সুখেন্দুশেখর রায়
ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্মলগ্ন থেকে বিদেশি লোকজনেরও অবদান রয়েছে। প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম যা সিপাহী বিদ্রোহ নামে অবিহিত, তার সমর্থনে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় কার্ল মার্কসের একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। জাতীয় মহাসভা গঠনের ক্ষেত্রেও অ্যালেন অক্টোভিয়ান হিউমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ ছাড়াও ওয়েডারবার্ন, অ্যানি বেসান্ত, ভগিনী নিবেদিতা প্রমুখ বিদেশি হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয়দের স্বাধীন চেতনা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বরাবর সমর্থন করেছেন। এই প্রসঙ্গে ভারতের সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ডিরোজিও তথা ইয়ং বেঙ্গলের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যদি আরও পেছনে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায় কীভাবে রুখে দাঁড়ান এবং ইংরেজ রাজপুরুষ লর্ড বেন্টিংককে সতীদাহ প্রথা বিলোপের জন্যে আইন প্রণয়নে প্রভাবিত করেন। এমন আরও ভারতপ্রেমী বিদেশিদের সম্পর্কে অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। অবশ্য এমন ইংরেজ লোকজনও ছিলেন, যাঁরা ভারতপ্রেমী হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যের স্বীকার হন। এমনই একজন মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় আলিপুর প্রেসিডেন্সি কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের শাস্তির বিধানে বিপ্লবী মহলে চাঞ্চল্য ছড়ায়। সুশীল সেন নামে এক বিপ্লবী যুবককে প্রকাশ্যে চাবুক মারার নির্দেশ দেন কিংসফোর্ড। এরপর বিপ্লবীরা তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। আইনের একটি বইয়ের সঙ্গে বোমা পার্সেল করে পাঠানো হয় কিংসফোর্ডের বাড়িতে। ভাগ্যক্রমে কিংসফোর্ড বেঁচে যান, সরকার তাঁর পদোন্নতি ঘটিয়ে জেলাশাসক হিসেবে মুজাফ্ফরপুরে বদলি করে। মুজাফ্ফরপুরেও পৌঁছে যান বিপ্লবীরা। এই দুই তরুণ বিপ্লবী হলেন ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু একে অপরের আসল পরিচয় জানতো না। কারণ ক্ষুদিরামের ছদ্মনাম ছিল হরেন সরকার, আর প্রফুল্লের ছদ্মনাম দীনেশচন্দ্র রায়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮, রাত্রি ৮.৩০ মিনিট। মিসেস কেনেডি বাড়ি চলে যেতে চাইছেন। কিন্তু ইউরোপিয়ান ক্লাবে মুজাফ্ফরপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী প্রিঙ্গল কেনেডি তখন জেলা জজ কিংসফোর্ডের সঙ্গে ব্রিজ খেলায় ব্যস্ত। শেষ পর্যন্ত একটি ফিটন গাড়িতে উঠলেন কেনেডি পরিবার। অন্যটিতে কিংসফোর্ড এবং তাঁর স্ত্রী। ক্লাব থেকে বেরিয়ে রাস্তার ডানদিকে মোড় নিতেই প্রবল বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চতুর্দিক। দুর্ভাগ্য বশত, প্রথম ফিটন গাড়িটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ঘোড়ার গাড়ির সহিস, যে ফিটনের পেছনে দাঁড়িয়েছিল, আর প্রিঙ্গল কেনেডির ১৬ বছরের মেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। মিসেস কেনেডি মারা যান পরের দিন হাসপাতালে। ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন। প্রফুল্ল আত্মহত্যা করেন। কিন্তু প্রফুল্লের আসল পরিচয় দীনেশ না-কি প্রফুল্ল তা জানতে পুলিশ প্রফুল্লের মাথা কেটে একটি কাঁচের জারে মদে চুবিয়ে কলকাতায় নিয়ে আসে শনাক্তকরণের জন্য। প্রয়াত ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে-র মতে, প্রফুল্লের মাথার খুলিটি না-কি বামফ্রন্টের আমলেও লালাবাজার পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সে ছিল। কিন্তু সেই সময় তিনি ওই খুলি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলে তা সরিয়ে ফেলা হয়।

স্ত্রী ও কন্যার শোকে প্রিঙ্গল কেনেডি ভেঙে পড়েন। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি তাঁর অসমাপ্ত বই লেখার কাজ আবার শুরু করেন। এই মানুষটি সম্পর্কে যতটুকু খোঁজ নিতে পেরেছি, তা জেনে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি। জন্মলগ্নে কংগ্রেস ছিল জাতীয় মঞ্চ। প্রতিবছর বিশিষ্টজনেরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনও শহরে মিলিত হয়ে রাজনৈতিক মত বিনিময় করতেন। তাই এই সম্মেলনকে বলা হতো জাতীয় সম্মেলন। প্রথম ও দ্বিতীয় সম্মেলন হয় যথাক্রমে বম্বে ও কলকাতায়। তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মাদ্রাজে। ইন্ডিয়ান স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি জাহাজ ভাড়া করে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, প্যারীমোহন মুখার্জি প্রমুখ মাদ্রাজে যান। জাতীয় সম্মেলনে দাবি তোলেন, প্রাদেশিক সমস্যাগুলিও আলোচনা করতে হবে। কিন্তু তাঁরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ক্ষুব্ধ বাংলার নেতৃবৃন্দ এরপর সারা দেশে প্রথম প্রাদেশিক সম্মেলনের আয়োজন করেন কলকাতায়। ১৮৮৮ সালে প্রথম প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতি মনোনীত হন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার। এমন প্রাদেশিক সম্মেলন বাংলায় প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৯০ সালে প্রাদেশিক সম্মেলনের সভাপতি নিযুক্ত হন, মুজাফ্ফরপুরের উকিল প্রিঙ্গল কেনেডি। পরবর্তী সময়ে লখনউয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় মহাসভার অধিবেশনের প্রস্তাবে তিনটি সংশোধন আনেন প্রিঙ্গল কেনেডি। উকিল হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিলই। এবার জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তিনি দেশের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন।
১৮৯১ সাল নাগাদ প্রিঙ্গল কেনেডির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজে যোগদান করেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘাযতীন)। তখন ওকালতি, বই লেখার পাশাপাশি ‘তিরহুত কুরিয়ার’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন প্রিঙ্গল কেনেডি। যতীন্দ্রনাথ তাঁর সংস্পর্শে এসে দেশের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন। তাঁর পত্রিকার সম্পাদকীয়তে কেনেডি সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করতেন। কংগ্রেসের মঞ্চ থেকেও তাঁর প্রতিবাদের ভাষা তরুণ যতীন্দ্রনাথকে খুবই প্রভাবিত করে। ভাবতে অবাক লাগে যে, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা ভারতীয় জাতীয় সেনাদল গড়ার প্রয়োজনীয়তা প্রথম জনসমক্ষে তুলে ধরেন প্রিঙ্গল কেনেডি। কারণ, তখন চীন ও অন্যান্য দেশে ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য বাজেটের বেশিরভাগ টাকা সামরিক খাতে ব্যয় করতো। আর এই টাকার জোগান দিত ভারতীয়রাই। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কেনেডি যতীনকে বলতেন, ‘শুধু সভা সমাবেশ করে কিছু হবে না। আমার জাতটাকে আমি চিনি। সশস্ত্র বিপ্লবই একমাত্র পথ’। কেনেডি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাইচাঁদ-প্রেমচাঁদ স্কলার প্রাপ্ত এম.এ.বিএল। ১৮৮২ সালে এশিয়াটিক সোসাইটিরও সদস্য ছিলেন কেনেডি। ইতিমধ্যে যতীনের মাতৃবিয়োগ হয়। মুজাফ্ফরপুরে তার পক্ষে আর থাকা সম্ভব নয়, জানান কেনেডিকে। কেনেডি তার বন্ধু বাংলার অর্থ সচিব হেনরি হুইলারকে অনুরোধ করেন, যতীনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার জন্য। এরপর ৭ বছর যতীন সরকারি চাকরি করেন (১৯০৩-১৯১০)।
স্ত্রী ও কন্যার মৃত্যু সত্ত্বেও স্কটল্যান্ডে ফিরে যাননি কেনেডি। ১৯১৬ সালে তাঁর প্রথম বই ‘হিস্ট্রি অব দ্য গ্রেট মুঘলস’ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বই ‘অ্যারাবিয়ান সোসাইটি অ্যাট দ্য টাইম অব মহম্মদ’ অল্পদিনের ব্যবধানে দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়। কেনেডির লেখা এই বই দুটি আজও সারা বিশ্বে সমাদৃত। রাজনীতির মঞ্চ থেকে দূরে সরে গেলেও রাজনীতি তাঁর পেছন ছাড়েনি। গান্ধীজির চম্পারণ সত্যাগ্রহের সময় প্রিঙ্গল কেনেডিকে বিহার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত করা হয়। সেই সময় কেনেডি চম্পারণ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যে আইনের খসড়া কাউন্সিলে পেশ করে তার তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯২৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এশিয়াটিক সোসাইটির সভায় প্রাক্তন এই সদস্যের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯৪৮ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ক্ষুদিরাম-প্রফুল্লের স্মৃতিরক্ষার্থে প্রফুল্ল চক ও ক্ষুদিরামের মূর্তি উন্মোচন করেন। মুজাফ্ফরপুরের ইউরোপিয়ান ক্লাব আজও আছে। কিংসফোর্ডের বাংলো আজও আছে। নেই শুধু ভারতবন্ধু প্রিঙ্গল কেনেডির বাসভবন।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত