সময় মানুষের স্মৃতিকে দুর্বল করে দেয়। মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, বেদনার স্মৃতিও হারিয়ে যায়। কারণ গতিশীল এই জীবনে নতুন নতুন ঘটনার প্রবাহ মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অতীত দিনের ঘটনাগুলি ক্রমশ আবছা হয়ে যায়। একেবারে শৈশবের কিছু ঘটনা আবার নিঁখুতভাবে মনে থেকে যায়, যার কোনও ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো এর ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
শেষ থেকেই শুরু করতে চাই। দীর্ঘদিন কোমায় থাকার পর ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর প্রিয়দা ৭২ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে যাত্রা করেন। তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলাম প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী এক বর্ণময় চরিত্র। তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হওয়ার বেশ কয়েক বছরে আগে থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম রাজনৈতিক কারণে, কিন্তু যৌবনে যে মানুষটিকে সারা দেশের যুব কংগ্রেসের নেতৃত্ব করতে দেখেছি, যাঁর বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছি তাঁকে ভুলতে পারিনি। জীবনে প্রথম যদু বাজারের মোড়ে টুলের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছিলাম প্রিয়দার নির্দেশে। যদিও আমি ৭১ নং ওয়ার্ডেই রাজনীতি করতাম, কিন্তু দেওয়াল লেখা, পোস্টার মারা, অবৈতনিক কোচিং চালানো, লোকাল ডেভেলপমেন্ট কমিটি তৈরি করে বস্তি পরিষ্কার এবং কলেরা ইনজেকশন দেওয়ার মত নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতাম। যা প্রিয়দা জানতেন। প্রিয়দা প্রতাপাদিত্য রোডে একটা ছোটো ঘরে থাকতেন। একটা চৌকিতে বিছানা আর তার পাশে রান্নার সরঞ্জাম। খুবই সহজ সরল জীবনযাত্রা দেখেছি প্রিয়দার। এই সময় প্রিয়দা দক্ষিণ কলকাতা যুব কংগ্রেসের সভা ডাকলেন অন্ধ্র হলে। তখন দক্ষিণ কলকাতা জেলা যুব কংগ্রেসের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত বসু এবং গোবিন্দ ঘোষাল। বিশাল কর্মী সমাবেশে আমাকে আহ্বায়ক নিযুক্ত করলেন প্রিয়দা। পরবর্তীকালে মহাজাতি সদনে দক্ষিণ কলকাতা জেলা যুব কংগ্রেসের নির্বাচন হলো। প্রিয়দার প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীকান্ত বসু ও নীরেন চ্যাটার্জির প্রার্থীকে হারিয়ে আমি ১৯৭১ সালে দক্ষিণ কলকাতা জেলা যুব কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হলাম। ১৯৭২ সালে রাজ্য যুব কংগ্রেসের নির্বাচন হলো মহাজাতি সদনে এবং প্রিয়দা আমাকে এবং বীরেন মহান্তিকে সাধারণ সম্পাদক এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। বার্লিনে বিশ্ব যুব উৎসবেও আমাকে পাঠিয়েছিলেন প্রিয়দা। সমগ্র পশ্চিমবাংলায় প্রতিটি জেলায় প্রিয়দাই তৎকালীন নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলেছিলেন যাঁরা পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ জেলায় নেতৃত্ব করেছিলেন। সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে প্রিয়দার কংগ্রেস রাজনীতিতে কী বিপুল প্রভাব তা দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। গুণ্ডুরাও, মহেশ যোশী, এক কে অ্যান্টনি, ওমানচণ্ডী, বাবা মিশ্র, হরিন্দার সিং-এর মতো নেতারা মুগ্ধ ছিলো প্রিয়দার নেতৃত্বে। যাঁদের নাম উল্লেখ করলাম তাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রদেশে হয় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন অথবা রাজ্যের দায়িত্বশীল মন্ত্রী হয়েছেন। পশ্চিমবাংলাতেও আজ আমাদের সকলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুব নেতৃত্বের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল এবং তাঁদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলছেন যাতে পরবর্তীকালে রাজ্যের দায়িত্ব তাঁরা গ্রহণ করতে পারেন।
১৯৭১ সালে প্রিয়দা বিপ্লবী গণেশ ঘোষকে পরাজিত করে প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীকালে কেন্দ্রের বাণিজ্য মন্ত্রী হন। ১৯৮৫ সালে প্রিয়দা পরিষদীয় মন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছিলেন।
প্রিয়দা রাজ্যের সকল কংগ্রেস নেতৃত্বের নজরে আসেন ছাত্রনেতা হিসেবে। সুদূর রায়গঞ্জ থেকে এসে কলকাতায় নেতা হয়েছিলেন অসাধারণ বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক শক্তির জোরে। দীর্ঘ ২০ বছর অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন এবং একমাত্র ভারতীয় যিনি ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ কমিশনার হয়েছিলেন।
আমার মনে পড়ে যায় শঙ্কর চক্রবর্তীর কথা। আমি রায়গঞ্জ গিয়েছি যুব কংগ্রেসের সভা করতে। শঙ্কর বলল, এই জেলায় প্রিয় ছাড়া কারও সভা করার অধিকার নেই। তখন গল্পোচ্ছলে বলেছিল শঙ্কর যে, ওকে আমিই কংগ্রেসে এনেছি এবং এনসিসি-তে ঢুকিয়েছি। কিন্তু প্রিয়ই আমার নেতা। আমি উঠেছিলাম শঙ্করের বাড়িতেই। ও জেলা যুব কংগ্রেস সভাপতি ছিল। পরে অবশ্য আমার কথায় সভা করতে দিয়েছিল। প্রিয়দার সঙ্গে সুব্রতর সম্পর্ক ছিল মজার। দিনের বেলা কোনও কারণে ভীষণ ঝগড়া হলো, রাত্রে সুব্রতর বাড়িতে গিয়ে দেখি একই বিছানায় দু-জনে দু-দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। একবার কুমুদ ঘোষণা করল ছাত্র পরিষদ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, জাতীয় কংগ্রেসের নির্দেশে নয়। প্রিয়দার সঙ্গে প্রবল ঝগড়া হলো। কুমুদ আর দল করবে না বলে বাড়ি চলে গেল। পরদিন সকালে সুব্রতর বাড়িতে মজা করে কুমুদের শহিদবেদি করে মালা দেওয়া হলো। প্রিয়দা ফোন করে আমাকে বলল, কুমুদকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমি গিয়ে বোঝাবার পর সব ঠিক হলো। আমার মনে আছে, মাঝে মাঝেই প্রিয়দার বাড়িতে আড্ডা হতো। হাসিঠাট্টা চলত কয়েক ঘণ্টা করে। আমি এবং আমার স্ত্রী সুপ্রিয়া প্রিয়দার পরিবারের সকলের কাছে খুবই প্রিয় ছিলাম। প্রিয়দার বাড়ির সরস্বতী পুজোর পুরোহিত ছিলাম আমি। প্রিয়দার বিয়েতে (রেজিস্ট্রি) সৌগত, সুদীপ, আমি আর সুপ্রিয়া সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলাম।
সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে প্রিয়দার বিশাল সাফল্য দেখেছিলাম দিল্লিতে বোট ক্লাবের সভায়। লক্ষ লক্ষ যুবক এসেছিল সেই সভায়। সভায় সঞ্জয় গান্ধী উপস্থিত ছিলেন। অনেকে বলে, জমায়েতের সাফল্যই প্রিয়দার পক্ষে বিপদের কারণ হয়েছিল।
শেষ করব প্রিয়দার সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেস সভাপতি হবার ঘটনা দিয়ে। ইন্দোরে সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন। ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন প্রিয়দাই সভাপতি হন, কিন্তু কমলাপতি ত্রিপাঠীর ছেলে মায়াপতি দুপুরে সভাঘরে ঢুকল কর্মীদের কাঁধে চড়ে। এসেই মাইক নিয়ে প্রিয়দাকে অপমানজনক কথা বলতে শুরু করল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এভাবে সভা চলতে দেবো না। প্রথমে বাধা দিলাম স্লোগান দিয়ে কিন্তু যখন কিছু হলো না তখন আমরা পঞ্চাশ-ষাট জন ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যে মায়াপতি ত্রিপাঠীর ছেলেরা পালিয়ে গেল। প্রিয়দা সর্বসম্মত সভাপতি হলেন কিন্তু ঘোষণা হলো না। পরবর্তীকালে দিল্লি থেকে প্রিয়দার নাম ঘোষণা হলো সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে।
অনেক কথা মনে আসে, কিন্তু সব কথা লিখলে এক অতি দীর্ঘ রচনা হবে তাই এখানেই শেষ করার আগে আবারও বলি, সময় মানুষের স্মৃতিকে দুর্বল করে কিন্তু সাংস্কৃতিক মনষ্ক, বাগ্মী, প্রাণচঞ্চল ও বিশিষ্ট সংগঠক ছিলো প্রিয়দা যাঁর কথা চিরদিন মনে থাকবে।