| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

জাকির তালুকদার-এর ছোটগল্প ‘প্রেম এবং একজন মানসিক রোগীর গল্প’

Reporter
জাকির তালুকদার / ৪২০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০২২

দুনিয়াজুড়ে ব্যবসা করে বেড়ানো পার্ক যে এতটা অবাক আর হতবাক হতে পারে, তা সে নিজেই জানত না। নিজের কানে শোনা কথাগুলো এখনো তার কাছে ঠিকমতো অনুবাদ হয়ে পৌঁছায়নি মনে হয়। তাই নিজের অজান্তেই তার দুই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে আবার বেরিয়ে আসে প্রশ্নটা-হোয়াট?

পার্ককে বিমূঢ় হতে দেখে সামনে বসা বিলকিস সুলতানার একটুও ভাবান্তর হয় না। সে যেন জানতই যে এমনটা হবে পার্কের প্রতিক্রিয়া। সে নিচু নিষ্কম্প কণ্ঠে বলে-আই অ্যাম ক্যারিং। আমি কনসিভ করেছি। আমার গর্ভে তোমার বেবি এসেছে।

পার্ক ইংরেজি বলতে পারে কোরিয়ান উচ্চারণে। বাংলাও পারে। ইন্দোনেশিয়ায়ও ব্যবসা আছে। সেখানকার ভাষাও ভালোই জানে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সব ভাষাই ভুলে গেছে সে। এমনকি মাতৃভাষাটাও। তবু কোনোমতে বলতে পারে-আমরা তো প্রটেকশন নিয়েছিলাম!

এবার এই পরিস্থিতিতেও কটাক্ষ হেনে মৃদু হাসে বিলকিস। বলে-ইস! বললেই হলো। তুমি তো ক্যাপ পরতে চাও না। বলো যে ভালো লাগে না। ক্যাপ ছাড়াই তো চলছে কত দিন ধরে।

বাট? তুমি তো পোস্ট-কয়টাল পিল খাও।

খাই। তুমি যখন দাও, তখন খাই। কিন্তু সেটা নাকি নিয়মিত খাওয়ার নয়। তাই মাঝেমধ্যে বাদ পড়ে গেছে।

তাহলে?

কী তাহলে?

এখন কী করতে হবে?

তুমিই বলো।

অ্যাবরশন।

মুহূর্তে চোখ উপছে সামুদ্রিক জোয়ারের মতো জলের স্রোত বইতে থাকে বিলকিসের। এ রকম বিনা নোটিশে মুহূর্তের মধ্যে কাউকে সম্ভবত জীবনেও এভাবে কাঁদতে দেখেনি পার্ক। সে উঠে আসে নিজের চেয়ার ছেড়ে। বিলকিসের কাছে এসে জড়িয়ে ধরে তাকে। পার্কের স্পর্শ পেয়ে এবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বিলকিস। ভালোবাসার টানে সে-ও কিছু কিছু কোরিয়ান শব্দ শিখেছে। সেগুলোর সঙ্গে নিজের ভাষা মিশিয়ে ফোঁপানির ফাঁকে ফাঁকে যা বলে, তার সারমর্ম হচ্ছে-একটা শিশু ঈশ্বরের বাগানের দেবদূত। মানব-মানবীর পরম চাওয়ার ফসল। বিলকিস সুলতানার হৃদয় ভেঙে যাবে ভ্রুণ হত্যা করলে। নিজেকে সে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারবে না।

—তাহলে?

বিমূঢ় পার্কের প্রশ্ন।

উত্তরটা যেন অনেক আগেই তৈরি করা ছিল বিলকিসের মনে। পার্কের প্রশ্নটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বলে-ম্যারি মি জান! ম্যারি মি সোনাবাবু!

তা কিভাবে সম্ভব?

পার্কের তো দেশে বউ-ছেলে-মেয়ে আছে। সেখানকার আইন অনেক বেশি কড়া। প্রথম স্ত্রী ডিভোর্স না দিলে দ্বিতীয় বিবাহ প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।

এবার শক্ত হয়ে ওঠে বিলকিসের শরীর। পরিষ্কার কণ্ঠে বলে-আমি আমার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট হতে দেব না। তার পিতার পরিচয়ও হারাতে দেব না।

ওকে ওকে! লেত মি থিংক। তুমি এখন ফ্ল্যাতে যাও। আমি একটা রাস্তা বের করব। আই প্রমিজ।

দুই

বিদেশি পুঁজির জামাই আদর এই দেশে। সেই রকম জামাই আদরেই অভ্যস্ত পার্ক। বাংলাদেশের যেখানেই যায়, সেখানেই সে ভিআইপি। আর এ দেশের মানুষ বিদেশি দেখলেই ভক্তিতে গদগদ হয়ে ওঠে। বিদেশি মানেই যেন উন্নত মানুষ। তাদের চেয়ে উঁচুদরের মানুষ। এই রকম ভক্তি-শ্রদ্ধা পাওয়া যায় সব জায়গায়। পার্ক তবু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় বাইরে থাকে না। বাঙালিদের ক্লাব বা বাঙালি মিলিওনিয়ারদের সঙ্গে চলা-ফেরা, বাঙালি উঁচু সোসাইটিতে ওঠা-বসা-এসব কোনোটায়ই বেশি আগ্রহী নয় পার্ক। এমনকি অন্য কোরিয়ান যারা এই চট্টগ্রাম শহরেই থাকে, তাদের সঙ্গে মাসে একবারের বেশি গেট টুগেদারে যায় না সে। নিজের ফ্যাক্টরি, হিসাবপত্র, নিজের সুন্দর কোয়ার্টার নিয়েই নিজের মতো করে থাকে সে। মদটদ যা খায়, একাই। আর মেয়েমানুষ তো অবশ্যই চাই। চট্টগ্রাম শত শত বছর ধরেই বন্দর। পোর্ট সিটি। নাবিকরা কোনো বন্দরে জাহাজ ভেড়ালে নেমে প্রথমেই যেখানে যায়, সেটা হচ্ছে ব্রোথেল। অথচ প্রথম এখানে এসে খুব অবাক হয়ে পার্ক জেনেছিল যে চট্টগ্রামে কোনো রেজিস্টার্ড ব্রোথেল নেই। হাউ স্ট্রেঞ্জ! কী, না মুসলিম কান্ট্রি। তার বদলে গলিতে গলিতে মসজিদ। কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য জানা গেল যে পতিতালয় না থাকলেও হাজার হাজার মেয়ে আছে এই লাইনে। ভ্যারাইটিও কম নয়। বাঙালিদের মধ্যে মুসলমান, হিন্দু ছাড়াও আছে বৌদ্ধ বড়ুয়া, মার্মা, চাকমা, ত্রিপুরাসহ কত জাতির মেয়ে! থ্রি স্টার আর ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে ডেরা বেঁধে আছে ইন্ডিয়া, চায়না আর ইস্ট ইউরোপ থেকে আসা মেয়েরা। কাজেই নারী শরীরের কোনো ঘাটতি পড়েনি কোনো দিন। এত সস্তায় এই মুসলিম দেশে এত সুন্দর সুন্দর সুদেহি মেয়ে পাওয়া যায়! খুবই সস্তা। কেউ কেউ প্রফেশনাল। অনেক বছর আছে এই লাইনে। কিন্তু খুব সফিস্টিকেটেড। কোনো কোনো সময় তো ভার্সিটিগার্লও পাওয়া যায়। খুবই সস্তা। ডলারে কনভার্ট করলে ব্যাংককের চেয়েও অনেক সস্তা। কাজেই পার্কের কোনো অভাববোধ ছিল না। বাড়ির আয়া-দারোয়ান-বাবুর্চি নিয়েই তার দিব্যি কেটে যাচ্ছিল দিন।

এ সময় একদিন এলো বিলকিস সুলতানা। তারই এক এ দেশি ক্লার্ক আছে ইউনুস আলী। সেই ইউনুস আলীর বোন। ইউনুস আলীই সঙ্গে নিয়ে এসেছিল বোনকে। বিএ পাস করে বসে আছে। চাকরি দরকার। স্যার যদি একটা চাকরি দেন।

মেয়েটার দিকে একনজর তাকিয়েই গা শিরশির করে উঠেছিল পার্কের। না, জিন্স পরে আছে বলে নয়। বাংলাদেশে জিন্স-টি শার্ট পরা মেয়ে এখন অনেকই দেখা যায়। কিন্তু মেয়েটার মধ্যে অন্য কিছু একটা আছে। সম্পূর্ণ অবয়ব, সম্পূর্ণ শরীরি ভাষাই আলাদা। এক লহমায় বুঝে ফেলে পার্ক-এ মেয়ে নিছক চাকরির জন্য এখানে আসেনি। ছোটখাটো নিরীহ চেহারার ইউনুস আলীর বোন এই মেয়ে, তা ভাবাই মুশকিল। ভাইয়ের সঙ্গে এসেছে। কিন্তু সব অবয়বে যৌনতা ফুটিয়ে তুলে রাখতে বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। চোখে আমন্ত্রণের সঙ্গে একটা চ্যালেঞ্জও। তাৎক্ষণিকভাবে পার্কও গ্রহণ করে চ্যালেঞ্জটা। ইউনুস আলীর দিকে তাকিয়ে বলে-এইচ আর ডিপার্তমেন্তে বলো, সি ইজ নাউ আওয়ার গার্ল।

কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে ইউনুস আলী। ওকে স্যার! থ্যাংক ইউ স্যার! ইউ আর গ্রেট স্যার! গড ব্লেস ইউ স্যার!

আর মেয়েটা, বিলকিস সুলতানা, ভাইয়ের পেছন পেছন বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার তার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসে। চাপা খসখসে কণ্ঠে বলে-ইউ আর ভেরি স্মার্টম্যান।

সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে পার্ক। দেরি করা কেন? সে ইউনুসকে লক্ষ্য করে বলে- আমাদের নিউ পারসনের অনারে আজ আমার ভিলায় ডিনার। কাম বোথ।

ধন্য হয়ে সঙ্গে সঙ্গে যেন মাটিতে শুয়ে পড়ে ইউনুস আলী-ইওর গ্রেটনেস স্যার!

রাত ৮টার আগেই চলে এসেছিল ভাইবোন পার্কের ভিলায়। ইউনুস আলী খুব বুঝদার। সে এককাপ ওয়েলকাম কফি শেষ করেই উঠে পড়েছিল-অফিসের অনেক পেন্ডিং কাজ পড়ে আছে। সেগুলো শেষ না করলে কম্পানির অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আর জীবন থাকতে কম্পানির কোনো ক্ষতি হতে দেবে না ইউনুস আলী। তাই সে এখন রাতের লোভনীয় ডিনার আর মহান স্যারের মহার্ঘ্য সঙ্গ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বিলকিস সুলতানা থাকছে। সে খাওয়াদাওয়া-গল্পগুজব সেরে ফোন করলেই ইউনুস আলী এসে তাকে নিয়ে যাবে।

তারপর। ডিনারের আগেই তারা একবার বেডরুমে।

রাত ১১টার দিকে বোনের মোবাইলে একবার রিং দিয়েছিল ইউনুস আলী। ফোন রিসিভ করেনি বিলকিস। সময় ছিল না। সারা রাত পার্ক বা বিলকিস, দুজনের কারোরই সময় ছিল না অন্য কোনো দিকে মন দেওয়ার।

তার পরের ছয় মাসে বিলকিসকে ছাড়া এক রাতও চলেনি পার্কের। আর বিলকিসের ভাষায়, পার্ককে শরীর-পূজার অর্ঘ্য না করলে একদিনও বাঁচতে পারে না সে। পার্ক এই ছয় মাসে এক রাতের জন্যও কাছছাড়া করেনি বিলকিসকে। ঢাকায় গেলে সঙ্গে নিয়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়ায় গেলেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। কোনো কোরিয়ান ব্যবসায়ী জীবনেও যা করার কথা ভাবতেও পারবে না, তেমন কাজও করেছে পার্ক। অফিসে না গিয়ে সারা দিন কাটিয়েছে বিলকিসের সঙ্গে। অনেক জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করেছে। দেখিয়েছে শরীর খারাপের অজুহাত। ইউনুস আলী উৎসাহ জুগিয়েছে-শরীর তো আগে স্যার। শরীর না থাকলে কিছুই নাই। আপনি রেস্ট করুন স্যার। আমরা সামলে নেব। নইলে আমরা আছি কী করতে!

এবার এখন কী করবে পার্ক?

বিলকিস সুলতানার এক কথা-বিয়ে করতে হবে। আবার চেহারা পাল্টে গেছে কেরানি ইউনুস আলীরও। আমার ফ্যামিলির কাছে কী করে মুখ দেখাব আমি! অনেক দূরের নর্থ বেঙ্গলে বাড়ি আমাদের। আমার মা আর ভাইবোনরা আমার ওপর ট্রাস্ট করে বিলকিসকে পাঠিয়েছে এত দূরে চাকরি করতে। আর আমি স্যার ট্রাস্ট করেছিলাম আপনাকে। বিনিময়ে এই পেলাম স্যার!

তারপর এটা হচ্ছে মুসলিম কান্ট্রি। এখানে ব্যভিচারের সোশ্যাল পানিশমেন্ট তো লিগ্যাল পানিশমেন্টের চেয়ে অনেক বেশি। সৌদি আরব হলে তো দুজনকে কোমর পর্যন্ত গর্তে পুঁতে পাথর ছুড়ে ছুড়ে হত্যা করা হতো। বাংলাদেশে সেটা করা হয় না বটে, কিন্তু সোসাইটি মেয়েটাকে সেই রকমই ঘৃণার পাথর ছুড়ে ছুড়ে একটু একটু করে হত্যা করতে থাকে সারা জীবন ধরে।

একমাত্র উপায় বিয়ে।

কিন্তু বিয়ে করতে হলে মুসলমান হতে হবে পার্ককে। এতে কিছুতেই রাজি নয় সে।

অনেক ঘণ্টার আলোচনা, অনেক কান্নাকাটি, অনেক রাগারাগি, অনেক হুমকি-ধামকির পরে অবশেষে সমঝোতা হয়। পার্ক তার সন্তানের দায়িত্ব নেবে। সন্তানকে নিয়ে যাবে কোরিয়ায়। তবে সন্তানের জন্ম হবে ইন্দোনেশিয়ায়। সন্তান হবে কোরিয়ান। তার ওপর মায়ের কোনো দাবি থাকবে না। বিনিময়ে পার্ক তার চট্টগ্রামের ব্যবসা আর জাকার্তার ব্যবসা লিখে দেবে বিলকিস সুলতানার নামে। আর সেই ব্যবসাপাতির চিরস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক ইউনুস আলী।

তিন

বাড়িটার অবস্থান ভারি সুন্দর জায়গায়। সামনে দিয়ে লালসাগর দিঘি, পেছনে চৌকির দিঘি। সারা বছর বাড়ি ফুঁড়ে ঝিরঝির বাতাস এপার থেকে ওপার, ওপার থেকে এপার যাতায়াত করে। তার পরও বিলকিসের ঘরে খুব দামি এসি লাগানো হয়েছে। গরমের দিনে তো বটেই, শীতের রাতেও যেন সে কষ্ট না পায়, তার জন্য এসি টিউনিং করা আছে নিখুঁতভাবে।

ইউনুস আলী যে কী পরিমাণ করিৎকর্মা লোক, কেউ তা আগে বুঝতে পারেনি। এক বছরের মধ্যে সে পার্কের ইন্দোনেশিয়া আর চট্টগ্রামের ব্যবসা নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছে। তবে পার্কের মতো সে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নয়, ইন্দোনেশিয়াকেন্দ্রিক। চোখ টাটানো বাঙালিদের কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। এই এক বছরের মধ্যে সে ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ বুঝে নিয়েছে, সেটাকে সচল রেখেছে। বেশির ভাগ সময় ইন্দোনেশিয়ায় কাটালেও উত্তরবঙ্গে নিজেদের ছোট্ট শহরে বাড়িটা তৈরি করেছে মনের মতো। পাড়াপড়শিও একটু অবাক হয়েই দেখেছে এক বছরের মধ্যে ইউনুসদের খলপাঘেরা বাড়ি সুন্দর দোতলা দালানে পরিণত হতে। চলাফেরার ঢং পুরো আলাদা হয়ে গেছে বাড়ির মানুষের। কিন্তু বিলকিস সুলতানাকে কেউ বাইরে বেরোতে দেখে না। নিজের ঘর ছেড়ে বেরই হয় না বিলকিস। ইন্দোনেশিয়া থেকে পুত্রসন্তান প্রসব করে ফেরার পরে সে কারো সঙ্গে তেমন কথা বলে না। ঘরের মধ্যে একা একা বসে থাকে। মনোরোগের বড় ডাক্তাররা তাকে দেখে আর ডিপ্রেশনের ওষুধ দেয়। সেসব ওষুধ খেয়ে বিলকিস সুলতানার ডিপ্রেশন তো কমেই না, উল্টো নেশা হয়, পাগল পাগল লাগে।

এ রকম মানসিক রোগীর হাতে তো এত বড় ব্যবসা ছেড়ে দেওয়া যায় না। ইউনুস আলী তত্ত্বাবধায়ক তো আছেই। এর পরও উকিল লাগিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি পুরোটাই নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। সই করার সময় বিলকিস সুলতানা বিড়বিড় করে বলেছিল-সব কিছু আমার। সব আমার!

আহা তোরই তো। আমি তো খালি দেখভাল করার জন্য। তুই সুস্থ হলেই দায়িত্ব বুঝে নিতে পারবি।

বিলকিস সুলতানা ঘর ছেড়ে বের হয় না। সব সময় মাথার যন্ত্রণা নিয়ে শুয়ে থাকে। বাড়ির অন্য সদস্যদের পাখি পড়ার মতো শিখিয়ে দিয়েছে ইউনুস, বিলকিসকে যেন কোনো কাজে বাধা দেওয়া না হয়। শুধু একা তাকে বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। আর ওষুধগুলো যেন সে ঠিকমতো খায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এক বছর বিলকিস সুলতানার মুখ পাড়াপড়শিও দেখতে পায় না। তারা এই বাড়ি নিয়ে এমনিতেই একটু হতভম্ব। মাঝেমধ্যে হঠাৎ রাতের বেলায় বিলকিস সুলতানার খনখনে গলার চিৎকার শুনতে পায়-সব আমার! সব আমার! এই আওয়াজ শুনে পড়শিরা আরো বেশি হতভম্ব হয়। কেউ কেউ আগবাড়িয়ে বিলকিস সুলতানার মাকে পরামর্শ দিতে আসে-জিন-ভূতের আছর হতে পারে। তারা ওঝার ঠিকানা দেয়। বিলকিস সুলতানার মা খুব সুন্দরভাবে বলে যে এইবার ইউনুস দেশে এলে অবশ্যই ওঝা ডাকানো হবে।

ইউনুস এই বাড়িতে প্রায় অভিভাবক বানিয়ে গেছে তার সবচেয়ে চালাক-চতুর ভাতিজিকে। মেয়েরাই এই বাড়ির লক্ষ্মী। তার অন্য ভাই-ভাতিজারা সবাই অকম্মা। সেই চালাক ভাতিজির কাছে মোবাইলে জাকার্তা থেকে ইউনুস জানতে চায়-পাগলিডার খবর কী?

চালাক-চতুর ভাতিজি উত্তর দেয়-বাড়তিছে পাগলামি। মাঝেমধ্যে কমেও যায়। পুরা পাগল হয়নি।

আচ্ছা। খেয়াল রাখিস।

এই সময় হঠাৎ একদিন কোরিয়া থেকে কুরিয়ার সার্ভিসে বিলকিস সুলতানার নামে একটা প্যাকেট আসে। সেটা অন্য কারো হাতে দিতে রাজি নয় কুরিয়ারের লোক। বাধ্য হয়ে বিলকিস সুলতানাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে আসা হয়। সে নির্বিকারভাবে সই-সাবুদ করে প্যাকেট হাতে নিয়ে সবার সামনেই মুখটা খুলে ফেলে। একটা বাচ্চা ছেলের ডজন ডজন ফটো। কয়েকটা ফটোতে দেখা যায় পার্ক সেই বাচ্চাটাকে খুব আদর করছে। ফটোগুলো দেখেই বিলকিস সুলতানা থরথর করে কাঁপতে থাকে। প্যাকেটে একটা চিঠিও আছে। কোরিয়ান অক্ষরে লিখেছে পার্ক। সেই সঙ্গে কোনো বাংলা অনুবাদককে দিয়ে নিখুঁতভাবে অনুবাদও করিয়েছে। কাঁপা কাঁপা হাত আর ঝাপসা চোখ নিয়েও চিঠিটা পড়ে বিলকিস সুলতানা। পার্ক লিখেছে-‘তোমরা দুই ভাইবোন মিলে আমার জন্য যে ফাঁদ পেতেছিলে, তা তোমার গর্ভসঞ্চারের পরের কথাবার্তা থেকেই আমি বুঝে গেছি। ইচ্ছা করলেই আমি প্রভাব খাটিয়ে তোমাদের পাতা ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম। তোমরা যে আমার কিছুই করতে পারতে না, অন্তত সেটুকু বোঝার ক্ষমতা তোমাদের আছে বলেই মনে করি। তাহলে আমি হার স্বীকার করলাম কেন? কারণ, তুমি শরীরকে মূলধন করে আমাকে গ্রাস করার ষড়যন্ত্র করলেও আমি আসলে তোমার শরীরের পাশাপাশি তোমাকেও ভালোবেসেছিলাম। আমার ভালোবাসাই আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এই রকম ত্যাগ স্বীকার করতে। তা ছাড়া এই সন্তান, যার নাম আমি রেখেছি কিম, সে আমার অফুরন্ত আনন্দের উৎস। আমার সন্তানকে নিয়ে আমি আনন্দে থাকব। আর ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে অর্জন করা সম্পদ তোমার গায়ে-অন্তরে প্রতিমুহূর্তে কাঁটা হয়ে ফুটবে।’

পরদিন চালাক-চতুর ভাতিজি ইউনুস আলীকে ফোনে জানিয়ে দিল-আর চিন্তা নাই চাচা, ফুপি এখন পুরা পাগল।

প্রথম প্রকাশ : ঢাকা, বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev