এই একটা আশ্চর্য পরিবার। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। একটা পরিবার কিন্তু একটা পুরো সমাজ, একটা দেশ, একটা মহাদেশ। বিস্ময়কর এই বাংলাদেশের মাটিতে। একটা পুরো সংস্কৃতি।
এর প্রাণপুরুষ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় সন্তান হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পুরো সংসারের একটা পুরো মানুষ। আদর্শবাদী, নিয়মনিষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল। নিজের আদর্শের পরিপন্থী কোনো কিছুই প্রশ্রয় পেতো না তাঁর কাছে। অথচ আশ্চর্য পিতৃভক্ত। আচারে-ব্যবহারে পাকা স্বদেশী। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সেই ইংরেজি পড়াবার হুজুগের যুগে তিনি ‘দীর্ঘকাল বাঙ্গালা শিখাইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।’ বাংলা ভাষা ছাড়া তাঁর অধিকারে আরও দু’তিন ভাষা এসেছিল। বৈজ্ঞানিক পরিভাষা সৃষ্টি, যোগব্যায়ামে অনুরাগ, সঙ্গীতচর্চা―জ্ঞানের ও জীবনের সর্বস্তরে তাঁর পদচারণা ছিল সহজ। দেবেন্দ্রনাথের ভ্রমণসঙ্গী, প্রজানুরঞ্জক, আদর্শ স্বামী, অনুরাগী পিতা হেমেন্দ্রনাথের জীবন বাস্তবিকই অনুকরণীয় ও আলোচনার যোগ্য।
হেমেন্দ্রনাথ-নীপময়ীর বিবাহের দুবছর পরে জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রতিভাময়ী প্রতিভাসুন্দরী দেবীর জন্ম। প্রতিভাসুন্দরী পিতামাতার একমাত্র সন্তান নন―তাঁর আরও তিন ভাই এবং সাত বোন ছিল। হেমেন্দ্রনাথ পুত্র এবং কন্যা―প্রত্যেকের শিক্ষা সম্পর্কে সমান আগ্রহী, সমান যত্নশীল ছিলেন। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল জীবনের সর্বতোমুখী বিকাশের লক্ষ্যমুখী। এ লক্ষ্য করেই রাজনারায়ণ বসু যথার্থ মন্তব্য করেছিলেন―‘He was the educationist of the day.’ প্রতিভাসুন্দরীর জীবনগঠনে তার ভূমিকা লক্ষ্য করলেই এই মন্তব্যের সত্যতা প্রতীয়মান হয়। বালিকা প্রতিভাকে প্রতিদিন সকালে ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠতে হত এবং ঈশ্বরবন্দনান্তে শরীরচর্চায় ব্যাপৃত হতে হত। কিছুক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করে এবং পদচারণান্তে আরম্ভ করতে হত সংগীতচর্চা। তার নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলেই চিত্রবিদ্যা, বিদ্যালয় নির্দিষ্ট পাঠ আয়ত্ত করতে হত নিয়মিতভাবে, ব্যতিক্রম ছিল না এর। বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট পাঠ শিক্ষার সম্পূর্ণতা এনে দিতে পারে না―সুতরাং প্রতিভাকে ঘরে পড়তে হত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, অঙ্কশাস্ত্র, উদ্ভিদবিদ্যা, অস্থিবিদ্যা এমনকি দেহতত্ত্বেরও বিবিধ পাঠ।
প্রতিভার চার পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে বেথুন বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর আগেই দেবেন্দ্র কন্যা সৌদামিনী এই বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ করে গেছেন। কিন্তু প্রতিভাসুন্দরীর দৃষ্টান্তেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অন্য মেয়েরা বিদ্যালয়ের উচ্চশ্রেণী পর্যন্ত পড়বার সুযোগ পেল; তাঁকে কেন্দ্র করেই বিদ্যালয়ের দ্বার উন্মোচিত হল এই পরিবারের কাছে পদ্ধতিগতভাবে। বিদ্যালয়ের সর্বশাখায় প্রতিভাসুন্দরীর প্রতিভা বিচ্ছুরিত হতে থাকল। লেখাপড়া, গানবাজনা সব কিছুর শীর্ষে প্রতিভার নাম। প্রত্যেক শ্রেণীতেই তিনি প্রথম। প্রথম পুরস্কার, বিশেষ পুরস্কারগুলি অনায়াসেই করায়ত্ত হত তাঁর। বিদ্যালয়ে পাঠকালীন তাঁর পিয়ানোতে অধিকার অন্যান্য ব্রাহ্মকন্যাদের যন্ত্রসংগীতচর্চায় প্রেরণা জুগিয়ে চলেছিল। যাই হোক, যথাসময়ে প্রতিভাসুন্দরী বেথুন স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর (বর্তমান ক্লাস নাইন) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম শ্রেণীতে উঠলেন। তখনও বেথুন স্কুলে কলেজ বিভাগ স্থাপিত হয়নি। ঠিক সেই সময়েই হেমেন্দ্রনাথ প্রতিভাসুন্দরীকে ভর্তি করে দিলেন রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনীদের-প্রতিষ্ঠিত ‘লোরেটো হাউস’-এ। বেথুনে তখনও প্রবেশিকা পরীক্ষা চালু হয় নি। ভারতবাসী বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম (ব্রাহ্ম) বালিকা যিনি লোরেটো হাউসে ভর্তি হলেন। শিক্ষয়িত্রীগণের প্রত্যক্ষ যত্ন, লালন এবং অপরিসীম স্নেহে প্রতিভা এখানে সকলের নয়নমণি হয়ে উঠলেন। শিখতে লাগলেন ফরাসি এবং ইটালিয়ান ভাষা, আর ইংরেজি গান। আরও শিখতে লাগলেন এখানে পিয়ানো প্রভৃতি যন্ত্র এবং নানা চিত্রাঙ্কন। বাড়িতে শিখতে লাগলেন সেতার এস্রাজ প্রভৃতি এদেশী যন্ত্রসংগীত। হেমেন্দ্রনাথের খুব ইচ্ছে ছিল জার্মান থেকে হার্পযন্ত্র আনিয়ে প্রতিভাকে শেখান। সে ইচ্ছে অবশ্য তাঁর পূর্ণ হয়নি। এখানেও এনট্রান্স পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। মহর্ষির বড় জামাই সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়কে হেমেন্দ্রনাথ অনুরোধ জানালেন যাতে এখানে এনট্রান্স খোলা হয়। শেষ অবধি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্মতও হলেন এ-বিষয়ে। কিন্তু এনট্রান্স চালু হবার আগেই প্রতিভা ঐ বিদ্যালয় ত্যাগ করলেন। কিন্তু ব্রহ্মচর্য ও জীবনের শিক্ষায় হলেন সুশিক্ষিতা।
নিষ্ঠাবান শিক্ষাব্রতী পিতার যত্নে বহুবিদ্যাপারদর্শিনী হয়ে উঠেছিলেন প্রতিভা। তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছিল, কারণ তাঁর যত্ন নিয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা ‘ঝি-মাষ্টারে’ নয়। সেকারণে ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়লেও বাড়িতে কখনই মাথা তুলে উঠতে পারেনি ইংরেজিয়ানা। ভদ্রতা ও জ্ঞানের পিপাসা জাগানো ছিল পিতার লক্ষ্য, হেমেন্দ্রনাথ লিখিত পত্রাবলীতে তার পরিচয় মুদ্রিত হয়ে আছে।
প্রতিভাময়ী প্রতিভার জীবনের এইসব শিক্ষার পরিচয় আমরা কয়েক অধ্যায়ে গ্রহণের চেষ্টা করছি। বিবাহ, সংগীত, স্বরলিপি, সংগীত পত্রিকা প্রকাশ, সংগীত প্রতিষ্ঠান ও অভিনয় পর্যায়গুলিতে প্রতিভা দেবীকে দেখার সুযোগ নিয়েছি।
দুই
১৮৮১-এর এপ্রিল মাস। যে জাহাজে আশুতোষ চৌধুরী চলেছেন বিলেতের উদ্দেশ্যে সেই জাহাজে রবীন্দ্রনাথও চলেছেন ঐ বিলেতেই। উদ্দেশ্য ব্যারিস্টার হওয়া। এটি রবীন্দ্রনাথের বিলাত যাত্রার দ্বিতীয় উদ্যোগঃ তবে অসমাপ্ত ছিল এই যাত্রা। সেবার কবিকে মাদ্রাজ পর্যন্ত গিয়েই ফিরে আসতে হয়। কিন্তু এরই মধ্যে বন্ধু হিসেবে পেলেন হরিপুরের চৌধুরী পরিবারের সাত ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে চকদার ভাই আশুতোষ চৌধু়রীকে। সেই আশুতোষ চৌধুরী যিনি একই বছরে (১৮৮০) বি. এ. এবং এম. এ. পাশ করে হৈ-চৈ জাগিয়ে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন― ‘দ্বিতীয়বার বিলাত যাইবার জন্য যখন যাত্রা করি তখন আশুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. পাশ করিয়া কেমব্রিজে ডিগ্রি লইয়া ব্যারিস্টার হইতে চলিতেছেন। কলিকাতা হইতে মাদ্রাজ পর্যন্ত কেবল কয়টা দিন মাত্র আমরা জাহাজে একত্রে ছিলাম। কিন্তু দেখা গেল, পরিচয়ের গভীরতা দিনসংখ্যার উপর নির্ভর করে না। এক সহজ সহৃদয়তার দ্বারা অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি এমন করিয়া আমার চিত্ত অধিকার করিয়া লইলেন যে, পূর্বে তাঁহার সঙ্গে যে চেনাশোনা ছিল না। সেই ফাঁকটা এই কয়দিনের মধ্যেই আগাগোড়া ভরিয়া গেল’।
ব্যারিস্টারি পাশ করে আশুতোষ চৌধুরী পাঁচ বছর পরে দেশে ফিরে এসে অসমাপ্ত পরিচয় পূর্ণতর করার জন্য এলেন ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের কাছে। জাহাজেই রবীন্দ্রনাথ ভেবে রেখেছিলেন যে আশুতোষের সঙ্গে তিনি কুটুম্বসম্পর্ক স্থাপন করবেন। আশুতোষ চৌধুরী আসতেই তাঁর সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ স্থাপিত হয়ে গেল। ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করে পরিচিত হয়ে রইলেন আদি রবি-অনুরাগীদের অন্যতম হয়ে। ক্রমে পরিচিত হলেন হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভাসুন্দরীর সঙ্গে। পরিচয় নিবিড় হল। রবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণনগরে চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে প্রস্তাব করলেন উভয়ের বিবাহের। পরিচয় পরিণত হল পরিণয়ে। হেমেন্দ্রনাথ সানন্দে সম্মতি দিলেন এই বিবাহে। সবচেয়ে খুশী হলেন মহর্ষি নিজে। তিনি বলেছিলেন, ‘আশু আমার একটি অর্জন। অনেক সাধনায় প্রতিভা এমন পাত্রে পরিণীতা হয়েছে।’
বিয়ে হল ৩০ শ্রাবণ ১২৯৩ বঙ্গাব্দ, ১৪ আগস্ট ১৮৮৬ তারিখে। এর আগে হেমেন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটেছে। সুতরাং গৌণভাবে রবীন্দ্রনাথের উপর বিবাহের ব্যবস্থাদির দায়িত্ব এসে পড়েছে। সত্যেন্দ্রনাথের অস্থায়ী কর্মস্থল নাসিকে তিনি অবকাশ কাটাতে গিয়েছিলেন, এখন ফিরে এলেন স্নেহের পাত্রী প্রতিভার বিবাহোপলক্ষে আগস্টের গোড়ায়। বিয়ে হল আদি ব্রাহ্মসমাজ পদ্ধতি অনুসারে। রবীন্দ্রনাথ এবং সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়-এর পুত্র সত্যপ্রসন্নর প্রত্যক্ষ যত্নে বিবাহকর্ম সুচারুরূপে সম্পাদিত হল। প্রতিভা রাঢ়ীশ্রেণীর ব্রাহ্মণকন্যা; আশুতোষ চৌধুরী বারেন্দ্রশ্রেণীর ব্রাহ্মণপুত্র। দুই শ্রেণীতে শুধু মেলবন্ধন হল না―মেলবন্ধন হল দুই পরিবারে, দুই সংস্কৃতি-সংস্কৃত হৃদয়ের মধ্যে। একে অন্যের উপযোগী হয়ে উঠতে লাগলেন ক্রমশ। স্বভাবতঃ আত্মমুখী প্রতিভার হৃদয়দ্বার উন্মোচিত হল, মনের দ্বার গেল খুলে।
তিন
গান প্রতিভা দেবীর প্রথম প্রেম। জন্মমুহূর্তে সূতিকালয়ে তিনি যে ক্রন্দন করেছিলেন তাতেও বোধহয় সুর ছিল। তাঁর সংগীতচর্চা ত্রিধারাবাহী―স্বরলিপি নির্মাণ, সংগীতবিদ্যালয় স্থাপন এবং সংগীতবিষয়ক পত্রিকা সম্পাদনা।
বেথুন বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন সেই কোন্ শিশুকালে এবং সেই শৈশবেই হিন্দুবালিকাদের মধ্যে তিনিই প্রথম আয়ত্ত করেছিলেন পিয়ানোর বিচিত্র সুর। বিদ্যালয়ে তখন এসেছেন ভূতপূর্ব ছোট লাট লর্ড ক্রোমারের কন্যা কুমারী বেয়ারিং। প্রতিভার পিয়ানোবাদন শুনে তিনি একেবারে বিস্ময়াহত। একটি রূপার ফুলদানী বিশেষ উপহার হিসাবে তিনি সানন্দে তুলে দিলেন বালিকা প্রতিভার কোমল করপল্লবদ্বয়ে। তাঁর দেখাদেখি অন্য ব্রাহ্মকন্যারা এই বাজনায় আকর্ষিত হলেন। বেথুন থেকে ভর্তি হয়ে এসেছেন লোরেটো হাউসে। এখানে ফরাসি, ইটালিয়ান ইংরেজি গান শেখার ফাঁকে ফাঁকে বাড়িতে বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তীর কাছে শেখেন বাংলা গান। সরলাদেবী বলেছেন, প্রতিভা দেবী ইংরেজি গান খুব ভাল গাইতেন, তবে দেশিগানের চেয়ে হিন্দিগানেই তাঁর কণ্ঠ সমধিক স্ফূর্তিলাভ করতো। কণ্ঠসংগীত ছাড়া বাড়িতে আরও শিখতেন সেতার, এস্রাজ প্রভৃতি যন্ত্রসংগীত। শিখেছিলেন বীণাও। দেবেন্দ্রনাথ স্বয়ং প্রতিভার গুণমুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন। প্রায়ই এই আদরের নাতনীটিকে কাছে ডেকে গান গাইতে বলতেন এবং গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ও ঠাকুর পরিবারে অন্যান্য মেয়েদের সংগীতবিষয়ে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিভার হাতে তুলে দিতেন কখনও কখনও হাতির দাঁতের খেলনা, কখনও বা মোহর আশরফি।
প্রকাশ্য অধিবেশনে মহিলার সংগীতও সে সময়ের লোকে শুনেছিলেন এই প্রতিভার কণ্ঠেই। ১৭৯৪ শকাব্দের (১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে―বয়স ছয় অথবা সাত ?) মাঘোৎসব উপলক্ষে নিজের ছোট ভাই-এর সঙ্গে মিলিতভাবে কয়েকটি গান গেয়েছিলেন প্রতিভা। মেয়েদের মধ্যে মাঘোৎসবে কেবলমাত্র তাঁরই স্থান হত। সরলাদেবী কেন যে লিখেছেন যে সাহেব মেমেদের দেখাবার জন্যই এই প্রচারমুখিতা! ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’ উৎসবে এদেশীয় লোকেদের সম্মুখেও তো তিনি দেশীয় যন্ত্রে ও গানে মুগ্ধ রাখতেন শ্রোতৃমণ্ডলীকে। হেমেন্দ্রনাথের আদেশে তিনি গান ও সেতারে মুগ্ধ রঘুনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে পুরস্কারস্বরূপ পেলেন এক সুবৃহৎ মূল্যবান তানপুরা এবং প্রখ্যাত শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিভার হাতে তুলে দিলেন স্বরচিত সংগীতবিষয়ক অনেকগুলি পুস্তক। মাঘোৎসবের উৎসব এনে দিয়েছিল তাঁর প্রথম পরিচিতি জনসমক্ষে, এখন ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’ সভা এনে দিল স্বীকৃতি। রাজকৃষ্ণ রায় যথার্থই লিখেছিলেন তাঁর সংগীত প্রসঙ্গে―
বীণা আর পিকবর তুলি’ নিজ নিজস্বর
রাখিয়াছে গলে ওর, শ্রবণের সুখকর।
পরবর্তীকালে মহারাণী সুচারু দেবী স্পষ্টতই বলেছিলেন জীবনে যত লোকের গান শুনেছেন তার মধ্যে প্রতিভা দেবীর গান তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হয়েছিল।
এ সমস্ত উদ্যোগের পিছনে যে মানুষটির নিরন্তর ইচ্ছা এবং প্রশ্রয় সক্রিয় ছিল, তিনি পিতা হেমেন্দ্রনাথ স্বয়ং। ব্রাহ্মগণই প্রথম সংগীতকে জাতে তোলেন সন্দেহ নাই। পিতা-পুত্র যে একই আসরে গান গাইতে পারেন, সে তাঁদেরই প্রবর্তনা। কিন্তু স্ত্রী-কন্যা-ভগ্নীদের সংগীত শিক্ষার ব্যবস্থা এদেশে সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সংগীতবিষয়ে সর্বপ্রকার জড়তা ত্যাগ করার জন্য কন্যাকে তিনি একাধিক পত্র লিখেছেন। প্রতিভা তখন সত্যেন্দ্রনাথের কাছে বোম্বাইতে। মেজদাদাকে সর্বপ্রকারে সুখী করার উপদেশ দিয়ে তিনি কন্যাকে লিখেছিলেন, ‘শুনিতে পাই তোমার গান গাহিতে লজ্জা করে, কিন্তু তাহা উচিত না। লজ্জা খাটো করিয়া গান শুনাইয়া তাঁকে সুখী করিবে।’ সংগীতশিক্ষার সম্পূর্ণতার জন্য বোম্বাইয়ে তিনি হ্যামিল্টন ও শৌরীন্দ্রমোহনের সেতার শিক্ষা গ্রন্থ পাঠাচ্ছেন এবং ‘কেবল নাচের বাজনা ও সামান্য গান না শিখিয়া যদি Beethoven প্রভৃতি বড় বড় German পণ্ডিতদিগের রচিত গানবাজনা শিক্ষা করিতে পার এবং সেই সঙ্গে music-এর theory-ও শেখ তবেই আসল কার্য হয়। Miss Ingles ভজাইয়া এইরূপ যাহাতে শিক্ষা হয় করিও’ প্রভৃতি পরামর্শ দিয়েছেন।
জড়তা প্রতিভা সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছিলেন। বেথুন বিদ্যালয়ের পুরস্কারবিতরণের উৎসবের সময় তিনিই একদা প্রকাশ্যে গান করে সংগীতের জগতে নারীমুক্তির আন্দোলনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দেশীয় সংগীতের উন্নতিসাধনই তার শেষ বয়স তথা সারাজীবনের লক্ষ্য ছিল। তাতেই সমর্পণ করেছিলেন দেহমন। পারিবারিক উৎসবাদিতে পরিবারস্থ বালক-বালিকাদিগকে যিনি আবৃত্তিপাঠ ও সংগীতচর্চায় আহ্বান করেছিলেন, তিনিই আহ্বান করেছিলেন স্বদেশবাসীকে তাঁর সংগীতসংঘের আসরে, বৃহত্তম ক্ষেত্রে।
চার
প্রতিভা দেবীর প্রতিভার অযাচিত খ্যাতির কারণ ত্রিবিধ—১. মাঘোৎসবে গান, ২. ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’-এ গান ও বাজনা এবং ৩. স্বরলিপি প্রকাশ।
‘স্বরলিপি’ নির্মাণে মৌলিকতা, দক্ষতা ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করলেই তাঁর সম্পর্কে সবকথা বলা যাবেনা। ‘বালক’ পত্রেই তাঁর প্রথম স্বরলিপি প্রকাশিত হয়। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের সাহিত্যচর্চার জন্য এই পারিবারিক পত্রিকা জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় এবং রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ যত্নে ১২৯২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। মাত্র এক বছর আয়ুসম্পন্ন এই পত্রিকায় প্রতিভা দেবী ‘বল গোলাপ মোরে বল’, ‘বন্দেমাতরম্’, ‘ভাসিয়ে দে তরী’, ‘আজি শুভদিনে পিতার সদনে’ (‘ভবনে’ নয়), ‘এ কি সুন্দর শোভা’, ‘রিমঝিম ঘন ঘন রে’ এবং ‘কালমৃগয়া’র ধারাবাহিক স্বরলিপি প্রকাশ করেন। ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় স্বরলিপিসহ ‘গান অভ্যাস’, ‘সহজে গান শিক্ষা’, ‘সঙ্গীত শিক্ষা’ প্রভৃতি প্রবন্ধ। এ ছাড়া ‘তুমি হে ভরসা মম অকূল পাথারে’, ‘কে রচে এমন সুন্দর বিশ্বছবি’, ‘গাও তাঁরে গাও সদা’, ‘আয় তবে সহচরি’, ‘চন্দ্র বরিষে জ্যোতি তোমারি নিরমল’, ‘ধন্য সেই সাধু সেই জ্ঞানী যে বুদ্ধ’ প্রভৃতি পরিচিত অপরিচিত গানের স্বরলিপিও এই পত্রিকায় পত্রস্থ হয় (১২৯৩ বঙ্গাব্দ)।
‘পুণ্য’ পত্রিকা ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রধানত প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর সম্পাদনায় প্রকাশিত উচ্চশ্রেণীর মাসিক। প্রতিভা দেবী এই পত্রিকাতেও কয়েক হিন্দুস্থানী সংগীতের স্বকৃত স্বরলিপি ব্যাখ্যাসহ প্রকাশ করেন। এগুলির মধ্যে হিন্দুস্থানী চতুরঙ্গ―“চতুরঙ্গ সব মেলে গাও বাজাও, রেঝাও সোর সঙ্গতর সো তাল’ উল্লেখযোগ্য।
স্বরলিপিকে কার্যক্ষেত্রে সহজসাধ্যরূপে প্রকাশ করে বঙ্গীয় সঙ্গীতজগতে প্রতিভা দেবী যে মহামূল্য সম্পদ রেখে গেছেন, তা বিশেষভাবে পরিমাপযোগ্য। স্বাধীনভাবে স্বরলিপিনির্মাণে তিনি যে কি আশ্চর্য পরিশ্রম ও নিষ্ঠার পরিচয় রেখে গেছেন, তার প্রমাণ তাঁর আনন্দসংগীত পত্রিকা।
দীর্ঘদীন ধরে প্রচারিত এই পত্রিকার পৃষ্ঠায় স্বরলিপিকার প্রতিভার মূল সম্পদ রক্ষিত হয়ে আছে। তানসেনের ‘মহা বাকবাদিনী সনমুখ হুজে হুজে হো’ চামেলি ফুলি চঁউম্পা গোলাব’, ‘ধায়েরি বাদর ধূম রোরি’, ‘উমড ঘর ঘুমড বরষ বুদারিয়া চলত পুর বাই’, ‘আঁদেবে দিলবরা জাঁদে মনসভা’ (টপ্পা), ‘বাজুর মন্দর বাজু’, ‘গরজাত বরষত ভিঁজত আইলো’ (খেয়াল), বঙ্গসিপাহীর হোরী সংগীত― “আজু তলোয়ারসে খেলেঙ্গে হোরী’ প্রভৃতি হিন্দুস্থানী গানের স্বরলিপিগুলি এই পত্রিকার পাণ্ডুর পৃষ্ঠায় লুক্কায়িত রয়েছে। এছাড়া ‘আজি শুভদিনে পিতার ভবনে’, ‘এই যে কালো মাটির বাসা’, ‘পথ দিয়ে কে যায় গো চলে’, ‘তরীতে পা দিইনি’, ‘আলোকের এই ঝরণাধারায়’, ‘কেন তোমরা আমায় ডাক’, ‘বল গোলাপ মোরে বল’ প্রভৃতি সুপরিচিত রবীন্দ্রসংগীত সমূহের (যে কালে রবীন্দ্রনাথের গান রবীন্দ্রসংগীত পর্যায়ে পরিচিত হয়নি) স্বরলিপিও প্রতিভা দেবী কৃত। এই পত্রিকার পৃষ্ঠায় তাঁর সর্বাপেক্ষা কৃতিত্ব হল ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র প্রথম সংস্করণের গানগুলির ধারাবাহিক স্বরলিপি নির্মাণ ও প্রকাশ। শ্রদ্ধেয় শান্তিদেব ঘোষ মহাশয়কে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, বর্তমানে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র গান কি ঐ পুরানো স্বরলিপি অনুযায়ী গীত হয়? তাঁর কাছে না-সূচক উত্তর পেয়েছিলাম। একটা প্রশ্ন মনে স্বতঃই জাগে, রবীন্দ্রনাথ এককালে যে স্বরলিপি অনুমোদন করেছিলেন, পরবর্তীকালে তা পরিবর্তিত হল কেন? এ বিষয়ে আমার সম্যক জ্ঞানের অভাব আছে, যাঁরা জানেন, তাঁরা অনুগ্রহ করে আলোকপাত করবেন। দিনেন্দ্রনাথ-কৃত স্বরলিপি প্রকাশিত হয় অনেক পরে ১৩৩৫ সালের আশ্বিন মাসে গ্রন্থাকারে।
রবীন্দ্রসংগীত ব্যতীত, ‘যদেমি প্রস্ফুরন্নিব দৃতি ন ধ্নাতো অদ্রিবঃ’ প্রভৃতি বেদগান (২য় বর্ষ)-এর স্বরলিপি করেছিলেন প্রতিভা দেবী। সম্পূর্ণ তালিকা দীর্ঘ পরিসর গ্রহণ করে বসবে বলে, সে প্রচেষ্টা করলাম না; কিন্তু প্রতিভা দেবী-কৃত এই স্বরলিপিগুলিকে বিশ্লেষণ, উদ্ধার এবং প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে, একথা এখনও বিশ্বাস করি―উপযুক্ত মহলের কাছে এই আবেদন রাখলাম।
পুনশ্চ বলি, বহু আগে থেকেই হেমেন্দ্রনাথ প্রতিভা দেবীকে দিয়ে রাগ সংগীতে ও হিন্দুস্থানী সংগীতের যে স্বরলিপি সংগ্রহ করাচ্ছিলেন, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বরলিপির আদর্শানুসারে প্রতিভা ‘বালক পত্রিকা’য় তার সূচনা করেন এবং আনন্দসংগীত পত্রিকায় সেই নিষ্ঠার পূর্ণ পরিণতি ঘটে।
পাঁচ
সংগীতবিষয়ক পত্র-পত্রিকার মধ্যে আনন্দসংগীত পত্রিকার এক বিশিষ্ট চরিত্র আছে। আমার ধারণা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘সংগীত-প্রকাশিকা’ পত্রিকা ব্যতীত এসব পত্রিকা অন্তত বাংলা ভাষায় অদ্যাবধি দ্বিতীয়-রহিত। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্রিকাটির প্রকাশ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত এর অভাবই প্রতিভা দেবীকে সংগীতধর্মী আর এক পত্রিকা প্রচারে প্রবর্তনা দিয়েছিল। শ্রাবণ ১৩২০ বঙ্গাব্দে ‘আনন্দসংগীত পত্রিকা’র প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ৪৭ নং ওল্ড বালিগঞ্জ থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকার প্রতি সংখ্যার মূল্য ছিল চার আনা এবং অগ্রিম বার্ষিক মূল্য ছিল দু’টাকা ছ’ আনা। এর দ্বিতীয় সংখ্যা সুখ্যাত এইচ. বোসের কুন্তলীন প্রেসে মুদ্রিত হয়েছিল। পত্রিকার প্রচ্ছদে মুদ্রিত হয়েছিল বীণাবাদনরতা হংসবাহিনী সরোবরবিহারিণী সরস্বতীর চিত্র। সম্পাদিকাদ্বয় ছিলেন প্রতিভা দেবী এবং ইন্দিরা দেবী। প্রথম সংখ্যার প্রস্তাবনায় একস্থলে প্রতিভা দেবী লিখেছেন― “যাঁহারা সঙ্গীতজ্ঞ, যাঁহারা সংগীতপ্রিয়, তাঁহাদের কাছে আমাদের এই নিবেদন, নিজেরা অনুগ্রহপূর্বক গ্রাহক হইয়া এবং অনেক গ্রাহক করাইয়া ইহার সাহায্য করিবার চেষ্টা করিবেন। … সকলের কাছে আমাদের অনুনয় আমি এবং শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী এই পত্রিকার সম্পাদিকার ভার লইয়া যদি কিছু করিতে পারি সেই চেষ্টা করিতে উদ্যত হইয়াছি।’
এখানে একটা কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য নিবেদন করি। প্রথম বর্ষ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় (১০, ১১ ও ১২) ―এই তিন সংখ্যার প্রচ্ছদ দেবনাগরী অক্ষরে মুদ্রিত। কিন্তু কেন? মনে হয় পত্রিকাটিতে সম্পাদিকাদ্বয় একটা সর্বভারতীয় চেহারা দিতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া হিন্দুস্থানী সংগীতের প্রচার ও প্রসার একটা বড়ো লক্ষ্য ছিল পত্রিকার।
পত্রিকার উদ্দেশ্য বিষয়ে পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (শ্রাবণ ১৩২১) ‘নিবেদন’ অংশে লিখিত হয়েছিল―
‘এই পত্রিকার উদ্দেশ্য―সংগীত বিষয়ে আলোচনা, স্বরলিপি সংগ্রহ এবং যে সমস্ত সংগীত কালে লুপ্তপ্রায় হইয়া গিয়াছে তাহার পুনরুদ্ধার। যাঁহারা এই পত্রিকাখানির পোষণের জন্য ঐ সমস্ত সংগ্রহ করিয়া আমাদের নিকট পাঠাইবেন তাঁহারা আমাদিগের বিশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হইবেন। তাঁহাদের প্রেরিত বিষয়গুলি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য সাদরে গৃহীত হইবে।
‘আমাদের এই আনন্দসংগীতে পত্রিকা গত বৎসর ৩০ শে শ্রাবণ রাখী পূর্ণিমার দিন প্রথম প্রকাশিত হয়। ইহারই দুই বৎসর পূর্বে এই প্রশস্ত শুভ দিনেই সংগীত সংঘ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।’
ষষ্ঠ বর্ষ প্রথম সংখ্যার শেষে আনন্দসংগীত পত্রিকার তৎকালীন কার্যাধ্যক্ষ (এখন পত্রিকার কার্যালয় ৬ নং সানিপার্ক, বালিগঞ্জ, কলিকাতা) শিবকুমার চৌধুরী পত্রিকার যে নিয়মাবলী প্রকাশ করেছিলেন তা উদ্ধারযোগ্য।
১। আনন্দসংগীত পত্রিকার বৎসর শ্রাবণ হইতে আরম্ভ হইয়া আষাঢ় মাসে পূর্ণ হয়।
২। ইহার অগ্রিম বার্ষিক মূল্য শহরে ও মফঃস্বলে ডাকমাশুল সমেত দুই টাকা ছয় আনা মাত্র। প্রতি সংখ্যার মূল্য (১০) আনা মাত্র। নমুনা চাহিলে (১০) আনার ডাকটিকিট পাঠাইতে হইবে।
৩। আনন্দসংগীত পত্রিকার বিজ্ঞাপন প্রকাশের হার―মলাটের ২য় ও ৩য় পৃষ্ঠা মাসিক ৬ টাকা ও ৪র্থ পৃষ্ঠা মাসিক ১২ টাকা। সাধারণ পৃষ্ঠা মাসিক ৪ টাকা মাত্র।
৪। পত্রিকা সম্বন্ধীয় চিঠিপত্র, টাকা কড়ি ইত্যাদি কার্যাধ্যক্ষের নামে নিম্নলিখিত ঠিকানায় পাঠাইতে হইবে।
পত্রিকা দীর্ঘস্থাযী হয় নাই ৮ম বর্ষ পর্যন্ত প্রকাশের পর প্রধানত প্রতিভা দেবীর মৃত্যুর কারণে পত্রিকার প্রচার রহিত হয়। অবশ্য তার পরেও আশুতোষ চৌধুরীর সম্পাদকতায় এটি পুনঃপ্রকাশিত হয়, যদিও তা’ অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল। স্ত্রীর এবং সংগীতের প্রতি অকৃত্রিম প্রীতিই আশুতোষ চৌধুরীকে পত্রিকা পুনঃপ্রচারে উৎসাহী করে তুলেছিল, যদিও পত্রিকার যথাযথ চরিত্র তাতে রক্ষিত হয় নাই। ৯ বর্ষ ১ম সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩২৯) প্রকাশিত ‘ঁপ্রতিভা দেবী’ শীর্ষক স্মরণ রচনা এক উল্লেখযোগ্য রচনা।
আনন্দসংগীত একটি ঐতিহাসিক পত্রিকা। এর জীর্ণ পৃষ্ঠাগুলিতে বিবিধ স্বরলিপি, বিচিত্র সংগীত, সংগীতসংঘের অজানা নানা ইতিহাস ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, দিনেন্দ্র ঠাকুর, নিধুবাবু, সদারঙ্গ, বিজয়চন্দ্র মহাতাব, চণ্ডীদাস, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, রামকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোমোহন বসু, বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী, তানসেন প্রভৃতি সংগীতকারদের গান ও বেদগান এবং বিভিন্ন হিন্দিগান মুদ্রিত হয়ে স্বরলিপির আকারে প্রকাশিত হয়। স্বরলিপি করেছেন প্রতিভা দেবী স্বয়ং এবং ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরুণা বেজবরুয়া, ব্রজেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, মোহিনী মোহন সেনগুপ্তা, লালা দীপ্তি প্রকাশ নন্দে, সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কামিনী কুমার ভট্টাচার্য প্রমুখ স্বরলিপি বিশেষজ্ঞগণ। সংগীত বিভাগ পরিচালনা করেছেন বিভিন্ন সময়ে প্রতিভা দেবী ব্যতীত আশুতোষ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী, শিবকুমার চৌধুরী, রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কৌকুভ খাঁ।
প্রকাশিত স্বরলিপি সমূহের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকি-প্রতিভা এবং ফাল্গুনী নাটকের প্রথম স্বরলিপিগুলি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
আর উল্লেখযোগ্য এর পৃষ্ঠাগুলিতে মুদ্রিত কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, তানসেন (রচয়িত্রী প্রতিভা দেবী), সা সদারঙ্গ, বাজুবাওরা নায়ক, গোপাল নায়ক প্রভৃতি সংগীত শিল্পীদের মনোহর জীবনীগুলি। প্রতিভা দেবীর মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এই পত্রিকা যে হারিয়ে গেল এই আক্ষেপ আমাদেরকে দীর্ঘদিন দরিদ্র রেখে গেছে।
ছয়
আনন্দসংগীত পত্রিকার পৃষ্ঠাগুলিতে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে এক সংগীত প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসও― “সংগীত সংঘের’ ইতিকথা। সংগীত সংঘ-এর ইতিবৃত্ত পৃথকভাবে রচিত হওয়া প্রযোজন। আমরা এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য নিবেদন করে এর সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ নিচ্ছি।
প্রতিভা দেবী প্রতি বৎসর ১লা বৈশাখ পারিবারিক নববর্ষ উৎসব পালন করতেন বহু আগে থেকেই। ১৩০৮ বঙ্গাব্দে এই উৎসবের তিনি এক পৃথক নামকরণ করেন—আনন্দসভা। এই উৎসবে পরিবারের বালক-বালিকাগণ অংশগ্রহণ করে সভাকে ভরিয়ে তুলত গানে, পাঠে এবং আবৃত্তিতে। ধীরে ধীরে উৎসব বৃহদাকার ধারণ করল। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বুকে জাতীয় চেতনার একটা হিল্লোল বয়ে গেছে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র ক’রে। সংগীত সংঘ-এও তার ঢেউ এসে পৌঁছেছিল। ৩০ শ্রাবণ ১৩৩৮ (আগস্ট ১৯১১ খ্রীঃ) তারিখে অনেকের পরামর্শে প্রতিভা দেবী আনন্দসভার নানা সংস্কার সাধনান্তে ও আয়তন বৃদ্ধি করে এক স্থায়ী প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সংগীত সংঘ’। তারপর থেকেই প্রতিবৎসর রাখীপূর্ণিমায় ‘সংগীত সংঘের’ বার্ষিক উৎসব উদযাপিত হতে লাগল।
তা ব’লে একথা ভেবে নেওয়া উচিত হবে না যে নববর্ষ উৎসব প্রতিভা এই কাল থেকে বিসর্জন দিলেন। নববর্ষ প্রতিবার প্রতিভা দেবীর কাছে নতুন নতুন আলোক নিয়ে উপস্থিত হত। এই দিনে তিনি ইষ্ট দেবতার কাছে প্রাণমন সমর্পণ করে প্রার্থনা করতেন। তাঁর প্রার্থনাবলী মুদ্রিত হয়ে প্রচারিত হত এই উৎসবে। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে নিবেদিত প্রার্থনার নাম ‘আনন্দ’। আট পৃষ্ঠাব্যাপী এই ক্ষুদ্র নিবেদন ৬/১ নং দ্বারকানাথ ঠাকুরের লেন স্থিত ‘পুণ্য যন্ত্রে’ মুদ্রিত হ’য়ে প্রচারিত হয়েছিল। এমন অন্য এক নিবেদনের নাম ‘ধর্ম ও একতা’। ১লা বৈশাখ ১৩২০ বঙ্গাব্দে নিবেদিত ১০ পৃষ্ঠার পুস্তিকা ‘মিলন’-এ আনন্দকেই তিনি যে ধর্মসভা মনে করতেন―তা নিবেদন করেছেন। ‘জ্ঞান ও চিন্তা’ ‘সফলতা’ (আনন্দসভার একাদশ সাম্বৎসরিক উপলক্ষে পঠিত―শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত এই পুস্তকটিকে প্রতিভা দেবী সংশোধিত নানা নোটও রয়েছে) ―অন্য দুটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা। ১৩২১ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ মঙ্গলবার (যোগেশচন্দ্র চৌধুরীর Weekly Notes Printing Works, Calcutta-তে মুদ্রিত) নিবেদিত হয়েছিল ‘আলোক’―কুড়ি পৃষ্ঠা ব্যাপী দীর্ঘ ঈশ্বর নিবেদন। এর সূচনাংশ নিম্নরূপঃ
আজ আমাদের নববর্ষের উৎসব বলিয়া তোমার কাছে ছুটিয়া আসিয়াছি। এক বৎসর পরে সকলে মিলিত হইয়া একের ও অদ্বিতীয় যে তুমি সকলে মিলিয়া তোমাকে এক করিয়া দেখিব, সেই প্রাণের আশায় অনুপ্রাণিত হইয়া পবিত্র হৃদয়ে তোমাকে প্রীতি উপহার দিবার জন্য করজোড়ে এই বন্দনা লইয়া বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হইয়াছি। তুমি আমাদের ক্ষুদ্র সভায় আসিয়া সকলের পূজা গ্রহণ কর।
প্রতিভা দেবী―যাঁর সাহিত্য চর্চার হাতে খড়ি হয়েছিল বালক পত্রিকায় এবং যাঁর সাহিত্য চর্চার প্রাণমূল অবস্থিত ছিল পিতা হেমেন্দ্রনাথের বিশিষ্ট ধ্যান ধারণায়―তাঁর সাহিত্যচর্চা ও জীবনচর্যার এক মনোরম উদাহরণ এই পুস্তিকাবলী।
কাজেই দেখা যাচ্ছে সংগীত সংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও আনন্দ সভার গুরুত্ব হ্রাস পায়নি―কেবল এক পারিবারিক বিষয় সর্ব সাধারণের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের আগষ্ট মাস থেকে এই প্রতিষ্ঠান ৩ নং গড়িয়াহাটার ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে এটি উঠে আসে ৩৪ নং পার্ক স্ট্রিট। এখানের বাড়ি ভাড়া ছিল অত্যধিক, যাতায়াতেরও তেমন সুবিধা ছিল না। সেজন্য ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে এ ১৮/১ ল্যান্সডাউন (বর্তমান শরৎ বসু রোড) রোডে স্থানান্তরিত হয়। এই সময়ে সংগীত সংঘের প্রখ্যাত হিন্দুস্থানী সংগীতজ্ঞ কৌকুভ খাঁ মারা গেলে প্রতিষ্ঠানরি শিক্ষার্থী সংখ্যা হ্রাস পায় এবং প্রথমে ৮১ সার্কুলার রোড, পরে ৭০ কর্পোরেশন স্ট্রি স্থানান্তরিত হয়। এখানে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান কালে প্রতিভা দেবীর মৃত্যু হয়। অবশ্য ইতিমধ্যে ভবানীপুর ডায়াসিসন কলেজ-এর এক শাখাও উন্মোচিত হয়েছিল।
শেষে ৭০ কর্পোরেশন স্ট্রিট-এ যখন সংগীত সংঘ প্রতিষ্ঠিত ছিল তখন ৬ নং সানিপার্ক থেকে শিবকুমার চৌধুরী প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি থেকে জানতে পারি―
‘অনেকেই হয়ত অবগত নহেন যে কলিকাতা শহরে সংগীত সংঘ নামে এক সংগীতসভা ও বিদ্যালয় প্রায় ৬ বৎসরাবধি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এই সংগীত বিদ্যালয় সম্প্রতি ৭০ নং কর্পোরেশন স্ট্রীট উঠিয়া গিয়াছে। সকলের সুগম্য এবং বিজলী বাতি ও পাখা প্রভৃতি আধুনিক সুবিধাসম্বলিত। শহরের সুবিখ্যাত ওস্তাদগণ ইহার শিক্ষক। হিন্দী বাংলা গান, সেতার, এস্রাজ. তবলা ইত্যাদি শেখানো হয়। বৃহস্পতিবার ও শনিবার অপরাহ্ণ ৪টা ৩০ মিনিট হইতে ৭টা ৩০ মিনি পর্যন্ত স্ত্রীলোক ও বালকবালিকাদের শিখিবার সময়। এই বিভাগ ভদ্রমহিলা দ্বারা পরিচালিত। রবিবার অপরাহ্ণ ঐ সময় পুরুষদের শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট যাঁহারা নিজেরা শিখিতে বা সন্তানগণকে শিখাইতে ইচ্ছা করেন এইরূপ সুযোগ সহজে পাইবেন না। নিম্নলিখিত ঠিকানায় পত্র দিলে ছাপান নিয়মাবলী এবং অন্যান্য তথ্য পাইবেন।’
পূর্ববৎসরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি এর শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৩৬। সেতার শিক্ষক কেরামতুল্লা খাঁ। দ্বারভাঙ্গা মহারাজ সহস্র মুদ্রা দান করেছিলেন এবং শিক্ষার্থীগণকে পদক দিয়ে পুরস্কৃত করেন রজনীকান্ত সরকার, প্রসন্নময়ী দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী এবং শ্রীমতী এন পি সিংহ। এ সময়ে প্রতিভা দেবী গুরুতররূপে অসুস্থ ছিলেন। বাৎসরিক পুরস্কার-বিতরণী উৎসব আশুতোষ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও কুচবিহারের মহারাণী সুনীতিদেবীর উপস্থিতিতে সম্পাদিত হয়েছিল। সংগীত সংঘের মহিলা বিভাগের তত্ত্বাবধায়িকা ছিলেন প্রতিভা দেবী ব্যতীত ইন্দিরা দেবীচৌধুরানী, হিরন্ময় দেবী, প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী এবং প্রিয়ম্বদা দেবী। তৎকালীন বহু সংগীতপ্রিয় মানুষ সংঘে বিভিন্ন কালে বিভিন্ন প্রকারের দান করেন।
যাঁর সংযোগে ‘সংগীত সংঘ’ ধনী হয়ে উঠেছিল―তিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। প্রথমাবধিই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল-প্রার্থনা করে এসেছিলেন। এর বাৎসরিক অনুষ্ঠানে তিনি একাধিকবার বক্তৃতা দিয়েছেন। ১৩২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ সংগীত সংঘে ‘সঙ্গীতের মুক্তি’ শীর্ষক চমৎকার বক্তৃতা প্রদান করেন। শুরুতে তিনি বলেন― “সংগীত সম্বন্ধে কিছু বলিবার জন্য সংগীত সংঘ হইতে আমাকে অনুরোধ করা হইয়াছে।’ বক্তৃতা আনন্দ সংগীত পত্রিকার ৬ষ্ঠ বর্ষ ১ম সংখ্যা (শ্রাবণ ১৩২৫) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে।
‘সংগীত সংঘ’-ও রবীন্দ্রনাথকে গভীর সম্মানদান করে এর রাখী সম্মেলন উৎসবে ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউটে। ৫ ভাদ্র ১৩২৮ তারিখে এই উদ্দেশ্যে সংঘের উদ্যোগে গানের যে জলসা হয় তাতে রবীন্দ্রনাথ ‘আমাদের সংগীত’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। এটি পরে ভাদ্র ১৩২৮ সংখ্যার ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গক্রমে বলেন―
‘সংগীত সংঘ আমাদের দেশের সংগীতকে দেশের মেয়েদের কণ্ঠে প্রতিষ্ঠিত করবার ভার নিয়েছেন। তাঁদের এই সাধনার গভীর সার্থকতা আছে। আমাদের দুই রকমের খাদ্য আছে, এক প্রয়োজনের, আরেক অপ্রয়োজনের, ― একটি অন্ন, আরেকটি অমৃত। অন্নের ক্ষুধায় আমরা মর্ত্যলোকের সকল জীবজন্তুর সমান, অমৃতের ক্ষুধায় সুরলোকের দেবতাদের দলে। সংগীত হচ্ছে অমৃতের নানা ধারার মধ্যে একটি। দেশকে অন্নের পরিবেষণ ত মেয়েদের হাতেই হয়, আর অমৃতের পরিবেষণও কি তাদের হাতেই নয়?’
রবীন্দ্রনাথকে এদিনে প্রদত্ত অভিনন্দন বাণী পাঠ করেন স্বয়ং প্রতিভা দেবী। পর বৎসরের বার্ষিক উৎসবেও রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু উপস্থিত ছিলেন না প্রতিভা দেবী। ১৭ মার্চ ১৯২২ (৩ চৈত্র ১৩২৮) সংগীত সংঘের শিক্ষার্থিনী ছাত্রীবৃন্দের পারিতোষিক সভায় সভাপতিত্ব করে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘এবারে তাঁহার নিমন্ত্রণ স্বর্গীয় প্রতিভা দেবীর অন্তর হইতে আসিয়াছে”―সেইজন্যেই সভায় সভাপতিত্ব করার আহ্বান তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন নি। তাঁরা একবয়সী এবং বাল্যকালে খেলার সঙ্গী ছিলেন। তিনি আরও বলেন―বাংলা দেশে সংগীত ও সাহিত্য চর্চার প্রতিষ্ঠাত্রীগণের অন্যতমা ছিলেন প্রতিভা দেবী। ১৭ মার্চ ১৯২২ তারিখে সংগীত সংঘের পারিতোষিক সভায়ও তিনি সভাপতিত্ব করেন।
রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত কুন্তলীনখ্যাত এইচ. বসু (হেমেন্দ্রমোহন বসু) সংগীত সংঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ক’রে ‘আনন্দ সংগীত পত্রিকা’ (৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা) লিখেছেন যে, তিনি সংগীত সংঘের একজন উল্লেখযোগ্য পেট্রোন (Patron) ছিলেন। ‘তিনি মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে সংঘের সহকারী সম্পাদকের পদ গ্রহণ করিয়া সংঘের জন্য বিশেষভাবে কার্য করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন।
সংগীত সংঘ প্রযোজিত অভিনয়ের প্রসঙ্গ আমরা পরে আলোচনা করছি। কারণ সে-সব অভিনয়ের কেন্দ্রীভূত প্রাণ ছিলেন প্রতিভা দেবী। একদা সংগীত সংঘ প্রচারের জন্য সংগীত-বিষয়ক পুস্তক প্রকাশেও উদ্যোগী হয়েছিল। প্রফেসর এ. কে. কৌকুভ-রচিত ‘সঙ্গীত-পরিচয়’ পুস্তক এই প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করে নিতান্ত স্বল্পমূল্যে—আট আনায় মাত্র।
স্বামীর সহযোগিতায় এবং পূর্ণ অনুমোদনেই প্রতিভা দেবী আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠান চালান। এতে তাঁর সমস্ত শক্তি ও নৈপুণ্য, অর্থ এবং হৃদয়, ঐশ্বর্য ঔদার্য নিয়োগ করে নিজেই যেন ধন্য হয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরও তাই আশুতোষ চৌধুরী পত্নীর প্রতি নিতান্ত প্রণয়বশত এই প্রতিষ্ঠানকে কিছুকাল জীবিত রেখেছিলেন।
সাত
এবারে আমরা প্রতিভা দেবীর অভিনয় প্রসঙ্গের অবতারণা করে তাঁর জীবনের মূল বক্তব্যের ইতিহাসে যবনিকাপাত ঘটাতে চাইছি। এ-বিষয়ে একটা সমস্যা আমাকে দীর্ঘদিন চিন্তাসঙ্কুল রেখেছে। সে হল প্রতিভা দেবীর জন্ম বৎসর নির্ণয়। এই প্রবন্ধের সূচনায় আমি তাঁর আবির্ভাব কাল সঠিকভাবে দিতে পারি নি। প্রতিভা দেবীর মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল সাতান্ন―এ সংবাদ আমরা একাধিক স্থান থেকে পেয়েছি। বামাবোধিনী পত্রিকা মাঘ ১৩২৮ সংখ্যায় প্রতিভা দেবী সম্পর্কে লিখেছিলেন― ‘মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স সাতান্ন বৎসর হইয়াছিল।’ প্রতিভা দেবীর মৃত্যুদিবস ২৩ পৌষ ১৩২৮, ৭ জানুয়ারি শনিবার রাত্রি ৪টা ৩০মিনিট। বামাবোধিনী মৃত্যু তারিখ ৮ জানুয়ারি লিখেছিলেন সম্ভবত রাত্রি ৪.৩০টায় মৃত্যু হয়েছিল। যাই হোক এই হিসাবে ১৩২৮-৫৭=১২৭১ বঙ্গাব্দ (=১৮৬৪ বা ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ) জন্মতারিখ হয়। ‘আনন্দসংগীত পত্রিকা’-ও (বৈশাখ ১৩২৯ সংখ্যা ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা) স্বর্গীয় প্রতিভা দেবী’ শীর্ষক স্মরণ-রচনায় মৃত্যুকালীন বয়স ৫৭ বলে উল্লেখ করেছেন। এই প্রবন্ধে আরও উল্লিখিত আছে যে তিনি ১২ বছর বয়সে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় প্রথম অভিনয় করেন। সাধারণী পত্রিকা ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র প্রথম অভিনয়ের পরেই ১৭ই ফাল্গুন ১২৮৭ (২৭ ফ্রেব্রুয়ারি ১৮৮১)’ সংখ্যাতেও তাঁকে ‘দ্বাদশবর্ষীয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। বারো বছর বয়সে অভিনয় করলে অভিনয় সাল দাঁড়ায় ১২৭১+১২=১২৮৩ বঙ্গাব্দ। এই বঙ্গাব্দে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ রচিতই হয় নি। ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’ উপলক্ষে রচিত ও অভিনীত বাল্মীকি প্রতিভা প্রথম প্রকাশিত হয় ফাল্গুন ১৮০২ শক অর্থাৎ ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে (=১২৮৮ বঙ্গাব্দ)। কাজেই হয় মৃত্যুর বয়স অথবা অভিনয়ের বয়স উল্লেখে একটা গলদ রয়ে গেছে। প্রধানত এ কারণেই জন্মসন নিরূপণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এই সংশয়ের নিরসন কিছুটা ঘটেছে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রজীবনী’র প্রথম খণ্ডে। সেখানে তিনি প্রতিভা দেবীর জন্মবৎসর ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ধরেছেন (৫৭ বছরে মৃত্যু হলে মৃত্যু ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে―এই হিসাব পরিচ্ছন্ন) এবং বাল্মীকি প্রতিভার প্রথম অভিনয়ের বয়স ধরেছেন পনেরো। এই হিসাবই সঙ্গত মনে হয়। ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পুণ্য’ পত্রিকায় লিখেছেন হেমেন্দ্রনাথের বিবাহের দু’বছর পরে প্রতিভার জন্ম। হেমেন্দ্রনাথের বিবাহ ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে হলে এই হিসাব ঠিক দাঁড়ায়।
যাই হোক হেমেন্দ্রনাথের অনুমতিক্রমে তাঁর কন্যা প্রতিভা ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র প্রথম অভিনয়ে অংশ গ্রহণ করেন। ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’ সভার ষষ্ঠ বার্ষিক অধিবেশনে “তেতলার ছাদের উপর পাল খাটাইয়া নাক বাঁধিয়া ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ অভিনয় হইল।” রবীন্দ্রনাথ সাজলেন বাল্মীকি এবং ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা সাজলেন সরস্বতী। ‘বাল্মীকি-প্রতিভা নামের মধ্যে সেই ইতিহাসটুকু রহিয়াছে।’ রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি থেকে বোঝা যায় প্রতিভা দেবী সরস্বতীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এবং অন্য অনেকেই লিখেছেন প্রতিভা দেবী অভিনয় করেছিলেন ‘বালিকা’র ভূমিকায়। বস্তুতপক্ষে রাজকৃষ্ণ রায়ই যথার্থ ইতিহাস তুলে ধরেছেন― ‘…..শ্রীযুক্তবাবু হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রতিভা’ নাম্নী কন্যা প্রথমে বালিকা, পরে সরস্বতী মূর্তিতে অপূর্ব অভিনয় করিয়াছিলেন।’ (আর্যদর্শন বৈশাখ ১২৮৮ এপ্রিল ১৮৮১―৭ম ভাগ ১ম সংখ্যা― ‘বালিকা-প্রতিভা’ (গীতি) দ্রষ্টব্য)। রাজকৃষ্ণ রায়ই প্রথম আমাদের অভিনয়ের সঠিক তারিখ জানিয়াছিলেন―১৬ ফাল্গুন ১২৮৭ শনিবার। অবশ্য দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে প্রচারিত ‘আমন্ত্রণ-পত্রেও এই তারিখ ‘১৬ ফাল্গুন শনিবার সন্ধ্যা ৭.৩০ ঘটিকার সময়’―উল্লিখিত হয়েছিল। প্রতিভা দেবীর অভিনয়ে মুগ্ধ রাজকৃষ্ণ রায় ‘বালিকা-প্রতিভা’ নামক দীর্ঘ কবিতায় প্রতিভা দেবীর অভিনয় নৈপুণ্যের নানা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লেখেন―
সরলতা, মধুরতা তরলতা, কোমলতা
একসঙ্গে মিশাইয়া কে ছড়ালে ওর গায়,
বিস্মিত করিতে বিশ্ব কে নির্মিল হেন দৃশ্য,
এ মূর্তি প্রতিভাময়ী—ভরপুর প্রতিভায়।
অপূর্ব তার বেশভূষা―
পরণে গেরুয়া বাস, আলুথালু কেশ-পাশ
কি এক অপূর্ব প্রভা উথলে ও বরাননে।
অলঙ্কার বলে কারে, ও বালিকা জানে না রে,
প্রকৃতির অলঙ্কার অলঙ্কৃত অযতনে।
আর কণ্ঠস্বরও তদ্রূপ অনুপমঃ ―
বীণা আর পিকবর তুলি’ নিজ নিজস্বর
রাখিয়াছে গলে ওর, শ্রবণের সুখকর।
সাধারণী পত্রিকাও প্রতিভা দেবীর অভিনয় দক্ষতার উল্লেখ করে লেখেন―শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং বাল্মীকি হন আর ‘প্রতিভা’ নাম্নী প্রতিভা-সম্পন্না তাঁহার দ্বাদশবর্ষীয়া ভ্রাতুষ্কন্যা বাগদেবীরূপে অভিনয় করেন। বঙ্গ কুলকুমারী কর্তৃক রঙ্গ-বেদী এই প্রথম উজ্জ্বলীকৃত হইল। বঙ্গ-রঙ্গভূমির নব কলেবরের এই অভিষেক ক্রিয়ার প্রতিভা উপযুক্ত অধিষ্ঠাত্রী দেবী বটেন। তিনি সুকণ্ঠা, গীতিনিপুণা, সতেজ-নয়না এবং ধীর-পদবিক্ষেপ কারিণী। তাহার গীতাভিনয়ে দর্শকবৃন্দের অনেকে বিস্মিত এবং প্রীত হইয়াছিলেন।” দর্শকবৃন্দের মধ্যে ছিলেন বৃদ্ধ রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্যারীমোহন মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়, লাহোরের ট্রিবিউন পত্রিকার শীতলপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিহারীলাল গুপ্ত, তারকনাথ পালিত, ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী, শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রসায়নচার্য কানাইলাল দে বাহাদুর, মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন, কৃষ্ণবিহারী সেন, চক্ষুচিকিৎসক লালমাধব মুখোপাধ্যায়, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাজকৃষ্ণ রায় প্রমুখ তৎকালীন বিদ্বজ্জনেরা। এঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অভিনয় দেখে খুশী হয়েছিলেন এবং গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি-প্রশস্তি লিখেছিলেন কবিতায়। ‘প্রতিভা’র কথা এঁরা কেউ লেখেননি যদিও। অবশ্য গৌণভাবে তারিফ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী তাঁর ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’ গ্রন্থে বেশ মজা করেই লিখেছেন― ‘জ্যাঠামশায়ের একটু অভ্যাস ছিল হঠাৎ হঠাৎ ‘এই যে অমূক সাহেব’ বলে স্নেহভাজনদের পিঠ থাবড়ে দেওয়া। প্রথম বাল্মীকি প্রতিভার অভিনয়ের পরে প্রতিভা দেবী সরস্বতী সেজে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাঁর পিঠ থাবড়ে ‘এই যে সরস্বতী সাহেব’ বললেন! আমি সেখানে উপস্থিত।’
প্রথম অভিনয়ের দিনে উপস্থিত ইন্দিরাদেবী চৌধুরানী আরও একটি সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন ঐ দিনে লক্ষ্মীর ভূমিকায় ‘বোধ হয় সুশীলা দিদি’ অভিনয় করেছিলেন। সুশীলা হলেন মহর্ষিকন্যা শরৎকুমারীর জ্যেষ্ঠা কন্যা সুশীলা। অথচ ‘আনন্দসংগীত’ পত্রিকা তাঁর প্রাগুক্ত ‘ঁপ্রতিভা দেবী’ প্রবন্ধে লিখেছেন অভিনয় করেছিলেন ‘কনিষ্ঠা ভগিনী অভিজ্ঞা।’ অভিজ্ঞার পক্ষে অভিনয় করা অসম্ভব ছিল না কারণ ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর তারিখে অভিনীত ‘কালমৃগয়া’য় তিনি বনদেবীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘প্রিয় ছাত্রী’ অভিজ্ঞা বাল্মীকি প্রতিভার অন্য অভিনয়েও অংশগ্রহণ করেন। তবে ইন্দিরাদেবী স্বচক্ষে দেখেছেন, আনন্দসংগীতের প্রতিবেদক ‘রেঃ মোঃ হাঃ’ দেখেছেন কিনা জানি না। ‘বোধহয়’ শব্দটির জন্যই আমাদের এতো কথা ভাবতে হল। রাজকৃষ্ণ রায় যদি ‘লক্ষ্মী’র ভূমিকা সম্পর্কেও অন্তত দু’এক লাইন লিখে যেতেন!
‘বাল্মীকি প্রতিভা’ আরও বহুবার অভিনীত হয়েছে। প্রতিবারই সরস্বতীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রতিভা ১৮৯২ পর্যন্ত। এর দ্বিতীয় অভিনয়েও ‘সরস্বতীর আবির্ভাব ও সেতার বাদ্য দর্শকদিগকে মুগ্ধ করিয়াছিল।’ আরেকদিনের অভিনয় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ঘরোয়ায় চমৎকার করে বর্ণনা করেছেন― “লক্ষ্মী সেজে বিধি যখন লাল আলোতে স্টেজে ঢুকত, আহা সে যে কি সুন্দর দেখাত। সরস্বতীর বেলায় থাকত সব সাদা-সাদা সোলার পদ্মফুলের মধ্যে শুভ্রসাজে প্রতিভাদিদি যখন বীণা হাতে বসে থাকতেন প্রথমে সবাই ভেবেছিল মাটির প্রতিমা। সেও যে কী শোভা কী বলব তোমাকে। অস্ট্রিচের ডিমের খোলা দিয়ে শখ করে এক ছোটো সেতার বানিয়েছিলুম, সেটা রূপোলী রাংতা দিয়ে মুড়ে বীণা তৈরি হয়েছিল। আমার সেই সেতার ওই করে করেই গেল। তা সেই বীণা হাতে নিয়ে প্রতিভাদিদি বসে থাকতেন, শেষটায় উঠে রবিকাকার হাতে বীণা দিয়ে বলতেন,
এই নে আমার বীণা, দিনু তোরে উপহার,
যে গান গাহিতে সাধ, ধ্বনিবে ইহার তার।
সে কথা সত্যি সত্যিই ফলল ওঁর জীবনে।’
প্রথম দিনের অভিনয়ের গেরুয়া পোষাক এখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে শ্বেতাম্বরে। একদিনের দর্শক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও লিখেছেন এই অভিনয়ের কথা। শেষ দৃশ্যের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন― “এইবার শেষ দৃশ্য―বিদ্যার সমাদর―প্রিয়তম বরপুত্রকে বর দিতে সরস্বতীর পটভূমিকায় আবির্ভাব! দেবী সর্বশুক্লা―শুক্লবর্ণা―শুক্লবাস―শুরু পদ্মে সমাসীনা―শুক্ল হস্তে তুষার―শুভ্র শুক্ল বীণা―সর্বাঙ্গ শুক্ল পরিচ্ছদে সমাবৃত―কেবল বীণার তারে সংলগ্ন বাঁ হাতের বাঁকা আঙুলগুলি অবধি কনুই পর্যন্ত সুস্পষ্ট ছিল―যেন ভুজাকার কোঁদা তুষার দণ্ড, ―ডান হাত বীণার অন্তরালে―তত সুস্পষ্ট নয়। দূরে ছিলাম―বোধ হল, যেন মৃন্ময়ী প্রতিমা। অনির্বচনীয় শোভা। সরস্বতী পদ্মাসন থেকে উঠলেন, হাতে বীণা বাল্মীকির হাতে দিলেন, বললেন, ―
আমি বীণাপাণি, তোরে এসেছি, শিখাতে গান,
তোর গানে গলে য়াবে সহস্র পাষাণ প্রাণ।
―এই অভিনয়েই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সম্ভবত শেষ অভিনয় নয়।
অবশ্য তা বলে এটিই বাল্মীকি প্রতিভার শেষ অভিনয় নয়। রবীন্দ্রনাথ বিলেত যাবেন বলে সব ঠিক। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ২৪এ মার্চ যাবার দিন স্থির হয়েছে। আগের দিন তেইশ তারিখে আশুতোষ চৌধুরী নিমন্ত্রণ করেছেন রবীন্দ্রনাথকে। আর সেই নিমন্ত্রণ উপলক্ষ্যে ব্যবস্থা করেছেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ অভিনয়ের। দিনেন্দ্রনাথ অভিনয় করলেন এবার বাল্মীকির ভূমিকায়। অশোকা দেবী অভিনয় করলেন প্রতিভা দেবীর সরস্বতীর ভূমিকা। লক্ষ্মী চরিত্রে অবতীর্ণা হলেন শোভনা দেবী। অভিনয় হল―তবে পরদিন কবির যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। এই নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যাপারে প্রতিভা দেবীই যে অগ্রনী ছিলেন, সেকথা উল্লেখের বিশেষ প্রয়োজন কোথায়?
এমনি আরও একবার এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাল্মীকি-প্রতিভার প্রযোজনা করলেন প্রতিভা দেবী ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম মহাযুদ্ধের সাহায্যার্থে। একালে বিশিষ্ট অতিথির সম্মুখে সংগীত সংঘের উদ্যোগে অভিনীত এই অভিনয়ের বিষয়ে ‘আনন্দ-সংগীত পত্রিকা’ উল্লেখ করে লিখেছেন (২য় বর্ষ ৫ম সংখ্যা) ― “থিয়েটার রয়ালে” ‘বাল্মীকি প্রতিভা’―বিগত ৮ই ডিসেম্বর মঙ্গলবার চৌরঙ্গীস্থিত ‘থিয়েটার রয়াল’ ভবনে বাল্মীকির প্রতিভা অভিনয় হয়। সংগীত সংঘের ছাত্র, ছাত্রী ও সভ্যগন মিলিয়া অভিনয় করিয়াছিলেন রঙ্গালয়ে যতলোকের স্থান হইতে পারে ততগুলি মাত্র টিকিট বিক্রয় করা হইয়াছিল। …..লেডি কারমাইকেলের অনুরোধানুসারে সংগীতসংঘের সম্পাদিকার প্রযত্নে এই অভিনয় কার্য সম্পাদিত হয়। ….টিকিট বিক্রয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা সংগৃহীত হইয়াছিল। খরচ খরচা বাদ ৩৫২৩ টাকা দুই আনা বর্তমান ইউরোপীয় যুদ্ধে Relief Fund-এ প্রেরিত হইয়াছে।…….” ―এই অভিনয় উপলক্ষে এক বাল্মীকি প্রতিভা পুস্তিকা অবনীন্দ্রনাথ অঙ্কিত চিত্রে সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিভা দেবীর চিরাভিনীত সরস্বতী চরিত্রে এবার অভিনয় করেছিলেন শ্রীমতী অরুণা বেজবরুয়া। এটিই সম্ভবত প্রতিভা দেবীর প্রত্যক্ষ পরিচালনায় বাল্মীকি প্রতিভার শেষ অভিনয়।
উদার ও দানশীলা, বিচিত্রগুণসম্পন্না, পতিপরায়ণা প্রতিভা দেবীর মধ্যে বয়সে বাংলার সংস্কৃতি জগৎ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন কাল হৃদরোগের আক্রমণে। ফলে বাংলার সংগীতজগত অবশ্যই দরিদ্র হয়ে পড়েছিল। এই ‘রূপলাবণ্যবতী বিদুষী ও কলানিপুণা’ পত্নী স্বামী এবং চারপুত্র ও একটি কন্যাকে রেখে বিদায় নিলেন ইহজগৎ থেকে। যোগীন্দ্রনাথ শিরোমণির পৌরোহিত্যে ও চিন্তামণি চট্টোপাধ্যায় এবং সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোজনায় তাঁর শ্রাদ্ধ ব্রাহ্ম পদ্ধতি অনুসারে নিষ্পন্ন হল। ভবসিন্ধু দত্ত শ্রাদ্ধবাসরে গাইলেন সময়োচিত গান। কথকতায় শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন কথক হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কবিরত্ন। ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় শ্রদ্ধাকবিতা রচনা করলেন প্রসন্নময়ী দেবী জ্যেষ্ঠ ননন্দা―
এসেছিলে আমাদের ঘরে
চলে গেছ অন্ধকার করে,
কমলা-রূপিণী বধূ
কণ্ঠভরা গীত মধু।
সুষমায় আলোকিয়া গেহ;
কি আনন্দ উৎসবে
প্রথম আসিলে যবে,
সে কথা ভুলিতে নারে কেহ।……
প্রিয়ম্বদা দেবী লিখলেন “স্মরণ’―
তুমি গেছ বিস্মৃতির তীরে
স্মৃতি আর নয়নের নীরে
মোরা আজ রচিতেছি নূতন করিয়া
তোমার প্রতিমাখানি অন্তর ভরিয়া।…..
ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী ‘ভৈরবী ঝাঁপতালে’ নিবদ্ধ সুরে রচিত সংগীতে (সুর ও স্বরলিপি—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর) শপথ নিলেন―
সৌম্যমূর্তি নেত্রপথে যদি অদর্শনে,
স্মৃতিপট সদা তারে করিব রক্ষণ,
―যে বৃক্ষ রোপিলে তুমি―করিব সেচন।।
‘বাল্মীকি-প্রতিভা’র শততম উৎসব উপলক্ষে সেই স্মৃতিরক্ষণ কর্ম আমরাও সম্পাদনা করে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ গ্রহণ করে কৃতার্থ হয়েছি।।’