দুই
সত্যি মনে ছিল না। মনে পড়েনি, সে কোন বিদায় সন্ধ্যাবেলা, এক নৌকায় আমি আর সে আর সঙ্গে আরেকজনসহ পার হয়েছিলাম। সত্যি মনে ছিল না। এই মনে পড়ল। এই মাত্র, সেই বিগত দিন। কোনো-একদিন আমরা একসঙ্গে পার হয়েছিলাম। যদি সে এখন ‘ও গো পথের সাথি’ বলে গেয়ে ওঠে গান?
তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি ওই একবারই আরো স্পষ্ট করে তার চোখের দিকে তাকালাম। যদিও সে একপ্রকার অভিমানেই যেন এখন মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছে সামনে। চিনতে পেরেছি বলার আগপর্যন্ত যেন ওই মুখ আর ফেরাবে না! দেখবে না আমায়। এই অভিমান যেন খুব স্বাভাবিক। হতে পারে। কিন্তু মুখ না-দেখলে হঠাৎই-বা আমি তাকে চিনি কী করে? সে-কথা এখন বলাও তো যায় না। এক বিকেলে, এক খেয়ায় পারাপারের পরে প্রকাশ্য মানুষই কি মনে থাকে? নাও তো থাকতে পারে! আর তার মুখখানা না দেখে, শুধু চোখ আর বাসে ওঠার মুহূর্তের এই অবয়ব দেখে কীভাবে চিনতে পারি! তবু অভিমান?
তা অভিমান যেন তার ভূষণই। যদিও সেই বিগত দিনের অপরাহ্ণবেলায় তো তার চোখে-মুখে একই রকম অভিমানের খেলা দেখেছিলাম, আমি আর আমার সঙ্গী। সেদিন প্রকৃতই দুর্যোগের মুখে তার অভিমান দানা বেঁধেছিল সহযোগীদের ওপর। তবে অনিশ্চিত পারাপারের সাহস ছিল তার সঙ্গে। সেই পারাপারে, আমাদের সঙ্গে সেই মোরা যাত্রী একই তরণির সময়টুকুতে তার সঙ্গে যা কথা হয়েছিল তাই পুঁজি উভয় পক্ষের। সে-কথা আজ আর আমার মনে নেই, সেই সহযাত্রী সঙ্গীও নেই আমার সঙ্গে, হয়তো তারও মনে নেই, কিন্তু সে ঠিকই মনে রেখেছে।
এখন সেকথা মনে করে আমায় লজ্জায়ই ফেলে দিলো। গায়ে-গতরে ভদ্দরলোকি স্বভাব, তা দিয়ে অস্বীকারও তো করা যায় ওই পরিচয়ের সূত্র। না বাপু, তোমায় চিনিনে, দেখিনি কোনোকালে! আবার উলটোটাই তো তার দিক থেকে, বন্ধু, আছো তো ভালো! কতদিন দেখা হয়নি। এতদিন কোথায় ছিলেন?
পথের মানুষদের এই স্বভাব। জিপসি যাযাবর মানুষ সে-স্বভাব নিয়েই পথ হাঁটে। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী পথকেই ঘর মনে করে। বাউল পথেই ক্ষণিকের আখড়া বানায়। যেখানে দেখা মানুষকেই ওগো পথের সাথি বলে বুকে জড়িয়ে ধরে। কাছে টেনে নেয়, আবার দূরে চলে যায়। আবার দেখা হলে চিনতে পারে। একদিন এই পথে, ওই জায়গায় এই দিনে ওই ক্ষণে দেখা হয়েছিল, সেদিন আমাদের দুজনেরই গন্তব্য ছিল একই, অন্তত একমুহূর্তের জন্যে। তারপর পথ গিয়েছিল বেঁকে। আবার সব পথ এসে যদি কখনো কোনোদিন কোথাও মিলে যায়। সেদিন দেখা হওয়ামাত্র চিনে নেওয়া। আজ আমি চিনতে পারিনি সেই চেনাটাই। সে চিনেছে সত্যি! একেবারে পরিচয়সমেত। আমার সেদিনের সঙ্গীর গড়নও নির্ভুল। এখন উপায়, এখন আমি পিছিয়ে আসি কী করে?
নদীর ওপারে ফেরি আটকা পড়েছিল। আমি আর আমার সেই সঙ্গী সেদিনের মতো কাজ থেকে ফিরছিলাম। রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। ফেরি আটকা পড়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না। সচরাচর যে-পথে আসি, তার থেকে এই পথ একটু শর্টকাট। শুধু ফেরি পার হতে হয়। মাঝেমধ্যে যখন এ-পথে এসেছি, যানবাহনের ভিড় ছিল যথেষ্ট। এপার ওপার সচল। আজো তাই। এপারে চায়ের দোকানে বসে চা খেয়েছি। কিন্তু তখনো মনে হয়নি যানবাহন আজ একটু কমই আসছে। জানা ছিল অভিজ্ঞতায়, এমন হয়। একটু আগেই এপারের সবশেষ যানটাকে নিয়ে ওপার গেছে ফেরি। আর সেটা আমরা দেখতে দেখতে এসে মিস করেছি। হতে পারে, জীবনে কতবার দেখতে দেখতে সামনে থেকে ট্রেন ছেড়ে যায়। কেউ ধরতে পারে, কেউ পারে না। কেউ দরজা থেকে হাত বাড়িয়ে দেয়। কারো হাত বাড়ানোই থাকে। পস্ন্যাটফর্মের লোকটি দৌড়েও সে-হাত ধরতে পারে না। এই তো ব্যাপার।
এ-ঘাটের যাত্রী হিসেবে, ফেরির বিষয়টা আমাদের জানাই ছিল। এখন একটু সময় লাগবে। এই মাত্র ছেড়ে গেল। ওপারে যাবে। খরস্রোতা কুশিয়ারার গভীর বুক চিড়ে তখন কাকচক্ষু পাহাড়ি জল। স্বচ্ছ কিন্তু বালু আর পাথর মিশে থাকায় একটু ভারী। কদিন আগে ঢল নেমেছিল। তারপর আবার শুকিয়েছে। একটানে সে জল নিচে মেঘনায় চলে গেছে। দুই পাড় একেবারে ক্যালানো যেন সব দাঁত বেরিয়ে গেছে। বর্ষায় নদী কত গভীর মাঝনদীতে থাকলে তা বোঝা যায়। বাংলার প্রতিটি নদীর চরিত্র আলাদা। এক নদীর সঙ্গে অন্য নদীর জল যেমন মিশ খায় না, তেমনি খেয়ার নৌকার কি বৈঠা গড়নও পৃথক। হয়তো প্রতিটি নদীর স্রোতের আলাদা আলাদা আড় বুঝে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নদীমাতৃক এই জনগোষ্ঠী নিজের প্রয়োজনেই এই কারিগরি রপ্ত করে নিয়েছিল।
সে যাক। কুশিয়ারার এই শিবপুর ঘাটের ফেরি নিয়ে কথা হচ্ছিল। সে ফেরি ওপারে গেছে। আমরা অপার হয়ে বসে আছি এপারে। ফেরির প্রতীক্ষায়। সেজন্যে দ্বিতীয় কাপ চা-ও শেষ। চাইলে এতক্ষণে হয়তো নৌকায় পার হওয়া যেত। একবার পন্টুনের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আজ একজন মাঝিও নেই। কেন কে জানে। যানবাহন কম বলেই হয়তো। তবে কি সব চন্দরপুরের দিকে ছুটেছে। নাকি অন্য কোনো বিষয়। হতে পারে, একজন বলেছিল, এ-ঘাটের একটা ফেরি আজ না কাল চন্দরপুরের দিকে নিয়ে গেছে কোনো দরকারে। তাহলেও তো এখন এখানে অন্তত সিএনজি অটোরিকশার যাত্রীর ভিড় থাকার কথা ছিল। তাও তেমন নেই।
কী জানি। আজ হয়তো পঞ্জিকায় কি রাশিচক্রে আমার জন্যে লেখা আছে যাত্রা নাসিত্ম। অথবা, যাত্রা অশুভ। কিন্তু সকালবেলা তো ভালোভাবেই এসেছিলাম, পরিবহনের নাম ছিল শুভযাত্রা। তাহলে, যাত্রা নাসিত্ম নয়; বরং, যাত্রা সামান্য অশুভ অথবা কিঞ্চিৎ সংকটপূর্ণ! আহা কতকাল পঞ্জিকা দেখা হয় না, এমনকি খবরের কাগজের রাশিফলের পৃষ্ঠায়ও তো দেওয়া হয় না চোখ। এমন ভবিষ্যদ্বাণী ছিল কি-না, আজ ঘরে ফিরে দেখতে হবে!
এ-সময় জানা গেল, ওপারে ফেরি খারাপ হয়েছে। যে-যাত্রীরা সরাসরি যানে পার হবে তাদের একজন অন্যজনকে জানাল সে-সংবাদ। শুনে, আমি আমার সঙ্গীর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। আমরা কাটা-পথের। দ্রুত যাবার জন্যে এভাবে আসি। আমাদের দুজনের সঙ্গে সিএনজিতে আরো যে তিনজন এসেছিলেন, তারা আশেপাশের। ওপারে যাবে না। তাই হয়তো আমাদের সঙ্গেই কোনো চায়ের দোকানে ঢুকে, তারপর বাড়ির দিকে চলে গেছে। এতক্ষণে দুপুরের খাবার খেয়ে নাক ঢেকে দিবানিদ্রায় নিশ্চয়ই তাদের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
মানুষ ভেতরে ভেতরে অন্যের ভালো সহ্য করতে পারে না। যেন আমরা মাত্র দুজন ওপারের যাত্রী না হওয়াই ছিল ভালো। সঙ্গে আর কেউ নেই কেন। তাই সহযাত্রীদের নিশ্চিতে বাড়ি চলে যাওয়াটা ভেতরে ভেতরে কষ্ট দিচ্ছে। নাকি খাওয়ার চিমত্মা। এ-ঘাটের হোটেলগুলোয় ভাত-মাছ পাওয়া যায়। এই নদীর মাছ। একটু আগে পন্টুনে গিয়ে দেখেছি, সেখানে তো বটেই, এর কাছাকাছি নদীর কূলে বড়শিতে মাছ ধরছে কয়েকজন। ছিপ নেই। সুতোয় বাঁধা বড়শি। আধার গেঁথে দূরে নদীর অনেক খানিক ভেতরে ছুড়ে দেয়। তারপর বসে থাকে। শুনেছি, বোয়াল বাঁধে। যদিও আজ পর্যন্ত কোনোদিন চোখে পড়েনি। সেই মাছ এই হোটেলগুলোয় বিক্রি করে কেউ। আশেপাশে হাওর আছে। এখন হাওরের জল শুকিয়ে গেছে। হাটে বাজারে মাছের অভাব নেই এ-অঞ্চলে।
এসব জানা থাকার পর এই হোটেলগুলোর একটাতেও দুপুরে ভাত-মাছ খাইনি। চা-শিঙাড়া খেয়েছি শুধু। এখন বেলা গড়িয়ে পশ্চিমে চলে গেছে। পেটে ঘণ্টাখানেক আগে যে শিঙাড়াটা পড়েছিল তার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। খেতে যদি হয়, তা গোলাপগঞ্জ গিয়ে। বনরাজ হোটেলের পরোটা আর ছোলার ডালের সঙ্গে আলুকুচির ঝোল আর পোড়া শুকনো মরিচের স্বাদ দারুণ!
নিজেদের জানালাম, হয়তো মনে মনেই, সে হবেক্ষণ। আগে তো ওপারে যাই। এভাবে ফেরি বন্ধ হলে, নদীর ওপারে গেলেও তো গোলাপগঞ্জ যাওয়ার কিছু জুটবে কি-না সন্দেহ! তখন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় কী। উপায় নেইও। এখনই তো প্রায় মাথায় হাত দিয়েই বসে আছি।
এই সময় পন্টুনের দিক থেকে হাঁক শোনা গেল, ওপার! ওপার!
তাহলে এতক্ষণে সে এসেছে। যে নিয়ে যাবে ওপারে। কিন্তু আমাদের মনের তলানিতে তো শঙ্কার শেষ নেই। নৌকায় গেলে এতক্ষণে যে কোনোভাবে হয়তো যাওয়া হতো। এই পন্টুন থেকে না-হোক, দোকানগুলো রেখে নদীর পার ধরে একটু এগিয়ে গিয়েও তো উঠতে পারতাম ওপার যাওয়ার একটা নৌকায়। কেউ কেউ হয়তো সেভাবে এই ভবনদী পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু নেড়ে ঠেকলে বেলতলায় আবার যেতে পারে, কিন্তু ঘরপোড়া গরু সিঁদুর মেঘ দেখলে বাড়ির পথ ধরে।
এই নদীতে, এই পন্টুনেই, এখানে, এই যে সামনে, ও জায়গায়ই, এক ভরা বর্ষায় নৌকায় উঠতে উঠতে, সে নৌকা তলিয়ে আমাদের দুজনেরই একদিন ডুবে মরার দশা হয়েছিল। সঙ্গে যারা ছিলেন, প্রত্যেকেই, যদি আঁকড়ে পন্টুনের সামনে ফেরিতে গাড়ি ওঠার বাড়িয়ে-রাখা পাটাতনটা কোনোভাবে না-ধরতে পারতাম, যদি ঝুলে না-থাকার সুযোগ হতো, যদি সেই ঝুলে-থাকার মুহূর্তে পাশে থেকে অন্য নৌকা এসে উদ্ধার না-করত আর ওপর থেকে কেউ টেনে না-তুলত, তাহলে নদীতে পড়তাম। বাঁচতাম হয়তো। কিন্তু সেদিন স্রোত ছিল তীব্র। ঘাড়ে ছিল সাইড ব্যাগ। ভেসেও তো যেতে পারতাম। এখন জল টানার পরও এই শান্ত কুশিয়ারার কূলে দাঁড়িয়েও সেই ভয় যায় না। সেদিন সঙ্গের সহযাত্রীরা বলেছিল, এরপর যদি দুদ- দেরিও হয় হবে, তবু আর কখনোই জীবন বাজি রেখে ওভাবে নৌকায় আসার কোনো অর্থ নেই। হুঁ, যার ব্যাগে ছিল প্রায় লাখখানেক টাকা, তিনি বলেছিলেন, যদি ভেসে যেত এই ব্যাগ, তাহলে কাল অফিসকে কী জবাব দিতাম।
কিন্তু এখন নিরুপায়। ওই নৌকাই অগতির গতি! যেতে হবে। ফেরি ভালো হবে না। এটা আসলে নষ্ট ফেরি, কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে একদিন চালানো হয়েছিল। ভালোটা চন্দরপুর নিয়ে গেছে। ওটা না-আসা পর্যন্ত এই লাইনে আর ফেরি চলবে না। এখন ফেরারও উপায় নেই। সামনে যেতে হবে। নৌকাই একমাত্র সম্বল। তাও সংখ্যায় বিরল। এখন যা পাওয়া যায়, যেটা পাওয়া যায়। তবে একটা যখন পাওয়া গেছে, ওটাই একবার ছেড়ে ওপার দিয়ে আসতে আর কতক্ষণ! তবে, দেরি হয়ে গেছে। বিকেলের দিকে গড়িয়েছে দিন। এখন চাখানা থেকে গাত্রোত্থান করা দরকার!
সঙ্গীকে বললাম, ‘চলুন যাওয়া যাক, যদি ওপারের খেয়া পাওয়া যায়!’
তিনি আমার দিকে চোখে রহস্য ঝুলিয়ে তাকালেন, কারণ এই যে খেয়াঅলা ওপার ওপার বলে ডাকছে সে তবে যাবে কোথায়!
যাবে কোথায়, তা তিনি দেখার সুযোগ পাননি। দোকানের ভেতরে সামনে খালি চায়ের কাপ নিয়ে বসেছিলেন। আমি বাইরে, পন্টুনের দিকে চোখ, খেয়ার সেই বারকি নাওখানা ছেড়ে গেছে। আর একখানা এখনো দেখা যাচ্ছে না। পন্টুনের কাছে গেলে ওখানা ফিরে আসার পরে জায়গা পেতে পারি। আর এর ভেতরে যদি আশেপাশে থেকে আর একখানা এসে উদয় হয় তো মুশকিল আসান।
তিনি হাসলেন, পন্টুনে তাকিয়ে। আমার রহস্য বুঝতে পেরেছেন। অনুমান করে নিয়েছেন, ওই যে মাঝগাঙে নাওখানা যাচ্ছে, ওখানা ফিরে এলে যাওয়া যাবে। একখানা নৌকা যখন এসেছে, আরো আসবে অথবা ওখানাকেই উঁচুগলায় ডেকে আনা যাবে ওপার থেকে। বিকেল হয়ে এলে আরো তো মানুষ আসবে, তখনো কি নৌকা জুটবে না!
আমরা পন্টুনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনে কুশিয়ারা। যে জায়গা থেকে নেমে নৌকায় ওঠার পরে গত বর্ষায় আমাদের নৌকা ডুবেছিল, সেখানে নিচে তাকালাম। দুজনের চোখেই সে-স্মৃতির রোমন্থন হলো যেন। কিন্তু ও নিয়ে কথা নেই। এক মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় অমন ঘটেছিল। কী হতো সেদিন একটুক্ষণ ফেরির জন্যে অপেক্ষা করলে! সন্ধ্যার পরে, ওই অন্ধকারে অমন করার কোনো দরকারই ছিল না! অনেকবারই সেই সন্ধ্যার হঠকারিতা নিয়ে কথা হয়েছে, তা নিয়ে বাড়তি কথা অপ্রয়োজনীয়। বরং এখন কীভাবে ওপারে যাওয়া যাবে, নৌকা এসে কোথায় দাঁড়াতে বলতে হবে, সেসব দেখে নিয়ে ওপারে তাকিয়ে থাকা!
তখন পিছনে ঘুরতেই দেখি, একটি মেয়ে। প্রায় বেদেনির সাজ। মাজায় শাড়ি প্যাঁচানো। কোমরের কাছে ধরা একটা পুঁটলি। হয়তো আমাদেরই মতন ওপারে যাওয়ার জন্যে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা তার দিকে তাকালাম। বুঝতে চাইলাম, সেও যাবে কি-না।
মেয়েটা ছোটখাটো। গায়ের রং ফর্সা। ঠোঁটে একটু আগে লাগানো হালকা লিপস্টিক। চুল দুই বেণি-বাঁধা। বয়েস আনুমানিক কুড়ি ছাড়িয়েছে। এই ফাঁকা পন্টুনে তার দুই সহযাত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় জড়তাহীন। জানি, আমরা জিজ্ঞাসা না-করলে সে-ই বলবে অথবা জানতে চাইবে, আমরা ওপারে যাব কি-না। অথবা এমন অপেক্ষমাণ মানুষ দেখে তো এমনিতে তার বোঝার কথা। যদি সেও যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সঙ্গী হবে।
তাই হলো। এ-সময়ে আমাদের সঙ্গে একটি কথাও বলল না, পন্টুনের থেকে নদীর তীরে তাকিয়ে যেন সে জলে ছায়া দেখার চেষ্টা করল। তারপর ফিরে গেল পারের দিকে। সেখান থেকে উলটো ফিরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল একটুক্ষণ। ওপারের নৌকাটা সবে পাড়ে ভিড়েছে। যাত্রী না-হলে এখনই এপারে আসবে না। একটুক্ষণ অপেক্ষা করবে। দেখবে যাত্রী পায় কি-না। তারপর ধীরে ধীরে চলে আসবে এপারে। আমাদের নেবে। এসব আমাদের যেমন জানা আছে, এই মেয়েটির উত্তাপ ও উত্তেজনাহীন চাহনিতে বুঝতে পারি, সেও জানে।
তবে এই মুহূর্তে তার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, ওপারে চেয়ে থাকার ভঙ্গিটা দারুণ! এমন সচরাচর আমাদের নাগরিক চোখে ধরা পড়ে না। অদ্ভুত লাগছে। কখনো আসা-যাওয়ার পথে বাস-রাস্তা থেকে বেদের আবাস দেখেছি এক-দুটো। আজকাল নৌকায় তাদের প্রায় চলাচল নেই। হয়তো ভ্যানে করে কাছাকাছি কোথাও যায়। নৌকার ছইয়ের মতন দেখতে ছোট ছোট ঘর তোলে ফাঁকা কোনো মাঠের প্রান্তে। আট-দশটি অমন অস্থায়ী ঘর। মাঝখানে এক চিলতে উঠোন। সেখানে হামাগুড়ি দেওয়া থেকে একটু বড়ো শিশুরা খেলা করে। দুই-একজন পুরুষ থাকে। নারীরা জীবিকায়। দিনের প্রথম কি শেষভাগ হলে প্রায় সবাইকেই দেখা যায়। ওসময়ে,
গ্রাম-গ্রামান্তরে হেঁটে আসা কোনো নারীকে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার সুযোগও থাকে না। তখন ওভাবে কেন দাঁড়াবে তারা। এখন পথক্লান্ত এই নারী ওপারে যাওয়ার বিরতির সময়টুকুও এভাবে দাঁড়িয়েছে। যেন এই তার সারাদিনের কাজের শেষে বিশ্রাম।
এ-সময় নদীর পাশ থেকে, আমাদেরই প্রায় অগোচরে পন্টুনে একখানা বারকি নাও এসে দাঁড়াল। মাঝি ওপরে চোখ তুলে তাকিয়েছে। আমাদের নিয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গী জানতে চাইলেন, কই ছিল সে। জানাল সে-কথা। দুপুরে খাওয়ার জন্যে বাড়ি গিয়েছিল। এসে নদীর কূলে বসে দেখে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তাই তাড়াতাড়ি এসেছে। নয়তো আর একটু বাদে আসত।
আচ্ছা, বোঝো অবস্থা। এই হেমন্তের মাঝামাঝি, দুপুরে খাওয়া সেরে একপ্রস্ত ভাতঘুম দিয়ে আবার কাজে বেরিয়েছে মানুষ। আর আমরা এখনো পথে। শুধু পথে নই, একেবারে অনিশ্চিত গন্তব্যে! এইমাত্র ওপারে নেওয়ার কা-ারি এসে হাজির হলো। অপার আমাদের এখন পার করবেন।
কিন্তু ওই জায়গা থেকে তো নৌকায় ওঠা যাবে না। আমার সঙ্গী সেকথা মাঝিকে মনে করিয়ে দিলেন। আর মাঝিও দেখি সঙ্গে সঙ্গে মনে করতে পারল, সেই সন্ধ্যার কথা। ছোকরা বলে স্মৃতি টাটকা। নাকি অমন ঘটনা কমই ঘটে। সেদিন সে কাছেই ছিল। সেই নৌকাখানা ছিল তার চাচাত ভাইয়ের। সে-কথাও মনে করিয়ে দিলো। পরে আমাদের ওপারে দিয়ে এসেছিল তার ছোট চাচা! দেখো কা-, যে-কথা যতভাবেই ভুলতে চাও না কেন কারো কারো কাছে তা একেবারে গল্প হয়ে রয়। আর একটু টোকা পড়লে খুলে নিয়ে বসে একেবারে খোল-নলচেসমেত।
পন্টুনের খুব নিরাপদ জায়গায় মাঝি নৌকা ভেড়াল এবার। একটু সিঁড়িমতনও আছে। অনায়াসে নৌকায় উঠে বসা যাবে। উঠবার সময় যেন একটু সামলে উঠি, নৌকায় যেন বেশি দোলা না লাগে। পুরনো ভীতির কারণে আমি আর সঙ্গী তাই করলাম। জোয়ান মাঝির নির্দেশ বলে কথা। নিজেও হুশিয়ার সে। পন্টুনের একপাশ সে শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
মেয়েটা তখন আমাদের পিছনেই। আমি আগে নৌকায় উঠে পিছনে তাকিয়ে সঙ্গীর ওঠা লক্ষ করছি, ধরেছি পন্টুনের একপাশ। বারকি নৌকা বড়ো দোল খায়। ঘাড় ঘুরিয়ে লক্ষ করছি, সে আমাদের সঙ্গী হয় কি-না। তেমন উদ্যোগ তার আচরণে নেই। নৌকার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকল। উঠল না। কারণটা বুঝলাম একটু বাদে। সে জানে, দুজন নিয়ে নৌকা ছাড়বে না এই নওজোয়ান মাঝি। অন্তত চারজন লাগবে, পাঁচজন হলে আরো ভালো। ওদিকে আমাদের পেটে এতক্ষণে ছুঁচো ডন দিচ্ছে। নৌকায় উঠেছি, ওপার যাব এখনই, কিন্তু গোলাপগঞ্জ কতক্ষণে যাব তার ঠিক নেই। সেখানে না-গেলে খাওয়াও নেই। ফলে একটুবার চেয়ে মাঝিকে প্রস্তাব দেবো। দুজনে দেবো চারজনের ভাড়া, তুমি ভাই ছাড়ো, ওপারে তুলে দাও। ওপার গিয়েও তো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একটা সিএনজি অটোরিকশাও জুটবে বলে মনে হয় না।
আমার সঙ্গী তাই-ই বললেন, ‘ছাড়িদাও বা, দিরাম আমরা আর দুইজনোর ভাড়া!’ মাঝিও রাজি। যেন এই প্রস্তাবের জন্যেই অপেক্ষায় ছিল সে। আর তখনই, ওই মেয়েটি প্রায় লাফিয়ে মাঝির উলটো দিকে নৌকায় উঠল। এখন আমাদের মুখ তার দিকে। মাঝির সামনের গলুইয়ে আমার সঙ্গী আর তার পরেরটায় আমি। মাঝির দিকে পিঠ। তার মুখ মাঝির দিকে। আমরা মুখোমুখি। সে লাফিয়ে উঠতেই মাঝি যেন একটু বেজার।
তাও যেন স্বাভাবিকই। জোয়ান মাঝির ভঙ্গিটা এমন, তুই ভাই যাবি আগে বললেই হতো। আবার ভেতরে খবরটাও তো তার হয়তো জানা, এই বেদেনি ভাড়া দেবে না। লোক ওঠা শেষ হলে তারপর এভাবেই উঠবে। তাই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। আমাদের সঙ্গে মাঝির রফা হলে তারপর উঠে বসেছে। মানে, এরাই তো তোমায় দেবে চারজনের ভাড়া, তো এখন আমি উঠলেই কি আর না উঠলেই কি। শতেক ঘাট ও বারোরকম মানুষের সঙ্গে মিশে, জীবনের নানা সুবিধা-অসুবিধায় ঠোক্কর খেয়ে এদের আসলেই জানা আছে কীভাবে পথ চলতে হয়। জীবনকে চালিয়ে নিতে হয়। প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় ধৈর্য ধারণ করতে পারে। কখনোই হতাশ হয় না, সুযোগকে কাজে লাগাতে জানে।
এই যেমন, মাঝির বেজার মুখখানাকে ভালো করতে যেন সেদিকে ফিরে সে হাসল। হাসিটা সুন্দর। মাড়ির ডানদিকের খানিকটা বেরিয়ে পড়ে। তারপর বলল, ‘আইজ পানিতে কোনো রাগ নাই।’
অর্থাৎ, প্রায় স্রোতহীন। হ্যাঁ, পাহাড় থেকে ঢল নামা শেষ। এ-বছর আর তা ঘটার সম্ভাবনাও নেই, যদি হঠাৎ প্রকৃতি খেয়াল না পালটায়। সাধারণত তা ঘটে না।
মেয়েটির এই কথায় মাঝি বলল না কিছু। হাসির জবাবও দিলো না। এই আচরণে এটুকু অন্তত বোঝা গেল, এদের এমন ব্যবহারে সে অভ্যস্ত। ঘুরিয়ে নিল মুখ। মেয়েটি তখন আমাদের খেয়াল করল। এখন ওপারে নামার পরে, মাঝির সঙ্গে যা হিসেব আমাদের। সে যেন আমাদেরই সহযাত্রী।
আমার সঙ্গী বললেন, ‘এই জায়গায় কতদিন ধরি?’
সে জানাল, মাসখানেক।
তারপর একটু উদাস ভঙ্গিতে নদীর দুই দিকে তাকাল। রোদ মরে এসেছে। প্রায় মাঝনদীতে নৌকার গলুইর একেবারে সামনে একটি মেয়ে। ভেতরের দিকে ফেরা। গায়ে একটু হলদে রঙের ছাপা শাড়ি। লাল রঙের বস্নাউজ। পা ছড়িয়ে বসায় শাড়ির নিচের সবুজ সায়ার একেবারে নিচের পাড় খানিকটা বেরিয়ে আছে। আমাদের দিকে তার মনোযোগ নেই। আবার আছেও, যদি প্রশ্ন করি তাহলে নিশ্চয়ই উত্তর দেবে। কিন্তু তার আগে একটু আগে কথার জবাব দিলো যেন, ‘এই যে চন্দরপুর আছে না -’ সে ডান হাতের তর্জনী তুলে দেখায়। হা, কুশিয়ারা সেদিকে পুব মুখে নেমে গেছে। সেদিকেও একটা ফেরিঘাট আছে। ব্রিজ হচ্ছে। তখন এই ফেরিঘাটটাই হয়তো আর থাকবে না। ওদিক থেকেও আমাদের যাওয়া-আসা আছে। নদী সেখানে আরো প্রশস্ত ও গভীর। একটু পরেই হয়তো এই নদীতে কোনো আন্তর্দেশীয় জলযান পণ্য বহন করে সুতারকান্দি স্থলবন্দরের পাশ ধরে চলে যাবে শিলচরের দিকে। অর্থাৎ তার হাতের বাঁয়ে। ওই যে তাকালে খাসিয়া-জৈমত্মা পাহাড়ের ছাপ দেখা যায়। সেদিকে এখন আর আমাদের চোখ পড়বে না। বরং উলটোদিকে, নদীর স্রোত যেদিকে নেমে যাচ্ছে, সেদিকে সে আমাদের দেখতে বলল। তাকালাম। কিন্তু সামনেই বাঁক নিয়েছে নদী। ওদিকে তাকিয়ে আর কী। বরং, তার কথামতো দিঙ্নির্দেশনা মেনে নিই।
তাহলে, ওইদিকে ওই চন্দরপুর ফেরিঘাটের কাছে, সেখানে আছে তাদের বহর। মেয়েটি জানিয়ে চলল। মনে হলো, কোনো কারণে আজ এদিকে ফেরি বন্ধ হওয়ায় তার সঙ্গী-সাথিরা এদিক থেকে চলে গেছে। সে গিয়েছিল ভেতরের দিকে কোনো গ্রামে। ফিরে এসে এই ফেরিঘাটের কাছে আর তাদের কাউকে পায়নি। এ-খবর তার জন্যে মোটেও দুঃখজনক নয়, কথার ভঙ্গিতে মনে হলো। এমন ঘটনা ঘটে থাকে। কীভাবে নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে হয়, জানা আছে এই স্বাধীনচেতা নারীর। স্বাধীনচেতা, অন্তত তার একটু আগের অতীতকে শুনে তাই মনে হলো। সবাই মিলে বেরিয়েছে, এই বহরগ্রাম শিবপুরের আশেপাশের গ্রামে একজন-দুইজন গিয়েছে। তারপর হয়তো সবাই এক জায়গায় যখন মিলিত হওয়ার কথা, তখন সে একটু দেরিই করে ফেলেছিল। সঙ্গীরা উলটোদিক দিয়ে ফিরে গেছে বহরের কাছে। জানে সে যেতে পারবে। এখনো ওদিকে যানবাহন কমে আসায়, সে ধরেছে আরেক পথ। ওপার যাবে, সেখানে থেকে গোলাপগঞ্জের দিকে যাবে খানিকটা, তারপর বাঁয়ের হাতায় ঢাকা দক্ষিণের দিকে গিয়ে চলে যাবে চন্দরপুর। এ কদিনে এ-অঞ্চলের পথঘাট তার ভালোই চেনা আছে। অথবা নদীর পাড় ধরেই হেঁটে সামনে কোনো রাস্তায় উঠবে।
আমার সঙ্গী তাই বললেন আমাকে, ‘জানেন তো, জিপসি যাযাবরদের ঐতিহ্য?’
‘হুঁ, পথ হেঁটে পথ চিনে নেয়।’
আমাদের এ-কথা সে খেয়াল করল না। বরং, আমাদের কাছে যেমন তার পরিচয় খোলাসা হয়েছে, তবে সে কেন আমাদের পরিচয় সাকিন ঠিকুজি-কুলজির হিসেব নেবে না। যত কেতাদুরস্তই লাগুক, সেও বারোবাজারের মানুষ দেখে আর চড়ায় বা চিন পরিচয়, এখন আমাদেরটা নিতে তো কোনো দোষ নেই। সঙ্গী জানালেন, একটা কাজে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে এই পথে যাই।
নৌকা পারে যেতে আর বেশি বাকি নেই। কিন্তু পারের এদিকে স্রোত। তাই একটু উলটোদিকে যেতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে কূলের দিকে। আর নামার ব্যবস্থাও এপাশের পন্টুনের গা-ঘেঁষে নয়। আর-একটু ভেতরে নদীর পাড়ে। নৌকা যতটা সম্ভব হালকা চরের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হবে। তারপর পাশাপাশি বাঁধা কয়েকটা নৌকার ওপর দিয়ে আমরা যাব ডাঙায়।
সঙ্গী বললেন, ‘অনন্তকাল ধরে এইভাবে হাঁটছে।’
‘হুঁ।’
তখনই, মেয়েটি একটু উদাসভাবে যেন আমাদের বলছে না কিন্তু আমাদের কথা ধরে উত্তর দিয়ে গেল, ‘হাঁটন ছাড়া উপায় কী? হাঁটনেই পেটের ভাত হয়।’
এবার বিস্ময়ে তার মুখে তাকাই। সেখানে রোদ। একগোছা চুল তার মুখে পড়েছে। সেটা সরাল আলতো করে। পোটলাটা ডান-পাশ থেকে আনল বাঁ-পাশে। অনাদি অনন্তকাল এভাবে হেঁটে চলছে এই মেয়ে। আরো হাঁটবে। পৃথিবীর অগম্য প্রান্তরে হেঁটে যাবে। নদী থাকলে সে থাকবে। যদিও এখনই নদীর ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমেছে। তবে মানুষ থাকলে থাকবে। কিন্তু আজকাল তাদের বিদ্যায় মানুষ সাড়া দেয় কম। সেই যে ছোটবেলায় হঠাৎ দেখতাম আমাদের শহরের রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে হাঁক দিচ্ছে। একসঙ্গে দুই-তিনজন। পাশাপাশি দু-তিনটে বাড়িতে এক-একজন করে ঢুকে যেত। অথবা একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটু কর্কশ সুরেলা গলায় জানাত, বাতের বিষ ঝাড়াই, পুরান বেদনা সারাই, দাঁতের পোক ফেলাই। অর্থাৎ, এ-কাজে তোমাদের দুয়ারে এসেছি, যদি প্রয়োজন তো জানাও। কারো আঁচলে শক্ত করে কোমরে বাঁধা থাকত কোলের শিশু। হঠাৎ সে কোনো গাছতলায় অথবা বাড়ির সামনের সিঁড়িতে বসে শিশুকে মাই দিত। ওদিকে তাদের আগমনে কোনো কোনো উন্মুক্ত বাড়িতে এ-কথাও বলত কেউ কেউ, এই রে বেদেনিরা আইছে, কোন জিনিসটা যে হাতে বাঁধিয়ে নিয়ে যায় তার ঠিক আছে। সামলে রাখ। কবে কোন বাড়ির সামনে থেকে রাতে রাখা একটা হারিকেন নাকি এই বেদেনিরা নিয়ে উধাও হয়েছিল।
কিন্তু তখন তাদের সত্যি ডাক পড়ত। তাই পেটে ভাত ছিল। কিন্তু আজ? কী জানি, যদি কোথাও কিছু না-ই জুটবে তাহলে এভাবে জলকাদা বর্ষা মাড়িয়ে রৌদ্রহীন কি রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে এত কষ্ট মাথায় নিয়ে তারা কেন পথ হাঁটে!
‘তা তো সত্যি। সবাই ভাতের লাগি হাঁটতে বাইর হয়।’
এই বলে আমার সঙ্গী তার কথায় সায় দিলে, সে জানাতে চায়, ‘ভাইর বাড়ি সিলেটে।’
সঙ্গী ‘জি অয় অয়’ বলার পরে তার কাছেই জানতে চায়, আমার বাড়ি কোথায়। সেটা বলে, তার বাড়ি কোথায় জানতে চেয়ে তিনি যেন একটু ভুলই করলেন। ওদের বাড়িঘর, জাত-ধর্ম তো প্রায় থাকতে নেই। তবু জানাল গাজীপুর-ময়মনসিংহ এই এলাকার একটা জনপদের নাম। সেখানে নাকি তার বাবা থাকে। ওই জায়গায় আবার ফিরে যাবে। একটু অবোধ্যই থাকল বিষয়টা। সেটা সে স্পষ্ট করার আগে আমি সঙ্গীকে বললাম, বাঙালির চোখে তারা ছোট জাত। আর ধর্মের দিক থেকে বহুকাল তারা নিধর্মী। বাংলায় এখনো বেদেদের একাশং প্রচলিত কোনো ধর্মের আশ্রয়ে আসেনি। আরো কাছে কোথাও কোথাও বাজনদার আর ধুনচিরা – ওই যারা লেপ-তোশক বানায়।
আমাদের আলোচনা সে শুনেছে। তখন অবশ্য জানাচ্ছিল, সে কাদের সঙ্গে ওখান থেকে কতদিন ধরে এসেছে। কিন্তু আমাদের আলোচনা শুনে উত্তাপহীনভাবে তার ধর্মপরিচয়ও জানিয়ে দিলো। তারা ঈদ করে। কোরবানি দেয়।
সঙ্গী তখন আমায় জানালেন, প্রায় মেইন স্ট্রিমের সঙ্গে মিলে গেছে।
জানতে চাইলাম, ‘আবার কবে ফিরে যাবেন?’
‘এই পানি টানলেই।’
‘পানি টানলেই, কোনদিকে যাবেন?’
‘ঢাকার দিকে।’ ঈষৎ হাসল। আমার উচ্চারণ তার মতো হয়নি, ‘গাজীপুর-ময়মনসিংহ চেনোইন।’
‘চিনি। চেনব না কেন?’
‘গেছোইন?’
‘হুঁ —’
‘কবে গেছোইন?’
জানালাম। নৌকা তীরের কাছে। আমার সঙ্গী তাকে জানিয়ে দিলো, আমি কেন তাকে এই প্রশ্ন করছি। যেন প্রশ্ন করে এখনই এই মানুষটাকে নিয়ে লিখতে বসে যাব। অথচ, সে কী বুঝল কে জানে। দুজনকে অবাক করে বলল, ‘মানুষ দেখলেই সব বুঝি!’ সে আমাকে দেখেই নাকি তা বুঝে গেছে।
আমি একটু কপট রাগের চোখে সঙ্গীর দিকে তাকালাম। তিনি হাসছেন। ভাবটা এই, এবার ঠেলা সামলাও। অথচ সাধারণত ঠেলা সামলানো কী, উলটো ঘটে। এমন কোনো উদ্দেশ্য থাকুক কি না-ই থাকুক লক্ষ করেছি, পরিচয়পর্ব উন্মোচিত হলেই মানুষের কথা বলার ধরন বদলে যায়। সে খোলসে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে বের করে আনতে সময় লাগে। কখনো উলটো পথে হাঁটতে হয়। তার চেয়ে স্রেফ আলাপে, এ-কথা বলায় ধীরে ধীরে পরিচয় গাঢ় হওয়া বা জানাশোনা একটু এগোলে বরং মানুষকে জানা সহজ হয়।
এদিকে আমরা আর যেন বিষয়টা পাত্তা দিলাম না। অথবা আমি একটু উদাসী ভঙ্গি করলাম। আর সঙ্গী নৌকার ভাড়া মিটিয়ে নেমে আসার আগে তার কাছে জানতে চাইলাম, এখন এই শিবপুরের গ্রামের দিকে সে যাবে কি-না? সে জানাল, বেলা পড়ে গেছে। বেশিক্ষণ পথে থাকতে পারবে না। নদীর পাড় ধরে এগোবে। মাঝখানে হঠাৎ ঢুকে পড়বে কোনো গাঁয়ে।
চোখে সূর্য পড়ায় মাথায় আঁচল তুলে দিলো সে। এককোনা দিয়ে মুখটাও মুছে নিল। তারপর একবার চোখের দিকে তাকিয়ে ডানহাতটা একটু তুলে কিছু না-বলেই নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকল। একবার ফিরল, এবার তাকাল আমার সঙ্গীর দিকে। হাসল। এই হাসিটাই তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া।
সঙ্গী বললেন, সাহস আছে। এই নদীর পাড় ধরে যাবে।
এবার একথা শুনে সে ফিরে তাকাল। চোখে আত্মবিশ্বাস। এইটুকু সাহস তো থাকতে হয়।
হুঁ, অচেনা পথ। নদীর পাড় ধরে ধরে, প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে নদীর পাড়ের একচিলতে মাঠে নিজেদের বহরের কাছে যাওয়া। সে যাবে, যেতে পারবে। পথ হারাবে না। এর ভেতরে নিজের পেশার কাজও করবে। জীবিকা বলে কথা। বলেছে সে, তাতে পেটে ভাত!
আমি সঙ্গীকে বললাম, ‘দেখলেন নামটা জানা হলো না!’
‘জানি আমি। বলেছে। সুমাইয়া!’
‘আমি তো শুনলাম না।’
‘আপনি মাঝির সঙ্গে কথা বলছিলেন, নদীর স্রোত নিয়ে, তখন।’ (চলবে)