খবর আর আমরা রাখি না। কি যে অবর্ণনীয় সৌন্দর্য নিয়ে দূরের পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, তার শান্ত, স্নিগ্ধ গাম্ভীর্য যেন কত দিনের কত না বলা কথা বুকে জমা করে অপেক্ষা করছে, যদি কেউ কখনো শোনে, সেই আশায়।
সবে কালীপুজো গেল, আজ দ্বিতীয়া। তাই চাঁদের আলোর তো প্রশ্নই নেই। অনেক রাতে হয়তো উঠবে। আমাদের এখানে থাকা শনিবার দুপুর অবধি।
আজ আমাদের জঙ্গল সাফারি ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই মন একটু উত্তেজিত সবার। সকালে উঠে সবাই ভাবছি, কখন যাবো? দুপুর একটার সময়। গাড়ি এসে নিয়ে যাবে শুনলাম। ঘণ্টা দেড়েক জঙ্গলে ঘোরা।

এইসব ভেবে ভেবে দুবার চা খেয়ে, জলখবারের সময় হলো। আজ এখানে লুচি, রুটি, আলুর দম আর ছোলার ডাল মেনুতে। আমরা লুচি আর ছোলার ডাল খেলাম, রান্না এখানে আমাদের বাড়ির মতই। তারপর থেকে অপেক্ষা চলছে। সব কাগজ পড়া শেষ, মোবাইলে মন বসছে না। আশেপাশে হেঁটে বেরিয়ে, ঘর বারান্দা ঘুরে ঘুরে যখন কিছুই আর ভালো লাগছে না, ঠিক তখনই ফোন এলো, গাড়ি এসে গেছে, যেতে হবে। জিপসিতে তো আগে চড়ি নি কখনো। কিন্তু সবই ঠিক মত হলো। ভালো ভাবেই বসলাম। ড্রাইভার এবং গাইড দুজনেই তো অনেক বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।
জঙ্গল তো তার নিজের মতো সৌন্দর্য বিছিয়ে বসেই থাকে, আমাদের দেখার চোখের অপেক্ষা শুধু। কি যে তার অপরূপ রূপ তা তো বলে শেষ করা যায় না।
বেশ কিছু বাঁদর, ময়ূর-ময়ূরী, দু-একটা হরিণ দেখার পর, আমাদের গাইড গাড়ি থামাতে বললো ড্রাইভারকে, আমাদের বললো, সামনে গন্ডার আছে, বুনো ওরা, আমরা যেন চুপচাপ থাকি, কথা না বলি। সামনে কিছু বক উড়ছে, গাইড বললো, ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে গন্ডার। একটু খেয়াল করে দেখি ঠিক তাই। কান দুটো মাঝে মাঝে নাড়াচ্ছে, আর আমাদের দিকে মুখ করেই দাঁড়িয়ে আছে। বকগুলো তার পিঠের উপরে বসে খুঁটে খুঁটে তার শরীরের থেকে পোকা মাকড় খাচ্ছে। কিছুক্ষন পরে গাইড বললো, “এবারে আমরা যাই, ও আরাম করুক।”
আমরা আস্তে আস্তে চলে এলাম ওখান থেকে। সত্যিই তো, ওকে ওর মতই থাকতে দেওয়া উচিত। আমরা যে একটু খোলা মেলা ভাবে ওকে দেখতে পেলাম, এর মূল্যই আলাদা।
যখন ফিরছি তখন আবার হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল, বাইসন ছবিতে দেখেছি, কিন্তু সামনে তো জন্মেও দেখি নি। সবাই চুপ করে আছি। ঝোপে নড়াচড়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, গাইড হাত তুলে ইশারা করাতে ঝোপের মধ্যে চোখ ফেলতেই দেখি বিশাল আকৃতির এক বাইসন। কি বিরাট রে বাবা! যথারীতি তার উপরেও অনেক বক বসে নিজেদের কাজ করে চলেছে। মিশমিশে কালো, কি বিরাট শক্তিধর এক জন্তু, ভয় এবং রোমাঞ্চ মিলে মিশে শরীরে মনে এক অনন্য অনুভূতি।

পাশ থেকে একটি হরিণ লাফাতে লাফাতে চলে গেল, অদ্ভুত আওয়াজ করছিল। শুনলাম বার্কিং ডিয়ার। বেশ লাগলো দেখতে। চিড়িয়াখানার সঙ্গে কত তফাৎ এইসব জঙ্গলের। আমরা তো চিড়িয়াখানায় জন্তু জানোয়ার দেখেই আনন্দ পাই, বন্দীদের দেখে স্বাধীন মানুষের আনন্দ। আর এ যেন উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা স্বমহিমায় উজ্জ্বল প্রাণের প্রকাশ।
এরপর ফেরার পথে আমরা। হোম স্টে-তে ফিরে এলাম প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ।
ডাইনিং হলে ঢুকে গরম ভাত আর তার সঙ্গে ডাল, আলুভাজা, ফুলকপি আলুর তরকারি, কাতলা মাছ ভাজা, চাটনি আর পাঁপড়, মন ভরে, পেট ভরে খাওয়ার পর্ব চুকিয়ে, ঘরে এসে অফুরন্ত ঠান্ডা গরম মিশ্রিত জলে স্নান সেরে সবাই বিছানার আশ্রয় নিলাম। কেউ কারো সঙ্গে তেমন কথা বলছি না। মন তো সবার আনন্দে, বিস্ময়ে ভরপুর হয়ে আছে। সবাই ভাতঘুম দিয়ে উঠে চা খেলাম, তখন সাতটা বাজে প্রায়। বাইরে অন্ধকার নেমেছে আবার। একটু দূরে আদিবাসীরা আগুন জ্বালিয়ে মাদোলের বাজনার তালে নাচছে। বারান্দা থেকে ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে খুশিতে মন ভরে গেল।
একটু একটু ঠান্ডা লাগছে, তবু বাইরে বসে থাকতে ভালো লাগছে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। মনের মধ্যে নানারকম ভাবনার উদয় হয়ে চলেছে।
চোদ্দো পনেরো বছর বয়েস ছিল তখন আমার। পুজোর ছুটিতে বর্ধমানে তখন আমরা সবাই। বাবা, মা-ও তাদের কর্মস্থল থেকে ওই সময় ওখানেই আসতো, আমি আর দিদিভাই ও চলে যেতাম কলকাতা থেকে।

ওখানে ইলেকট্রিক ছিল তখন, কিন্তু সন্ধ্যেবেলায় মাঝে মাঝে লোডশেডিং হতো। এইরকমই একদিন সন্ধ্যের সময় অন্ধকার হয়ে গেল, আমরা দুই বোন একটু অশান্ত হয়ে পড়ছি দেখে, মা আমাদের নিয়ে ছাদে চলে এল। লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগের দিন সেটা। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। ছাদে এসে সবাই মাদুর পেতে বসলাম। মা রবীন্দ্রসংগীত গাইতো খুব ভালো। মায়ের গান “চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে…” আমাদের খুবই আনন্দ দিল। দিদিভাই তাড়াতাড়ি নিচে গিয়ে গীতবিতানটা নিয়েই এল। মা থামলে দিদিভাই গাইলো, “সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে…”।
এইসব গান কবিতার আসর চলতে চলতেই একসময় মা বললো, কাল লক্ষ্মীপুজো, অনেক কাজ বাকি, নিচে নামতে হবে এবার।
রাতে ঘুমোবার সময় আমাদের বিছানায় তো আলোর বন্যা। এদিকে ইলেকট্রিক তো আসে নি। অন্ধকার ছিল বটে, তবে সেইসময় আমাদের মনে সুখের আলোর অভাব কখনো হতো না। (আগামীকাল শেষ পর্ব)
খুব সুন্দর লেখনী। বর্ণনায় ভালোলাগা আমাদের ডুয়ার্স ,যদিও আমরা বার বার দেখতে যাওয়ায় হয়তো আপনাদের দুচোখ ভরা স্বাদ থেকে কিছুটা বঞ্চিত।
সুন্দর বর্ণনা ডুয়ার্স এর। গতি আছে লেখা তে, দাঁড়িয়ে থাকে না। অভিনন্দন। যারা ছোটবেলাতে অফুরন্ত প্রকৃতির মধ্যে বড় হয়েছে তারা চট করে একাত্ব অনুভব করতে পারবে। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।