| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, জনজাতি ও হিন্দুত্বের রাজনৈতিক নির্মাণ : অতনু সিংহ

Reporter
অতনু সিংহ / ১০২১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০২২

“দ্রৌপদী মুর্মু নিজেকে হিন্দু বলেন। কিন্তু আদিবাসীরা হিন্দু নয়। আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ধর্মের স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছেন”—বীরবাহা হাঁসদা

শেষ হলো ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ক্রশ ভোটিং, টাকা ছড়িয়ে বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা ইতাদি নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চললো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সবথেকে চমকপ্রদভাবে যে বিষয়টা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তা হলো, আদিবাসী বা জনজাতি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নেত্রীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি-এনডিএ বিরোধী শিবিরের ঐক্যতে শুরুতেই ফাটল ধরিয়ে দেওয়া। এভাবেই দ্রৌপদী মুর্মুর জয় এক প্রকার সুনিশ্চিত করে ফেললো। দ্রৌপদী মুর্মু আদিবাসী আর যশবন্ত সিন্‌হা তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণ’-এর প্রতিনিধি, এই প্রচারকেই সামনে এনে নির্বাচনী অঙ্কে সম্ভবত বাজিমাত করলো বিজেপি। কিন্তু বিজেপির এই অঙ্কের অন্তঃসার কী, কীই বা বিজেপির রাজনৈতিক সমীকরণের মর্মবস্তু, তা বুঝতে হলে বাংলার অবিজেপি আদিবাসী বিধায়ক শ্রীমতি বীরবাহা হাঁসাদার বয়ানকে সামনে আনা এবং তা বিশ্লেষণ করা জরুরী। এই বিষয়েই আলাপ করব। তার আগে সংক্ষেপে প্রাসঙ্গিক আরও দু-একটা কথা, যেগুলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, সেগুলো একবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। তারপর মূল আলাপে অগ্রসর হওয়া যাবে।

আদিবাসী বনাম উচ্চবর্ণ— এই ন্যারেটিভকে পুঁজি করেই বিরোধী শিবির থেকে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, বহুজন সমাজ পার্টি, ওয়াইআরএস-কংগ্রেস, শিবসেনা ইত্যাদি দলের ভোটকে কংগ্রেস-তৃণমূল-সিপিআই-সিপিএম ইতাদি বিরোধী দলের ঐক্য থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। সব থেকে মজার ব্যাপার হলো আদিবাসী ও উচ্চবর্ণ- এই পরিচয়ের বাইনারি নিয়ে যারা সরব হলো, অর্থাৎ সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি, তাদের মতাদর্শগত ভিত্তিই হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ, মনুবাদ, বর্ণাশ্রম, নিম্নবর্গবিদ্বেষ। যাদের লক্ষ্য সার্বিকভাবে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানি ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্রের উন্মেষ ঘটানোর মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ কায়েম করা।

তো বিজেপি তথা আরএসএস-এর এহেন ইডিওলজিক্যাল স্টান্ডপয়েন্টের পরেও কীভাবে তারা আদিবাসী, নমঃশূদ্র ও দলিতদের নিজেদের ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনীতির মধ্যে নিয়ে আসতে পারছে সেই ভাবনা এখন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে বিজেপি বিরোধী শিবিরকে। বিজেপি বিরোধী শিবির হিমশিম খাচ্ছে বিজেপির ডুয়াল পলিটি বা রাজনৈতিক দ্বৈততাকে সামাল দিতে। কী সেই দ্বৈততা, সেটা হলো বিজেপি ও আরএসএস তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শে ব্রাহ্মণ্যবাদী, কিন্তু তারপরেও তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসাবে নিম্নবর্গের প্রতিনিধিকে সামনে এনে মন জয় করে ফেলছে ভূমিমানুষদের। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এটা? এই কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এই উত্তর খুঁজে না পেয়ে বিজেপির রাজনীতিকে মোকাবিলা করার কোনো উপায়, কোনো বয়ান, কোনো রাজনৈতিক স্লোগান সামনে আনতে পারছে না বিরোধীরা। কিন্তু এতকিছুর পরেও বাংলার বিধায়ক বীরবাহা হাঁসদা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণমাধ্যমে মোক্ষম জবাব দিলেন। তিনি যা বললেন, তা বিশ্লেষণ ও তার সারবস্তু খুঁজে বের করাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

গোটা ভারতের বিজেপি বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা-নেত্রী যে কথা বলতে পারলেন না, সেটা বলে দিলেন বাংলার বিধায়ক বীরবাহা হাঁসদা। বাংলার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমের বৈদ্যুতিন ক্যামেরার লেন্সের মুখোমুখি হয়ে উনি বললেন, দ্রৌপদী মুর্মু যদি আদিবাসী হন তাহলে উনি নিজেকে ‘হিন্দু’ বলে পরিচয় দেন কেন? এবং বিজেপিও তাঁকে ‘হিন্দু’ বলে পরিচয় দেয় কেন? আদিবাসীরা তো হিন্দু নয়। বীরবাহার স্পষ্ট জবাব, বিজেপি আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করলে ‘জয় শ্রীরাম’ না বলে ‘জোহার’ বলতো।

শ্রীমতি বীরবাহা হাঁসদার আরো মন্তব্য, “ভারতের আদিবাসীরা যেখানে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও নিজস্ব ধর্মীয় রীতির সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে, তখন একজন আদিবাসী মহিলা নিজেকে ‘হিন্দু’ বলে পরিচয় দিয়ে যদি রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে বুঝে নিতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে আদিবাসীদের বিশ্বাস ও লড়াইকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে”। অর্থাৎ শ্রীমতি বীরবাহা স্পষ্টতই চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন, আদিবাসীদের হিন্দুত্বের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসার যে রাজনৈতিক কৌশল দীর্ঘদিন ধরে নিয়ে আসছে তা আসলেই আদিবাসীদের ঈমান বিরুদ্ধ একটি কাজ।

‘হিন্দু’ কখনো, কোনোদিন, কোনো অবস্থায় ধর্ম নয়। ঔপনিবেশিক আমলে বৈদিক ধর্মের আধারে অবৈদিক নানা সনাতনী ধর্মকে একত্রে নিয়ে এসে ‘হিন্দু’ পরিচিতি তৈরি হয়। অবৈদিক সনাতনী ধর্মগুলো যেমন, শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি ধর্মকে হিন্দু ধর্মের ভিতরে মধ্যে আনা হয় বটে কিন্তু বৈদিক বর্ণাশ্রম ধর্মের আচার-বিচারকেই ‘হিন্দু ধর্ম’ বলে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৈদিক আগ্রাসনে গিলে নেয় অবৈদিক নানা সনাতন ধর্মকে। নৃতাত্ত্বিক জনজাতিদের আরও কিছু ধর্ম যেমন ‘সারনা’ ইত্যাদিকে অবশ্য হিন্দুত্বের পরিচিতির আওতায় আনার কাজটা তখনও খুব একটা সহজ হয়নি। এ বিষয়ে আসছি।

কৃত্রিমভাবে ‘হিন্দু’ পরিচিতি নির্মাণের ব্যাপারে বেশ কিছু আকাদেমিক কাজও হয়েছে। তথ্যপ্রমাণ ও ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ পেশ করে এ নিয়ে বেশ কিছু বইও রচিত হয়েছে। আপাতত এমন একটি বইয়ের কথা রেফারেন্স হিসাবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। সেটা হলো, ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস’ থেকে ২০০৫ সালে প্রকাশিত ব্রায়ান কে. পেন্নিংটনের (Brian K. Pennington) বই ‘Was Hinduism Invented?’। অবিভক্ত বঙ্গের প্রথম জনগণনার সময়েই ‘হিন্দু’ বলে একটি পরিচিতিকে সামনে আনা হয়। বুঝে নেওয়া দরকার, পশ্চিমের রিলিজিয়ন আর উপমহাদেশের ‘ধর্ম’ কখনোই এক জিনিস নয়। জলের ধর্ম আছে, গাছের ধর্ম আছে, তেমনই মানুষেরও ধর্মবোধ আছে। যা জৈবিক সত্তাকে ধারণ করে এবং জৈবিক বা প্রাণীক সত্তা যা ধারণ করে সেটা ধর্ম। ‘ধৃ’ ধাতু থেকে ধর্ম-এর বুৎপত্তি এটা আমরা সবাই জানি। প্রাণ, প্রকৃতি এবং এই দুইয়ের সম্পর্ক স্থাপনে ‘পরম’-এর ভাবনার মধ্যে সম্বন্ধই বঙ্গ তথা গোটা উপমহাদেশের বেদ-পূর্ব ধর্ম ভাবনা। কিন্তু পশ্চিমের রিলিজিয়ন শব্দটা স্ক্যান করলে যে অন্তর্ভাব প্রকাশিত হয় সেটা হলো শাস্ত্রাচার। অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স এবং তার সঙ্গে সমাজের কর্তৃত্বের ক্ষমতাকে মিলিয়ে ইওরোপে রিলিজয়ন ও চার্চের দাদাগিরির উদ্ভব। বাংলায় ব্রিটিশরা আসার বেশ কিছু আগেই শাস্ত্রাচারি বৈদিকদের, ব্রাহ্মণদের আগমন ঘটেছিল। যারা একইসঙ্গে প্রকৃতিবাদী অবৈদিক বিভিন্ন সনাতনী ধর্মমতের মধ্যে থাকা বৈদিকদের চোখে ‘নিম্নবর্ণ’র মানুষের ওপর বৈদিক বর্ণাশ্রমকে চাপিয়ে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালায়, যা প্রতিহত হয় সুলতান যুগে চৈতন্য-নিত্যানন্দদের দ্বারা। কিন্তু ব্রিটিশদের সৌজন্যে বঙ্গে এই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পলাশী-উত্তর পর্বে স্ট্রাকচারালি ও প্রশাসনিকভাবে বৈদিক ধর্ম বা বর্ণাশ্রমকে কায়েম করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ব্রিটিশদের সাহায্য নিয়েই যৌথভাবে অষ্টাদশ শতকেই ‘হিন্দু’ নামক একটি পশ্চিমা শাস্ত্রাচারমুখি বর্ণাশ্রমবাদী রিলিজিয়াস আইডেন্টিটির নির্মাণ করা হয়। মূলত বঙ্গ থেকে যেমন ব্রিটিস সা্ম্রাজ্য উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক সেভাবেই ঔপনিবেশিক প্রভু এবং বঙ্গে বহিরাগত ব্রাহ্মণদের দ্বারাই বঙ্গদেশ থেকে গোটা উপমহাদেশে হিন্দু পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে।

নৃতাত্ত্বিক জনজাতিদের নিজস্ব ধর্মগুলোর ক্ষেত্রে বলা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের সাহায্যে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৈদিক আগ্রাসনে গিলে নেয় অবৈদিক নানা সনাতন ধর্মকে গিলে খাওয়ার চেষ্টা করলেও আদিবাসীদের প্রবল প্রতিরোধে তাদের ধর্মমতগুলোকে হিন্দু পরিচিতির মধ্যে আনার ক্ষেত্রে নানাভাবে বেগ পেতে হয় বেশ কিছু সময়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৯৪৭-এ আধুনিক ভারত রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পর থেকে আবারও আদিবাসীদের হিন্দু পরিচিতির মধ্যে নিয়ে আসারা নানা প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এক্ষেত্রে বাংলার নমঃশূদ্রদের কথাও উল্লেখ করতে হয়। নমঃশূদ্ররা আদিবাসী নয়। কিন্তু এককালে তারা বৈদিক ধর্মকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল। কিন্তু এককালে যারা বৈদিক ধর্মকে সপাটে থাপ্পড় মেরে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিল, সেই মতুয়াদেরকেও হিন্দু বলে পরিচিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় আরএসএস-এর দ্বারা। এই উদ্যোগের সার্বিক রূপ দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে দিয়ে। দেখা যায়, মতুয়ারা বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে।

এবার আদিবাসীদের সার্বিকভাবে হিন্দুত্বর পরিচয়ের ভিতর আনার কাজ চড়ান্ত হচ্ছে দ্রৌপদী মুর্মুকে সামনে রেখে। সাঁওতালদের নিজস্ব সারনা ধর্মকে ব্রাহ্মণ্যবাদী বৈদিক হিন্দু ধর্মের মধ্যে আনার প্রক্রিয়া শুরু। প্রথমে হিন্দু রাষ্ট্র এবং পরে ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতেই এই কাজ। হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে নিয়ে এসে পুরানো বৈদিক বর্ণাশ্রম প্রথা বাউন-কায়েতদের আধিপত্য স্থাপন করার জন্যেই প্রথমে আদিবাসী ও নমঃশূদ্রদের বিভ্রান্ত করে নানা টোপ দিয়ে পাতা ফাঁদে ফেলতে চাইছে বিজেপি।

আর বিজেপিকে সাহায্য করছে আদিবাসী ও নমঃশূদ্র সমাজের কিছু দালাল। সুন্নি মুসলিম, আদিবাসী ও নমঃশূদ্র/দলিত ঐক্য যাতে কখনো না গড়ে উঠতে পারে সেকারণেই নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন কায়েম করতে মরিয়া। মুসলিম, আদিবাসী, নমঃশূদ্র/ দলিত- এরা সকলেই নিম্নবর্গের হওয়ার পরেও, গ্লোবাল ক্যাপিটালের যে ইসলামোফোবিয়ার রাজনীতি, গোলকায়ণের যে ‘ওয়ার অন টেরর’-এর পলিটিক্স, সেই রাজনীতির আমদানির মাধ্যমে আদিবাসী ও নমঃশূদ্রদের মধ্যে তাদেরই ভাইবোন মুসলিম সমাজের ব্যাপারে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিজেপির লক্ষ্য, ২০২৪-এ প্রায়-বিরোধীনির্মূল করে ভারতের রাজনীতিতে একচ্ছত্রভাবে ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান’-এর মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করে প্রত্থমে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, হিন্দিকেই একমাত্র যোগাযোগের ভাষার মর্যাদা দেওয়া এবং গোবলয় ও হিন্দি বলয়ে আধিপত্য কায়েম করা। কিন্তু তখন আর মুসলমানকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করার উপায় থাকবে না বিজেপি, কেননা, এই রাজনীতির ফলে আম-সুন্নি মুসলিম আরও আরও কোণঠাসা হবে, তাদের সংখ্যা ও প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন বিজেপি তাদের ঝুলি থেকে বের করবে আদিবাসী, দলিত ও নমঃশূদ্র বিরোধিতার রাজনৈতিক এজেন্ডা। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হবে ব্রাহ্মণ্যবাদী ও উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তের খাঁটি ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্রকে সার্বিক রূপ দেওয়া।

বীরবাহা হাঁসদার মতো মানুষেরা এটা বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু বিজেপি বিরোধী দলগুলো তো ক্ষমতা নিয়ে ভাবা ছাড়া আর কিছুই পারে না। তাদের কোনো সোশ্যাল এনজেনিয়ারিং-এর ভাবনা নাই। তাদের কোনো সমাজবীক্ষা নাই। এবং তারাও অনেকে ভিতরে ভিতরে ব্রাহ্মণ্যবাদী। তাই বিজেপির অতি-চালাকিকে জনগণের কাছে তুলে ধরার সাধ্য তাদের নাই। বীরবাহারা একা পড়ে যাচ্ছেন। আমাদের উচিত তাঁদের সঙ্গে ঐক্য তৈরি করা।

আপনার মতামত লিখুন :

3 responses to “রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, জনজাতি ও হিন্দুত্বের রাজনৈতিক নির্মাণ : অতনু সিংহ”

  1. Debapriya Nag says:

    বীরবাহা যদি প্রকৃত ই আদিবাসী হন কেন তিনি তার বাবার পার্টি ছেড়ে বর্ণহিন্দুদের দলে যোগ দিলেন কেন?

    • অতনু সিংহ says:

      ব্যক্তিগতভাবে বীরবাহার অতীত জীবনের থেকে গতকালকে তার মন্তব্যটার ব্যাপারেই আম্মার কনসার্ন। জনজাতি, নাকি মুসলিম নাকি দলিত নাকি বর্ণহিন্দু- কোনো মানুষের ব্যক্তি জীবনের এই পরিচিতির বদলে গুরুত্ব তার রাজনৈতিক বয়ান। বীরবাহার বর্তমান দলের মধ্যে বর্ণহিন্দুর প্রতিনিধিত্ব যেমন আছে তেমনই নিম্নবর্গের মানুষেরও প্রতিনিধিত্ব আছে। তাঁর দলের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আমার বিস্তর অভিযোগও আছে, থাকাটা জায়েজ। তাঁর দলের কোনো কর্মী বা সমর্থক আমি নই। কিন্তু বস্তনিরপেক্ষ আলোচনায় এটা স্বীকার করতেই হবে এটাও গত কয়েক বছরে বাংলার সংসসদীয় রাজনীতিতে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ হিসাবে এই দল কোথাও প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করেছে, তাই নানা দল, নানা শ্রেণী, নানা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব এই দলে রয়েছে। অবশ্য এই কথাগুলো অপ্রাসঙ্গিক। কেননা, এখানে বীরবাহার ব্যক্তি জীবন, বীরবাহার দল, তাঁর রাজনৈতিক জীবন এসব নিয়ে তো আলোচনা করা হয় নি।, আলোচনাটা হলো, ঠিক সময়ে বীরবাহারর মুখ দিয়ে সঠিক কথাটা বেরিয়ে আসার ব্যাপারে। বীরবাহার এই বক্তব্য, রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক চর্চার পরিসর নির্মাণ করেছে। এই আলোচনাটা সেই চর্চার ফলশ্রুতি।

    • অতনু সিংহ says:

      ব্যক্তিগতভাবে বীরবাহার অতীত জীবনের থেকে গতকালকে তার মন্তব্যটার ব্যাপারেই আম্মার কনসার্ন। জনজাতি, নাকি মুসলিম নাকি দলিত নাকি বর্ণহিন্দু- কোনো মানুষের ব্যক্তি জীবনের এই পরিচিতির বদলে গুরুত্ব তার রাজনৈতিক বয়ান। বীরবাহার বর্তমান দলের মধ্যে বর্ণহিন্দুর প্রতিনিধিত্ব যেমন আছে তেমনই নিম্নবর্গের মানুষেরও প্রতিনিধিত্ব আছে। তাঁর দলের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আমার বিস্তর অভিযোগও আছে, থাকাটা জায়েজ। তাঁর দলের কোনো কর্মী বা সমর্থক আমি নই। কিন্তু বস্তনিরপেক্ষ আলোচনায় এটা স্বীকার করতেই হবে এটাও গত কয়েক বছরে বাংলার সংসসদীয় রাজনীতিতে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ হিসাবে এই দল কোথাও প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করেছে, তাই নানা জাতি, নানা শ্রেণী, নানা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব এই দলে রয়েছে। অবশ্য এই কথাগুলোও অপ্রাসঙ্গিক। কেননা, এখানে বীরবাহার ব্যক্তি জীবন, বীরবাহার দল, তাঁর রাজনৈতিক জীবন এসব নিয়ে তো আলোচনা করা হয় নি।, আলোচনাটা হলো, ঠিক সময়ে বীরবাহারর মুখ দিয়ে সঠিক কথাটা বেরিয়ে আসার ব্যাপারে। বীরবাহার এই বক্তব্য, রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক চর্চার পরিসর নির্মাণ করেছে। এই আলোচনাটা সেই চর্চার ফলশ্রুতি। ধন্যবাদা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev