এই মুহুর্তে দেশে রাজনৈতিক চর্চার মুখ্য বিষয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আর সেই নির্বাচন ঘিরে রাজধানীতে তৎপরতা তুঙ্গে। একদিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ অন্যদিকে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেবেন ৪ হাজার ৮০৯ জন জনপ্রতিনিধি। তবে তাদের ভোটের মূল্য যেহেতু আলাদা তাই লোকসভা, রাজ্যসভা ও বিধানসভার সদস্যদের ভোটের মূল্য মিলিয়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৬ হাজার ৪৩১টি। এর মধ্যে বিজেপি এবং তার জোটসঙ্গীদের রয়েছে মোট ভোটের প্রায় ৪৮ শতাংশ। সব বিরোধী দল একত্র হলে তাদের ভোট হবে ৫১ শতাংশ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক মুহুর্তে যখন বিরোধীদের জোট তৈরি এবং সর্বসম্মত বিরোধী প্রার্থী ঠিক করার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন দেশের রাজধানীতে এবং বাংলায় দুজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অথবা তাঁদের পরিবারকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি জেরার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় ইডি জেরা করছে রাহুল গান্ধীকে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্ত্রী রুজিরা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী ঐক্যের তরফে সর্বসম্মতিক্রমে একজন প্রার্থীকে দাঁড় করানোর কাজে প্রাথমিকভাবে সফল। কার্যত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে তাঁর নেতৃত্বেই এখন পর্যন্ত আম আদমি পার্টি, টিআরএস, অকালি দল, বিজেডি এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেস ছাড়া প্রায় সব অ-বিজেপি দলই এক ছাতার তলায় এসেছে৷
ফের সনিয়া গান্ধী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাছাকাছি হলেও এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বিরোধী জোটের ঐক্য বৈঠকে শরদ পওয়ার সভাপতিত্ব করলেও টিআরএস, আপ অনুপস্থিত। এই বড় দুটি দলের পালস বোঝা সেইসঙ্গে মায়াবতী এবং আসাদুদ্দিন ওয়েইসির দলকেও বিরোধী শিবিরে আনা জরুরী বলে মনে করছেন শরদ পাওয়ার৷ বিরোধী জোটের পাল্লা ভারী নয় ঠিকই কিন্তু তারা সহজে এনডিএকে জমি ছেড়ে দিতে চাইছে না। তাই বৈঠকে যারা অনুপস্থিত ছিল তাদের একই ছাদের তলায় আনাটাই শরদ পাওয়ারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে চলে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা, দেশকে বাঁচাতে এবং মোদী সরকারের জনবিরোধী নীতি রুখতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজোট হয়ে প্রার্থী দেবে বিরোধী শিবির।
রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের একাংশের মত, বিরোধীদের জেতার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ এনডিএ পিছিয়ে মাত্র ১.২% ভোটে। একাধিক সিবিআই, ইডির মামলা নিয়ে ব্যস্ত অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জগন রেড্ডির দলের কাছেই আছে ৪% ভোট৷ অন্যদিকে কেন্দ্রের সঙ্গে কোনও ঝামেলা না করেই রাজ্য চালানো নবীন পট্টনায়কের বিজেডির কাছে আছে ৩% ভোট। যদিও খাতায় কলমে ওড়িষার বিজেডি বা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দল এনডিএতে নেই৷ তবে তারা ঘোষিতভাবে বিজেপি বিরোধীও নয়৷ তাই বিজেপি চাইলেই তারা সমর্থন করবে এমনটাও নয়৷ আবার বিরোধী শিবিরকে সমর্থন জানাবে তেমনটাও আশা করা যায় না। সেদিক থেকে এনডিএর সব এমপি, এমএলএ মিলিয়েও কিছু ভোটের ঘাটতি আছে৷ তবে সেই ঘাটতি পূরণ করে নিজেদের প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বের করে আনাটা কঠিন হলেও সম্ভব৷ কিন্তু বিজেপি বা এনডিএকে বাদ দিয়ে অন্য সব দলকে সঙ্গে নিয়ে, এক সম্মিলিত বিরোধী প্রার্থীকে জিতিয়ে নিয়ে আসাটাও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।
তবে বিরোধীরা এই লড়াই সহজেই যে ছেড়ে দেবে তা কিন্তু নয়৷ বাস্তবিক পরিস্থিতি হল সোনিয়া গান্ধী হাসপাতালে, রাহুল দু-বেলা ইডি দফতরে৷ এরপরও কংগ্রেস বৈঠকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল৷ এসপি, ডিএমকে, আরজেডি, এনসিপি, ন্যাশন্যাল কনফারেন্স আগেই জানিয়ে দিয়েছিল তাঁরা আসছে৷ সিপিএমও বুঝেছে, না গেলে আরও বিচ্ছিন্নতা বাড়বে৷ তাই সিপিআইএমও এই নীতিগত প্রশ্ন তোলেনি। সিপিআই, সিপিআইএম এসেছিল। বৈঠকের আগের দিন রাতেই শরদ পাওয়ার জানিয়েছেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হতে রাজি নন৷ কারণ তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ভোটে দাঁড়িয়ে হারতে রাজি নন৷ কিন্তু তিনি মমতা বা সোনিয়া গান্ধীকে উপেক্ষা করতে পারেন না।
অন্যদিকে টিআরএস-এর প্রধান শত্রু কংগ্রেস তাই চন্দ্রশেখর রাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ডাকা এই বিরোধী বৈঠকে অনুপস্থিত। কিন্তু তাঁর মতো আঞ্চলিক দলের নেতারও বোঝা দরকার কেন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কোনও বিজেপি বিরোধী জোট গড়ে তুলতে গেলে কংগ্রেসকে দরকার। বোঝা দরকার এখনো গোটা দেশে যদি গেরুয়া শিবিরের ১৩০০-র বেশি বিধায়ক থাকে, তাহলে কংগ্রেসের কাছে ৭৫০-এর কাছাকাছি বিধায়ক রয়েছে। গোটা দেশে আর কোন রাজনৈতিক দলেরই এই ধরণের সর্বভারতীয় উপস্থিতি নেই। তাছাড়া আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং সনিয়া গান্ধীর উদ্যোগে কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে বিরোধী জোটের বৈঠক রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ তো বটেই। কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে এবং অন্য আঞ্চলিক দলগুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে একটি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি বিরোধী একটা জোট যদি তৈরি করা যায়, সেই জোট যদি বিজেপির হিন্দুত্বের বিরোধীতা করে তাহলে সেটা কেবল বিজেপি বিরোধীতা নয়, হিন্দুত্ব বিরোধীতাও বটে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে সেই বিরোধী জোট সফল হবে এমনটা বলা যায় না। কারণ, তেমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু সত্যি যদি তেমন বিরোধী জোট তৈরি হয়, তাহলে ২০২৪-এর নির্বাচনে গেরুয়া শিবিরকে বিরাট চ্যালেঞ্জ দেবে।
ভালো বিশ্লেষণ। আমার তো মনে হয় অগ্নিপথ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে হিন্দীবলয়ে বিক্ষোভ বিজেপি-র বিরুদ্ধে জনপ্রতিবাদের এক অগ্নিগর্ভ
অভিব্যক্তি।