শুক্রবার দুপুরে কোভিড প্রটোকল মেনে ভবানীপুর বিধানসভা উপনির্বাচিনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হলেন প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল৷ এ দিনই বিজেপি-র পক্ষ থেকে প্রিয়াঙ্কার নাম ঘোষণা করা হয়েছে৷
আগামী একমাস যে রাজ্য রাজনীতির নজর থাকবে ভবানীপুরে তা বলাই বাহুল্য। কারণ এই উপনির্বাচনের ফলাফল থেকেই নির্ধারণ হবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর। প্রসঙ্গত, চার মাস আগে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। যদিও সেই ফলাফল নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা চলছে। তবু নিয়ম অনুসারে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকতে হলে তাঁকে ছ’মাসের মধ্যে কোনও একটি কেন্দ্র থেকে জিতে আসতে হবে।
অনেক টালবাহানার পর ভবানীপুর-সহ আরও দুই কেন্দ্রে নির্বাচনের কথা জানায় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন ভবানীপুর কেন্দ্রের দিন ঘোষণা করতেই তৃণমূলের তরফে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যেমন ঘোষণা করা হয়, পাশাপাশি কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই মমতার হয়ে জোর কদমে প্রচারে নেমে পড়ে তৃণমূল। কিন্তু রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল প্রার্থী ঘোষণা করে উঠতে হিমসিম খাচ্ছিল। কে দাঁড়াবে? দিলীপ ঘোষ শাক দিয়ে মাচ ঢাকার চেষ্টা করলেন। পারলেন কৈ? সে যাক, বিজেপির তরফে নাকি কেউ প্রার্থী হতে চাইছিলেন না। তবে শেষমেশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী খুঁজে পেল। নাম ঘোষণা করল- প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল। পেশায় আইনজীবী প্রিয়াঙ্কা এই কয়েক মাস আগে হয়ে যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন এন্টালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। তিনি ৫৮,২৫৭ ভোটের ব্যবধানে তৃণমূলের স্বর্ণকমল সাহার কাছে হেরে যান। তার আগে ২০১৫ সালের কলকতা পুরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের স্বপন সমাদরের কাছে হেরে যান ১৯,১৩৪ ভোটে।
তবু সবদিক চিন্তা করেই প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের নামে শিলমোহর দিয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাঁরা মনে করছেন, যেখানে কেউই মমতার বিরুদ্ধে লড়াইতে নামতে রাজি হচ্ছেন না সেখানে প্রিয়াঙ্কাই যথেষ্ট। তাছাড়া বিজেপি নাকি এই কেন্দ্রে একজন মহিলা প্রার্থীর কথাই ভাবছিল। ভবানীপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে এই আইনজীবীর নাম নাকি শুভেন্দু অধিকারীও বলেছিলেন। এ বিষয়ে শাহ-নাড্ডার সঙ্গে আলোচনা করতে তিনি দিল্লি পৌঁছেছিলেন। তারপরই নাকি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শিলমোহর দিয়েছে। এছাড়া ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে প্রিয়াঙ্কার আইনি লড়াইটাও মনে রেখেছে তাঁর দল। কখনও সুপ্রিম কোর্ট তো কখনও কলকাতা হাইকোর্টে মামলা লড়েছেন।
ভবানীপুরে প্রিয়াঙ্কাকে জেতাতে গুরু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অর্জুন সিংকে। তাঁকে সাহায্য করবেন সৌমিত্র খাঁ এছাড়া অন্যান্য সহকারী তো আছেই। কিন্তু বিজেপির কেউই যেখানে মমতার বিরুদ্ধে লড়তে রাজি হলেন না, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালকেই প্রার্থী করল বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব৷ প্রশ্ন, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের মতো ভবানীপুরের উপনির্বাচনেও কি প্রার্থী নিয়ে নিজেদের পছন্দ রাজ্য নেতাদের উপরে চাপিয়ে দিলেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা? নাকি কেউই যখন জেনে বুঝে গো হারা হারতে রাজি নয় তখন লড়াইয়ে মহিলা প্রার্থীকেই এগিয়ে দিল বিজেপি?
কলকাতা হাই কোর্টের অ্যাডভোকেট প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল বাবুল সুপ্রিয়োর আইনি উপদেষ্টাও ছিলেন। ২০১৪ সালে মোদী ঝড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। শুরুতেই দলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করেছেন। ছ’বছর পর, ২০২০ সালের আগস্টে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার (বিজেওয়াইএম) সহ-সভাপতি করা হয়। ওয়েল্যান্ড গোল্ডস্মিথ স্কুল, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক প্রিয়াঙ্কা হাজরা ল কলেজ থেকে আইন ডিগ্রি পেয়ে প্র্যাকটিস করেন।
গুঞ্জন উঠেছিল, নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে আবার ভোটে লড়বেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। রাজ্য সভাপতি দীলিপ ঘোষ, জানিয়ে দেন শুভেন্দু প্রার্থী হবেন না। আলোচনায় ছিল রুদ্রনীল ঘোষের নামও। শেষবেলায় দৌড়ে কিভাবে এগিয়ে গেলেন এই তরুণ আইনজীবী? বিজেপি-র তাবড় নেতাই ভবানীপুরে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন৷ সেখানে ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী হিসেবে প্রিয়াঙ্কার নাম গত দু-তিন দিন ধরেই হাওয়ায় ভাসছিল৷ গত দু-দিন ধরে ফেসবুকে কার্যত ভবানীপুরে উপনির্বাচনের জন্য নিজের সমর্থনে প্রচারও শুরু করে দিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা৷ এ নিয়ে প্রশ্ন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে প্রশ্ন করা হলে তাঁর জবাব ছিল, ‘প্রতিপক্ষ যেখানে মুখ্যমন্ত্রী সেখানে যাকে তাকে প্রার্থী করা যায় না৷’ শুধু তাই নয়, বিজেপি রাজ্য সভাপতি এও জানান, প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের নাম দিল্লির কাছে পাঠানোও হয়নি৷ ধরেই নিতে হয় নিশ্চিতভাবে যখন কেউই হারতে রাজি হননি তখন মহিলা প্রার্থী হেসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সেই প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালকেই প্রার্থী করল বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব৷
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে এখানে তৃণমূল প্রার্থী জিতেছে অন্তত ২৫ হাজারের বেশি ভোটে। প্রিয়াঙ্কা কি এবার তার ব্যতিক্রম ঘটাবেন। বরং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হিসাবে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে একটা রেকর্ড তৈরি করবেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ।
২০১১ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি পেয়েছিলেন ৮৭ হাজার ৯০৩ ভোট। তিনি সিপিএমের নারায়ণ প্রসাদ জৈনকে হারিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ৯৩৬ ভোটে। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে জিতে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময়ে তিনি ছিলেন সাংসদ। উপনির্বাচনে তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রটিকেই বেছেছিলেন। প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে তিনি সিপিএম প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায়কে ৫৪ হাজার ২১৩ ভোটে হারান। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটেও এই কেন্দ্রেই প্রার্থী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেবারও তিনি কংগ্রেস জোটের প্রার্থী দীপা দাশমুন্সিকে ২৫ হাজার ৩০১ ভোটে হারিয়েছিলেন। এবারও যে মমতা বড় ব্যবধানেই জিতবেন সেকথা বিজেপিও জানে, তবে কত ভোটে প্রিয়াঙ্কা হারবেন সেই অঙ্ক কষছে তৃণমূল।