রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রেসিডেন্ট মহারাজ স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী নিজের জন্মদিনে কেক কাটছেন। পাশে বসে আছেন আর এক প্রেসিডেন্ট আত্মস্থানন্দজি। যদিও তখনও তিনি প্রেসিডেন্ট হননি। রঙ্গনাথানন্দর পর প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন স্বামী গহনানন্দ মহারাজ। তারপর স্বামী আত্মস্থানন্দ মহারাজ।
আমি জানিনা বেলুড় মঠ ও মিশনের প্রেসিডেন্ট মহারাজ নিজের জন্মদিনে কেক কাটছেন এ ধরনের ছবি আমরা আগে দেখেছি কিনা।
যদিও এর পুরো কৃতজ্ঞতা বিখ্যাত সাহিত্যিক মনিশংকরদা মহাশয়-এর। শংকরদার জন্যই আমি বেলুড়মঠে কিছু অন্যরকম ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম।
বেলুড় মঠ মিশনের নিয়ম অনুসারে ঠাকুর রামকৃষ্ণ, মা সারদা, স্বামী বিবেকানন্দ যে ষোলোজন শিষ্যকে ডাইরেক্ট কানে মন্ত্র দিয়ে দীক্ষিত করেছিলেন, আমরা তাদের ঠাকুরের সন্তান বলি। সেই সব মহারাজদের আমরা পুজোও করি। একমাত্র এই সন্তানদেরই জন্মদিন হয়। পুরোটাই ঘরোয়া।
ছবির ঘটনায় আসি….”অচেনা অজানা বিবেকানন্দ” বইটির লেখার কথা শুনেই প্রেসিডেন্ট মহারাজ মনিশংকরদাকে বলেছিলেন, “আমায় একটা কপি দিও।”
সেই দিনই মণিদা ঠিক করেন, “বইয়ের প্রথম কপি আমি প্রেসিডেন্ট মহারাজের হাতে তুলে দেব।”
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সঙ্গে মণিশংকরদার একটা গভীর যোগাযোগ আছে। অনেক না জানা তথ্য আমরা পাই ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের উপরে তাঁর বহু লেখায়। আমরা ঠাকুর ও স্বামীজির ঘরোয়া অনেক কিছু শংকরদার লেখাতেই জেনেছি।
রঙ্গনাথানন্দজী মনিশংকর দাকে খুবই স্নেহ করতেন। বইটার প্রথম কপি রঙ্গনাথানন্দজীর হাতে যেদিন তুলে দেবেন তার আগেই মনিশংকরদাই আমায় খবর দেন, “অশোক তুমি আমার সাথে বেলুড়ে যাবে?”
আমি তখন সাদা বাড়ির কালো গ্রিল (আনন্দবাজার পত্রিকা)’র কলকাতার পাতার জন্য একটা বিশেষ ছবি প্রতিদিনই তোলার চেষ্টা করি। ভাবলাম প্রেসিডেন্ট মহারাজের হাতে বিখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকরদা বিবেকানন্দের উপরে বইটা তুলে দেবেন কলকাতার পাতায় ভালো ছবি হতেই পারে। কিন্তু আমি জানতাম না সেইদিন আবার মহারাজের জন্মদিন।
আনন্দবাজারের কর্ণধার সরকার পরিবারের সঙ্গে বেলুড় মঠ ও মিশনের খুবই যোগাযোগ এবং খাতির। এই হাউসে কাজ করার সময় থেকেই দেখে আসছি মঠ ও মিশন-সহ বেলুড় মঠের সঙ্গে যে সমস্ত হাসপাতাল, স্কুল ছিল তাদের কোনো কিছু হলেই আমরা কভার করতাম। এটা আমাদের মিস হতো না আমার এই ছবি ভালো না লাগলেও বিশিষ্ট চিত্র সাংবাদিক দেবীপ্রসাদ সিংহ (চন্ডীদা) ও মাঝে মাঝে তপন দাস (প্রাক্তন মুখ্য চিত্র সাংবাদিক) এই ছবিগুলি তুলতেন।
তপনদার বাবা শ্রদ্ধেয় তারক দাস ও দেবীদার বাবা শ্রদ্ধেয় বীরেন সিংহ বাংলার গ্রেটেস্ট চিত্র সাংবাদিক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার আগে ও পরে এই দুই মহান চিত্র সাংবাদিক আমাদের গর্ব। যদিও সেই সব ঐতিহাসিক ছবি আমরা ঠিক মতন আর্কাইভ করে রাখতে পারিনি। এটা সরকার-সহ আমাদের মূর্খতা। তবে ডিজিটাল ক্যামেরা আসার পর ছবি রাখতে অনেক সুবিধা হলেও নেগেটিভের সময় এই সুবিধা কাজের ভিতরে আমাদের আর্কাইভ করা মুশকিল ছিলো। তবুও আনন্দবাজারের লাইব্রেরীতে যে ভাবে ছবি ও প্রকাশিত কাগজ আর্কাইভ করা আছে তা অতুলনীয়। বলা হয় জাপানের আসাহি শিম্বুন-এর পর সাদা বাড়ির কালো গ্রিল (আনন্দবাজার) যদিও একবার আগুনে অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যায়।
আমার ছবিওয়ালার গল্পে ভুল বানানেও যে কজন পাঠক আমার লেখা পড়েন তারা এতদিনে জেনে গেছেন যে মানুষ ছাড়া আমার সাধারণত ভগবানের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা ছোট থেকেই নেই। যদিও স্বামীজি, ঠাকুর রামকৃষ্ণ, মা সারদা এনাদের কথা, বই, গান আমি ক্লাস ফাইভ থেকে কিছু কিছু জানি কারন আমার মা ভালো পড়াশোনার জন্য গ্রামের বাড়ি থেকে আমায় বীরভূম রামপুরহাটের কাছে রামকৃষ্ণ শিক্ষাপীঠে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ওই পরিবেশে থেকেও কেন জানিনা আমার লেখাপড়া ঠাকুরভক্তি কোনোটাই হয়নি। দুটোতেই আমি গোল্লা একেবারে জিরো।
যদিও হাবভাব করি হিরোর মতন। কবির সুমনের গানের মতো “পুরনো অভ্যাস….পুরনো চাল”।
লেখা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার নিয়ে চলে যাচ্ছি। মাফ করবেন। এবার ছবির কোথায় ফিরি…।
মণিদার কথা মত ঠিক সময় বেলুড়ে মঠে গিয়ে দেখি আমার জন্য অফিসের ভিতর মণিশংকরদা অপেক্ষা করছেন। আমায় দেখেই উনি বললেন, “চলো প্রেসিডেন্ট মহারাজের ঘরে যাই।”
বেলুড় মঠের একেবারে ডানদিকে গঙ্গার পাড়ের কাছাকাছি প্রেসিডেন্ট মহারাজের নিবাস। একসাথেই গেলাম। দেখলাম রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ আত্মস্থানন্দ মহারাজ ছাড়াও ঘরের ভিতরে আরো কয়েকজন মহারাজ রয়েছেন। ঘরের এক পাশে বড় কেক নিয়ে উত্তর কলকাতার বিখ্যাত সন্দেশের দোকান নকুরের কর্ণধার দাড়িয়ে আছেন। আমি তখনও জানি না যে মহারাজের আজ জন্মদিন। সবার সাথে আমিও হুড়মুড় করে প্রণাম করলাম। তারপর মণিদা বিবেকানন্দের উপর লেখা প্রথম বইটি মহারাজের হাতে তুলে দিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
পাশেই বসে আছেন স্বামী আত্মস্থানন্দজী। ওনার কথা আমি অনেক আগেই জানতাম কারণ ওনার নিজের এক ভাই প্রীতিন ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সময় রাইটার্স-এ ইনফরমেশন অফিসার ছিলেন পরে আইএনসি-এর ডিরেক্টর হয়েছিলেন। আমরা সবাই প্রীতিনদা বলেই ডাকতাম। জ্যোতি বসুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন। এটাও জানতাম স্বামী আত্মস্থানন্দ প্রীতিনদার নিজের দাদা। প্রীতিনদারা সাত ভাই ছিলেন। কেউ বিয়ে করেননি। তাদের ভিতরেই দুজন রামকৃষ্ণ মঠের মহারাজ হয়েছিলেন। স্বামী আত্মস্থানন্দজী যিনি মঠ ও মিশনের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। আর একজন নাম মনে পড়ছে না বেলুড় থেকে বেরিয়ে নিজে কিছু একটা করেছিলেন।
আমি মণিশংকরদার ছবি তুলে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর দেখি ওই কেকটা প্রেসিডেন্ট মহারাজের দিকে নকুরের কর্ণধার এগিয়ে দিচ্ছেন। রঙ্গনাথানন্দজী কেকটা কাটলেন আর প্রসাদের মতো সকলেকে দিলেন। পিছনে সকলে হাততালি দিয়ে গুন গুন করে বোধহয় কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন।
পরিবেশটা আমার বেশ ভালো লাগছিলো। আমার ছোটবেলার মিশনে সেই অমর মহারাজের কথা মনে পড়ছিলো। আমাদের সকালে ওঠানোর জন্য প্রতিদিন ছাত্রদের থাকার বিভিন্ন ধামে গিয়ে চিৎকার করে গান গাইতেন….”কাউয়া ধান খাইলো রে খেদাবার মানুষ নাই”! ওরে তোরা উঠ উঠ….!”
রঙ্গনাথান্দজীর সম্পর্কে কিছু কিছু বই আমার পড়ার সুযোগ হয়েছিল। বেশির ভাগ ইংলিশে লেখা যা পড়তে আমার দাঁত ভাঙার জোগাড়। তারপর কিছু অনুবাদ বাংলায় পরে বুঝি ও শান্তি পাই। যদিও পড়ার চেয়ে বহু মানুষের মুখে এই মহারাজ সম্পর্কে অনেক কথা জেনেছিলাম। ওনার পাণ্ডিত্য নিয়ে আমি মূর্খ কোনো কথাই বলতে পারবনা। সারা পৃথিবীর বিশিষ্ট মানুষরাই বিচার করবেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী, মনমোহন সিং, এল কে আডবাণী মত মানুষরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন ওনার কথা শুনবেন বলে!!
অথচ এই মানুষটার পড়াশোনা ছিল ক্লাস এইট।
কেরালায় ষোলো বছর এক সাধুর কথা শুনে মহিশূরের রামকৃষ্ণ মিশনে চলে আসেন। ঘরের নানা কাজ যেমন রান্না, বাসনধোয়া, ঘর পরিষ্কার করাই ওনার কাজ ছিল। রান্নাঘর থেকেই ছেলেটি স্বামীজির কথা ভজন গান শুনতেন। এমন কি সংস্কৃত ভাষার প্রতিও আকৃষ্ট হন। ছোটবেলায় একটু দুরন্ত ছিলেন। নারকেল গাছে ওঠা বয়স্ক মানুষদের হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া। খেলা ধুলা। এসব বিষয়ে ছোটো থেকেই চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। পরে উটিতে শিবানান্দ মহারাজের কাছে দীক্ষিত হন।
স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ ২৪ ঘণ্টা বই পড়তেন। অসুস্থ হবার পর উডল্যান্ডে ভর্তি হবার সময় বিখ্যাত ডাক্তার সুব্রত মিত্র বলেছিলেন এই অবস্থায় এতো বই পড়া যাবেনা। কিন্তু উনি অনড়।
মহারাজ যখন আমাদের ছেড়ে চলে যান আমি আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। সকল ভক্তগণ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে ফুল। অনেকে কান্নাকাটিও করছেন। পিন ড্রপ সাইলেন্স। সবাই ভক্তিভরে প্রণাম করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমি অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কী ছবি তুলবো। অন্যভাবে দেখা ভাবনা ফটোগ্রাফিতে মেলাতে পারলেই ছবি হয়তো হয়। যাক সেসব অন্য বিষয়। আমি ক্যামেরার ‘ক’ ও বুঝি না। ৩৭ বছরের জীবনে কাকতালীয় ভাবে ছবি হয়তো কিছু হয়েগেছে। তার পুরো কৃতিত্ব আমার কলকাতার বন্ধুরা বেশি করে কলেজের। যাক এসব কথা।
স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ মারা যাবার পর বেলুড় মঠ পৌঁছে দেখছিলাম মহারাজের পায়ের ওপরে সবাই একে একে ফুল দিয়ে প্রণাম করে চলে যাচ্ছেন। জমে যাওয়া ফুল ব্রহ্মচারী ও অন্য মহারাজেরা ঘরের এক কোণে রেখে দিচ্ছেন। আমি পায়ের কাছে গিয়ে দেখি পা টকটকে লাল। হয়তো আলতা দিয়ে পায়ের ছাপ নেওয়া হয়েছে। সাদা ফুলের ভিতরে লাল পা দুটো ফুলে ঢাকা অবস্থায় বেশ লাগছে। আমি টেলিলেন্স দিয়ে ক্লোজআপে ফুলের ভিতরে দিয়ে পা দুটোর ছবি তুলি। পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় পেজ ওয়ানে ছাপা হয়।
পরে অনেক বন্ধুবান্ধবের মা-বাবা, ঠাকুমা দাদু ও বেশি করে যারা মঠ মিশনের শিষ্যরা সাদা বাড়ির কালো গ্রিলে (আনন্দবাজার) পত্রিকার ওই ছবিটার কথা বলে।
ছবিওয়ালা গল্পে এই লেখাটি লেখার একদিন আগে আমি মণিশংকরদাকে ফোন করি। মণিদা বলেন “অশোক মিশনের প্রেসিডেন্টদের পাণ্ডিত্য নিয়ে আমার কিছু বলার নেই কিন্তু এই রঙ্গনাথানন্দজীর পান্ডিত্য আমায় মুগ্ধ করে। তুমি জানো না উনি চলে যাওয়ার পর আমি ওই ঘরে গিয়েছিলাম, আমাকে এক মহারাজ একটা ছবি দেয় আমি জানি ওই ছবিটা তোমারই তোলা। আমি প্রেসিডেন্ট মহারাজের হাতে বই তুলে দিচ্ছি। তোমার কাছে তো একশোবার চেয়েও ওই ছবি পাইনি কিন্তু আমার কাছে ওই ছবিটা এখনো সম্পদ হয়ে আছে।”
ফোন রেখে ভাবি আমি ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ শিক্ষাপীঠে পড়ার পরও এত পাপী হয়েও কাজের সুত্রে রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ, আত্মস্থানন্দ মহারাজ, গহনানন্দ মহারাজ, ভরত মহারাজদের ছবি তুলেছি। যাঁরা আপনাদের মনের ভগবান। এতো পাপী মূর্খ হয়েও আমার ক্যামেরায় তাঁদের ধরতে পেরেছি। জানিনা কোন কর্মের ফল। ঈশ্বর তো মানিনা, আমার কাছে মানুষই সবকিছু। রক্তমাংসের মানুষ যাদের চারপাশে দেখি জীবনে কতো যুদ্ধের ভিতরে তারা বেঁচে থাকে। আনন্দ করে। আমার কাছে তারাই ভগবান।
তোমার ওই আসন তলে
হৃদয়ের দুয়ার খুলে
গাহি তোমারই জয় গান ঠাকুর (আমার ঠাকুর আপনারাই)
গাহি তোমারই জয় গান….
এভাবেই রামকৃষ্ণ মঠ মিশনের মহারাজরা তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদা মায়ের আসীমতায়।
বেলুড় মঠের মহারাজদের সম্মন্ধে কিছু বলার মত পণ্ডিত আমি নই। আমার স্বল্পজ্ঞানে যতটুকু শুনেছি, জেনেছি, পড়েছি তার কিছুটা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। ভুল ত্রুটি হলে মার্জনা করবেন।
২ ডিসেম্বর ২০২২
খুব ভালো লাগলো। অনেক অনেক ধন্যবাদ এই লেখার জন্য।
অশোক বাবু যা লিখেছেন তা সবই সত্য। প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত চৈতন্য শক্তি আছে, এবং সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলাই মনুষ্য জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। সে ভাবে প্রথাগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও স্বামী রঙ্গনাথানন্দ এই সত্যকে জানতেন, এবং নিজের জীবনে সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ঠাকুর, মা, স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উনি একাজ করেছিলেন। ওঁনাদের সবাইকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।