বাসটা হঠাৎ আচমকা নিকলিতে থামে।
বিরতিহীন বাস। এভাবে থামা বাস মালিক সমিতির আইনসিদ্ধ নয়, কিন্তু থামে। হেলপার-কন্ডাক্টর কেউ চাপড় মেরে থামায়। ভেতরে কী পরিমাণে যাত্রী আছে তার ওপর নির্ভর করে এই থামাথামি। যাত্রী বেশ কম। ফলে চারখাই পার হওয়ার পর থেকেই ধারণা ছিল থামবে।
চারদিকে হালকা কুয়াশার আস্তরণমতো। তবে এ-কুয়াশা নয়, বিকেলে হালকা বৃষ্টিপাতের পর সীমান্তের পাহাড়ে জমে থাকা জলের বাতাসে ছড়ানো আভাস। শীত আসি আসি। বাসের জানালা একটু খোলা থাকলে সেখান থেকে শীতল বাতাস ঘা মারে। এখনো তীব্র নয়। শেষ বিকেলে আচমকা বৃষ্টিটুকু না-হলে বাতাস এমন ভারি আর শীতল হতো না।
ড্রাইভার তীব্র ব্রেক কষলে তন্দ্রা টুটে গেছে। চারখাই থেকে রানাপিং – রাস্তা অপেক্ষাকৃত মসৃণ আর সোজা। বাস দ্রুত চলে। দুপাশেই হাওর। সন্ধ্যার মুখে এ-সময়ে বৃষ্টিতে চারধারে ভিজেভাব থাকায় চোখ জড়িয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক!
কিন্তু এমন আচমকা ব্রেক! সামনে কিছু পড়ল? হতে পারে। কে চোখ খোলে। আমার পিছন ও ডানপাশের দুজন যাত্রী এমন হঠাৎ থামানোয় ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে শুরু করেছে। এতে চোখ খুলে যাওয়া স্বাভাবিক। প্রায় প্রতিদিন এমন ঘটনার সঙ্গে পরিচিতি, তাই এক চোখ মেলে আমি চারপাশ দেখি। দরজার পাশের সিটদুটো ফাঁকা। তার পরের সিটে বসেছি। এক চোখ মেলে বুঝতে পারলাম যাত্রী তোলার জন্যেই এমনভাবে ব্রেক করেছে ড্রাইভার। ভাবখানা এই, সামনে কিছু-একটা পড়েছিল। সেই জন্যে এমন ব্রেক কষা! এমন অজুহাত বানাতে এ-লাইনের ড্রাইভাররা ওস্তাদ। হেলপাররা সত্যিকারের হেলপার, কন্ডাক্টরও সত্যিকারের সংযোগকারী!
প্রথমে পরপর দুজন পুরুষ ওঠে। একবার চোখ খুলি মাত্র। কন্ডাক্টর দ্রুত উঠতে বলে তাদের। নিচে বোরকা-পরা এক নারী দাঁড়িয়ে, তাকে যাবে কি-না জানতে চেয়ে দ্রুত উঠতে বলে। চোখ পুরোপুরি না খুললেও কথা কানে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি কী হচ্ছে! ওই নারীর পাশে দাঁড়ানো হেলপার। সে বাসে আবার প্রায় লাফিয়ে উঠছে। তখন বিকট চিৎকার দিয়ে গলির মুখে দাঁড়ানো একজনকে ডাকে। ওই চিৎকারে চোখ খুললাম। সে-লোক সিগারেট ধরাচ্ছে। মনে হয় ধরাতে দেরি হচ্ছে। ওই নারী তখনো বাসের দরজার নিচে দাঁড়ানো। সিগারেট জ্বালিয়ে লোকটা তার পাশে এসে সে উঠবে কি-না জানতে চায়। তারপর হেলপারের হাতে সিগারেটটা দিয়ে বাসে ওঠে। ওই মহিলা তখন একবার উলটোদিকে তাকিয়ে হেলপারকে পাশ কেটে বাসের ফুটবোর্ডে পা রাখে। সেখানে দাঁড়ায় একটু। পরেরটায় ওঠে। হেলপার তখন নিচেরটায়। বাসের গায়ে থাবা দেয়, ‘যান বাড়ান’ – বলে। এসব অতি দ্রুত ঘটে। সব মিলে খুব বেশি হলে কুড়ি কি পঁচিশ সেকেন্ড। প্রায় প্রতিদিন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ায় অভ্যস্ত। চোখ আবার ধরে এসেছে। ভাবছি, একটা মাফলার থাকলে গলায় জড়িয়ে নেওয়া যেত। গতবারের অভ্যাসে সাইড ব্যাগে একবার হাত দেওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু এখনো তো সেভাবে শীত পড়েনি, ব্যাগে মাফলার রাখার প্রশ্নই নেই। গায়েই সকালে সোয়েটার জড়াইনি। প্রয়োজনও ছিল না, হালকা ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছিল, তবে তা পুরোপুরি উত্তুরে নয়। বৃষ্টির কারণে হয়তো।
হেলপারের পাশ গলে এসে ওই মহিলা বাসের ভেতরে উঠে সামনে-পিছনে তাকায়। মুখে নেকাব। কিন্তু বড়ো চোখদুটো বোঝা যায়, আলো জ্বললে আরো ভালো বোঝা যেত। বাসের ভেতরে আলো কমে এসেছে। আমারও চোখ লাগানো। চশমা খুলে জামায় বুকের কাছে ঝুলিয়ে রেখেছি। ফলে জড়ানো-চোখ খুলেই তাকানোমাত্র সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠবে না; তাই ওই চোখ জোড়া বাসের সামনে-পিছনে কী তালাশ করছে, তাই-বা বুঝে নিই কী করে?
সামনে-পিছনে দেখে সে বাসের গতির তালেই প্রায় ধপ করে সামনের ফাঁকা সিটদুটোর বাইরের দিকেরটায় বসে পড়ে। আমি তার পিছনে। জানালার পাশে। এবার সে আমার মুখ ভালোভাবে নিরিখ করে। প্রায় পলকহীন। আমিও চোখ তুলে তাকাই। তার এই আচরণে আমার চোখ তুলে তাকানো স্বাভাবিক। চোখ জানালার বাইরে ছিল, সেখান থেকে তার চোখে। আমিও অপলক। তার তাকানোয় মনে হয়েছে আমায় কিছু বলতে চায়। ভাবি, এমনিতেই উঠব কি উঠব-না করে সে এই বাসে উঠেছে। নিশ্চয়ই কোনো সমস্যায় আছে, না-হলে বারবার এভাবে তাকাচ্ছে কেন?
আমি তার চোখ ও মুখ থেকে চোখ সরিয়েছি। ইতোমধ্যে সেও সামনে ফিরেছে। আবার একবার ফিরে তাকায়। আমায় দেখে। আবার সামনে তাকায়। আমি তার আচরণ একটু অস্বাভাবিক মনে করলেও পাত্তা দিই না। আবার চোখ বুজি। সে তার পাশের জানালা খোলে, বাতাসের ঝাপটা লাগে মুখে। আমার চোখ আপসে খুলে যায়। দেখি, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয়, জানালাটা খুলে সে পিছনে তাকিয়েছে। এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সে আমায় কিছু বলতে চায়! তার এই তাকানোর ভঙ্গিতে আমি সত্যি অবাক! মুখখানা দেখতে পারলে অন্তত বুঝতে পারতাম, কেন সে এভাবে তাকাচ্ছে, আমার পরিচিত কি-না; কিন্তু মুখঢাকা নেকাব-পরা এই নারী সত্যি আমার কাছে অপরিচিত। বাস বলেই হয়তো এমন আচরণে সাড়া দেওয়ার সাহস হচ্ছে, একলা থাকলে এড়িয়ে যেতাম।
সে বলে, ‘আমায় চিনছেন?’
হা কপাল, মুখঢাকা একজন মানুষকে আমি কী করে চিনি! আমার পরিচিত কেউ? তা যদি হয়, তাহলে কণ্ঠস্বরেই তো চিনতে পারতাম। বেশ, পরিচিত কেউ নয়। তাহলে আমার নাম ধরেই ডাকত। আবার অল্পপরিচিত, তাহলে সেও তো নিজের পরিচয় দিত। আগেই বলত না, আমায় চিনতে পারছেন? এ ভীষণ দোটানা। একবারে বলা যাচ্ছে না, চিনতে পারিনি। তবু চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে স্মৃতি হাতড়াই। নিকট অতীতকে একটানে সামনে আনি। দেখেছি এমন কাউকে কখনো। আর যদি দেখেও থাকি, মুখ না-দেখে মানুষকে চেনার উপায় কী? নেকাবের ওপর থেকে মুখ অনুমান করি, সেইসঙ্গে সামনে বসে থাকা মানুষটার গড়নও। সে ওই কথা বলে আমার দিকে তাকিয়েই আছে। আমার উত্তরের অপেক্ষায়!
নিরুপায় আমি ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ি। অর্থাৎ, চিনতে পারিনি। আমি এই মুহূর্তে অসহায়। তাকিয়ে থাকি, যদি সে তার পরিচয় দেয়। অথবা মুখের সামনে থেকে পর্দা সরায়। ডানপাশের যাত্রীদের কৌতূহল, হয়তো আমার পিছনেও তা প্রবাহিত হয়েছে। সে সবই অনুমান। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েই থাকে। আমি চোখ সরাই না। সেও না। যেন বেশ একটা মজা পাওয়া গেছে।
এবার আবার সে জিজ্ঞাসা করে, শুদ্ধ বাংলার বদলে আধা উত্তর-ঢাকা আধা-ময়মনসিংহের উচ্চারণ তার গলায়, ‘আমারে চিনচোইন না?’
আমি আবার ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ি। একইভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। এবার তার যেন অপলক চোখ জোড়া দিয়ে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে তাকে চেনার! কিন্তু তাতে লাভ? আমার পক্ষে তবু অসম্ভব!
এবার নিজের অপারগতা আর তার আচরণে হেসে ফেলি। কিন্তু তাকিয়েই বুঝি, সেও আমার চিনতে না-পারায় বিস্মিত। তাই নেকাবের ওপর থেকে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে আছে। এদিকে বুঝতে পারছি, সে আবার আমাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে। সে আমায় চিনিয়ে ছাড়বে তাকে। অথবা হতে পারে আমি তাকে বেশ ভালোভাবেই চিনি, কিন্তু মুখ-ঢাকা-থাকায় চিনতে পারছি না। তা হলে হবে অপরাধ! যদিও অত উদাসীন মানুষ আমি কোনোকালেই নই। পথচেনা মানুষকে মনে রাখতে পারি। বাড়িঘর
ঠিকুজি-কুলজি আমি সবার জানতে চাই না ঠিকই, তবু যেটুকু পরিচয় হয়, সে-পথের সঞ্চয়টুকু চিরদিন সঙ্গে রাখার চেষ্টা করি। সবসময় যে পারি তা হয়তো নয়। অত আত্মবিশ্বাস কোনো বিষয়েই আমার নেই, তবে নিজের ভেতরে সে-চেষ্টা থাকে, তা জানি। পথের মানুষ বন্ধুরও বাড়া। পথের মানুষ সবচেয়ে জরুরি, পথের মানুষই এই জীবনের বড়ো সঞ্চয়। পথিকের পথ আর সহযাত্রী ছাড়া সহায় কে?
কিন্তু এই নারী অথবা মেয়েটি আমায় তো সমস্যায়ই ফেলে দিলো। এমনভাবে বলছে যেন কতকালের চেনা আমি তার। অথচ দেখতে পাচ্ছি শুধু তার চোখ দুটি। সেগুলো ছোটোও না বড়োও না। তবে ডান-বাঁয়ের চেয়ে এই চোখ ওপরে-নিচে আকৃতিতে বেশি, দেখেই বুঝতে পারছি। সেখানে কৌতূহল। কেন আমি তাকে চিনছি না। এবার যদি সে কোথায় কখন কীভাবে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাই জানায় তো আমার পক্ষে সুবিধাই হয়!
এ-সময়ে কন্ডাক্টর তার কাছে গোলাপগঞ্জের ভাড়া চায়। যেন এই পথের যাত্রী হিসেবে কন্ডাক্টরের জানা আছে, সে সামনে গোলাপগঞ্জে নেমে যাবে। এটা আমারও অনুমান। বাস গোলাপগঞ্জে থামবে। সেটা বড়ো স্টপেজ। একটু বেশিক্ষণ দাঁড়াবে। এই মহিলা ওখানেই নামবে, যদি ততক্ষণে তার কাছে থেকে ভাড়া আদায় না হয়। কন্ডাক্টরের কথায় তেমন তাড়া। এর ভেতরে লক্ষ করলাম, কন্ডাক্টরের কথায় যেন একটু তুচ্ছজ্ঞান। আবার, যেইমাত্র আমার সঙ্গে কথা বলেছে, তারপর এই এখন এই ভাড়া চাওয়ার সময়ে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে সেই বিস্ময়ও, এই নারী কী করে আমাকে চেনে।
মানুষের চোখে কত পদের রঙ্গ ভাসে। একজনের চোখে, শুধুমাত্র চোখ জোড়াতেই আমি তাকে চিনি কি-না সেই আকুতি; অন্যজনের, আমি তাকে চিনিনি, তাও সেখানে রঙ্গ ও কৌতূহল। হোক, যা-ই হোক, এই মুহূর্তে আমি ভেবে পাই না, কীভাবে তাকে শনাক্ত করি। যেভাবে তাকাচ্ছে, তাকিয়েছে, তাতে নিশ্চিত হওয়া একটা ব্যাপার আছে। আর গলার উচ্ছ্বাস, চোখের নাচন, সবমিলে যতটা বয়েস তার ভেবেছি, তাও হয়তো নয়। তবে এই মেয়েটিকে আগে কোনোদিন দেখেছি, পরিচয় ছিল বলে তো মনে পড়ে না। কিন্তু তার কথায় তো মনে হচ্ছে সে সত্যি আমায় চেনে।
ভাড়া চাওয়ায় কন্ডাক্টরকে সে বলল, ‘দিরাম, দিরাম!’
এ-কথায় আবার ধন্দ বাড়ল আমার। যদি এখন সে ধন্দটুকু খোলাসা করার সুযোগ সে দেয়। একটু আগে আমাকে পরিচয় দেওয়ার কথায় মনে হয়েছে সে ঢাকাইয়া অথবা ময়মনসিংহা, এবার এইমাত্র এমনভাবে বলল যেন এ-অঞ্চলেরই মানুষ। উচ্চারণের লগৎও বেশ। তাহলে কোথায় দেখেছি? কোথায় আলাপ হয়েছিল তার সঙ্গে? গাজীপুর কিংবা সাভারে? অথবা, ময়মনসিংহে? সাভারে হলে নবীনগর? ময়মনসিংহে হলে গাঙিনার পাড়ে? নাকি এই এখানে। গোলাপগঞ্জ, ঢাকা দক্ষিণ, শিবপুর নাকি রানাপিং, চারখাইয়ের রাস্তায় জকিগঞ্জ যাবার পথে। নাকি সিলেটে, রেলস্টেশনে কিংবা খাদিমনগরে। অথবা, আমি ভাবছিলাম, কমলগঞ্জে!
বেশ ধন্দে পড়া গেল। সেটুকু মিটানোর সুযোগ এখন সে আমায় দেবে কেন? বাসের গতি বেড়েছে। ডানদিকে গ্যাসফিল্ডের চুড়োর আলোয় চোখ আলোকিত। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। হয়ে আসছে কি, গাঢ় না হলেও অন্ধকার হয়ে গেছে। আজ মেঘলা, পাহাড়ে কিছু বৃষ্টিও হয়েছে, তাই একটু আগেই চরাচরের রং ধরে এসেছে।
এই যে কথাগুলো ভাবছি, এই সুযোগ বাসের গতির মতন।
এইমাত্র পিছনে ঘুরে তার চোখ আবার আমার মুখে। এবার সে একেবারে মরিয়া হয়ে বলে, ‘কিতা, চিনচোইন না, আমারে?’
আমি অসহায়। এমন পরীক্ষার মুখে জীবনে কখনো পড়িনি। যার মুখ দেখিনি, দেখতে পারছি না তার কাছে কবুল করতে হবে তাকে চিনি কি-না। এর চেয়ে জটিল অবস্থা আর কী হতে পারে? বলতেও পারছি না, এবার অবগুণ্ঠন তোলো। অথবা, মুখের ওই ঢাকনাটা সরাও মেয়ে, আমি দেখি তোমার চাঁদবদনখানা। দেখি তোমায় চিনতে পারি কি-না!
এবার আর ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকালাম না। অপলক তাকিয়ে থাকলাম ওই নেকাবঅলা মুখখানার দিকেই। যতক্ষণ সে সামনে না তাকায়। সামনে তাকালে ডাকব? নাকি জানতে চাইব কোথায় আমাদের দেখা হয়েছিল। অথবা, কীভাবে চিন-পরিচয়।
সেও মাথা সামনে নিল না। আমার অসহায়ত্ব পড়ে নিতে পারল। বলল, ‘ওই যে একদিন, শিবপুরে ফেরির লাগি দাঁড়াই থাকি থাকি বাদে খেয়া পার হইছিলাম। আপনার সাথে আর একজন। আপনারা আমার ভাড়া দিয়া দিছিলেন, মনে নাই?’ (চলবে)