এ যেন দু-পা বাড়িয়েও ফের তিন পা পিছিয়ে যাওয়া। নিজের নতুন দল গড়ার কথা ঘোষণা করেও ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোর কেন পিছিয়ে গেলেন? পিকে তাঁর নতুন দলের ঘোষণা করতে চলেছেন— একথা চাউড় হওয়া মাত্র কেবল বিহারের রাজ্য-রাজনীতি নয় জাতীয় রাজনীতিতে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই জল্পনায় নিজেই জল ঢেলে দিলেন তিনি। নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষনার বদলে নতুন বিহার তৈরি করার লক্ষ্যে আগামী ২ অক্টোবর বিহারে ৩০০০ কিলোমিটার পদযাত্রার সুচনা করছেন তিনি। বিহারের সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই পিকের এই পদযাত্রা কর্মসূচি হল “নয়ি সোচ, নয়া প্রয়াস” অর্থাৎ নতুন চিন্তা, নতুন প্রচেষ্টা।
ভোটকুশলী হিসেবে বারবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিও পিকের আকর্ষণ ছিল যথেষ্ট। প্রথম গাঁটছড়া বাঁধেন ২০১২ সালে গুজরাটে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। ২০১৪ সালে ‘হর হর মহাদেব, ঘর ঘর মোদি’ স্লোগানের জন্মদাতা পিকে নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রীপদে আসীন হতে সাহায্য করেছিলেন। ২০১৫-এর বিহার নির্বাচনে জনতা দলের প্রচারের দায়িত্ব কাঁধে নেন এবং নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করেন। ২০১৭ সালে পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অমরিন্দর সিং-এর জয়ের কারিগর ছিলেন তিনি। যদিও সেই বছর উত্তর প্রদেশের ভোটে কংগ্রেসের হয়ে কাজে নামলেও তিনি ব্যর্থ হন। ফের ২০১৯ সালে অন্ধ্র প্রদেশে তিনি জগনমোহন রেড্ডির দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসকে সাফল্যের মুখ দেখান। ২০২০ সালে অরবিন্দ কেজরিওয়ালে আর ২০২১-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী করার কৃতিত্বও তাঁর। আগামী বছর তেলেঙ্গানার ভোটে গাঁটছড়া বেঁধেছেন তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের সঙ্গে। ২০১২ থেকে ২০২২- এক দশকের এই যাত্রাপথে পিকে তাঁর রাজনৈতিক অভীপ্সার কথা গোপন না করে বরং খোলাখুলি প্রকাশ করে ২০১৮ সালে নীতীশ কুমারের জনতা দলে যোগ দিয়েছিলেন। নীতীশ তাঁকে দলের সহ-সভাপতি করেছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের গোড়াতেই ‘দলবিরোধী’ কাজের জন্য পিকে জনতা দল থেকে বহিষ্কৃত হন।
অতি সম্প্রতি পিকের কংগ্রেসে যোগদানের সম্ভাবনা নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তীরের কাছাকাছি পৌঁছেও তরি ঘাটে ভেড়েনি। কংগ্রেসকে ঘিরে পিকে বিজেপি বিরোধী ফ্রন্ট গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কংগ্রেস যাতে হৃত মর্যাদায় ফিরতে পারে, তার নীলনকশাও তিনি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে পেশ করেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ সেই নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত না হলেও নবতম সম্ভাবনা জেগে ওঠে প্রশান্ত কিশোরের নিজের টুইট হ্যান্ডেলে- “গণতন্ত্রে অর্থপূর্ণভাবে অংশ নেওয়ার ও জনতার পক্ষে নীতি গঠনে সাহায্যের জন্য ১০ বছর ধরে অন্বেষণ করলাম। এখন রিয়েল মাস্টার হওয়ার সময় এসেছে। ইস্যুগুলো আরও ভালো করে বুঝতে মানুষের কাছে যাওয়ার সময় এসেছে। জন সূরয- পিপলস গুড গভর্ন্যান্স।” সেই সঙ্গে টুইটের শেষে একথাও লেখেন, ‘শুরুয়াত বিহার সে’। অর্থাৎ, বিহার থেকেই পথচলা শুরু হচ্ছে তাদের।
বিগত এক দশক ধরে প্রশান্ত কিশোর বিভিন্ন রাজ্যে শাসকদল অথবা বিরোধী দলকে ভোটের কৌশল ঠিক করে দিয়েছেন আর এবার ভোটকুশলী নতুন এক সফর শুরুর কথা জানালেন। কিন্তু রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল আপাতত নয়, তাঁর নজর পদযাত্রা। বিহারকে কেন্দ্র করে প্রশান্ত যে তিন হাজার কিলোমিটার পদযাত্রার পরিকল্পনা করেছেন সেখানে নজরে শুধুই জনতা, জনতার রায়, তাদের অভাব অভিযোগ শোনা। চলতি বছরের অক্টোবরেই যাত্রা শুরু হবে। বিহারের রাজনীতি নিয়ে প্রশান্ত কিশোর সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী তা আগেও স্পষ্ট হয়েছে। তবে এবার বিহারে তাঁর পদযাত্রা ঘিরে যে প্রশ্নগুলি সামনে আসছে, তা হল লালু-নীতীশকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই কি প্রশান্ত কিশোর এই পদযাত্রার উদ্যোগ নিয়েছেন, নাকি বিহারের রাজনীতিকে চাঙ্গা করাই প্রশান্তের লক্ষ্য?
অবশ্য পিকের কথা থেকেই প্রশ্নগুলির একরকম উত্তর মিলে যায়। প্রশান্ত জানান, গত ১৫ বছর ধরে বিহারে কোনও কাজই হয়নি। বিহারের সেই ভেঙে পড়া উন্নয়নের হাল ধরতেই তিনি উদ্যোগী হয়েছেন। আপাতত আগামী চার বছর রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল নিয়ে পিকে তেমনভাবে ভাবছেন না। তাছাড়া বিহারে সামনে কোনও নির্বাচন নেই। তবে তিনি একথও জানান এই চলার পথে যদি তারা মনে করেন যে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন আছে তবে তারা দল তৈরি করতে পারেন। তার কথায়, বিহারের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে বিহারে নতুন চিন্তা ভাবনা দরকার। আগামী তিন-চার মাসে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে যত বেশি সম্ভব মানুষের সাথে দেখা করার চেষ্টা করবেন। সামনে নির্বাচন নেই ঠিকই কিন্তু বিহার নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই ঘুঁটি সাজানোর কৌশল নিয়েছেন পিকে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আটঘাঁট বেঁধেই বিহারের ভোট যুদ্ধে নামতে চান তিনি। তিনি নিজেই বলেছেন, আগামী ৩-৪ বছরে মানুষের কাছে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
বুঝতে অসুবিধা হয়না যে বিহারে পিকের ৩০০০ কিলোমিটার পদযাত্রা আসলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এক প্রক্রিয়া এবং একই ভাবনা-চিন্তা করা মানুষদের একটি ছাতার তলায় সামিল করার চেষ্টা। তার থেকে বড় কথা রাজনৈতিক দল ঘোষনার আগে সলতে পাকানো।