আমাদের বন্ধু আইআইটি খড়গপুরের পদার্থ বিদ্যার গবেষক অর্ণব পাল জানালেন —
রেলমন্ত্রক সিবিআই ডেকেছেন? বেশ বেশ। তাহলে মাননীয় রেলমন্ত্রীকে সিবিআই জেরা করতে ডাকবে তো? ভাবছেন, কেন এ কথা বলছি? ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ দক্ষিণ-পশ্চিম রেলের চিফ অপারেশন ম্যানেজার হরিশঙ্কর ভার্মা রেল মন্ত্রককে একটি চার পাতার রিপোর্ট পাঠান। ঠিক করমন্ডলের মত এই বছরই ৮ ফেব্রুয়ারি ১২৬৪৯ যশোবন্তপুর-হজরত নিজামুদ্দিন সম্পর্কক্রান্তি এক্সপ্রেসের ভাগ্যেও একই পরিণতি লেখা হতে পারত। ট্রেনের গতি কম থাকায় ড্রাইভার বুঝতে পারেন রুট পয়েন্টে কোথাও কিছু গোলমাল হচ্ছে, তিনি গাড়ি থামিয়ে দেন। হরিশঙ্কর ভার্মা কিন্তু ঘটনাটিকে হাল্কা করে নেননি, সিগন্যাল ও পয়েন্টস ইন্টারলকিং ব্যবস্থায় বহু গলদ উল্লেখ করেন তিনি, চিঠি পড়লে এও দেখতে পাবেন রেলে নিজস্ব নিয়ম নীতিরও তোয়াক্কা করা হয় না!

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, রেলের Maintenance Handbook on Rout Relay Interlocking এর ৬৪ নম্বর পাতায় পরিষ্কার বলা আছে Relay Room ডবল তালা মেরে লক করা থাকবে একটি তালা দেবে S&T Staff, অপর তালাটি দেবে Operating Staff. রিলে রুমে ঢোকা, বেরোনো, কিসের জন্য ঢোকা হল সবকিছু স্পেশ্যাল রেজিস্টারে নথিভুক্ত রাখতে হবে। এছাড়াও সিগন্যাল, পয়েন্ট, গ্রুপ সংক্রান্ত রিলেগুলি সিল্ড অবস্থায় থাকবে। রেলে রুম নিয়ে এত কড়াকড়ির কারণ এই রুম, সিগন্যাল ও পয়েন্ট ব্যবস্থার প্রাণভোমরা। এর উপর নির্ভর করেই প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে এত এত ট্রেন ছুটে চলেছে।




হরিশঙ্কর ভার্মার চিঠির ৫ ও ৬ নম্বর পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে রিলে রুমে না ঢুকেও সিগন্যাল স্টাফ রুট রিলে সিস্টেমের আসল জায়গা গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে পারে, কারণ স্টেশনগুলিতে নিয়মবহির্ভূত ভাবে পয়েন্টস থেকে আসা সিগন্যালের তার গুলিকে রিলে রুমের বাইরে একটি জংশন বক্সে আনা হয়, তারপর রিলে রুমে কানেক্ট করা হয়, রিলে রুমের বাইরে সবার হাতের সামনে এরকম ভাবে জাংশন বক্স থাকা সম্পূর্ণ নিয়মবিরুদ্ধ। কিন্তু কাজের হ্যাপা বাঁচাতে রেল কর্মীরা এই শর্টকার্ট অবলম্বন করেন।
আবার চিঠির শুরুর দিকে ফেরা যাক, হরিশঙ্কর ভার্মার চিঠির ১ নম্বর পয়েন্টে চোখ বোলালে পরিষ্কার বুঝতে পারবেন করমন্ডলের সাথে ঘটনার মিল, ১২৬৪৯ সম্পর্ক-ক্রান্তিকেও সিগন্যাল দেওয়া হয়েছিল, যদিও পয়েন্টের গোলমালে রুট সেট হয় নি, কিন্তু প্যানেলে সব ঠিকঠাক দেখাচ্ছিল। ২ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে — প্যানেল স্টাফ সমস্যা ঠিক করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সঠিক নিয়ম মেনে নয়। খেয়াল করে দেখুন করমন্ডলের ক্ষেত্রেও বলা হচ্ছিল সিগন্যাল দিয়েও শেষমুহূর্তে সেটিকে অফ করা হয়। পয়েন্টে সমস্যা থাকলে সিগন্যাল স্টাফ তা সঙ্গে সঙ্গে স্টেশন মাস্টারকে জানাবে, স্টেশন মাস্টার গাড়ির চালককে সতর্কবার্তা দেবেন, গাড়ি পেরনোর পর তার লিখিত অনুমতি নিয়ে কর্মীরা রিলে রুমে ঢুকে ত্রুটি মেরামতি করবে।
দীর্ঘ চার পাতার চিঠিতে হরিশঙ্কর ভার্মা ছত্রে ছত্রে উল্লেখ করেছেন রেল কর্মীরা কিভাবে তাদেরই নিজস্ব নিয়ম কানুন ভাঙছেন, সঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পাঠানো এই চিঠি নিশ্চই রেলমন্ত্রীর অজানা নয়। তাহলে তিনি কেন ব্যবস্থা নিলেন না সব জেনে বুঝে? কেন রেলের শূণ্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া চালু করলেন না? এই প্রশ্নগুলোও তো সিবিআই তদন্তের আওতায় আসা উচিত। তবে আসবে না, কারণ কান টানলে মাথা আসার মত সব উত্তর গিয়ে পৌছাবে নরেন্দ্র মোদীর কাছে। যিনি বন্দে ভারতের নামে আত্মবন্দনায় মগ্ন, রেলমন্ত্রী তো ঠুঁটো জগ্ননাথ।
পারলে চারপাতা চিঠিটা মন দিয়ে পড়বেন, নিজের, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, নাম না জানা সহযাত্রী সকলের জন্যই পড়বেন, আপনাকে আমাকে সকলকেই বন্দে ভারত নয় করমন্ডলের মত কোনো দূরপাল্লার ট্রেন অথবা লোকাল ট্রেনেই চড়তে হবে কিন্তু।


দুর্ঘটনায় আহত নিহতদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুললেন সিবিআই তদন্তের নির্দেশ তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে নয় তো?
বালেশ্বরে ট্রেন দুর্ঘটনার আহত নিহতদের পাশে থাকতে দার্জিলিং সফর বাতিল করলেন মমতা। শেষ পাওয়া খবরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকালেই পৌঁছেগেছেন দুর্ঘটনাস্থলে। আহতদের সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে গেছেন তিনি। উদ্দেশ্য পশ্চিমবঙ্গে মৃত বা আহতদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনার সুব্যবস্থা করা।
গত কালই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, বালেশ্বরে ট্রেন দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৯০ জনের দেহ শনাক্ত করা গিয়েছে। মৃতদের দেহগুলি তাঁদের পরিবার-পরিজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে ইতিমধ্যেই মৃতদের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তার সঙ্গে আহতদের ৫০ হাজার টাকা এবং ট্রমায় যাঁরা রয়েছেন তাঁদের ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আরও ২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাছাড়া মৃতের পরিবারের একজনকে হোমগার্ডে চাকরির ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানিয়েছোন মুখ্যমন্ত্রী।
কিন্তু এখানেই তো ঘটনাক্রম শেষ হচ্ছে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জনানো হয়েছে যে কেন্দ্রিয় সরকার যে দুর্ঘটনা নিয়ে সিবিআই তদন্তর ঘোষণা করেছে, সেটা আদতে রেল দুর্ঘটনা বিষয়ে খবরাখবর যাতে মানুষের কাছে না যায় তার ব্যবস্থা করতে। তিনি জানান এখনও এক যুগ পরেও জ্ঞানেশ্বরী দুর্ঘটনা নিয়ে সিবিআই তদন্ত শেষ হয় নি। তাঁর আশংকা বালেশ্বরে রেলের গাফিলতি লোপাট করতে সিবিআই তদন্তর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রিয় সরকার।
রেলের দুই কর্তার কথোপকথনে শোনা যাচ্ছে যে করমন্ডলের সোজা থ্রু সিগন্যাল ছিল, কিন্তু পয়েন্ট সেট করা ছিল বাম দিকের লুপ লাইনে। রুট রিলে ইন্টারলকিং এর জমানায় এ আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব। এক কর্তা জানতেও চাইছেন এটা কি করে হয়? রেলের রুট রিলে ইন্টারলকিং এর ম্যানুয়াল ঘেঁটে দেখলাম এটা সম্ভব। ইন্টারলকিং এ কোনো মেরামতির কাজ হলে অটোমেটিক সিস্টেম কে বন্ধ করতে হয়, আবার পরে চালু করতে হয় কাজ মিটে গেলে। প্রত্যেক বারেই বেশ কয়েকটি ধাপে এটা করতে হয়, আলো বা ফ্যানের সুইচের মত নয়। এমনকি অটোমেটিক মোডে ফেরত আসার পর বেশ কয়েকটি ট্রেন পাস করার সময় খেয়াল রাখতে হয় যে সিস্টেম ফের ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা।
সম্ভবত বাহানাগা স্টেশনের ইন্টারলকিং এ কিছু কাজ হয়েছিল, কিন্তু পরে অটোমেটিক সিস্টেম ঠিকঠাক রেস্টোর হয় নি বা সঠিক ভাবে কাজ করছে কিনা দেখা হয় নি, করমন্ডল আর যশোবন্তপুর উভয়েরই চালক ও গার্ডকে ওয়াকিটকিতে গতিবেগ কমিয়ে পয়েন্টস পেরোতে বলা উচিত ছিল বাহানাগা স্টেশনের রুট রিলের। রেলের সিগন্যালিং, লোকো পাইলট, ট্র্যাক এসবের বহু বহু পদ খালি। একেক জনের উপর কাজের চাপ প্রচুর, এসব কাজে মানসিক চাপ থাকে, তাই ঠান্ডা মাথায় সাবধানে কাজ করার জন্য বিশ্রাম জরুরি।
বন্দে ভারতের পিছনে টাকা খরচ না করে আর স্টেশনে ঝাঁ চকচকে লবি লাউঞ্জ বানানোর বদলে শূণ্যপদ পূরণ করলে মোদিজী কাজের কাজ করবেন!