কলকাতায় আমার এক পরিচিত বলছিলেন, গত সপ্তাহেই তিনি জ্যোতি আলু কিনেছিলেন ৩০ টাকা করে। আর চন্দ্রমুখী ৩৫ টাকা করে। এই সপ্তাহে জ্যোতি আলুর দাম ২০ টাকা আর চন্দ্রমুখী ২৫ টাকা। একটু অবাক হয়ে তিনি দোকানীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন — কিরে জিনিষের দাম বারে আর আলুর দাম দেখছি দিনি দিনে কমছে। হেসে দোকানী বলেছিলেন, এবার বাংলায় আলুরদাম এত চড়া ছিল যে বাইরে আলু যায় নি। বেশিরভাগ আলু স্টোরে রাখা হয়েছিল। পুজোর আগে এবং পুজোর মুখো মুখি জ্যোতি আলুরদাম ছিল ৪০ টাকা কিলো, আর চন্দ্রমুখী ৫০ টাকা এখন যা হাফ দামে নেমে এসেছে। দোকানী বলেছিলেন, দাম বাড়ার সময় আমি প্রতিদিন ২০ বস্তার জায়গায় ১০ বস্তা বেচতাম। আমি তো খুচরো বিক্রেতা আমার কাস্টমার কমবেশি একই। এখন কিন্তু সেই আল ১০ বস্তার জায়গায় ১৫/১৬ বস্তা বেচছি।
সে যাক দিনের পর দিন কমছে আলুর দাম। হিমঘরে রাখা আলু বের করতে বিমুখ হচ্ছেন চাষিরা। ফলে হিমঘরে জমা রাখা আলু নিয়ে যেমন চিন্তিত হিমঘর মালিকরা, তেমনই দাম না পেয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে চাষিদের।

উল্লেখ্য, রাজ্যের প্রায় ৪৮০টি হিমঘরে চলতি বছরে আলু জমা হয়েছিল ৬৮ লক্ষ টন। আলু ওঠার সময় হিমঘরে জমা রাখতে খরচ হয়েছিল ৫০ কেজি বস্তা পিছু ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। সেই আলু বস্তা পিছু বিক্রি হচ্ছে এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। এখানেই চাষিদের মাথায় হাত।
চাষিরা চিন্তিত প্রধান কারণ হল হিমঘর মালিকের সঙ্গে বস্তা পিছু লোন নিয়েছেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেখানে আলুতে লাভ তো হচ্ছেই না, সেখানে উল্টে বাড়ি থেকে টাকা দিতে হবে। এখানেই বেধেছে গোল। তাই বহু চাষি হিমঘরমুখো হচ্ছেন না। বৈদ্যনাথ মান্না, নিরাপদ ঘোষ, শ্যামল জানাদের মতো চাষিরা জানাচ্ছেন যেটা মুখ্য সমস্যা তা হল আলু বসানোর সময় শুরু হয়ে গছে, এইসময় অনেক চাষি হিমঘরে জমানো আলু বিক্রি করে লাভের টাকা দিয়ে নতুন করে আলু বসানো শুরু করেন। এবারের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। একদিকে চাষিরা হিমঘর মালিকের লোন শোধ করতে পারছেন না যেমন, ঠিক একইভাবে মহাজন কিংবা সার, আলু ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও ধার পাচ্ছেন না চাষিরা। ফলে মহাফাঁপড়ে পড়েছেন অধিকাংশ চাষি ।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার থেকে হিমঘরগুলিতে জ্যোতি আলু বস্তাপিছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। হিমঘর মালিক দিলীপ শেঠ বলেন, যেভাবে আলুর দাম কমছে, তাতে দু-সপ্তাহ পর বিক্রি হবে না। এমনকী নিলামও হতে পারে।
প্রসঙ্গত, গ্রামবাংলার অর্থনীতি মূলত নির্ভর করে আলুচাষের উপর। হুগলি, হাওড়া, পূর্ব মেদনীপুর, পশ্চিম মেদনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান ইত্যাদি জেলায় বর্তমানে আলু চাষের পরিমাণ অনেকটাই বেড়েছে। এবারে আলুর দাম না থাকায় আলু চাষে সঙ্কট দেখা দিতে পারে। এখনো হিমঘরগুলিতে প্রায় ৩০ শতাংশ আলু রয়ে গেছে। এই আলুর কী হবে? এই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে চাষিদের মনে। যেখানে প্রতিদিন ৮ লক্ষ টন আলু বের হত, সেখানে কিঞ্চিৎ আলু বের হচ্ছে। চাষিদের অভিযোগ, আগে ভিন রাজ্যে প্রচুর আলু যেত। এখন আর যায় না। ফলে হিমঘরের সামনেই ডাঁই হচ্ছে আলুর বস্তা। যে আলু বিক্রি করে নতুন আলু বসানোর কথা চাষিদের, তা না হয়ে বহু চাষি আলু বসানো নিয়ে এখনো চিন্তায় আছেন।