আশঙ্কা সত্যি করে নভেম্বরে আরও বাড়ল জিনিসপত্রের দাম। সোমবার, ১৩ ডিসেম্বর কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক জানিয়ে দিল, গত মাসে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৯১ শতাংশ।
নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না মূল্যবৃদ্ধিকে। পরপর মাসগুলিতে বাড়ছে জিনিসের দাম। অক্টোবরের পর নভেম্বরে আরও বাড়ল খুচরো দরদাম। সোমবার বিকেলে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হলো, চলতি বছরের নভেম্বরে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৪.৯১ শতাংশ হারে। টানা মূল্যবৃদ্ধির চাপে বিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের অভিযোগ, লাগাতার পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে কেন্দ্র নিজে মূল্যবৃদ্ধির অনেকটাই দায়ী।

বিজেপি, আরএসএস-র নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী শক্তি যখন সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে ভোটের ঝোলা ভরানোর চেষ্টায় ব্যস্ত, তখনই জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। সোমবার, যখন প্রধানমন্ত্রী বারাণসীতে গঙ্গা স্নান করে ভোট কুড়োবার হিসেব কষছেন, তখন তাঁরই সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক জানিয়ে দিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরের পর নভেম্বরে আরও বেড়েছে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি। দেশের সরকারের হিসেবে অক্টোবরে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হার ছিল ৪.৪৮ শতাংশ। নভেম্বরে তা বেড়ে হলো ৪.৯১ শতাংশ, জানাচ্ছে কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক।
বাড়ছে দাম, কমছে জিডিপি
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৩৫ শতাংশ। অক্টোবরে বেড়ে হয়েছিল ৪.৪৮ শতাংশ। আবার বেড়ে নভেম্বরে হলো ৪.৯১ শতাংশ। আশঙ্কা, ডিসেম্বরে জিনিসপত্রের দরদাম আরও বাড়বে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সম্প্রতি অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। আগে এটা ছিল ৪.৫ শতাংশ। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ৮ ডিসেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী অক্টোবর-ডিসেম্বরে খুচরো দাম বৃদ্ধির হার হবে ৫.১ শতাংশ, যেটা অক্টোবর ও নভেম্বরের থেকেও বেশি। এটা তখনই সম্ভব, যদি ডিসেম্বরে জিনিসপত্রের দাম ৬ শতাংশেরও বেশি হারে বাড়ে। চলতি অর্থবর্ষ অর্থাৎ, ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়পর্বে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হবে ৫.৩% হারে, পূর্বাভাস রিজার্ভ ব্যাঙ্কের।
দাম যখন বাড়ছে, তখনই কমছে বৃদ্ধির হার। আগে আরবিআই বলেছিল, অক্টোবর-ডিসেম্বরে জিডিপি বাড়বে ৬.৮ শতাংশ হারে

চলতি মাসের ৮ তারিখে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই পূর্বাভাস কমিয়ে করেছে ৬.৬ শতাংশ। সারা বছরে জিডিপি বা জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির হার অবশ্য একই রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, ৯.৫ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, এই বৃদ্ধি হিসেব করা হচ্ছে গত বছরের তুলনায়, যখন করোনাজনিত লকডাউনে জাতীয় উৎপাদন সংকুচিত হচ্ছে।
পেটে ভাত নেই, হাতে কাজ নেই
বৃদ্ধির সব দাবি অসাড় করে দিয়ে মাথা চাড়া দিচ্ছে তীব্র কর্মহীনতা। অনেকে মনে করেন, কর্মহীনতা ৭ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গেলে বেড়ে যায় সামাজিক অস্থিরতা। সেদিক থেকে ভারতের অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শহুরে কর্মহীনতার বাড়াবাড়িতে চিন্তার ভাঁজ বিশেষজ্ঞদের কপালে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রাম-শহর মিলিয়ে কর্মহীনতার হার ছিল ৬.৮৬ শতাংশ, অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৭.৭৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে শহুরে কর্মহীনতার হার ছিল ৭.৩৮ শতাংশ, অক্টোবরে তা দাঁড়িয়েছে ৮.৬২ শতাংশে। গ্রামেও পরিস্থিতি বেশ খারাপ। গ্রামীণ কর্মহীনতা সেপ্টেম্বরে ছিল ৬.০৬ শতাংশ, অক্টোবরে হয়েছে ৭.৯১ শতাংশ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গরিবি ও ক্ষুধা।

এদিকে লাগাতার কমেছে ব্যাঙ্ক ও স্বল্পসঞ্চয়ের সুদ। মূল্যবৃদ্ধি যে হারে হচ্ছে, সঞ্চয়ের সুদ তার থেকে কম। এর অর্থ, ব্যাঙ্কে বা পোস্ট অফিসে জমা রাখলে টাকা কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির গভীরে ডুব দিলে অবশ্য আরও নানা কথা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। একটি হলো, মূল্যবৃদ্ধির সরকারি তথ্য কতটা বাস্তবানুগ। ডিসেম্বরের ৬ থেকে ৮ তারিখে দেশের বিশিষ্ট ৩৯ জন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। তাঁদের মতে, অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নভেম্বরে মূল্যবৃদ্ধি ৫.১ শতাংশ, যা সরকারের ৪.৯১ শতাংশের থেকে অনেকটাই বেশি। তবে মোদি সরকারের আমলে ভারত যে তথ্যে কারচুপি, সাংবাদিকদের হেনস্থার মতো কাজে সিদ্ধহস্ত, তা বর্তমানে বুঝছে সারা বিশ্বই।